করোনাকে রুখিবে যে, কোন কুলে বাড়িছে সে?

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
664 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিনের জন্য সেই কবে থেকে আমরা হাপিত্যেশ করে বসে আছি, আর বিশ্ব জুড়ে বহু বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা সেটা তৈরির জন্য দিনরাত পরিশ্রমও করে চলেছেন। একটি ভ্যাকসিন বানাতে  কত ধাপ রয়েছে এবং তাতে কি কি প্রক্রিয়া আছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে ‘ভ্যাকসিনের ভুল-ভুলাইয়া’ প্রবন্ধে । সেটা পড়লে বোঝাই যাচ্ছে,  ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও তাকে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে বহু বছর লেগে যেতে পারে। তবে আশার কথা, কোভিডের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ভ্যাকসিন আবিষ্কার করার কাজটিকে ত্বরান্বিত করেছেন। এর আগে COVID-19-র জন্য দায়ী করোনা ভাইরাস SARS-COV-2 এর পূর্বসূরী SARS-COV ভাইরাস আবির্ভূত হয়েছিল ২০০৩ সালে। বিজ্ঞানীরা সেটির ওপরে চালানো অনেক বছরের গবেষণা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন যে ভাইরাসের কোন কোন অংশকে ভ্যাকসিনের জন্য চিহ্নিত করা যায়। সাথে, তাঁরা অত্যাধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোন কোন অংশ থেকে সাফল্য আসার সম্ভাবনা কতটা, সেটিও গণনা করে ফেলেছেন। ফলে করোনা ভ্যাকসিনের টার্গেট আবিষ্কারের যে প্রাথমিক মৌলিক গবেষণা করতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগে যেত, সেটিকে পুরোপুরিভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। 

বর্তমানে ১৮০টির বেশি করোনা ভ্যাকসিন তৈরীর কাজ চলছে, যার মধ্যে চল্লিশটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আছে আর তাদের মধ্যে দশটি আছে  ফেজ  থ্রী বা তৃতীয় ধাপে।  এই ভ্যাকসিনগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়: ধ্রুপদী, আধুনিক, অত্যাধুনিক। ধ্রুপদী পদ্ধতিতে ভাইরাসের সম্পূর্ণ বা আংশিক দেহ ব্যবহার করা হয় আমাদের শরীরে অনাক্রম্যতা তৈরি করতে। সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বা সম্পূর্ণ মৃত ভাইরাস দ্বারা তৈরি ধ্রুপদী ভ্যাকসিন ইতিমধ্যেই চীন, কাজাখাস্তান, ও ভারতে তৈরি হচ্ছে,এবং ইতিমধ্যে তৃতীয় ধাপে পৌঁছে গেছে। আধুনিক ভ্যাকসিনে ভাইরাসের যেকোনো একটি প্রোটিনকে (প্রোটিন কি সেটি আমার আগের প্রবন্ধে আলোচনা করেছি) ব্যবহার করা হয় আমাদের অনাক্রম্যতা তৈরি করতে। গ্রেট ব্রিটেন ও চিন এই পদ্ধতি ব্যবহার করে তৃতীয় ধাপে পৌঁছে গেছে। দু’ভাবে আধুনিক ভ্যাকসিন তৈরি করা হচ্ছে। এক, করোনা ভাইরাসের একটি প্রোটিনকে সরাসরি ভ্যাকসিন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পদ্ধতি বেশ নিরাপদ, কারণ কখনোই গোটা ভাইরাস ব্যবহৃত হচ্ছে না। আবার কখনো করোনার একটি প্রোটিনের জিনকে অন্য একটি ভাইরাসের খোলসের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। এটিও নিরাপদ পদ্ধতি। কারণ,  এই ভাইরাসের খোলস কোন রোগ সৃষ্টি করতে পারে না। এবার আসা যাক, অ্যামেরিকায় গবেষণাধীন অত্যাধুনিক পদ্ধতির  বিষয়ে। এই পদ্ধতিতে শুধুমাত্র আরএনএ ব্যবহৃত হচ্ছে। এলেবেলের পাতায় ‘বাতাস লাগুক প্রাণে’ প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছিল, যে ডিএনএর মধ্যে সমস্ত তথ্য সঞ্চিত থাকে, সেই তথ্যের প্রথমে একটি অনুলিপি তৈরি হয় আরএনএ-তে। আর সেই আরএনএ-র তে লিখিত তথ্য ব্যবহার করে তৈরি হয় প্রোটিন। এই নতুন ধরনের ভ্যাকসিনে, করোনা ভাইরাসের স্পাইক বা কাঁটা-প্রোটিনের জন্য প্রয়োজনীয়  আরএনএ-টিকে মানবশরীরে  চালান করা হবে; আমাদের কোষ  সেটি  থেকে ভাইরাসের প্রোটিনটি তৈরি করে নেবে। এই পদ্ধতিও নিরাপদ। আর আমরা সমস্ত ভ্যাকসিনেই চারটি জিনিস দেখতে চাই- ভ্যাকসিনটি অনাক্রম্যতা তৈরি করতে পারছে কিনা, শরীরের অন্যান্য কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে কিনা, দীর্ঘস্থায়ী অনাক্রম্যতা থাকছে কিনা, আর স্বল্প খরচে সবার কাছে তা পৌঁছে দেওয়া যায় কিনা। এই চারটি মানদণ্ড মেপে আপাতত সাতটি ভ্যাকসিনের কথা বলব, যাদের সবকটিই তৃতীয় পর্যায়ে আছে। যে ফলাফল গুলি আলোচনা করবো সেগুলো সবই দ্বিতীয় দফার।

