একদিন জাদুঘরে টেসলা (পর্ব এক)

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
181 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

আরেকটা পরিষ্কার চনমনে দিন। চারিদিক চমৎকার মনোরম দেখাচ্ছে। বিছানায় উঠে বসলেন নিউটনবাবু। হাত পা ছড়িয়ে একবার আড়মোড়া ভাঙলেন অলস কায়দায়। কটমট করে আওয়াজ করে উঠল অস্থিসন্ধিগুলো। বয়স তো আর কম হলোনা। ইহকাল পরকাল মিলিয়ে তা প্রায় ৩০০ বছর হবে! হাঁক পারলেন একবার, “ওরে কে আছিস আমার পরচুলা খানা নিয়ে আয় দেখি।” আজ আবার একটু সভায় বসতে হবে। কাল সন্ধ্যার দিকেই খবর পেয়েছিলেন যে কাল রাতে নাকি একটা নতুন  ‘ছোকরা’ এসেছে জাদুঘরে। রাতে খাওয়ার ঘরে তাই নিয়ে কত কানাঘুষো! কিন্তু তাঁকে তখনও বলা হয়নি। নিউটনবাবুকে বাদবাকি সকলেই বেশ সমীহ করে চলেন। আর সে কারণেই যখন তখন, যাকিছু হুটহাট করে বলতে সাহসও পায় না প্রায় কেউই। এখনও সবাই চেপে গেল। তা সে না বলুক গে! খবর তিনি ঠিক পেয়েই যাবেন। জাদুঘরের চতুর্দিকে তাঁর গুপ্তচরেরা সর্বদাই সজাগ। পান থেকে চুন খসলেই খবর পৌঁছে যায় তাঁর কর্ণকুহরে। হাজার হোক স্যার আইজ্যাক নিউটন বলে কথা!

জাদুঘরের প্রতি নিউটন বাবুর অসীম ভলোবাসা। আর হবে নাই বা কেন! তখন ৩১শে মার্চ ১৭২৭। পৃথিবীর পাঠ চুকিয়ে পরপারে সদ্যই এসেছেন  স্যার আইজ্যাক নিউটন। সাধের রয়্যাল সোসাইটি ছেড়ে! মন আর কিছুতেই বসতে চায় না। আরও কিছু বছর যেতে যখন একে একে সতীর্থরা এসে পৌঁছলো এপারে, নিউটন শেষে প্রস্তাব একটা রেখেই দিলেন।  আর তারপরেই সকলের সম্মতিতে নিউটনের পরিচালনায় রয়্যাল সোসাইটি-এর আদলে গড়ে উঠল এই জাদুঘর। নতুন কোন বিজ্ঞানচর্চা হয় না এখানে।  মৃত্যুর পর নতুন নতুন বিজ্ঞানীরা আসেন এই যাদুঘরে । সভা বসে। পুরানোরা নতুনদের কাছ থেকে বিজ্ঞানের একেবারে নিত্যনতুন তথ্যগুলো জেনে নেন। তর্ক চলে। খাওয়া দাওয়া হয়। সে এক এলাহি ব্যাপার। তবে আজকাল নতুন একটি নিয়ম করা হয়েছে। এখন জাদুঘরের সদস্য হতে গেলে একটা আবেদন পত্র জমা দিতে হয়। ওপর মহল আবেদনকারীর বিজ্ঞানের অবদান দেখে যথার্থ মনে করলে, তবেই পাওয়া যায় প্রবেশাধিকার। কারণ প্রবীণদের মতে আজকালকার দিনে বিজ্ঞান বিষয়টিও ধীরে ধীরে মূর্খ দিয়ে ভরে উঠেছে।  কেমন যেন একটা ঢিলেঢালা ভাব!

পরচুলার অপেক্ষা করতে করতেই ভাবতে লাগলেন “নাহ! গুপ্তচরগুলোও কোন কাজের না! কোন ঠিকঠাক খবর ঠিকঠাক সময়মত  দিতে  পারেনা!” সন্ধ্যার খবর শেষমেশ কিনা রাতে পেতে হলো! শেষে রাগ হব হব করছে ঠিক তখন মুখঢাকা, গুপ্তচর-ক এসে খবর দিয়ে গেল। জানা গেল যে, গতকাল, অর্থাৎ ০৭/০১/১৯৪৩ তারিখে, টেসলা নামের একজন নাকি সদ্য জাদুঘর ঢোকার দরখাস্ত দিতে এসেছিল। কিন্তু সমস্যা এখানে নয়। এডিশন নামের আরেক সদস্য নাকি এতে ঘোর আপত্তি জানাচ্ছে। “এডিশন যেন কোন জন?” গুপ্তচরকে প্রশ্নও করেছিলেন তিনি।

