আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে / সাত সাগর আর তেরো নদীর পাড়ে…

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
165 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

স্বপ্ন আসলে কি? আমরা কেন স্বপ্ন দেখি? ভোরের স্বপ্ন কি সত্যি হয়? কেন বেশিরভাগ স্বপ্ন আমরা মনে রাখতে পারিনা? স্বপ্নের কি কোন প্রকারভেদ আছে? স্বপ্ন দেখার পিছনে কি থাকে তবে মনের অভিসন্ধি? স্বপ্ন যেন ঘুমিয়ে থেকেও বেঁচে থাকা রহস্যময় এক জগতে।

প্রায় 100 বছর আগে ‘সিগময়েড ফ্রয়েড’ নামে এক মনস্তাত্ত্বিক স্বপ্নের ধারণা দেন। তারপর 1953 সালে অ্যাসেরিন্সকি এবং ক্লেইটম্যান নামে দুজন বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেন স্বপ্নের এক মুখ্য কারণ। ক্লেইটম্যান কে বলা হয় আধুনিক ঘুম সম্পর্কিত গবেষণার জনক।

স্বপ্ন কি?

স্বপ্ন কি?  স্বপ্নকে বেশ কিছু ভাবমূর্তি, কল্পনা, আবেগ এবং অনুভবের সংমিশ্রন বলা যেতে পারে। যা আমাদের মনের অন্তরে অজান্তেই থেকে যায় আর ঘুমের মধ্যে দিয়ে ফিরে আসে। অনেক সময় স্বপ্নের মধ্যে বাস্তবতাও লুকিয়ে থাকে। অনেকটা সিনেমার মতো- একটা গল্প, কিছু চরিত্র এবং একটা অন্তর্নিহিত অর্থ থাকে। সবই তো হলো; কিন্তু হিরো কই? সেও থাকে। তবে কি জানেন, স্বপ্নে দেখা বেশিরভাগ গল্পেরই হিরো হন সেই ব্যক্তি নিজেই।

মানুষ কেন স্বপ্ন দেখে? সব মানুষই কি স্বপ্ন দেখে? – উত্তরটা হ্যাঁ। যারা বলে, “কই !! আমি তো স্বপ্ন দেখি না।” তারাও স্বপ্ন দেখে, কিন্তু নিজেদের অজান্তেই। কিরকম তা বুঝিয়ে বলি। আমাদের ঘুম কে সাধারণত দুটো ভাগে ভাগ করা হয়। একটা কে বলে ‘রেপিড আই মুভমেন্ট’ বা সংক্ষেপে ‘রেম’ আর দ্বিতীয় টা হল ‘নন-রেপিড আই মুভমেন্ট’ বা  ‘এন-রেম’। ঘুমের যে অবস্থায় চোখের মণি নড়াচড়া করে সেটা হল ‘রেম’। ঘুমের যে সময় চোখের মনি স্থির থাকে তাকে বলে ‘এন-রেম’। রেম ঘুমের সময় আমরা স্বপ্ন দেখে থাকি। এই সময় মস্তিষ্কের সেইসব স্নায়ুকোষ গুলি বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে, যারা ‘মেলানিন-কনসেনট্রেটিং হরমোন’ (MCH) ক্ষরণে অংশগ্রহণ করে। এই বিশেষ হরমোন টি আমাদের ঘুম এবং খিদেকে নিয়ন্ত্রণ করে। ইঁদুরের ঘুমের বেশকিছু বৈদ্যুতিক গ্রাফ্ থেকে জানা গেছে যে, এই হরমোন তৈরিতে অংশগ্রহণকারী স্নায়ুকোষ গুলি ‘হিপ্পোক্যাম্পাস’ নামে মস্তিষ্কের এক অংশে নিষেধাত্মক সংকেত পাঠায়। এই বিশেষ অংশটি মস্তিষ্কে যাবতীয় স্মৃতি এবং তথ্যকে সঞ্চয় করতে সাহায্য করে। যেই মুহূর্তে MCH নিষেধাজ্ঞা বার্তা পাঠায়, হিপ্পোক্যাম্পাস সঙ্গে সঙ্গে সব তথ্য কে মুছে দেয়। আবার ‘আমেরিকান জার্নাল অফ সাইক্রিয়াটি’ তে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে জানা যায় যে, স্বপ্ন দেখার সময় মস্তিষ্কে ‘নর-এপিনেফ্রিন’ নামে এক হরমোনের অনুপস্থিতির কারণেও আমরা সেই স্বপ্নে কি দেখেছিলাম তা ভুলে যাই। এবার প্রশ্ন আসে, অনেক সময় স্বপ্নে কি দেখেছিলাম তা আমরা মনে করতে পারি। পুরোটা না হলেও কিছু কিছু আমাদের মনে থেকে যায়। তা কী করে সম্ভব?- হ্যাঁ। তাও সম্ভব। রেম ঘুমের সময় অর্থাৎ যখন আমরা স্বপ্ন দেখি, সেই সময় কোন কারণবশত ঘুম ভেঙে গেলে মস্তিষ্ক স্বপ্নের সমস্ত তথ্য মুছে ফেলার সময় পায় না। এবং শেষের দিকের কিছু স্বপ্ন আমাদের মনে থেকে যায়। মজার বিষয় হলো যে, মানুষ রোজ রাতে সাত থেকে আটটি করে স্বপ্ন দেখে কিন্তু আমরা তা জানতেই পারি না।

