বিজ্ঞান: বই থেকে বাইরে

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
1,125 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

 “কিরে টুবলু গলার আওয়াজ পাচ্ছি না কেন?” রান্নাঘরে খটর খটর করে খুন্তি নাড়তে নাড়তে মা চিৎকার করে উঠল “আওয়াজ করে পড়বি তো, নাকি!!! লাল্টু মাষ্টার যেগুলোতে লাল কালি দিয়ে দাগ দিয়ে গেছে সেগুলো ভালো করে পড়। পরীক্ষায় ওগুলোই আসবে কিন্তু …!” এখানে বলে রাখি, আমাদের টুবলু ক্লাস সেভেনের ছাত্র। ক্লাসের ফার্স্টবয় নয় ও। তবে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বরাবর প্রথম হয়ে এসছে। বুদ্ধিদীপ্ত বলেও একটু নামডাক আছে বৈকি এই রোগা পাতলা ছেলেটার। আজ সকাল থেকে ইতিমধ্যে অনেকটা পড়ে নিয়েছে ও। এখন একটু ফাঁকা পেয়ে মোবাইল ঘাটতে লেগে গেছে। ইউটিউবে নানান মজার ভিডিও দেখা ওর একটা দারুণ নেশা। প্রশান্ত মহাসাগর কত বড়, মারিয়ানা খাদ ঠিক কতটা গভীর, এইসব আরকি।

এই মুহূর্তে মায়ের গলা শুনে চটপট মোবাইলটা রেখে দিয়ে তারস্বরে চেঁচাতে লাগল “অ্যাঁ … সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে চাঁদ…. অ্যাঁ… চাঁদ এসে পড়লে… পড়লে পৃথিবীর যে সকল স্থানে… অ্যাঁ… স্থানে চাঁদের ছায়া পড়ে… সেখানে দিনের বেলায়… অ্যাঁ… বেলায় কিছুক্ষণের জন্য সূর্য দেখা যায় না…।” এবার একটু থামল। একটু কেশে নিয়ে আবার শুরু করল “অ্যাঁ… এই ঘটনাকে আমরা… আমরা সূর্যগ্রহণ বলে থাকি।” এইবারে চিৎকার থামিয়ে এই লাইনটা আরেকবার পড়ল টুবলু।