– আরে বাবু ওই যে লোকটা ১২ বছর আগে এসেছিল।

তারপর হাতের ডাইরির পাতা ভালো করে উল্টেপাল্টে দেখে বললো,

–  ১৮/১০/১৯৩১ তারিখে

– কে? ওই আমেরিকা নিবাসীর কথা বলছ নাকি হে?

– আজ্ঞে হ্যাঁ!

– অ… তো সে বেটা আবার এও বলেছিল যে জাদুঘর নাকি বিজলীবাতির আলোতে ভরিয়ে দেবে! তার কি খবর?

– সে তো যদ্দুর জানি একটা দল বানিয়ে জোরদার কাজ করছে।

-হুম … ঠিক আছে। এখন যাও।

গুপ্তচর-ক হনহন করে দরজার দিকে হাঁটা দিতেই নিউটনবাবু ডাক দিলেন,

-এই তুমি এরমভাবে মুখ ঢেকে ঘোরো কেন হে!

ক একটু থতমত খেয়ে বলল, 

– এই মানে, এমনিই। মানে…

আরও কি সব বলতেই যাচ্ছিল, কিন্তু নিউটনবাবু হাত উঠিয়ে চলে যেতে ইশারা করতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সে। 

সভা বসলো। বেশ বড় অডিটোরিয়াম ধাঁচের সভাঘর। মঞ্চের সামনে একটা চেয়ার নিউটনবাবুর জন্য বরাদ্দ। আর মঞ্চে একটা কেদারা আবেদনকারীর জন্য। মঞ্চের পেছনে ব্ল্যাক-বোর্ড আর চক রাখা। ঠিক সকাল দশটায় নিউটনবাবু এলেন। বসলেন তাঁর ওই বড় কাঠের চেয়ারটিতে। বেশ  পরিপাটিভাবে কাপড় পড়ে চুল আঁচড়ে এসছেন। এই ছোট ছোট ব্যাপারগুলোতে তাঁর খুব নজর। চেয়ারে বসেই নজর গড়ালেন এদিক ওদিক। মুখ কুচকে ভাবলেন “সত্যি বাবা আজকালকার ছেলেপুলের মধ্যে পরিপাটি ভাবটিই নেই!”।  আর ভাবতে ভাবতেই কাঠের হাতুড়িটা দিয়ে কাঁসার গোল ঝোলানো থালাটিতে মারলেন এক ঘা। সভাময় গমগম করে উঠল। সব ফিসফাস এক্কেবারে বন্ধ। গলা উঠিয়ে বললেন,

-শুরু করা যাক তবে।

কর্মচারী গোছের একজন হাতে একখানা খাতা নিয়ে উচ্চস্বরে বলতে লাগল , 

“ সভা সংখ্যা-  ৮০৪২৩, 

আবেদনকারী- নিকোলা টেসলা, 

জন্মস্থান- ক্রোয়েশিয়া, এশিয়া, 

কর্মস্থান- মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র ” 

আবেদনকারী- নিকোলা টেসলা, 

জন্মস্থান- ক্রোয়েশিয়া, এশিয়া, 

কর্মস্থান- মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র

সভায় আবেদনকারীর জন্য বরাদ্দ জায়গায় বসে আছেন ছয় ফুটের চেয়ে সামান্য বেশি উঁচু এক ভদ্রলোক। ছোট ছুঁচালো বুদ্ধিদীপ্ত মুখ। ছিমছাম পাতলা চেহারা। এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে, পা নাচাচ্ছেন। ইনি হলেন নিকোলা টেসলা।

নিউটন- “ বলুন টেসলাবাবু। বিজ্ঞানে আপনার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু বলুন।”

উঠে দাঁড়ালেন টেসলা। কি বলবেন সেটা একটা খসড়া খাতায় সাজিয়ে লিখে এনেছেন। তিনি শুরু করলেন, 

