নোবেল ২০২০: শারীরবিদ্যা ও ঔষধ

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
867 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

এই বছরের শারীরবিদ্যা ও ঔষধে নোবেল পুরস্কার পেলেন হার্ভি অলটার, মাইকেল হাটন, এবং চার্লস রাইস। হেপাটাইটিস সি ভাইরাস আবিষ্কারের জন্য তাঁদের দেওয়া হল এই সম্মান। গ্রীক শব্দ হেপাটাইটিস কথার অর্থ যকৃতের (লিভার) প্রদাহ। যে রোগের লক্ষণ ক্ষুধা হ্রাস, বমিভাব, অবসন্নতা এবং জন্ডিস (বিলিরুবিনের মাত্রা  অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার ফলে ত্বক এবং চোখের হলুদ বর্ণ ধারণ)। সারা বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় চার লক্ষ মানুষ মারা যান হেপাটাইটিস সি রোগের প্রভাবে। দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস যকৃতের পচন এবং যকৃত ক্যান্সারের রূপ নিতে পারে। হেপাটাইটিস রোগ অত্যধিক মদ্যপান, পরিবেশগত দূষণ, ও অটোইমিউন জনিত কারণে হলেও, এই রোগের প্রধান কারণ ভাইরাস জনিত সংক্রমণ। 

১৯৪০ সালে প্রথমবার জানতে পারা যায় যে, হেপাটাইটিস রোগ মূলত দুই ধরনের, প্রথম ধরনের রোগটি সংক্রমিত হয় দূষিত জল এবং খাবার মাধ্যমে, যার নাম দেওয়া হয় হেপাটাইটিস A। দ্বিতীয়টি হেপাটাইটিস-বি, রক্ত ও শারিরীক তরলগুলির মাধ্যমে। এই প্রকারটি অনেক বেশী গুরুতর কারণ এর পরিণতি স্বরূপ যকৃতের পচন এবং যকৃতের ক্যান্সার হতে পারে। হেপাটাইটিসের এই প্রকারটির চিকিৎসা দুরূহ, কারণ গুরুতর জটিলতা দেখা দেওয়ার আগে এই রোগ রুগীকে জানান না গিয়ে বহু বছর সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। এই রক্তবাহিত হেপাটাইটিস-এ প্রতি বছর সারা বিশ্বে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ মারা যায়। AIDS এবং যক্ষার মত হেপাটাইটিসও বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমদিকে এই রোগের কারণ সনাক্ত করা যায়নি এবং তাই চিকিত্সাও সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে ১৯৬০ বারুচ ব্লম্বার্গ আবিষ্কার করেন যে এই রোগের জন্য দায়ী আসলে এক ধরনের ভাইরাস, তার নাম দেওয়া হয় হেপাটাইটিস B ভাইরাস। এই আবিষ্কারের ফলে এই রোগের রোগনির্ণয়সংক্রান্ত পরীক্ষা এবং টিকা আবিষ্কারের কাজ অনেক টা সহজ হয়ে যায়। এই কাজের জন্য ১৯৭৬ সালে বারুচ ব্লম্বার্গ কে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। এরপর এই রোগের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা সম্ভবপর হলেও দেখা দেয় নতুন সমস্যা। 

সেই সময় হার্ভি অলটার আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ -এ রক্ত পরিসঞ্চালনের ফলে সংক্রমিত হেপাটাইটিসের নমুনা নিয়ে কাজ করছিলেন। কিছু হেপাটাইটিস রোগীর দেহে হেপাটাইটিস A এবং B কোন ধরনের ভাইরাসই তিনি পেলেন না, এবং এই সংখ্যাটা নেহাত কম ছিল না। তখনই আঁচ করলেন, এটি একটি ভিন্ন ধরনের হেপাটাইটিসের। এই রোগটিও রক্ত বাহিত, আবার মানুষের থেকে শিম্পাঞ্জীর দেহেও সংক্রমনে সক্ষম, অলটার এর নাম দেন “নন-A, নন-B ” হেপাটাইটিস। আগের দুই ধরনের হেপাটাইটিস যেহেতু ভাইরাসবাহিত ছিল, তাই বিজ্ঞানীরা অনুমান করলেন এক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই কোন ভাইরাসই দায়ী, শুরু হল ভাইরাস শিকারের কাজ। 