এক, চীনের সাইনো-ভ্যাক কোম্পানি CoronaVac নামে ভ্যাকসিন তৈরি করছে। এটি ধ্রুপদী শ্রেণীর ভ্যাকসিন। এখানে করোনাভাইরাসকে নিষ্ক্রিয়  করে ব্যবহার করা হচ্ছে।  সুখবর হল, এই ভ্যাকসিনের বুস্টার ডোজ দেওয়ার পর বেশ ভালো পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে। যদিও কতদিন পর্যন্ত অনাক্রম্যতা থাকছে সেটি এখনো জানা যায়নি। ২০২১ জানুয়ারি পর্যন্ত আমাদের তৃতীয় পর্যায়ের ফল জানতে অপেক্ষা করতে হবে।

দুই, ক্যান-সাইনো নামক চীনের আরেকটি কোম্পানি ‘Ad5-nCoV’ নামক আধুনিক ভ্যাকসিন তৈরি করছে। এখানে করোনাভাইরাস এর কাঁটা-প্রোটিন বা স্পাইক-প্রোটিনের জিন অ্যাডিনোভাইরাসের খোলসের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ভ্যাকসিনটির বুস্টার ডোজ দেওয়ার আগেই খুব ভালো পরিমাণ অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা অত্যন্ত আশাপ্রদ খবর। আশা করা যাচ্ছে, এ বছর ডিসেম্বর নাগাদ এটির ফলাফল জানা যাবে। 

তিন, অ্যাস্ট্রাজেনিকা নামক একটি বিখ্যাত আমেরিকান কোম্পানি ও অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সমন্বয়ে  তৈরি হচ্ছে ‘ChAdOx1 nCoV-19 v’ নামক একটি আধুনিক ভ্যাকসিন। এখানেও কাঁটা-প্রোটিনের জিনকে অ্যাডিনোভাইরাসে ঢোকানো হয়েছে। এই ভ্যাকসিনটি অনেক আশা দেখাচ্ছে। প্রথমত, এই নভেম্বরেই হয়তো তৃতীয় পর্যায়ের প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশিত হতে পারে। তাছাড়া প্রথম ডোজ আর বুস্টার ডোজ উভয়েই খুব ভালো পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি করেছে। এমনকি অনেক দিন অবধি অনাক্রম্যতা বজায় থাকছে। শুধু তাই নয়, ব্যবসায় ঝুঁকি নিয়ে ফলাফলের অপেক্ষা না করেই ভারতীয়  কোম্পানি সেরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া এটি তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছে। 

চার, আরেকটি আমেরিকান কোম্পানি নোভাভ্যাক্স ‘NVX‑CoV2373’ নামে একটি আধুনিক ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। এখানে করোনাভাইরাস এর স্পাইক প্রোটিনটি সরাসরি ভ্যাকসিন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ভ্যাকসিনটিও ভালো মাত্রায় অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে প্রাথমিক ডোজ এর পর। যদিও কতদিন অবধি অনাক্রম্যতা বজায় থাকছে সেটা জানা যায়নি, কিন্তু ফল আশাব্যাঞ্জক। 

এই প্রথম চারটি ভ্যাকসিনেরই সুবিধা হল এদের সহজে তৈরি ও বন্টন করা যায়।

পাঁচ, আমেরিকান কম্পানি মডারনা ‘mRNA-1273’ নামে অত্যাধুনিক ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। এখানে করোনাভাইরাস কাঁটা-প্রোটিনের আরএনএ ব্যবহৃত হয়েছে। এই ভ্যাকসিনটিও প্রাথমিক ভাবে খুব আশা জাগানো ফল দেখিয়েছে। প্রাথমিক ও বুস্টার ডোস, উভয়েই খুব ভালো অ্যান্টিবডি তৈরি করেছে। এই ভ্যাকসিনটিই বুস্টারের পর এখনো পর্যন্ত সর্বোচ্চ মাত্রায় অ্যান্টিবডি তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয়, বেশ অনেক দিন অবধি অনাক্রম্যতা বজায় থাকছে। এই ভ্যাকসিনটির তৃতীয় দফার ফলাফল নভেম্বরে আসার কথা।