“ হুম… বেশ মজার তো! ” মনে মনে ভাবল ও। আরও কিছুক্ষণ ধরে ভাল করে মন দিয়ে এই জায়গাটা পড়ে নিলো টুবলু। আর তারপরেই, সপ্তম শ্রেণীর রোগা পাতলা এই ছোট ছেলেটি নিজেকে ভাসিয়ে দিলো কল্পনার জটাজালে… আচ্ছা, তবে একদিকে আছে আমাদের নীল গ্রহটি আর অন্যদিকে সুবিশাল সূর্য। এই সূর্যের চারিদিকে কোন আদিকাল থেকে ঘুরে চলেছে পৃথিবী, আর পৃথিবীর চারিদিকে চাঁদ। আর যখনই পৃথিবী ও সূর্যের মাঝে চলে এসেছে চাঁদ এবং তারা তিনজন একই সরলরেখায় অবস্থান করেছে, পৃথিবীর কোন না কোন জায়গার (যে যে জায়গাগুলি সূর্যের দিকে আছে, অর্থাৎ পৃথিবীর যে অর্ধাংশে এখন দিন) ওপর এই পুঁচকে উপগ্রহটির ছায়া এসে পড়েছে। কিছুক্ষণের জন্য সেই জায়গা থেকে দেখা যায়নি সূর্যকে, এমনকি মেঘমুক্ত পরিষ্কার দিনের বেলাতেও! সেখানকার মানুষে বলে উঠেছে, “সূর্যগ্রহণ হয়েছে!” এবারে বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে পরের পাতায় দেখতে লাগল ও। সূর্যগ্রহণেরও কত রকম আছে পূর্ণগ্রাস, খণ্ডগ্রাস, বলয়গ্রাস! এখন আর আওয়াজ করে পড়ছে না টুবলু। এক্কেবারে উবু হয়ে শুয়েই পড়েছে। পা দোলাতে দোলাতে পাতা ওলটাচ্ছে আর অবাক চোখে দেখছে রংবেরঙের ছবিগুলো। ওহ্! তাহলে প্রতি অমাবস্যায়ও সূর্যগ্রহণ হয় না। তার জন্যে অবশ্যই সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবীকে এক সরলরেখায় থাকতেই হবে। তার ওপর পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে হলে চাঁদকে তার কক্ষপথের সেই বিন্দুতে থাকতে হবে যেটি পৃথিবীর নিকটতম। এমতাবস্থায় পৃথিবীর যে অংশগুলোতে চাঁদের প্রচ্ছায়া এসে পড়বে সেখানকার লোকেরাই শুধু দেখতে পাবে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের রূপ (চিত্র-১ দেখুন)। দিনের বেলাতেও কেমন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে! আর যে জায়গাগুলোতে চাঁদের উপচ্ছায়া এসে পড়বে (চিত্র-১ দেখুন) সেখানের লোকজন সূর্যকে দেখতে পাবে আংশিকভাবে। বইয়ের ভাষায় যাকে বলে খণ্ডগ্রাস সূর্যগ্রহণ। দিনের বেলায় আকাশের মাঝে একফালি সূর্য। অদ্ভুত সুন্দর ব্যাপার! এরপরের পাতায় দেখল বলয়গ্রাসের গ্রহণের ছবিটা। সুন্দর আংটির মত একটি ছবি। লাল্টুদা এই জায়গাটা লাল রঙে দেগে দেয়নি। আগেরবারের পরীক্ষায় বলয়গ্রাসটা চলে এসছে, এবারে নাকি অতটা ইম্পরট্যান্ট নয়। টুবলুর এখন আর এসব কিছু মাথায় নেই। ও পড়ে চলল… ও তাহলে সূর্য, পৃথিবীর মাঝে চাঁদ চলে এল, এক সরলরেখায়ও থাকল তিনজন, অথচ যদি চাঁদ তার কক্ষপথের সেই বিন্দুতে না থাকে, যেখান থেকে পৃথিবী আর চাঁদের দূরত্ব সবচেয়ে কম, তখন চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরিভাবে ঢেকে ফেলতে পারেনা। শুধু মাঝের বৃত্তাকার একটি অংশকে ঢেকে দেয়। যার দরুন সূর্যকে গোলাকার মনে হয় না বরং মনে হয় বলয়াকার। ঠিক আকাশে একটা জ্বলন্ত আংটির মত। ও মশগুল হয়ে দেখছে ওই আংটির ছবিটা। ভুলেই গেছে যে গলার আওয়াজ না পেলে মা আবার বকতে শুরু করবে।

 
 

 

রান্নাঘর থেকে মা এসে আঁচল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে একবার ঝুঁকে দেখল ছেলে ঠিক কি পড়ছে। ওমা এতো যে পাতা খুলে বসে আছে তাতে তো কোন লাল দাগ নেই! “ টুবলু… কই দেখি কি পড়ছিস তুই?” এপাতা ও পাতা দেখে নিয়ে মা একটু রেগে বলল “কি বললাম তোকে!…  লাল্টু মাষ্টার যেগুলোতে লাল পেনে দাগিয়ে দিয়ে গেছে ওগুলো পড়!… দেড় মাস বাদে পরীক্ষা, এখন এভাবে সময় নষ্ট করছিস কেন!!”