মাইকেল হাটন তার সঙ্গীদের নিয়ে ভাইরাসের জিন বিন্যাস খুঁজে বের করার কাজ শুরু করলেন, এই রোগে আক্রান্ত একটি শিম্পাঞ্জীর দেহ থেকে সংগ্রহ করলেন রক্ত, এবং তার থেকে জিন বিন্যাস বের করলেন। এই জিন বিন্যাসের অধিকাংশই শিম্পাঞ্জীর DNA এর অংশ বিশেষ হলেও উনারা ধারনা করলেন যে এরই মধ্যে রয়েছে ঐ অজ্ঞাত ভাইরাসটির জিন বিন্যাসও । যে কোন জীবের জিনগত উপাদানের  (DNA বা RNA) মধ্যেই থাকে প্রোটীন তৈরির সংকেত, সেই সংকেতকে কাজে লাগিয়ে হাটন ও তার সঙ্গীরা বানিয়ে ফেলেন প্রোটীন। কোনো ভাইরাস ঘটিত রোগে আক্রান্ত হলে রোগীর দেহে ভাইরাসজাত প্রোটিনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। রক্তরসের মধ্যে পাওয়া যায় এই অ্যান্টিবডি, সেই কারণেই করোনার চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যাক্তির রক্তরস ব্যবহার করা হচ্ছে। হাটনও হেপাটাইটিস রোগীর সেরাম (রক্তরস থেকে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্যকারী উপাদান বাদ দিলে পাওয়া যায় সেরাম) সংগ্রহ করেন, এবং সেখান থেকে অ্যান্টিবডি আলাদা করে নিয়ে প্রয়োগ করেন সেই প্রোটিনের উপর, এতে দেখা যায় কিছু প্রোটিন প্রতিক্রিয়া করছে ঐ অ্যান্টিবডির সাথে। আর দেরী না করে তড়িঘড়ি সেই প্রোটিনের বিন্যাসকরণ করে ফেলেন তারা, এবং দেখতে পান আসলে এই প্রোটীন ফ্ল্যাভিভাইরাস পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একধরনের RNA ভাইরাস থেকে উৎপন্ন, তারা এটার নাম দেন হেপাটাইটিস C ভাইরাস। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর ছিল তখনও অজানা, এই ভাইরাস কি একাই এই রোগ সংক্রমনে সক্ষম? নাকি জড়িত থাকে অন্য কোন উপাদান? 

সেই উত্তরের খোঁজ শুরু করলেন চার্লস রাইস, তিনি ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন RNA ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি দেখেন যে এই ভাইরাসের জিন বিন্যাসের শেষের দিকের কিছু অংশ অপরিশোধিত, যা কিনা ভাইরাসটির প্রতিলিপি গঠনে বাধা প্রদান করতে পারে। তাই তিনি জিনগত প্রযুক্তিবিদ্যা কাজে লাগিয়ে ভাইরাসটি পুনর্গঠিত করেন। এরপর এই ভাইরাস উনি শিম্পাঞ্জীর দেহে প্রয়োগ করান এবং দেখেন যে শিম্পাঞ্জীর মধ্যে রোগ লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে ভাইরাসটি সয়ং সম্পূর্ণ ভাবে পোষক দেহে রোগ সংক্রমনে সক্ষম।  

হার্ভি অলটার, মাইকেল হাটন, এবং চার্লস রাইসের আবিষ্কারের ফলস্বরূপ হেপাটাইটিস C রোগের অত্যন্ত সংবেদনশীল রক্ত পরীক্ষা এখন উপলব্ধ। পৃথিবীর বহু দেশে রক্ত পরিসঞ্চালন জনিত হেপাটাইটিস নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। শুধু তাই নয়, বহু প্রতীক্ষিত ভাইরাস প্রতিরোধী ওষুধ তৈরি করা সম্ভবপর হয়েছে, যা প্রাণনাশী হেপাটাইটিস C রোগ নিরাময়ে সক্ষম। এলেবেলে সমগ্র মানবজাতির পক্ষ থেকে কুর্নিশ জানায় এই তিন বিজ্ঞানী ও তাদের সহকর্মীদের। 

——————

~ কলমে এলেবেলে অর্চিষ্মান ~

এলেবেলের দলবল 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

লেখাটি পঠিত হয়েছে Web Hits বার

2 thoughts on “নোবেল ২০২০: শারীরবিদ্যা ও ঔষধ

  • October 5, 2020 at 6:31 pm
    Permalink

    ভীষণ ভালো লাগলো… আজ ই নোবেল বিজয়ী দের নাম জানতে পারলাম, তাও এই এলেবেলের গ্রূপ থেকেই, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো তথ্য টাও জানতে পারলাম।। ভীষণ ভালো।। এভাবেই এগিয়ে যাও এলেবেলে, আর আমাদের সমৃদ্ধ কর!!

  • October 5, 2020 at 6:41 pm
    Permalink

    অতি সাধারণ পাঠক-ও লেখাটি গল্পচ্ছলে পাঠ করে জ্ঞানলাভ করতে পারবে যথেষ্ট পরিমাণে। আর তার জন্য বিশেষ ধন্যবাদ লেখকের পাওনা।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।