নোবেল ২০২০: পদার্থবিদ্যা

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
198 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

এ বছর পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেলেন ইংলিশ গণিতজ্ঞ-পদার্থবিদ রজার পেনরোজ,  কৃষ্ণগহ্বর সংক্রান্ত গবেষণার জন্য। পেনরোজের এই গবেষণা আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ  বা মহাকর্ষ তত্ত্বের সত্যতাকে আরো বলিষ্ঠ ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু কি ভাবে? সেটা জানার আগে একটু জেনে নি, এই কৃষ্ণগহ্বর কি এবং আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের নিরিখে কৃষ্ণগহ্বরকে কি করে সংজ্ঞায়িত করা যায়?

আমরা জানি, আইনস্টাইন বলেছিলেন যে, মহাকর্ষ (গ্রাভিটি) আসলে একটি চতুর্মাত্রিক স্থান এবং কালের জ্যামিতি। কোনো বস্তু যত ভারী হবে, সে তার চার পাশের স্থান কালের জ্যামিতিকে তত বেশি দুমড়ে দিতে পারবে (পড়ুন : মহাকর্ষের মহা গাথা)। এমনকি আলোরও নিস্তার নেই এই জ্যামিতি থেকে। আমরা তো দেখেছি যে, একটি খুব ভারী বস্তুকে একটা টানটান করে রাখা রুমালের উপর চাপানো হলে, রুমালটা আর টানটান থাকে না।  এবার এই রুমালটাকে মনে করুন একটা স্থান – কালের জ্যামিতিক ভূমি। এর ওপরে ভারী বস্তুটা রাখলে সেই জায়গাটার চারপাশের জ্যামিতিটা স্বাভাবিক ভাবেই একটু ভেতরের দিকে ঢুকে যাবে। অনেকটা সমতল রাস্তার মাঝখানের খানাখন্দের মত। রাস্তার গর্তটা যদি ছোট হয়, ওর পাশ দিয়ে হাঁটার সময় সামান্য পা হড়কে যেতে পারে। কিন্তু গর্তটা বেশি গভীর হলে? তখন পা ফস্কে আছাড় খাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। খুব ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আলোরও খানিকটা এরকমই দশা হয়। বস্তুর ভর অপেক্ষাকৃত কম হলে, তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আলোর  গতিপথ সামান্য বেঁকে যায়, ওই মহাকর্ষের দ্বারা তৈরি খানাখন্দের জন্য। কিন্তু যদি বস্তুটার ভর অসম্ভব রকমের বেশি হয় ? তাহলে আলো তার পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে একদম ধপাস করে জ্যামিতির গর্তে পড়ে যাবে। আর একবার পড়লে তার আর বেরোবার পথ নেই, তাই প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসার উপায় ও নেই তাদের। এই হল সেই কৃষ্ণগহ্বর। তার কাছে আলো এলে, সে আর ফিরতে পারবে না।  তাই তার ভেতরের কার্যকলাপের খোঁজ পাওয়াও দুর্লভ।

একটি তারা তার জীবৎকালে যে বিক্রিয়াগুলি করে, তা থেকে উৎপন্ন বিকিরণের চাপ মহাকর্ষীয় বলের উল্টোদিকে কাজ করে তারাটিকে মহাকর্ষীয় সংকোচনের হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু তার  জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে সে আর মহাকর্ষ বলের প্রভাবকে বাধা দিতে পারে না এবং ক্রমশ সঙ্কুচিত হতে থাকে। সংকোচনে আয়তন কমে, অথচ ভর স্থির থাকে। ফল স্বরূপ বস্তুটির ঘনত্ব বাড়তে থাকে। এই ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মুক্তিবেগও। কোনো বস্তু যে গতিবেগ নিয়ে ছুটলে মহাকর্ষের প্রভাব কাটাতে পারে, তাই হল বস্তুটির মুক্তিবেগ। পৃথিবীর আকর্ষণ বল কাটানোর ক্ষেত্রে এই মুক্তিবেগের মান প্রায় ১১ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড। তাই পৃথিবী থেকে কোনো আলো খুব সহজেই বাইরে এসে যেতে পারে (আলোর গতিবেগ প্রায় ৩০০,০০০ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড)। কিন্তু যে তারাগুলোর ভর সূর্যের ভরের থেকে বহুগুণ বেশি, তাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় মহাকর্ষীয় সংকোচনে ঘনত্ব এতটাই বেড়ে যায় যে, আলোও এর গর্ত থেকে বেরোতে পারে না, অর্থাৎ এই বস্তুদের ক্ষেত্রে মুক্তিবেগ আলোর থেকেও বেশি হয়ে যায়। এরাই আমাদের কৃষ্ণগহ্বর (পৃথিবীর ভরকে এক ইঞ্চির জায়গায় পুরে ফেললে যে রকম ঘনত্ব হবে, সেটাই  আনুমানিক কৃষ্ণ গহ্বরের ঘনত্ব)। অনেক সময় আবার এই কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে আলো ঘুরপাক খেতে থাকে, অনেকটা যেমন ভাবে পৃথিবীর চারপাশে উপগ্রহগুলো ঘুরপাক খায়।