– কিন্তু মা এগুলো ভীষণ মজার তো…
– এখন মজার জন্য পড়তে হবে না বাবা। এখন ভাল নাম্বার তোলার জন্য পড়ে নে। পরে অনেক সময় পাবি জানার জন্য পড়ার।
 এসব বলে মা চলে যেতে যেতে আবার একবার ফিরে তাকাল।
– আর হ্যাঁ রান্না আজকে তাড়াতাড়ি  করে রেখেছি। তাড়াতাড়ি স্নানটা সেরে নিস। এগারোটার মধ্যে খাওয়াদাওয়া শেষ করতে হবে আজকে। এগারোটা বেজে সাড়ে উনিশ মিনিটে আজকে সূর্যগ্রহণ লেগে যাবে।
– তাতে কি হবে?
– কি আবার হবে, গ্রহণের সময় খেতে নেই!
– কেন?
– অত কেন টেন জানিনা বাবা। খেতে হয়না।
– কিন্তু কেন বলোনা?
– উফ বাবা এত কেন কেন করিসনা তো এখন! প্রচুর কাজ পরে আছে। এখন কি এত বকবক করার সময় আছে আমার!
শেষের কথাটা নিজের মনেই বলতে বলতে মা চলে গেল। টুবলুও নাছোড়বান্দা। বললেই হল নাকি! মায়ের পেছন ছুটতে ছুটতে বলতে লাগলো। 
– না বলো বলো, কেন?
মা তখন টিভির ঘরে যাঁতি দিয়ে সুপারি কাটতে বসে গেছে। টুবলুও পাশে এসে চটপট মেঝেতেই বসে গেল।
– ও মা বলোনা, বলোনা কেন খেতে হয় না?
– দেখ বাবা সবকিছুতে অত প্রশ্ন করতে নেই। নিয়ম আচার বলে তো একটা ব্যাপার আছে। না মানলে চলবে কেন! হাজার হাজার বছর ধরে যে নিয়মটা চলে আসছে তার পেছনে নিশ্চই কোনও না কোন কারণ আছে। শুধু কারণটা জানিনা বলে সব উড়িয়ে দিলে কি হবে?
– কিন্তু বইয়ে যে আছে, এইসব গ্রহণ ট্রহণ শুধু সূর্য, চাঁদ, পৃথিবীর অবস্থানের খেলা! না খাওয়ার কথাটা এল কোথা থেকে?
– উফ! বেশি বিদ্যা ফলাস নাতো। আর, তুই স্নানে যাবি কিনা! খালি উল্টোপাল্টা প্রশ্ন!  
এমন সময় ক্যাঁচ করে গেট খোলার আওয়াজ এলো। জানলা দিয়ে উঁকি মেরে টুবলু দেখল লাল্টু মাষ্টার ঢুকছে। বয়স লাল্টুদার ২৭ কি ২৮ এর বেশি হবেনা। শরীর একটু ভারীর দিকে, এই বয়সেই টাক পড়েছে। গ্র্যাজুয়েশন করার পর পশ্চিমবঙ্গের এই বেকার যুবক, প্রচুর টিউশন পড়িয়ে ইতিমধ্যে একটা জায়গা করে নিয়েছে নিজের ছোট শহরটিতে। আর হয়ে উঠেছেন লাল্টু মাষ্টার। টুবলু ভাবছে অন্য কথা। লাল্টুদার আজকে তো আসার কথা ছিলনা!
– কাকিমা তুমি ওই রামওয়ের শ্যাম্পুটা চেয়েছিলে না। এই যে ধর …
বলে জানলা দিয়ে একটা নীল রঙের শ্যাম্পুর বোতল বাড়িয়ে দিল। মা তাড়াতাড়ি উঠে বলল “তুমি ঘরে এসে বস লাল্টু। আমি টাকাটা নিয়ে আসি।”

লাল্টু মাষ্টার ঘরে এসে বসতে না বসতেই টুবলু শুরু করে দিল,
– আচ্ছা দাদা গ্রহণের সময় খেতে নেই কেন?
– ও আজ গ্রহণ বলে বলছিস! আরে ওটাও বিজ্ঞান রে। ওই সময় সূর্য কিছুক্ষণের জন্য ঢেকে যায় বলে কিছু কিছু জীবাণু জন্ম নেয় বুঝলি। তো সেগুলো খাবারগুলোকে এফেক্ট করে …
– কিন্তু কই বইতে তো এমন কিছু বলা নেই!
– আরে এসব সেভেনের বইয়ে কি থাকবে! ধর্ম আর বিজ্ঞান দুটোই একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ বুঝলি।
বলতে বলতেই মা চলে এল। লাল্টু মাষ্টারও টাকাটা নিয়ে চটপট বেড়িয়ে গেলো। বোধহয় কোন টিউশন আছে এখন। কিন্তু টুবলুর মাথায় কেবল একটি কথাই ঘুরপাক খেতে লাগল – “ তাই নাকি! ধর্ম আর বিজ্ঞান দুটোই একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ!”

তখন দুপুরবেলা। গ্রহণ উপলক্ষ্যে স্নান খাওয়া দাওয়া সব সারা হয়েছে আগেভাগেই। সারা সকালের কাজের পর মা এখন একটু ঘুমাচ্ছে। এই ফাঁকে মায়ের পাশ থেকে মোবাইলটা তুলে টুবলু ছুট লাগালো ছাদে। গুগলে লিখল সোলার একলিপ্স (solar eclipse)। দেখি তো আদৌ ধর্মের সাথে এর কোন যোগ আছে কিনা। কই, সেরকম কিছুই তো পাওয়া যাচ্ছে না! যা আছে তা ওই বইয়ের কথার মতই। ইউটিউবেও খুঁজল একইভাবে সোলার এক্লিপ্স লিখে। সাথে সাথে বেড়িয়ে এল কত মজার মজার ভিডিও! একটার ওপর লেখা আছে “Battle of Eclipse” বা “ গ্রহণের যুদ্ধ”। বাহ দারুণ মজার তো! টুবলু ওই ভিডিওর লিঙ্কটা টিপে দিল।

