রোগ প্রতিরোধে জীনগত ত্রুটি বাড়াচ্ছে কোভিড সঙ্কট

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
236 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

 

সারা বিশ্বে গত কয়েকমাসে COVID-19 কেড়ে নিয়েছে ১০ লাখেরও বেশি প্রাণ, আক্রান্ত করেছে সাড়ে তিন কোটি মানুষকে। আমরা দেখছি, মোটামুটি ৮০% রোগলক্ষণহীন (Asymptomatic), বা মৃদু রোগলক্ষণযুক্ত। অন্যদিকে  প্রায় ২০% আক্রান্তকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে, তার মধ্যে ৫% কে ICU তে ভর্তি করাতে হচ্ছে এবং ১%-৩%-র মৃত্যুও হচ্ছে। অর্থাৎ, SARS-COV-2 র আক্রমণ সবার জন্য একই রকম হচ্ছেনা। এর জন্য বয়েস, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অনেককিছুই দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু শুধুই কি তাই? না অন্য গল্পও আছে? এই রোগীদের ভাইরাসের বিরুদ্ধে অনাক্রম্যতায় কোন সমস্যা নেই তো? পুরুষদেরই বা করোনা ভাইরাস বেশি কাবু করে ফেলছে কেন? 

যে কোন পরজীবী আমাদের দেহে আক্রমণ করলেই, আমাদের দেহের সহজাত অনাক্রম্যতা (Innate Immunity) জাগ্রত হয়, এবং অনাহূত এই পরজীবীদের বিনাশে  সচেষ্ট হয়। এই বিনাশার্থে  আমাদের কোষ তৈরি করে এক ধরণের ‘বায়োকেমিক্যাল ওয়েপন’ বা জৈবরাসায়নিক অস্ত্র, এদের বলে  সাইটোকাইন। সাইটোকাইন শ্রেণীর মধ্যে বিভিন্ন রাসায়নিক আছে।  

কোষে যে কোন ভাইরাস  ঢুকলে তাদের নিষ্ক্রিয় করতে কোষ এক বিশেষ ধরণের  সাইটোকাইন তৈরী করে, যাদের বলে ইন্টারফেরণ (Interferon)।  ইন্টারফেরণগুলো  এসেই ভাইরাসের সংখ্যাবৃদ্ধি  আটকায়। প্রয়োজনে এরা আক্রান্ত কোষগুলোকে মেরে  ফেলতে পারে, তাহলে কোষের সাথে ভাইরাসও শেষ হয়ে যায়। বেশির ভাগ সময়েই ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রেই ইন্টারফেরণরা খুব সুচারু ভাবে ব্যাপারটি সম্পন্ন করে।  তাই অনেক সময়  বাইরে থেকে টেরও পাওয়া যায়না (Asymptomatic ) বা সামান্য কিছু লক্ষণ দেখা গেলে দেখা যেতে পারে। কিন্তু যদি প্রথম দফায় ইন্টারফেরণরা ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তখন আক্রান্ত কোষ সঙ্কেত পাঠায় অন্যান্য বিভিন্ন  অনাক্রমতা কোষকে। সেই সব কোষেরা এসে আরও এক প্রস্থ অন্যান্য সাইটোকাইন বর্ষণ করে। সেই  বর্ষিত সাইটোকাইন আরও সাইটোকাইন তৈরির সঙ্কেত দেয় কোষেদের। ফলে আরো বেশি বেশি  সাইটোকাইন  তৈরি হয়, এরকম হতে হতে দেহে সাইটোকাইনের তুফান ওঠে (Cytokine Storm) এবং কোষে মারাত্মক প্রদাহ (Inflammation) সৃষ্টি হয়। এই ঝড় তখন সর্বগ্রাসী, সাইটোকাইনের তুফানে পারিপার্শ্বিক সব কোষের মৃত্যু হতে থাকে, তার থেকে আক্রান্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ  ক্ষতি হয় এবং তা বিভিন্ন অঙ্গকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে, এভাবে নিজের অনিয়ন্ত্রিত অনাক্রম্যতার ফলেই ভাইরাস আক্রান্তের মৃত্যু ঘটে অনেক ক্ষেত্রে। কিন্তু প্রথমদফায় যদি ইন্টারফেরণরা তাদের কাজটি সুচারু ভাবে সম্পন্ন করতে পারে, তবে করোনা বা যে কোন ভাইরাসই সামান্য ঝামেলা পাকিয়ে বিদায় নেয়। কিন্তু এই ইন্টারফেরণরা কি করোনা সংক্রমণে সবার ক্ষেত্রে সুচারু ভাবে কাজ করে? 

