চাঁদের দেশে জলের খোঁজ

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
226 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

এই প্রথমবার চাঁদের আলোকিত অংশে (যে অংশে সূর্যের আলো এসে পড়ে; প্রসঙ্গত, চাঁদের এক পৃষ্ঠে কখনোই সূর্যের আলো এসে পড়ে না।) জলের অস্তিত্ব পাওয়া গেলো। পৃথিবী থেকে চাঁদের যে গর্ত গুলি দেখা যায়, তেমনি একটি বৃহৎ গর্তে (ক্লাভিয়াস) মিলেছে জলের অণুর হদিস। শুধু তাই না, চাঁদের সমগ্র ভূভাগেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে পারে জল – এমনি  চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে নাসা-র স্ট্র্যাটোস্ফেরিক অবজারভেটরি ফর ইনফ্রারেড অ্যাস্ট্রোনমির ( সোফিয়া) গবেষণায়।

কোথায় বিশেষত্ব এই ফলাফলের?

প্রসঙ্গত, পৃথিবীতে প্রাণের জন্য অপরিহার্য যে জল, তা পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে আছে কিনা তা নিয়ে মানুষের কৌতূহল দীর্ঘ দিনের। আকাশের সীমা ছড়িয়ে মহাকাশে পৌঁছেছে মানুষ আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে, তারপর থেকে অনবরত পৃথিবীর তাবড় মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো উঠে পড়ে লেগেছে পৃথিবীর বাইরে জলের অস্তিত্বের খোঁজে। আজ অব্দি গবেষণায় বেশ কিছু ধূমকেতু, উল্কাতে মিলেছে জলের খোঁজ, তবে তা বরফ রূপে। মনে করা হয় এইগুলিই পৃথিবীতে জলের উৎস বলে বিজ্ঞানীদের অভিমত! তাহলে চাঁদ বা অন্য গ্রহ গুলিতেও কি থাকতে পারে জল? বা সেগুলোতে কি অতীতে কখনো ছিল তরল জল? ১৯৬৯ সালে মানুষ প্রথমবার চাঁদে নামার পরও মনে করা হতো যে চাঁদের মাটি শুষ্ক। এরপর শুরু হলো নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবেষণা।

২০০৮ সালে ভারতের চন্দ্রযান -১ অভিযানের গবেষণাতেও মেলে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। চাঁদের ছায়াযুক্ত জায়গায় মেলে জলযোজনের (হাইড্রেশন) প্রমাণ।

বিগত ২০ বছরে বেশ কিছু মহাকাশ সংস্থার গবেষণায়  চাঁদে জল থাকার কিছু ইঙ্গিত মিলেছিল। ২০০৮ সালে ভারতের চন্দ্রযান -১ অভিযানের গবেষণাতেও মেলে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। চাঁদের ছায়াযুক্ত জায়গায় মেলে জলযোজনের (হাইড্রেশন) প্রমাণ। তবে কোনো গবেষণাতেই নিশ্চিত ভাবে প্রমাণ মেলেনি এই জলযোজনের জন্য দায়ী জল নাকি হাইড্রক্সিল আয়ন! উপরন্তু এই গবেষণাগুলিতে যে জলযোজনের প্রমাণ মেলে সেগুলো সবই ছিল চাঁদের সেই অংশে যেখানে সূর্যালোক প্রায় পৌঁছয় না এবং তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম! আর এখানেই বিশেষত্ব ‘সোফিয়া’-র এই নতুন আবিষ্কারের; প্রথম বার নিশ্চিত ভাবে প্রমাণ পাওয়া গেলো যে চাঁদের পৃষ্ঠে জলযোজনের জন্য দায়ী জল এবং সাথে প্রথম বার চাঁদের আলোকিত অংশেও পাওয়া গেলো জলের সন্ধান!

কি এই ‘সোফিয়া’?

