মহাকর্ষের মহা গাথা

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
1,857 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

 

কিছুদিন আগের ঘটনা। আমার এক খুদে আত্মীয় খুব চিন্তিত গলায় ফোন করে জিজ্ঞেস করল – “আচ্ছা! নিউটনের আগে কি কেউ গাছ থেকে আপেল পড়তে দ্যাখে নি ?”
– “ওমা! দেখবে না কেন?”  বললাম আমি।
– “সেটাই তো বলছি! তাহলে সবাই কেন বলে মহাকর্ষ নিউটনই প্রথম আবিষ্কার করেছেন?” বলেই  ফোনটা ওর মায়ের  হাতে  দিয়ে হনহনিয়ে খেলতে চলে গেল।

যেটা সেদিন ওই বছর সাতেকের পুঁচকি বন্ধুকে বোঝানোর সুযোগ পাই নি (ভাগ্গিস!) তা হল, নিউটন যদি গাছ থেকে আপেল পড়তে দেখেই মহাকর্ষ বলের তত্ত্ব দিয়ে দিতেন, তাহলে সেটা হত নিছক একটা অনুমান মাত্র, আবিষ্কার নয়। আজ আমাদের আড্ডায় থাকছে সেই স্যার আইজ্যাক নিউটন প্রদত্ত মহাকর্ষের সার্বজনীন সূত্র। আমরা দেখবো কোন যাদুবলে গাছের আপেল থেকে সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-তারা সবাই এই ‘আকর্ষণীয়’ বিজ্ঞানের ইশারায় চলছে। তবে তার আগে একটু দেখে নেওয়া যাক, নিউটনের  আগে বিজ্ঞান মহলে মহাকর্ষ সম্পর্কে আদৌ কোনো ধারণা ছিল কিনা!

একদম গোড়ার দিকে, মহাকর্ষ সম্পর্কিত আলোচনার সূচনা হয় মূলতঃ জ্যোতির্বিদ্যার হাত ধরে। খ্রীষ্টের জন্মের বহু শতাব্দী আগে থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের দার্শনিক – জ্যোতির্বিদদের আলোচনার বিষয় ছিল দু’টি বস্তুর মধ্যস্থিত আকর্ষণ বল। আনুমানিক তৃতীয়  খ্রীস্ট পূর্বাব্দ তখন, এরিস্টটল ও টলেমির ভূ-কেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণা অনুযায়ী সে সময় মনে করা হত পৃথিবী স্থির, সূর্য ও অন্যান্য গ্রহগুলো পৃথিবীর চারপাশে প্রদক্ষিণরত। এই রকম একটি সময়ে দাঁড়িয়ে গ্রীক দার্শনিক এরিস্টার্কাস অফ সামোস ( ৩১০-২৩০ খ্রীস্ট পূর্বাব্দ) সর্বপ্রথম সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণা দেন। তিনিই প্রথম বলেন যে সমস্ত গ্রহগুলি সূর্য নামক একটি জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ডের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে। উপরন্তু সূর্যের চারপাশের গ্রহগুলির আনুমানিক সঠিক একটা ক্রমও নির্ধারণ করেন তিনি। কিন্তু অতি রক্ষণশীল ভূ-কেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণাসম্পন্ন ‘শিক্ষিত’ সমাজের ভ্রূকুটি তাঁর এই তত্ত্বকে সমূলে উৎখাত করে।

এর পর প্রায় ১৮০০ বছর কেটে গেছে। নিকোলাস কোপার্নিকাসের (১৪৭৩-১৫৪৩ খ্রীস্টাব্দ) হাত ধরে সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণা আবার এক বার নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হল। এর কিছু পরেই আমরা পেলাম জার্মান জ্যোতির্বিদ জোহানেস কেপলারকে (১৫৭১-১৬৩০ খ্রীস্টাব্দ)। ডেনমার্কের  বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহের (১৫৪৬-১৬০১ খ্রীস্টাব্দ) (ইতিহাস এনাকে আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার জনক হিসেবে মনে রেখেছে। উল্লেখ্য, ইনিই শেষ জ্যোতির্বিদ, যিনি খালি চোখে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করতেন) গ্রহ নক্ষত্র সম্বন্ধীয় বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কেপলার তিনটি গতি সূত্রের উপস্থাপনা করেন। এই গতি সূত্রগুলির পরবর্তী ধাপ হিসেবেই  আমরা  নিউটনকে ভবিষ্যতে মহাকর্ষের সার্বজনীন সূত্রে উপনীত হতে দেখবো।