রজার পেনরোজ এবং স্টিফেন হকিং -এর অঙ্ক (পেনরোজ – হকিং সিঙ্গুলারিটি থিওরেম ) দিয়ে কৃষ্ণগহ্বরের এই  অবস্থাটিকে ধরা সম্ভব। মহাকর্ষ থেকে যে সিঙ্গুলারিটি তৈরী হয়, তার হিসেব কষা আছে এই অঙ্কে। এই সিঙ্গুলারিটি মূলত দুই ভাবে জন্মাতে পারে।  ১) যখন সমস্ত বস্তুকে একটি জায়গায় সংকোচন করা যায় (স্পেস লাইক সিঙ্গুলারিটি), এবং  ২) এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে আলো অসীম বক্রতা সম্পন্ন একটি অঞ্চল থেকে আগত হয় (টাইম লাইক সিঙ্গুলারিটি) । এই অঙ্ক দেখায় যে, নন-রোটেটিং আধান বিহীন কৃষ্ণগহ্বরের স্বরূপ  স্পেস লাইক সিঙ্গুলারিটি,  এবং আধানযুক্ত এবং রোটেটিং কৃষ্ণগহ্বরে টাইম লাইক সিঙ্গুলারিটি দেখা যেতে পারে।  গর্বের বিষয় এই যে, এই  পেনরোজ – হকিং সিঙ্গুলারিটি থিওরেম যে সমীকরণের উপর দাঁড়িয়ে, তার জন্ম আমাদের বাংলায়। এটি সমীকরণটি হল অমল কুমার রায়চৌধুরী প্রদত্ত রায়চৌধুরী সমীকরণ।

যেহেতু কৃষ্ণগহ্বর থেকে আলোও বাইরে আসতে পারে না, তাই তা সম্পূর্ণ অদৃশ্য। তবুও তার অসামান্য ভরের কারণে তার আশেপাশের স্থান-কালের জ্যামিতির উপর একটা ব্যাপক প্রভাব পড়ে। তাই, আশেপাশের অপেক্ষাকৃত হালকা মহাজাগতিক বস্তুর গতি সম্পূর্ণ নির্ভর করে ঐ কৃষ্ণগহ্বরের ওপর। আর সেখান থেকেই কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কিত কিছু তথ্য জানা সম্ভব হয়।

রেইনহার্ড গেনসেল  এবং আন্দ্রেয়া গেস করলেন ঠিক তাই। তাঁরা করতে শুরু করলেন আকাশগঙ্গার একদম কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা তারাগুলি পর্যবেক্ষণ। আলাদা আলাদা ভাবে। এই কেন্দ্রে একটা কৃষ্ণগহ্বর আছে। যদিও সেটা অনুমান। প্রায় পঞ্চাশ বছর হয়ে গেছে সেই অনুমানের। পদার্থবিজ্ঞানীরা অঙ্ক কষে দেখিয়েছেন শুধু আকাশগঙ্গা নয়, বেশিরভাগ ছায়াপথের কেন্দ্রেই হয়তো এক একটি কৃষ্ণগহ্বর আছে। যদিও কিভাবে তা তৈরি হল তা বিজ্ঞানীদের কাছে আজও একটা চ্যালেঞ্জ। প্রায় ১০০ বছর আগে, হারলো শ্যাপলি খুঁজবার চেষ্টা করেছিলেন আকাশগঙ্গার কেন্দ্র। খানিক সফলও হন। এর নাম দেওয়া হয় Sagittarius A*। ১৯৬০ সাল নাগাদ এটা পরিষ্কার জানা যায় যে Sagittarius A*-এর চারদিকেই আকাশগঙ্গার সব নক্ষত্র ঘুরে চলেছে। যাই হোক,  গেনসেল এবং আন্দ্রেয়া গেস সিদ্ধান্ত নিলেন যে আকাশগঙ্গার কেন্দ্রে কৃষ্ণগহ্বর আছে কিনা সেটা ওনারা প্রমাণ করবেন। কাজটা খুব সোজা না। প্রায় এক লক্ষ আলোকবর্ষ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটা চাকতির মতো জায়গা, তাতে রয়েছে কয়েক কোটি নক্ষত্র। কাজটা সহজ হতো, কিন্তু, বাধা হয়ে দাঁড়াল গ্যাস এবং ধূলিকণা মিলে তৈরি হওয়া বিরাট ধোঁয়ার কুণ্ডলী। এই গ্যাস আর ধূলিকণা আলোকে বিক্ষিপ্ত করে দেয় বিভিন্ন দিকে। ফলে, পৃথিবীতে বসে সাধারণ টেলিস্কোপে সেই তারা দেখা প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তি নিয়ে এলো ইনফ্রারেড এবং রেডিও টেলিস্কোপ।  সেই টেলিস্কোপ দিয়েই চলল ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভেদ করে আকাশগঙ্গার কেন্দ্রের রহস্য উদ্ঘাটন। গেনসেল ব্যবহার করলেন চিলির Very Large Telescope facility,  গেস ব্যবহার করলেন হাওয়াই-এর Keck Observatory। এগুলি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ টেলিস্কোপের মধ্যে পড়ে। কিন্তু, টেলিস্কোপ যতই বড় হোক না কেন, তারও একটা সীমা থাকে। তাই সাথে চলতে লাগলো প্রযুক্তিগত পরিমার্জন, পরিবর্ধন আর সংশোধন, আর খুব ছোট পায়ে লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া। সাথে হাত লাগালেন গবেষণার সহকারীরা।