কিন্তু জেগে থাকে অবচেতন মন। 

স্বপ্নের রহস্য ভেদে, মনোবিদ ‘সিগময়েড ফ্রয়েড’-এর ব্যাখ্যা দেওয়া যাক। তিনি ভিয়েনা শহরে স্নায়ু-বিশেষজ্ঞ হিসাবে ডাক্তারি করার সময় তার মানসিক রোগীদের দেখা স্বপ্নগুলোর কথা মন দিয়ে শুনতেন এবং সেই স্বপ্ন থেকে তাদের রোগের কোনো হদিস পাওয়া যায় কিনা তা জানার চেষ্টা করতেন। ‘ইন্টারপ্রিটেশান অফ ড্রিমস(1899)’ বইতে তিনি মনের ক্রিয়া-কলাপ এর নতুন ব্যাখ্যা দিলেন। ফ্রয়েড বললেন, আমাদের যে মনটাকে আমরা চিনি বা বুঝি অর্থাৎ যে মনটার মধ্যে ইচ্ছে, আবেগ এসব জেগে ওঠে তা হল ‘চেতন মন’। সেই চেতন মনের গভীরে থাকে এক অবচেতন মন; যার অস্তিত্ব আমরা মাঝে মাঝে টের পাই। আমরা যখন জেগে থাকি, কোন কাজে ব্যস্ত থাকি, তখন আমাদের ভাবনা, চিন্তা, আবেগ, অনুভূতি সব থাকে চেতন মনের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু যখন আমরা ঘুমিয়ে পড়ি আমাদের চেতন মন ও ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু জেগে থাকে অবচেতন মন। সেই সময় আমাদের দেহের চলন, শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রতিটি অঙ্গের কার্যকারিতা এবং সাথে কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে সর্বেসর্বা অবচেতন মন। আর সেই মনের ইচ্ছে আকাঙ্ক্ষা স্বপ্নের রূপ নিয়ে ধরা দেয়ার চেষ্টা করে আমাদের চেতনার মধ্যে। এই অবচেতন মন কিন্তু বেশ কিছু অস্পষ্ট ছবি, সাংকেতিক চিহ্ন বা রূপকের মাধ্যমে আমাদের সামনে সেই ইচ্ছে আকাঙ্ক্ষা গুলোকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে, যা আমাদের চেতন মনের ভাবনাগুলোর সম্পূর্ণ উল্টোও হতে পারে। যেমন ধরা যাক, কোনো এক ব্যক্তির তার সহকর্মীর সাথে খুব ঝগড়া হয়েছে। ফলে সেই ব্যক্তির যথেষ্ট রাগ হওয়ার কথা; এবং সেই রাগ থেকে প্রতিহিংসার কথাও তার মনে জাগতেই পারে। ইচ্ছেটা যে অন্যায়; সেটা সে জানে বলেই চেতন মন থেকে তার সরিয়ে নিলেও তার অবচেতন মনে ইচ্ছেটা থেকে যায়। সেক্ষেত্রে সে হয়তো স্বপ্নে দেখল- একজন চোরকে সে মারছে, যার চেহারাটা কিঞ্চিৎ তার সহকর্মীর মতো। সে ক্ষেত্রে সহকর্মীর ক্ষতি করার যে আশঙ্কা জেগেছিল সেই ব্যক্তির অবচেতন মনে, সেই আশঙ্কার পরিতৃপ্তি হলো স্বপ্নের মধ্যে। কিন্তু স্বপ্নে সহকর্মীকে সরাসরি মার খেতে দেখা গেল না কেন? কেন চোর রূপে সহকর্মীকে দেখা গেল? ফ্রয়েডের মতে, এর পেছনে রয়েছে মনের প্রহরীর কেরামতি। ঘুমের সময় অবচেতন মনের অনৈতিক অসামাজিক ইচ্ছেগুলো স্বপ্নের মধ্যে হুবহু উঠে আসতে পারেনা; কারণ সহকর্মীর মার খাওয়ার চিন্তাটা চেতন মনে অন্যায়। অথচ অবচেতন মন সেটাই চাইছে। সেক্ষেত্রে, অবচেতন মন যেন চেতন মনের সাথে খানিকটা সমঝোতা করেই ঘটনা ঘটায় এবং সংঘাতে না গিয়ে অবচেতন মনের ইচ্ছাটা পূর্ণ হয়।