তবে সেখানে ঢোকার আগে কেপলারের গতিসূত্র নিয়ে দু-এক কথা বলা প্রয়োজন। কেপলারের সূত্র থেকেই আমরা জানতে পারি, পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগুলি সূর্যের চারপাশে একটা উপবৃত্তাকার পথ বরাবর প্রদক্ষিণ করে, এবং সূর্য এই উপবৃত্তের একটি নাভিতে অবস্থান করে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, একটি উপবৃত্তের দু’টি নাভি থাকে। সূর্য এই দু’টি নাভির মধ্যে যে কোনো একটিতে অবস্থান করতে পারে। এছাড়াও সূর্যের চারপাশে একটি গ্রহের প্রদক্ষিণ করতে যে সময় লাগে ও তার গতিবেগের সঙ্গে কক্ষপথের আকৃতির কি সম্পর্ক, সে সব আমরা কেপলারের এই তিনটি সূত্র থেকেই জানতে পারি। তবে এসব তো পাওয়া গেল পুরোনো তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে। কিন্তু, কি এমন ঘটছে যার জন্যে গ্রহগুলিকে নিয়ম মাফিক পাক খেতে হচ্ছে ?  সেই উত্তর পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে নিউটনের জন্য।

সেই সূত্রে আসার আগে আরো একবার থামতে হবে আমাদের। টেলিস্কোপের আবিষ্কর্তা ইতালির প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ গ্যালিলিও গ্যালেলির (১৫৬৪-১৬৪২ খ্রীস্টাব্দ) কথা এখানে একটু বলে না নিলে ভারী অন্যায় হবে।  কিন্তু তার আগে একবার মনে করে নেওয়া যাক, কি কি জানলাম আমরা এতক্ষণ? সব গ্রহরা সূর্যের চারদিকে ঘুরছে, তাই তো? কিন্তু গ্যালিলিওর কাছেই আমরা প্রথম খোঁজ পাই বৃহস্পতির উপগ্রহের।  অর্থাৎ? সূর্যই একমাত্র বস্তু নয় যার চারপাশে ঘুরপাক খাওয়া যায়।  তবে কি শুধু এটুকুই? সেই যে এরিস্টটলের কথা বলেছিলাম, যিনি ভূ-কেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণায় বিশ্বাস করতেন, তিনি একসময় বলেছিলেন কোনো বস্তুকে ওপর থেকে নিচে ফেললে সেটি যে বেগে নিচে পড়বে, তা হল বস্তুটির ভরের সঙ্গে সমানুপাতিক। অর্থাৎ ভারী বস্তু হালকা বস্তুর থেকে আগে মাটিতে পড়বে। কিন্তু গ্যালিলিওই প্রথম বলেন, একটি ভারী ও হালকা বস্তু এক সঙ্গে উপর থেকে ফেলা হলে (যদি বাতাস না থাকে) তারা একই সঙ্গে মাটি স্পর্শ করবে, যা এরিস্টটলের পুরনো তত্ত্বকে খারিজ করে। শোনা যায়, পিসার হেলানো মিনার থেকে তিনি এই পরীক্ষাটি করেছিলেন। তবে ইতিহাসবিদরা এটিকে চিন্তন পরীক্ষা বা অনুমান তত্ত্ব হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন।