ত্রিশ বছর লেগে গেলো। ত্রিশ বছর ধরে গেনসেল এবং গেস ঐ কেন্দ্রের দিকে টেলিস্কোপ তাক করে বসে রইলেন। যত নিখুঁত করে সম্ভব বের করে ফেললেন ঐ কেন্দ্রের কাছে ঘুরে বেড়ানো তারাগুলোর যাত্রাপথ। বেছে নেওয়া হয়েছিল একটি তারা। তার নাম একদল দিলেন S2, একদল দিলেন S02। সেই তারা কেন্দ্রের একদম কাছে। কেন্দ্রকে এক পাক ঘুরে আসতে তার সময় লাগে মাত্র বছর মাত্র। তুলনার জন্যে বলছি, সূর্যের এটা করতে লাগে প্রায় ২ কোটি বছর। ১৯৯২ সাল থেকে শুরু হয়েছিল পর্যবেক্ষণ। সেই নক্ষত্রের যাত্রাপথ থেকে শুরু হল গণনা। হিসেব বলল, ঐ কেন্দ্রের ভর সূর্যের প্রায় ৪০ লক্ষ গুণ। এবং সেটা আছে খুব ছোট একটা জায়গার মধ্যে। তাই তার ঘনত্ব অস্বাভাবিক রকমের বেশী। এবং সম্ভবত ওটি একটি কৃষ্ণগহ্বর। দুর্ভাগ্যবশত, এখনো একদম নিশ্চিত বলা যায় না। তাই জন্যেই, নোবেল কমিটি কায়দা করে বলেছে supermassive compact object, অর্থাৎ অত্যন্ত ভারী ও সংহত বস্তু, তবে এ জিনিসের কৃষ্ণগহ্বর হওয়ার সম্ভবনাই সব থেকে বেশী। ২০১৭ সালে কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষের ফলে তৈরি হওয়া মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণের জন্যে নোবেল দেওয়া হয়। এবারের নোবেলও কিছুটা সেই একই রাস্তায়। আসলে, এই আবিষ্কারগুলো মানবজগতের কাছে নতুন নতুন সূত্র নিয়ে আসে, শুরু হয় নতুন গবেষণা, প্রকৃতির রহস্যকে নতুন করে জানা। কি জানি আগামী দিনে আরও আরও কতো অজানা, আর আরও কতো চমক আমরা দেখতে পাবো? জানতে পারবো এই মহাবিশ্বের উৎস কোথায়? শেষইবা কোথায়? কি দিয়ে তা তৈরি? কিভাবে চলে সে? প্রকৃতির এই আদি রহস্য উন্মোচনের পথে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে এলেবেলের দল পেনরোজ, গেনসেল এবং গেসকে জানায় আন্তরিক ধন্যবাদ।

চিত্রসুত্র: https://www.nasa.gov/mission_pages/chandra/news/black-hole-image-makes-history

ভিডিওসুত্র: http://www.astro.ucla.edu/~ghezgroup/gc/animations.html

—————-

~ কলমে এলেবেলে চিরশ্রী ও এলেবেলে প্রত্যয় ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

লেখাটি পঠিত হয়েছে Web Hits বার

 

 

One thought on “নোবেল ২০২০: পদার্থবিদ্যা

  • October 6, 2020 at 4:57 pm
    Permalink

    লেখক ও লেখিকাকে ধন্যবাদ জানায় এই ধরণের লেখা উপহার দেওয়ার জন্য। গবেষণার বিষয়বস্তু এবং তিন জন বিজ্ঞানীর পরিশ্রম ও একনিষ্ঠার খুব সহজ বিবরণ এই লিখা কর্তৃক প্রতিফলিত।এই লিখা যাঁরা পড়বেন তাঁরা হয়তো খুব সহজেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন যে ,"বিজ্ঞান' এর অর্থ ভাবনা চিন্তা করা ,প্রশ্ন করা , সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা এবং উত্তর খুঁজতে গিয়ে সেই বিষয়টির প্রতি একনিষ্ঠ থাকা।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।