মানুষ ছাড়া অন্যান্য পশুরাও স্বপ্ন দেখে। এমনকি শিশুরাও স্বপ্ন দেখে। ছোট শিশুরা তাদের ঘুমের শতকরা 50 থেকে 70 ভাগ সময় থাকে স্বপ্ন দেখা অবস্থায়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে শিশুদের রেম ঘুমের পরিমাণ কমতে থাকে। কৈশোর বা তার পরবর্তী সময়ে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমের মধ্যে মাত্র ঘন্টা দুয়েক কাটে স্বপ্ন দেখা অবস্থায়। সাধারণত ঘুমিয়ে পড়ার 10 মিনিটের মধ্যে স্বপ্ন পর্ব শুরু হয়। 10 থেকে 15 মিনিট কাটে স্বপ্ন পর্বে। তারপর ঘণ্টা দেড়েকের এন-রেম পর্ব- অর্থাৎ কোন স্বপ্ন নেই। তারপরে আবার 10 থেকে 15 মিনিটের স্বপ্ন পর্ব। পরে ঘণ্টা দেড়েকের বিরতি। এই ভাবেই চলে সারারাত। স্বপ্নের মধ্যে যা কিছু আমরা দেখি, তার সঙ্গে আমাদের নিজেদের বাস্তব পরিবেশ এবং অভিজ্ঞতার দৃঢ় সম্পর্ক থাকে। যেমন যারা বরফের দেশে যায়নি বা তুষারপাত দেখেনি (এমনকি ছবিও না), তাদের পক্ষে স্বপ্নে সেই দৃশ্যটা দেখা প্রায় অসম্ভব। আবার, যারা জন্মান্ধ তাদের স্বপ্ন শুধুই শব্দময়। তাতে গন্ধ বা স্পর্শের বোধ যদিও থাকে, কোন দৃশ্য কখনো ধরা দেয় না। বিজ্ঞানীদের মতে, স্বপ্নের বেশ কিছু প্রকারভেদ আছে। এদের মধ্যে অন্যতম হল ‘ভয় বা আতঙ্কের স্বপ্ন’। যারা সম্ভবত হৃদযন্ত্রের গোলযোগে ভোগেন, তারা ঘনঘন এই স্বপ্ন দেখেন। রক্তনালীর পরিসর বাড়াতে তাদের সাধারণত বিটা-ব্লকার জাতীয় ওষুধ খেতে হয়। ভয়ের স্বপ্নের কারণ হিসেবে এই জাতীয় ওষুধের দুর্নাম আছে। এছাড়াও আছে ‘লুসিড স্বপ্ন’; মানে যখন কোন ব্যক্তি নিজেই বুঝতে পারেন যে তিনি স্বপ্ন দেখছেন। এবং তার ভাবনা অনুযায়ী তিনি সেই স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয় কি না?

আর সবশেষে আসি, ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয় কি না? – না। ভোরের স্বপ্ন কেন, কোনো স্বপ্নই যে সত্যি হবে এমন নিশ্চিত করে বলা যায় না। ভোরের স্বপ্ন দেখতে দেখতে অনেক সময় আমাদের ঘুম ভেঙে যায় এবং আমরা স্বপ্নে কি দেখেছি মনে করতে পারি। এমন স্বপ্ন কে বলা হয় ‘ভিভিড স্বপ্ন’। এরকম অনেক স্বপ্নের ইতিহাস রয়েছে; যার পুরোটাই বিজ্ঞানসম্মত ভাবে পরিচালিত। তাই বিজ্ঞানকে জানুন এবং গ্রহণ করুন। 

স্বপ্নের বেশ কিছু মজাদার তথ্য-

1) আমরা 90 শতাংশ স্বপ্নই ভুলে যাই।

2) প্রতিটি মানুষ স্বপ্ন দেখে।

3) আমরা স্বপ্নে সেই মানুষেরই মুখ দেখি যাদের আমরা আগে থেকে চিনি।

4) সবাই রঙিন স্বপ্ন দেখেনা।

5) স্বপ্ন প্রতীকী অর্থ বহন করে।

6) স্বপ্নে প্রতিটি আবেগ আমরা অনুভব করতে পারি।

7) মানুষ রোজ রাতে 4 থেকে 7 টি করে স্বপ্ন দেখে।

8) পশুরাও স্বপ্ন দেখে।

9) একটি শিশুর ঘুমের বেশিরভাগ সময়ই রেম ঘুম হয়। যার জন্য তারা বেশি স্বপ্ন দেখে।

10) ছেলে এবং মেয়েরা ভিন্ন ধরনের স্বপ্ন দেখে।

11) যদি কেউ নাক ডাকে, তাহলে সে সেই সময় স্বপ্ন দেখতে পারে না।

12) মানুষ তার সম্পূর্ণ জীবনকালের মোট 6 বছর স্বপ্ন দেখে কাটায়।

রেফারেন্স:

https://www.scientificamerican.com/article/the-science-behind-dreaming/

https://www.frontiersin.org/articles/10.3389/fpsyg.2018.01553/full

https://pixabay.com/images/id-2714174/

—————————–

~ কলমে এলেবেলের অতিথি দিশানী লক্ষন ~

দিশানী বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি তে অ্যাপ্লায়েড্ মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়ছেন।

 

 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

 

https://free-hit-counters.net/

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।