বিখ্যাত Science পত্রিকায় প্রকাশিত দুটি সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে মারাত্মক অসুস্থ বা পরবর্তীতে মৃত রোগীর অনেকের মধ্যে এই ইন্টারফেরণরা সঠিক ভাবে কাজ করেনি, যে জন্যে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ তাদের জন্যে এত মারাত্মক হয়ে উঠল। এর আগেও কিছু কিছু সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, জীনগত ত্রুটির জন্যে কোন কোন রোগীর কোন কোন সাইটোকাইন বা ইন্টারফেরণের বিরুদ্ধে দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। অ্যান্টিবডি হল এক বিশেষ শ্রেণীর প্রোটিন। যা ভাইরাস-ব্যাকটিরিয়ার প্রোটিনকে বিদেশী চিনতে পেরে তাদের নিষ্ক্রিয় করার জন্য তৈরি হয়। কিন্তু এসব রোগীর ক্ষেত্রে এই সব অ্যান্টিবডিরা নিজের দেহের ইন্টারফেরণকে বিদেশী প্রোটিন ভেবে তাদের জাপটে ধরে নিষ্ক্রিয় করতে। মানে, কমান্ডো ইনটারফেরণরা যাচ্ছিল করোনাকে সায়েস্তা করতে, এদিকে অ্যান্টিবডি পুলিশ কমান্ডোদেরই বিদেশী ভেবে আটক করে রাখল। এদিকে তার ফলে ভাইরাস প্রায়  বিনা বাধায় তার আক্রমণ চালাতে লাগল দেহে। এসব অ্যান্টিবডিকে  অটো-অ্যান্টিবডি বলে, যাদের আপন পর জ্ঞান নেই। 

ফ্রান্সের বিজ্ঞানীরা দেখেছেন করোনা ভাইরাস সংক্রমণেও এর ব্যতিক্রম হচ্ছেনা। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির করোনা আক্রান্ত মানুষের ও অনাক্রান্ত মানুষের থেকে  তাঁরা  রক্ত সংগ্রহ করেন। তাঁরা প্রায় হাজারখানেক মারাত্মক অসুস্থ রোগীর দশ শতাংশের মধ্যে এই জাতীয় অ্যান্টিবডির অস্তিত্ব পেয়েছেন (৯৮৭ জনের মধ্যে ১০১ জন )। এদিকে যে ৬৬৩ জন সংক্রামিতদের রোগ-লক্ষণ ছিলই না বা মৃদু ছিল, তাদের কারো মধ্যে এই জাতীয় অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি। ওই ১০১ জনের যাদের কয়েকজনের রক্ত ঘটনাচক্রে সংক্রমণের আগেও সংগ্রহ করা হয়েছিল, তাদের রক্তে এই  অটো-অ্যান্টিবডি আগেও ছিল। অর্থাৎ, ইন্টারফেরণকে এরা বেরোবার সাথে সাথেই বেঁধে ফেলছিল। এবং এর থেকে প্রমাণিত হয়, এই অটো-অ্যান্টিবডি নিঃসরণ করোনা ভাইরাস আক্রমণের ফল নয়, বরং আক্রান্তের অবস্থা  সঙ্কটপূর্ণ করে তোলার কারণ। 

এই ধরণের রোগীদের ক্ষেত্রে  বাইরে থেকে  ইন্টারফেরণ আলফা  শ্রেণীর কৃত্রিম ইন্টারফেরণ দিলেও খুব উপকার কিছু হবেনা বলেই ধারণা, কারণ বেশির ভাগেরই আলফার বিরুদ্ধে অটো-অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। তবে বিটা-শ্রেণীর ইন্টারফেরণের বিরুদ্ধে অটো-অ্যান্টিবডি খুব কম রোগীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে বলে, ইন্টারফেরণ বিটা হয়তো ব্যবহার করা গেলেও যেতে পারে। 

আমরা জানি , করোনা আক্রান্তের  করোনার বিরুদ্ধে তৈরি অ্যান্টিবডি সমৃদ্ধ রক্তরস বা প্লাজমা  অন্য আক্রান্তের দেহে ব্যবহার করে ভাইরাসকে খতম করা যায়। যাকে প্লাজমা থেরাপি বলে। অনেক জায়গায়  যার ট্রায়াল  চলছে। কিন্তু প্লাজমা থেরাপির জন্য এই ধরণের রোগীর রক্তরস একদমই নেওয়া চলবেনা, কারণ তাতে করোনার অ্যান্টিবডি থাকলেও  সাথে ইন্টারফেরণ নিষ্ক্রিয়কারী এইসব অটো-অ্যান্টিবডিও থাকবে, ফলে  হিতে বিপরীত হবে। 