ছয় ও সাত, আমেরিকান ফার্মা-দৈত্য ফাইজার ‘BNT162b1’ ‘BNT162b2’ নামে দুটি অত্যাধুনিক ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। এখানেও কাঁটা-প্রোটিনটির আরএনএ ব্যবহৃত হয়েছে, একটিতে গোটা কাঁটা প্রোটিনের জন্য, অন্যটায় কাঁটা-প্রোটিনটির টুকরোর জন্যে। এই দুটি ভ্যাকসিনেরই প্রাথমিক ডোজে ভালো অ্যান্টিবডি তৈরির ক্ষমতা দেখা গেছে। এই ভ্যাকসিনটির তৃতীয় দফার ফলাফলও নভেম্বর-ডিসেম্বরে আসার কথা।

তবে শেষ তিনটি ভ্যাক্সিনে আরএনএ অণু ব্যবহারের দরুন একটি সমস্যা আছে। আরএনএ অণু খুবই ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়, তাই সাধারণ তাপমাত্রায় তা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেই জন্য শীতল ট্রাকে -৮০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় এটিকে পরিবহন করতে হবে, যা খুব খরচসাপেক্ষ।

দেখাই যাচ্ছে, যে এতগুলি দেশ কী ভয়ঙ্কর দ্রুততার সাথে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আনার পরিকল্পনা করছে। হয়তো প্রথম ভ্যাকসিন বাজারে ডিসেম্বরের মধ্যেই চলে আসবে। কিন্তু প্রশ্ন অনেক, এত কোটি কোটি ভ্যাকসিন তাড়াতাড়ি তৈরি করা হবে কি করে? কতগুলো ডোজ লাগবে? কে খরচা বহন করবে? একটি দেশ কি অন্য দেশকে ভ্যাকসিন দেবে? ইনফ্লুয়েঞ্জার মতন করোনা ভাইরাসের কি প্রত্যেক বছর ভ্যাকসিন নিতে হবে? প্রথমেই স্বাস্থ্য কর্মী ও পয়ষট্টি বছরের উপরের বয়স্ক মানুষদের ভ্যাকসিন দিতে হবে, এটা তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। এদিকে, সমস্ত করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিনেই দেখা যাচ্ছে বয়স্ক মানুষদের বেশি পরিমানে ভ্যাকসিন দিতে হচ্ছে। তাহলে কোন ভ্যাকসিনটাই বা নেওয়া উচিত হবে? একে একে উত্তর দিচ্ছি। 

দুনিয়া শুদ্ধ মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে এবং একাধিক ডোজ দিতে হবে। খরচা সরকার এবং সাধারণ মানুষ উভয়কেই বহন করতে হবে না হলে অনেক দেশ দেউলিয়া হয়ে যাবে। এবং সমস্ত তথ্য এটা ইঙ্গিত করছে যে ইনফ্লুয়েঞ্জার মত করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিনও আমাদের প্রতি বছর নিতে হবে। বেশিরভাগ বিজ্ঞানীরা যারা করোনাভাইরাস নিয়ে কাজ করছেন, সব দিক বিচার করে তাদের বক্তব্য, ফাইজার বা নোভাভ্যাক্স এর গুলো ভালো ভ্যাকসিন হতে পারে। পরের বছরের মে বা জুন মাসে হয়তো প্রথম ডোজ পাবে কিছু মানুষ। কোন দেশে এখনি বলা যাচ্ছেনা। 

শেষে বলব, সেই ক্লিশে হয়ে যাওয়া প্রবাদ, প্রিভেনশান ইস বেটার দ্যান কিউর; তাই আপাততঃ,  মুখে মাস্ক আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাই এখন আমাদের একমাত্র হাতিয়ার। আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত না এই করোনা স্বাস্থ্যসমস্যার সমাধান করছি, ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান করতে পারবো না। জার্মানির উদাহরণ দেখাচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধি মানলে এবং নিয়মিত টেস্ট আর কন্টাক্ট ট্রেসিং করলে, সব খুলে রাখা সত্ত্বেও, করোনা ভাইরাস ভয়ানক ভাবে ছড়াচ্ছেনা। তাহলে আমরাই বা কেন সচেতন হবনা!

—————————–

~ কলমে এলেবেলের অতিথি সৌভিক ভট্টাচার্য্য~

 

সৌভিক আমেরিকায়, University of Texas এ, অস্টিন শহরে ব্যাকটেরিয়া দলবদ্ধ ভাবে কিকরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করে সেই বিষয়ে গবেষণা করছেন। 

 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

3 thoughts on “করোনাকে রুখিবে যে, কোন কুলে বাড়িছে সে?

  • October 10, 2020 at 8:41 am
    Permalink

    তথ্যভিত্তিক সাবলীল লেখা। সাধারণ লোকও আশা করি ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারবে বিষয়টির গভীরতা। অনেক ধন্যবাদ লেখককে।🙏

  • October 10, 2020 at 10:49 am
    Permalink

    ধারণা টা অনেক স্বচ্ছ হল, ভীষণ ভালো লাগল…☺️

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।