নিউটন তখন কেম্ব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের ছাত্র। বয়েস তেইশ কি চব্বিশ। ১৬৬৫-১৬৬৭ -র মধ্যে ইংল্যান্ডে হানা দিল মারণ প্লেগ। মহামারীর প্রকোপে ইউনিভার্সিটিতে তালা ঝুললো। লাইব্রেরী, ক্লাস সব বন্ধ। এখনকার মত কম্পিউটার ক্লাসঘর তখন আর কোথায়? বাক্স প্যাটরা গুছিয়ে তিনি ফিরে এলেন উলস্ট্রপের বসত বাড়িতে। কিন্তু মস্তিষ্ক কি আর বন্দী জীবন সইতে পারে? মাথার কোন বন্ধ প্রকোষ্ঠের চাবি তাঁর হাতে এল কে জানে! মাত্র এক দেড় বছরের মধ্যেই নির্মাণ করলেন আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর, তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা কাজগুলির মধ্যে দিয়ে। এই আবিষ্কারগুলি ভবিষ্যত পদার্থবিদ্যা ও অঙ্কের দুনিয়ার নতুন পথ খুলে দিল।  মহাকর্ষের ধারনাটিও এই সময়েই প্রথম ওনার মাথায় বাসা বাঁধে, যার ফলস্বরূপ কয়েক বছর পর আমরা পেয়ে গেলাম মহাকর্ষের সার্বজনীন সূত্র ( ১৬৬৬ সালটিকে নিউটনের অলৌকিক বছরও বলা হয়। মহাকর্ষ ছাড়াও এই ছোট্ট  সময়কালেই উনি সাদা আলো, কলনবিদ্যা ও গতি সূত্র সম্পর্কিত  বিভিন্ন আবিষ্কার   করেছেন। এরকম আরেকটা আলৌকিক বছর এসেছিল ১৯০৫ সালে, আইনস্টাইনের জীবনে)। ১৬৮৭ সালে ল্যাটিন ভাষায় ওনার নিজের লেখা প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমাটিকায় আমরা প্রথম এই সর্বজনীন সূত্রের হদিশ পাই।

এই সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, মহাবিশ্বের যে কোনও দু’টি বস্তু (বা ভর) একে অপরকে আকর্ষণ করে, এবং এই আকর্ষণ বল ওই দু’টি ভরের গুনফলের সঙ্গে সমানুপাতে এবং ওদের পারস্পরিক দূরত্বের বর্গের সাথে ব্যাস্তানুপাতে পরিবর্তিত হয়। এই সূত্রে আমরা পেয়ে যাই ‘G’ নামক একটি ধ্রুবককে, যাকে আমরা মহাকর্ষীয় ধ্রুবক বলে ডেকে থাকি । এই ‘G’ এর মান রণে, বনে, ধাপার মাঠে কিংবা দূরের কোনও গ্যালাক্সিতে, সব জায়গায় সমান, এক চুলও নড়চড় হবার জো নেই।

কিন্তু তাতে কি?  কি এমন আছে এই পুঁচকে সূত্রটায় যা আগে কেউ দেখে নি? ঐন্দ্রজালিক যেভাবে জাদু ছড়ি ঘুরিয়ে চোখের পলকে রাশিকৃত মুক্তো থেকে মালা বানিয়ে তাক লাগিয়ে দেন, এই সূত্রের অঙ্গুলিলেহনে তেমন ভাবেই এক সুতোয় গেঁথে যায় সমগ্র মহাবিশ্ব। আমরা জানলাম, এই সূত্রের নিয়ম মেনেই আপেল মাটিতে পড়ে, গ্রহরা নিজের কক্ষে প্রদক্ষিণ করে, জোয়ার-ভাটা, চন্দ্র-সূর্য গ্রহণ হয়। এই নিয়মে ফাঁকি দেওয়ার জো কারো নেই। মহাবিশ্বের যে কোনও ভর, রাঘব বোয়ালই হোক বা চুনোপুঁটি, এই সূত্রের সামনে সবাই সমান। তাই তো এ ‘সার্বজনীন’। এই ‘সার্বজনীন’ সূত্রের খোঁজই প্রথম দেন নিউটন।

এতক্ষণ বেশ চলছিল। কিন্তু একটা ছোট খটকা থেকে গেল। কোনো গ্রহ যখন সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে, প্রত্যেকবার ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে সেই কক্ষপথও একটু একটু করে সরে যেতে থাকে। অর্থাৎ কক্ষপথের যে কোনো একটা বিন্দু থেকে যদি আমরা যাত্রা শুরু করি, একবার সূর্যকে পুরো চক্কর লাগানোর পর আবার সেই বিন্দুতেই ফিরে আসা আর সম্ভব হবে না। এছাড়া আমরা তো এতক্ষণে জেনেই ফেলেছি, সূর্যের চারদিকে গ্রহের কক্ষপথ আসলে উপবৃত্তাকার, যার ফলে গ্রহটি সমসময় সূর্য থেকে সমদূরত্বে থাকে না। যখন কোনো গ্রহ সূর্যের সবচেয়ে কাছে অবস্থান করে, কক্ষপথের সেই অবস্থানকে বলে অনুসূর বিন্দু। প্রত্যেকবার প্রদক্ষিণের সাথে সাথে এই অনুসূর বিন্দুও একটু করে সরে যেতে থাকে এবং এই সরে যাওয়ার পরিমাণও আমরা নিউটনের সূত্র কষেই পেতে পারি। কিন্তু বুধ গ্রহের ক্ষেত্রে এসব মাপজোখ করে হিসেবে একটু গরমিল পাওয়া গেল। ১৮৯৮ সালে দেখা গেল, প্রতি ১০০ বছরে বুধের অনুসূর বিন্দু যে পরিমান সরে আসে তার মান নিউটনের সূত্র কষে পাওয়া মানের থেকে ৪৩” বেশী (এক ডিগ্রী কোণকে ৩৬০০ ভাগ করলে তার এক ভাগের মাপ হল ১”, তাই বোঝাই যাচ্ছে পার্থক্যটা আসলে ভীষণই কম)। তবে এই ছোট্ট ফাঁকটা নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র কিছুতেই মেলাতে পারলো না।