“উপস্থিত ভদ্রমহোদয়গণকে নমস্কার। আমি নিকোলা টেসলা। আমার গবেষণা ও আবিষ্কার মূলত তড়িৎতত্ত্ব এবং চুম্বকতত্ত্ব সম্পর্কিত। মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ মিলিয়ে আমার প্রায় ৭০০ টি patent অর্থাৎ কিনা মৌলিক, বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত আবিষ্কার রয়েছে। তার মধ্যে মূলত কয়েকটি বিশেষ ও আমার পছন্দের আবিষ্কারগুলি এই সভায় আপনাদের সামনে আলোচনা করছি।”

আমি নিকোলা টেসলা। আমার গবেষণা ও আবিষ্কার মূলত তড়িৎতত্ত্ব এবং চুম্বকতত্ত্ব সম্পর্কিত। মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ মিলিয়ে আমার প্রায় ৭০০ টি patent অর্থাৎ কিনা মৌলিক, বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত আবিষ্কার রয়েছে।

এই বলে খসড়া খাতার পাতা উল্টালেন। “আমি এখানে মূলত  টেসলা কুণ্ডলী বা Tesla Coil, রেডিও তরঙ্গের প্রবাহ (Transmission of Radio wave) এবং  বিবর্তিত তড়িৎপ্রবাহ ও তার প্রয়োগ সম্পর্কে আলোচনা করবো… 

এসব কিছু বলার আগে প্রাচীন সভাসদগণদের কথা মাথায় রেখে একবার তবে সংক্ষেপে বলে নিচ্ছি বিবর্তিত তড়িৎপ্রবাহ কি…প্রায় দুশ বছর হতে চললো আমরা তড়িৎ ও তড়িৎপ্রবাহ বিষয়টির সাথে পরিচিত। ১৭৯৯ সালে আলিসান্দ্র ভোল্টার আবিষ্কৃত ভোল্টায়িক স্তম্ভ আবিষ্কারের পর থেকে এর ব্যবহারকে আমরা এক ধাক্কায় বেড়ে যেতে দেখেছি। এমনকি বৈদ্যুতিক আর্কবাতি বলে একধরনের বাতির ব্যবহারও আমরা দেখলাম।” 

“আর্ক বাতিটা আবার কি হে?” ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন হাত উঠিয়ে জানতে চাইলো।

“ওহ হ্যাঁ! খুব সহজ ব্যাপার। এই মনে করা যাক কার্বনের দুটো দণ্ড নেওয়া হল। দুটোর সাথেই দুখানা তামার তার জড়িয়ে তারের অপরপ্রান্ত জুড়ে দেওয়া হল একটা শক্তিশালী তড়িৎকোষের দুই প্রান্তে। এইবারে ওই দুই কার্বন দণ্ডকে একে অপরের খুব কাছাকাছি আনা হলো এমনভাবে যাতে দুইয়ের মাঝখানে কিছুটা ফাঁক থেকেই যায়। এইবারে যদি সংযুক্ত তড়িৎকোষটি বেশ শক্তিশালী হয় তবে এই দুই দণ্ডের মাঝে উজ্জ্বল বিদ্যুৎ-স্ফুলিঙ্গ দেখা যাবে।” আবার একটু থেমে বললেন “এই মূল বিষয়টির কিছু সুন্দরীকরণ করেই আর্ক-বাতি তৈরি করলেন স্যার হাম্ফ্রে ডেভি ১৮৮০-এর দশকে। যদিও সে বাতির বাজারে আসতে আরও বেশ কিছু বছর লেগে গিয়েছিলো।” বলেই একবার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিলেন টেসলা। এক কোনায় দেখলেন স্যার হাম্ফ্রে ডেভি স্বয়ং বসে আছেন। আর মুচকি মুচকি হাসছেন। তাঁর প্রতি একটুকরো হাসি ফিরিয়ে দিয়ে আবার সামনের দিকে তাকালেন। দেখলেন নিউটনবাবু তাঁর একখানা মস্ত বড় খাতা খুলে ব্যস্তসমস্ত হয়ে আঙুল বুলিয়ে কি যেন দেখছেন। 

আসলে নিউটনবাবু হলেন পুরনো লোক। যখন পরপারে এলেন বিজ্ঞানের এতো কিছু আবিষ্কারই হয়নি। তাই আলোচনা সভায় নতুন কিছু অজানা আলোচনা হলেই লিখে রাখেন একটা লাল বাঁধানো খাতায়। ওই খাতা খুলে এখন খুঁজছিলেন  আর্ক-বাতি সম্পর্কে আগের লিখে রাখা তথ্যগুলো, যেগুল স্যার হাম্ফ্রে ডেভির সাথে আলোচনার সময় লিখে রেখেছিলেন। দেখতে দেখতে একটু অমনোযোগীই হয়ে পড়েছিলেন। টেসলা একটু কাশতেই আবার সামনের দিকে তাকালেন। 