আমেরিকা যুক্ত রাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (নেশন্যাল এরোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) এবং জার্মান এরোস্পেস সেন্টার এর যৌথ প্রকল্প হলো সোফিয়া। মজার ব্যাপার, এটি একটু ভ্রাম্যমাণ – বলা ভালো উড়ন্ত  মানমন্দির। ৪৫ হাজার ফুট উঁচুতে উড়ন্ত একটি বোয়িং জেট উড়োজাহাজ এ স্থাপন করা  হয়েছে, ১০৬ ইঞ্চি ব্যাসের অবলোহিত বর্ণালী ধরতে সক্ষম টেলিস্কোপ টিকে। আরও মজার ব্যাপার মূলত নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি হয়েছিল এর দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি। নেহাত পরীক্ষামূলক ভাবেই তাকে তাক করা হয়েছিল চাঁদের দিকে, আর তাতেই মিললো এই চাঞ্চল্যকরতথ্য!

জল তো পাওয়া গেলো, কিন্তু কতটা?

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ‘সোফিয়া’ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী চাঁদের মাটিতে প্রতি ঘন মিটারে জলের পরিমাণ ৩৪০ মিলি লিটার! হ্যাঁ, এই পরিমাণ ভীষণ কম, এমনকি সাহারা মরুভূমিতে সম আয়তনে এর প্রায় ১০০ গুণ জল পাওয়া যায়!

চাঁদের মাটিতে প্রতি ঘন মিটারে জলের পরিমাণ ৩৪০ মিলি লিটার!

উৎস কি এই জলের?

কিভাবে এলো চাঁদের মাটিতে এই জল, এখন সেই উত্তরের সন্ধানেই রয়েছে বিজ্ঞানীরা। চাঁদের অন্ধকার জায়গাগুলিতে তাপমাত্রা কম বলে সেখানে জলের অস্তিত্ব থাকতে পারে; কিন্তু চাঁদের যে অংশে সূর্যের আলো পড়ে সেখানে জল থাকতে পারে না – এতদিন এই ধারণাই ছিল বিজ্ঞানীদের। মূলত চাঁদে বায়ুমণ্ডল না থাকায় অতীতে কখনো জল থাকলেও, সেই জল আলোর ফোটন কনার সাথে বিক্রিয়ায় হাইড্রক্সিল অয়ন এবং হাইড্রোজেন আয়ন এ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাহলে কিভাবে এখনো ওই আলোকিত অংশেও জল এর অস্তিত্ব আছে?

এই ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের ধারণা, মূলত দুই ভাবে এই জলের উৎপত্তি হয় থাকতে পারে চন্দ্র পৃষ্ঠে। এক, অনবরত চাঁদের পৃষ্ঠে আছড়ে পড়ে ছোটো বড়ো উল্কা পিন্ড। সেগুলো থেকে অল্প পরিমাণ জল চাঁদের পৃষ্ঠে মিশে থাকতে পারে। দুই, সূর্য থেকে আগত হাইড্রোজেন আয়ন চাঁদের পৃষ্ঠে  খনিজের মধ্যে থাকা হাইড্রক্সিল  আয়নের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে তৈরি করে জল।

কিন্তু, সূর্যের আলো থাকা সত্ত্বেও সেই জল এখনো আছে কি করে? বিজ্ঞানীদের ধারণা, চন্দ্রপৃষ্ঠে বালুকনার মাঝে এই জলকনাগুলি থাকায় তা সূর্যের প্রখর তাপ থেকে রেহাই পেয়েছে।

কতটা  গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?

পরিমাণে কম হলেও চাঁদে পাওয়া এই জলের গুরুত্ব অপরিসীম, একদিকে এই আবিষ্কার তুলে ধরেছে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন, তেমনি ভবিষ্যতে চাঁদে মানুষের অভিযান বা বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রেও এই আবিষ্কার মূল্যবান হতে পারে! যদিও এই জল কতটা ব্যবহার যোগ্য সেসব এখনো পরীক্ষাধীন।

তথ্যসূত্র: https://www.nasa.gov/press-release/nasa-s-sofia-discovers-water-on-sunlit-surface-of-moon/

—————————–

~ কলমে এলেবেলে অর্কব্রত ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

2 thoughts on “চাঁদের দেশে জলের খোঁজ

  • October 30, 2020 at 3:55 pm
    Permalink

    It's an informative writing. I didn't have any idea on this topic before.

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।