যেমন করে খাবারে একটু নুন কম হলে পরে স্বাদ মতো মিশিয়ে দেওয়া যায়, সেরকমই চেষ্টা চলতে থাকলো বিজ্ঞানীমহলেও, নিউটনের সার্বজনীন সূত্রে কিছু ছোটখাটো সংশোধন করে যদি অঙ্কের হিসেব মেলানো যায়। কিন্তু প্রায় দু’ই শতাব্দী ধরে চেষ্টা করার পরেও এর সুরাহা হল না।

১৯০৫ সাল তখন। আমরা পেয়ে গেছি অ্যালবার্ট আইনস্টাইনকে। ততদিনে তিনি বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব আবিষ্কার করে ফেলেছেন ও আক্ষরিক অর্থেই স্থান-কাল এক করে দিয়েছেন। এর আগে অব্দি আমরা শুধু ত্রি-মাত্রিক মহাবিশ্বেরই কল্পনা করতে পেরেছিলাম যা কেবল বস্তুর স্থানীয় অবস্থান নিয়েই কথা বলতো। আইনস্টাইনই প্রথম বললেন, না হে! মহাবিশ্বে কোনও বস্তুর সঠিক অবস্থান জানতে হলে স্থানের সাথে কাল বা সময়ের হিসেবও জানতে হবে বৈকি! এটাকে আমরা একটা চতুর্মাত্রিক জ্যামিতি হিসেবে ভাবতে পারি ( ত্রিমাত্রিক স্হান + সময়) ।

কিন্তু মহাকর্ষের অঙ্কে উনি কি এমন বদল করলেন যাতে না মেলা অঙ্কগুলো এবার ঝট করে মিলতে শুরু করলো? নিউটনের সূত্রের নতুন কোনো সংশোধন কি? একদমই না! একেবারেই  ‘হ জ ব র ল’ ব্যাপার করলেন উনি , ছিল রুমাল – হয়ে গেল বিড়াল। এতদিন যে মহাকর্ষকে আমরা ‘বল’ বলে ডাকছিলাম, উনি বললেন – বল কোথায়? এ তো স্থান – কালের জ্যামিতির কারসাজি !!

ব্যাপারটা একটু খুলে বলি। একটা রুমালকে চার পাশ থেকে টানটান করে ধরে রাখলে রুমালের তলটা একদম সমান থাকে। এখন এই রুমালের ওপর একটা পয়সা রাখলে কি হবে? যেখানটায় পয়সাটা রাখলাম সেখানে রুমালটা একটু গর্ত হয়ে যাবে। তাহলে রুমালটা আর পুরো সমতল থাকলো না, তাই তো? এবার যদি আমি আরেকটা পয়সা রুমালে রাখতে চাই, দেখতে পাব দ্বিতীয় পয়সাটা আগের ওই সামান্য ঢুকে থাকা অংশটার দিকেই যেতে চাইছে। এরকম ভাবে প্রথম পয়সাটার বদলে একটা ভারী বাটখারা ওই রুমালে রাখলে ভরটা রুমালের তলে আরো অনেকটা বেশী গর্ত করতে পারবে। তখন হয়তো দেখা যাবে, দ্বিতীয় পয়সাটা হুড়মুড়িয়ে বাটখারাটার গায়ে গিয়েই পড়ছে।