 সে খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৫০০ বছর আগের কথা। গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডটাসের কথায়- এখনকার তুর্কির এক প্রান্তে তখন ধুন্ধুমার যুদ্ধ চলছে মেডিস আর  লিডিয়ান্সদের মধ্যে। হ্যালিস নদীর ধারে। এ  যুদ্ধ আর যে সে যুদ্ধ নয়। দুই দলের রাজাদের মধ্যে রেষারেষি রাজ্যের সীমানা নিয়ে। ইতিমধ্যে পাঁচ বছর হয়ে গেছে এই যুদ্ধের। ষষ্ঠ বছর চলছে। সেটা মে মাসের ৬ তারিখ। দুপুরের রৌদ্রের থেকেও উত্তপ্ত দুই দলের তলোয়ারবাজি। হঠাৎ মাঝ দুপুরের ঝকঝকে আকাশ কালো হয়ে, অন্ধকার ঘনিয়ে এল দিনের বেলায়! ঘাবড়ে গেল দুই দলের  সৈন্যরা। ভয়ে ফেলে দিল হাতের অস্ত্র। এ নিশ্চই কোন দৈবসঙ্কেত! দুই রাজা ঠিক করলেন সন্ধি করবেন। ঠিক হল হ্যালিস নদী হবে দুই রাজ্যের সীমানা। মেডিসরাজ অ্যালিয়েটের কন্যা অ্যারিয়েনিসের সাথে লিডিয়ান্সরাজ সিয়াকসেরেসের পুত্র অ্যাস্টিয়াগেসের বিবাহ হল। শেষ হল পাঁচ বছরব্যাপী এই মহাযুদ্ধের।

 টুবলু দেখল কিভাবে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে এই অজানা মহাজাগতিক বিষয়টি মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। ভয় থেকে প্রতিবার জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন কাহিনী! আরও কয়েকটা ভিডিও দেখল টুবলু। কি সুন্দরভাবে কার্টুন দিয়ে বোঝানো হয়েছে গ্রহণের ব্যাপারটা। তবে, যেমনটা বইয়ে লেখা আছে ঠিক তেমনটাই। কোথাও কই ওই জীবাণুর গল্পটা তো কেউ বলছে না! যেমনটা লাল্টু মাষ্টার বলেছিল। তাহলে কি ভুল বলেছিল  লাল্টুদা!

ছাদ থেকে নেমে টুবলু এবারে রান্নাঘরে আসল। খাওয়ার তেমন কিছু নেই এখন। অগত্যা বিস্কুটের কৌটোটাই তুলে বগলদাবা করল। স্কুলে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চের তরফ থেকে যে গ্রহণ দেখার চশমা দিয়েছিল ব্যাগ থেকে সেটা তুলে এক ছুটে এল ছাদে। এতক্ষণে এটুকু ও বুঝেছে সূর্যগ্রহণ দেখতে পাওয়া একটা বিরল ঘটনা। কে জানে আবার কবে দেখতে পাবে! ছাদে গিয়ে একটা ছোট চেয়ার টেনে টিনের শেডটার নীচে বসল। চোখে চশমাটা পড়ে নিল। ততক্ষণে গ্রহণ শুরু হয়ে গেছে। কেমন সুন্দর একটা আবছা অন্ধকার ভাব। যেন দুপুরবেলাতেই সন্ধ্যা নেমে এসেছে! চারিদিকে পাখির কলকাকলি। ঝাঁকে ঝাঁকে ওরা ফিরে চলেছে নিজেদের বাসায়। এবার চোখে চশমাটা লাগিয়ে আকাশের দিকে তাকাল ও। ও বাবা! সম্পূর্ণ সূর্যটাই ঢেকে গেছে। আজ তবে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। এবারে একটা বিস্কুট বের করল ও। দিল এক কামড়। দেখাই যাক না আজ, কি হয় খেলে!

—————————–

~ কলমে এলেবেলে মেঘদীপা ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

10 thoughts on “বিজ্ঞান: বই থেকে বাইরে

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।