ফসফিন – এক জীবন্ত স্বাক্ষর

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
468 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

“অবশেষে কি তাহলে শুক্রগ্রহে পাওয়া গেল প্রাণের সন্ধান?” গতমাসের খবরে এরকম কিছু চাঞ্চল্যকর শিরোনাম উঠে আসে। কিন্তু কিসের খোঁজ মিলল শুক্র গ্রহের পরিবেশে? এলিয়ন নাকি ইউ.এফ.ও? নাকি এ শুধুই ভিত্তিহীন শিরোনামের ভাঁওতা?  

না, একদমই ভাঁওতা নয়! ব্যাপারটা ঠিক এলিয়ন গোছের না হলেও প্রাণের সন্ধানের শিরোনামটা কিন্তু খুব একটা ভুলও নয়। কার্য দেখে কারণের অনুমান তো বিজ্ঞানেরই অঙ্গ। কিন্তু কি এমন পাওয়া গেল, যাতে এরকম একটা শিরোনামে পৌঁছনো যায়? আসলে, এর পেছনে লুকিয়ে আছে ফসফিন নামের এক বিষাক্ত যৌগের উপস্থিতির গল্প।

প্রথমেই বলে নেওয়া যাক ফসফিন (phosphine) বস্তুটি আসলে কি! ফসফিন একপ্রকারের বর্ণহীন,দাহ্য ও বিষাক্ত এক গ্যাসীয় যৌগ। শুদ্ধ ফসফিন গন্ধহীনও বটে। কিন্তু প্রতিস্থাপিত ফসফিন (substituted phosphine) বা ডাইফসফেনের (diphosphane) উপস্থিতির কারণে ফসফিন থেকে পচা মাছের মতো দুর্গন্ধ নির্গত হয়। একটি ফসফিন অণু আসলে গঠিত হয় একটি ফসফরাস পরমাণু ও তার সাথে লেগে থাকা ৩টি হাইড্রোজেন পরমাণু দ্বারা। ফসফিন পৃথিবীতে মূলত তৈরি হয় পচতে থাকা জৈবিক পদার্থে উপস্থিত ফসফেটের বিজারণের কারণে। ফসফিনের অ্যাবায়োটিক সংশ্লেষণে‌ প্রচুর পরিমান শক্তির প্রয়োজন হয়। সেই জন্য কোনো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে ফসফিনের উপস্থিতি সেই অঞ্চলে জীবনের সম্ভাব্য অস্তিত্বকে নির্দেশ করে। এই কারণে ফসফিনকে ‘জীবস্বাক্ষর’ (biosignature) বলা হয়ে থাকে।

এবার আসল ঘটনায় আসা যাক। ইউনাইটেড কিংডমের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী প্রফেসর জেন এস. গ্রিভসের (Jane S. Greaves) নেতৃত্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের এক আন্তর্জাতিক দল কর্তৃক এক গবেষণায় জানা গেল, শুক্রের ৫০ কি.মি. উচ্চতায় মেঘের মধ্যে ফসফিনের অস্তিত্ত্বের কথা। গবেষণাপত্রটি ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০-এ প্রকাশিত হয় ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’-এর সেপ্টেম্বর সংখ্যায়। শুক্র গ্রহের মেঘের মধ্যে এই ফসফিন গ্যাসের অস্তিত্ব প্রথম ধরা পড়ে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল টেলিস্কোপের (JCMT) মাধ্যমে। পরে চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত ALMA নামক রেডিও টেলিস্কোপের দ্বারা আরেকবার খতিয়ে দেখে ফসফিনের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন। শুধু তাই নয়, তাঁরা এই ফসফিনের পরিমাণও হিসেব করেন।

এর আগে বৃহস্পতি বা শনির মত গ্রহেও ফসফিনের উপস্থিতি ধরা পড়ে। তবুও, তার সঙ্গে প্রাণের অস্তিত্বের কোনো সম্পর্কের কথা আমাদের সামনে কখনো আসেনি। আসলে, শক্তির আধিক্যের কারণেই অ্যাবায়োটিক সংশ্লেষণে‌র দ্বারা ফসফিন তৈরি হওয়া সম্ভব এই গ্যাসের দানব গ্রহগুলিতে (Gas Giant) । কিন্তু শুক্রের ক্ষেত্রে ফসফিনের দেখা পাওয়া গেলেও, তার তৈরীর কারণটা বৃহস্পতি কিম্বা শনির মতো নয়। 

শুক্র গ্রহের তাপমাত্রা এবং চাপের তথ্য, এবং যে পরিমাণ ফসফিন শুক্রের আবহাওয়ায় মজুত, সেখান থেকে এইটুকু সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াই যায় যে, কোনো রকম চেনা জানা আলোক-রাসায়নিক বা ভূ-রাসায়নিক বিক্রিয়ার দ্বারা শুক্রের বুকে এই পরিমাণে ফসফিন উৎপন্ন হওয়া সম্ভব নয়, যেমনটা সম্ভব হয় বৃহস্পতি বা শনির ক্ষেত্রে। অতয়েব জৈবিক পদার্থে থাকা ফসফেটের বিজারণ শুক্র গ্রহে খুঁজে পাওয়া ফসফিনের উপস্থিতির সম্ভাব্য কারণ হতেই পারে। আর জৈবিক অবশেষ তো জীবনেরই স্বাক্ষর। অতএব, শুক্রে প্রাণের উপস্থিতির তত্ত্বটিকে নাকচ করে দেওয়া একেবারেই অসম্ভব।

অবশ্য তার মানে এই নয়, আপনিও হঠাৎ এক রাতের বেলা বঙ্কু বাবুর মতো শুনতে পেতে চলেছেন “মিলিপিপ্পিং খ্রুক, মিলিপিপ্পিং খ্রুক!” শুক্র গ্রহের অম্লপ্রধান আবহাওয়ায় প্রাণ থাকলেও এমনই ব্যাকটেরিয়া থাকার সম্ভাবনা বেশি যা উচ্চ তাপমাত্রা এবং অম্লীয় মাধ্যমে বেঁচে থাকতে পারবে। অবশ্য গবেষণার আরো অগ্রগতি ছাড়া এই মুহুর্তেই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। আপাতত দেখা যাক, বঙ্কু বাবুর মতো আমাদের বরাতেও ভিনগ্রহী বন্ধু জোটে কি না!

তথ্যসূত্র:

১) https://en.m.wikipedia.org/wiki/Phosphine

২) https://www.nature.com/articles/s41550-020-1174-4

—————————–

~ কলমে এলেবেলে স্বর্ণাভ ~

 

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।