টেসলা আবার শুরু করলেন, “ কি যেন বলছিলাম,… হ্যাঁ, আর্কবাতি। তো আর্কবাতির ব্যবহার পর্যন্তও আমরা দেখতে পেলাম। কিন্তু এইসব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত তড়িৎ একমুখী। অর্থাৎ কিনা একদিকেই প্রবাহিত হয়। তবে আরও কিন্তু একধরনের তড়িৎ হয়। যার প্রবাহের দিক ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয়। মানে, একটি তামার তারের মধ্য দিয়ে যদি এই তড়িৎ এই মুহূর্তে বামদিক থেকে ডানদিকে প্রবাহিত হয়, তবে ঠিক এর পরের মুহূর্তেই ডানদিক থেকে বামদিকে প্রবাহিত হবে! একে বিবর্তিত তড়িৎ-প্রবাহ বলে। আমার তড়িৎ সংক্রান্ত গবেষণা ও আবিষ্কার মূলত এই বিবর্তিত তড়িৎকে ভিত্তি করেই।”

“এই বিবর্তিত তড়িৎ প্রবাহ আবার ভীষণ মজার। কারণ, একটি তারের মধ্য দিয়ে একমুখী তড়িৎ প্রবাহিত হলে তাকে ঘিরে  একটি চুম্বকক্ষেত্র আবিষ্ট হয় (চিত্র-ক)। যার কিনা আবার একটি বিশেষ অভিমুখ আছে। এই অভিমুখ কিন্তু ওই তারের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া তড়িৎ প্রবাহের অভিমুখের ওপর নির্ভরশীল। এইবারে, ওই তারের মধ্য দিয়ে যদি বিবর্তিত তড়িৎ প্রবাহিত হয় তবে তার ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়া অভিমুখের ওপর ভিত্তি করে আবিষ্ট চুম্বকক্ষেত্রের অভিমুখও বদলাতে থাকবে।” 

 

“এইবারে যদি বিবর্তিত তড়িৎ কে একটি সরু তারের মধ্য দিয়ে না পাঠিয়ে একটা তারের কুণ্ডলীর মধ্য দিয়ে পাঠানো হয় তবে যে অভিমুখ পরিবর্তনশীল চুম্বকক্ষেত্র উৎপন্ন হবে তা নিশ্চিতরূপে অনেক বেশি শক্তিশালী (চিত্র-খ)। এমনকি  এই কুণ্ডলীর কাছাকাছি যদি আর একটি কুণ্ডলী রাখা যায় এমনভাবে, যাতে এই আবিষ্ট পরিবর্তনশীল চুম্বকক্ষেত্র ওই দ্বিতীয় কুণ্ডলীর মধ্য দিয়েও প্রবাহিত হয় তাহলেই দেখা যাবে যে, ওই দ্বিতীয় কুণ্ডলীর মধ্যেও তড়িৎপ্রবাহ শুরু হয়েছে। আর সেটা বাইরের কোন তড়িৎ উৎস ছাড়াই এবং প্রথম কুণ্ডলী (বা তা সংলগ্ন তড়িৎবর্তনী) কে না ছুঁয়েই! এই দ্বিতীয় কুণ্ডলীর সাথে যুক্ত বর্তনীতে কতটা তড়িৎপ্রবাহ দরকার, কতটা  তড়িৎবিভব বা ভোল্টেজ দরকার, এসবই নিয়ন্ত্রণ করা যায় এই কুণ্ডলীর পাকসংখ্যা কমবেশি করার মাধ্যমে। এরকম দুটি কুণ্ডলী বিশিষ্ট যন্ত্রাংশকে ট্রান্সফরমার বলা হয়।”

আবার একবার চারিদিক তাকালেন “ কারোর কিছু জিজ্ঞাস্য আছে কি? ”

কারুর কোন প্রত্যুত্তর না দেখে অগত্যা নিউটনবাবু বলেন “না হে। তুমি বল।”