১৯১৫ সালে আইনস্টাইন প্রথম বলেন, ভর আসলে একটা সমতলের আশেপাশের জ্যামিতিকে বাঁকিয়ে দিতে পারে, যার ফলস্বরূপই আরেকটা ভর ওটার কাছাকাছি আসতে চায়। অন্যভাবে বললে, উনি দু’টো ভরের মধ্যেকার আকর্ষণ বলটাকে একটা চতুর্মাত্রিক তলের দোমড়ানো মুচড়ানো জ্যামিতি বলে চিহ্নিত করলেন। এই তত্ত্ব সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ নামে পরিচিত হল। তবে মনে রাখতে হবে, যদিও এর নামে আপেক্ষিকতাবাদ আছে, তবু এটি কিন্তু বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের কোনও সংশোধন নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য তত্ত্ব, যার আধার চতুর্মাত্রিক স্থান কালের জ্যামিতি। ভবিষ্যতে আমরা দেখবো, মহাকর্ষের এই নতুন সংজ্ঞা কি করে আমাদের জানার পরিধিকে বাড়িয়ে বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে সে গল্প অন্য এক দিনের জন্য থাক।

আমরা বরং একটু দেখে নি, এত বড় এই মহাকর্ষ কাহনের সারবত্তা কি? এতক্ষণে আমরা এটুকু তো বুঝেছি যে নিউটন এবং আইনস্টাইন একই চিত্রকে দু’ভাবে এঁকেছেন, দু’টো ধারণা সম্পূর্ণভাবেই স্বাতন্ত্র্য। যদিও বৃহত্তর ক্ষেত্রে আইনস্টাইনের তত্ত্বই বেশী গ্রহনযোগ্য, তবুও পার্থিব জীবন যাপনে নিউটনের সার্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র অনেক সহজ সরল উপায়ে আমাদের একই সত্যে পৌঁছে দিতে সক্ষম। মহাজাগতিক পরিসরে নিউটনের সূত্রের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও, জাগতিক কার্যকলাপ – তা সে বাড়ি, ঘর, সেতু বানানোই হোক, আর ভূপতিত আপেলের ওপর পৃথিবীর আকর্ষণই হোক – সব জাগতিক প্রশ্নের উত্তরই আমরা পেয়ে যাই নিউটনের সার্বজনীন মহাকর্ষ সূত্রে। আবার উল্টোভাবে বললে, আইন্সটাইনের তত্ত্বকে কিছু সীমিত পরিসরে বেঁধে দিলে, আমরা সেখান থেকে নিউটনের তত্ত্বকে খুঁজে পাব।

“নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র কি তাহলে ভুল?”
–  কখনো এ প্রশ্নের সম্মুখীন হলে উত্তরটা মনে হয় এখন আমরা নিজেরাই দিতে পারব – কি তাই তো ?

 

 

—————————–

~ কলমে এলেবেলে চিরশ্রী ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

20 thoughts on “মহাকর্ষের মহা গাথা

  • September 1, 2020 at 6:23 am
    Permalink

    দারুণ লেখা। বিশেষ করে গদ্য ,তড়তড়িয়ে এগিয়ে চলেছে । দুটো বানান শুধরে নিলে ভালো হয় । এক) নিউটনের বয়েস তেয়িশ না করে তেইশ বাঞ্ছনীয়। দুই) সার্বজনীন নয়। হয় সার্বজনীক বা সর্বজনীন।

  • September 1, 2020 at 7:51 am
    Permalink

    ধন্যবাদ । সাথে থাকবেন । ' তেইশ ' বানান টি শুধরে নেওয়া হয়েছে । ' সার্বজনীন ' –
    এই শব্দ টি আমরা বেশ কিছু জায়গায় পেয়েছি ।

  • September 2, 2020 at 7:28 pm
    Permalink

    খুব ভাল উপস্থাপন। আর নতুন নতুন তথ্য r অপেক্ষা করছি।

  • September 3, 2020 at 9:07 am
    Permalink

    এটি গ্রীক নাম। বিভিন্ন লোকের মুখে এই উচ্চারণ বিভিন্ন হয়েছে। কেউ বলেন এরিস্টারটাস, কেউ অ্যারিস্ট্রাখোস, আবার অ্যারিস্টারচাসও শোনা যায়। এভাবেই শুনে থাকবেন ডি ব্রগলি বা দ্য ব্রয়। নিউট্রিনো বা নয়ট্রিনো। ইংরেজি শব্দের ক্ষেত্রেও কেউ অ্যাটিচিউড দেখায়, কেউ অ্যাটিটিউড।