আশ্চর্য্যজনক ভাবে, এই ১০১ রোগীর মধ্যে ৯৫ জনই পুরুষ (৯৪%)। ফলে মনে করা হচ্ছে, এই অটো-অ্যান্টিবডি মানুষের লিঙ্গ-নির্ধারক X-ক্রোমোজোমের সাথে সম্পর্কিত। হয়তো বা, করোনার প্রকোপ পুরুষদের মধ্যে বেশি হবারও এটাও একটা কারণ। 

অন্য পেপারটিতে এঁরা দেখিয়েছেন, আরেকটি জীনগত সমস্যা। ইন্টারফেরণ নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে, যে সব অন্যান্য প্রোটিন, তারা যদি অল্প অল্প বদলে যায়, তাহলেই সমূহ বিপদ। তখন ইন্টারফেরণ নিঃসরণ ব্যহত হয়। এই বদলানোকে বলে মিউটেশান বা পরিব্যক্তি। যে কোন ভাইরাস ক্ষেত্রেই এই ধরণের মিউটেশান বিপদ ডেকে আনতে পারে। ইনফুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে তা দেখা  গেছে; করোনা ভাইরাসও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রোটিনের বিন্যাসক্রম ধরা থাকে বংশগতির ধারক ডিএনএ-র  বিন্যাসে, যাকে জীন বলে। এই ডিএনএ বিন্যাসে সূক্ষ্ম পরিবর্তনে হয় মিউটেশান। বিজ্ঞানীরা  তেরটি ইন্টারফেরণ নিঃসরণের সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রোটিনের সঙ্কেতবাহী  জীনের বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ৩.৫% সংকটজনক  করোনা আক্রান্তের আটটি জীনে দুর্লভ মিউটেশান আছে (৬৫৯ জনে ২৩ জন)। সেখানে ৫৩৪ জনের মৃদু লক্ষণযুক্ত বা লক্ষণহীন আক্রান্তদের ক্ষেত্রে কারো কোন মিউটেশান নেই। এই মিউটেশানের জন্য  ইন্টারফেরণ নিঃসরণ ব্যহত হয় এবং এই ২৩ জনের রক্তে  ইন্টারফেরণের অস্তিত্ব  প্রায় ছিলনা বললেই হয়।  এই জন্যে হয়তো এদের অবস্থা সঙ্কটপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তবে এই জাতীয় আক্রান্তদের  ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায় কৃত্রিম ইন্টারফেরণ দিলে ফল মিলতে পারে বলে ধারণা।  

এই দুটি গবেষণা থেকে মোটামুটি ১৪% সঙ্কটপূর্ণ কোভিড রোগীর ক্ষেত্রে সঙ্কটের কারণ বোঝা যাচ্ছে। বিশ্বে জনসংখ্যার নিরিখে  ১৪% অত্যন্ত বড় একটি সংখ্যা। তাই এই গবেষণাদুটি আপাততঃ হিমশৈলের চূড়া হলেও কোভিডের গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ;  এবং সংক্রমণের প্রথম দফায় এই রোগীদের চিহ্নিত করা গেলে, হয়তো এদের সঙ্কটপূর্ণ অবস্থা ও মৃত্যুও আটকানো যেতে পারে।

তথ্যসূত্রঃ
https://science.sciencemag.org/content/early/2020/09/23/science.abd4585
https://science.sciencemag.org/content/early/2020/09/23/science.abd4570 https://www.sciencemag.org/news/2020/09/hidden-immune-weakness-found-14-gravely-ill-covid-19-patients
 
————————
~ কলমে এলেবেলে নির্মাল্য ~

2 thoughts on “রোগ প্রতিরোধে জীনগত ত্রুটি বাড়াচ্ছে কোভিড সঙ্কট

  • October 7, 2020 at 5:47 am
    Permalink

    সকলের বুঝবার মতো করে লেখক খুব ভালোভাবে নিজের বক্তব্য রেখেছেন। তথ্যপূর্ণ ও সাবলীল লেখা। অনেক ধন্যবাদ জানালাম।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।