    বাঙালী নামেও যেমন রবীন্দ্রনাথ কখনো ঠাকুর হন কখনো টেগোর, সেইরকমই এরিস্টারটাস উচ্চারণটিও প্রচলিত।

  • September 3, 2020 at 6:35 pm
    Permalink

    দয়া করে আপনার তথ্যর সূত্র দেবেন (ইতিহাসও কিন্তু গবেষণার বিষয়) … বিজ্ঞান-এর ইতিহাসের অনেক বই এবং ভিডিও-তে এরিসটারকাস উচ্চারণ-তা স্পষ্ট ভাবেই দেয়া আছে, তা না হলে লিখতাম না … চোখের পড়লো তাই লিখলাম … অনেকে অনেক কিছু বলে মানেই যে সেগুলো ঠিক, তা কিন্তু নয় … যারা নিউট্রিনো কে নয়ট্রিনো বলেন, তারা সঠিক উচ্চারণ করছেন না, … ফ্রান্স-এ গিয়ে ডি ব্রগলি বললে তারা বুঝবেন না কার কথা বলছেন, কারণ সেটা সঠিক উচ্চারণ নয় … (একটু মজা করে বলি: ঠিক যেমন গোভিনদা কিন্তু গোবিন্দ নন) … যারা ঠিক উচ্চারণটা জানিনা তারা ওরকম বলি হয়তো … আর গর্বিত বাঙালি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ সবসময় ঠাকুর … কোনো দ্বিধা নেই … ব্রিটিশ রা উচ্চারণ করতে পারতেন না বলে নিজেদের মতন বানিয়েছেন, কিন্তু সেটা ঠিক নয় … তখন ওনারাই সমাজ-এর নিয়ম বানাচ্ছেন, কোনো অন্যথা ছিলনা, কিন্তু এখন আছে … আমাদেরও হয়তো ফরাসিদের মতন এই ক্ষেত্রে সঠিক উচ্চারণে একটু জোর দেয়া উচিত … ঠাকুর কে ঠাকুর বলতে সেখানো উচিত বাকি বিশ্বকে (অনেক হয়েছে কলোনিয়াল হ্যাংওভার-এ থাকা … এর বাইরে বেরোনোর জন্যেই কিনা বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা … তাই এই উদাহরণ-এ খুব অবাক হলাম) … একটু ভেবে দেখবেন … সঠিক উচ্চারণ জানতে এবং ব্যবহার করতে কোনো আপত্তি থাকা উচিত নয় … এই এলেবেলে-র মাধ্যমে কত জন কত কিছু শিখবে, সঠিক বৈজ্ঞানিক শব্দচয়ন-এ এবং উচ্চারণ-এ আরেকটু গুরুত্ব দিলে ভালো হয় … আমরা সবসময় এলেবেলে-র মাধ্যমে বিজ্ঞান প্রসারের সাথেই আছি …

  • September 4, 2020 at 6:40 pm
    Permalink

    অসম্ভব সুন্দর উপস্থাপনা। বাংলা ভাষায় এমন দুরূহ বিষয় কে সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। এমন আরও লেখার অপেক্ষাই রইলাম।

  • September 4, 2020 at 6:41 pm
    Permalink

    অসম্ভব সুন্দর উপস্থাপনা। বাংলা ভাষায় এমন দুরূহ বিষয় কে সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। এমন আরও লেখার অপেক্ষাই রইলাম।

  • September 5, 2020 at 7:11 pm
    Permalink

    আপনাকেও অজস্র ধন্যবাদ আমাদের পাশে থাকার জান্যে। চোখ রাখুন। প্রতি সপ্তাহেই আমরা একাধিক নতুন লেখা নিয়ে ফিরে আসতে থাকবো।

  • September 7, 2020 at 7:16 am
    Permalink

    খাসা হচ্ছে। বইটা প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা, মাঝের অব টা তুলে দিস। প্রসঙ্গত, শুরুর ফিলসফি ন্যাচারালিস টা না বললে রাসেল এর বইটার সঙ্গে গোলাতে পারে।

  • September 7, 2020 at 8:36 am
    Permalink

    আপনার অনুপ্রেরণা ও পরামর্শের জন্যে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।