টেসলা আবার শুরু করলেন, “ এইবারে আসছি, টেসলা-কুণ্ডলীর কথায়। আমার বক্তব্যের শুরুতেই  যার উল্লেখ করেছি।” এইবারে একটা চক তুলে নিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে একটা ছবি এঁকে ফেললেন (চিত্র-গ)।  “এই যন্ত্রের মুখ্য তড়িৎবর্তনীতে থাকে একটি ট্রান্সফরমার, একটি তড়িৎধারক, তড়িৎ স্ফুলিঙ্গ উৎপন্ন করার জন্য বর্তনীতে একটি কাটা অংশ এবং একটি কুণ্ডলী। প্রথমে ট্রান্সফরমার দিয়ে এই বর্তনীতে উচ্চতড়িৎবিভব যুক্ত তড়িৎপ্রবাহ শুরু করা হয়। এর ফলে বর্তনী সংলগ্ন তড়িৎধারক প্রচুর পরিমাণে তড়িৎ আধান ধারণ করতে থাকে।  এরপর তড়িৎধারক যখন  আর আধানগুলোকে ধরে রাখতে পারে না, তখন এক ধাক্কায় বর্তনী সংলগ্ন কুণ্ডলীর মধ্য দিয়ে তড়িৎপ্রবাহ ঘটিয়ে ক্ষণিকের জন্য আধানমুক্ত হয়। এবারে আপনারা কেউ বলতেই পারেন বর্তনীতে কাটা জায়গা থাকতেও কিভাবে তড়িৎপ্রবাহ ঘটে গেল। তাহলে বলতে হয় ঠিক এই সময় ওই কাটা অংশের দুই প্রান্তের তারের মাঝে এমনি উচ্চতড়িৎবিভব তৈরি হয় যে, কাটা অংশকে উপেক্ষা করেই স্ফুলিঙ্গ উৎপন্ন  হওয়ার মাধ্যমে বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহ সম্ভব হয়। অবশ্য তড়িৎধারক আধান্মুক্ত হলে এই তড়িৎপ্রবাহ ক্ষণিকের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এরপরে আবার যখন ধারকটিতে মাত্রাতিরিক্ত তড়িৎ আধান জমে যায়। তখন আবার স্ফুলিঙ্গ উৎপন্ন হয় এবং কুণ্ডলীসহ সমগ্র বর্তনীতে তড়িৎপ্রবাহ হয়। এই প্রক্রিয়া চক্রাকারে চলতে থাকে। অর্থাৎ, কুণ্ডলীর মধ্য দিয়ে কিছু সময় পর পর একসাথে অনেকটা করে তড়িৎ আধান বয়ে চলে যায়। এই কুণ্ডলীর কাছেই আর একটি কুণ্ডলী রাখা হয় যার নীচের প্রান্তটি মেঝে ছুঁয়ে আছে আর আপরপ্রান্তে রয়েছে একটি বলয়াকার আকৃতির তড়িৎদ্বার। মুখ্য বর্তনীর কুণ্ডলী দিয়ে যখন যখন তড়িৎ আধান প্রবাহিত হয়, দ্বিতীয় কুণ্ডলী  দিয়েও তড়িৎ প্রবাহ হয় এবং বলয়াকার তড়িৎদ্বারটি উচ্চতড়িৎবিভব বিশিষ্ট হয়ে পরে এবং তা থেকে তড়িৎ স্ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরিত হতে থাকে।”(চিত্র-ঘ)

এক শ্বাসে এতখানি বলে নিয়ে এইবারে থামলেন তিনি। সভাময় লোকজন বেশ উৎসাহের সাথে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগলো। এরই ফাঁকে নিউটনবাবুর গলা শোনা গেল, “সবই তো বুঝলাম। তবে প্রয়োগ কোথায় হবে এই যন্ত্রের?”

টেসলা – “তারহীন বিদ্যুৎ চালনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে চাইছিলাম। সম্ভাবনাও আছে প্রচুর। আমি নিজে একখানা বিজলীবাতি হাতে নিয়ে ওই বলয়াকার তড়িৎদ্বারের স্ফুলিঙ্গের কাছে ধরতেই জ্বলে উঠেছিল সেটি। কোন তার বা তড়িৎকোষ ছাড়াই! ”

– বল কি হে!! তার ছাড়াই! তা ব্যাথা বেদনা কিছু টের পেলেনা?

– সেটাই তো মজার। কোন ব্যাথা বেদনা নেই। 

– তা আর কি করতে পারে তোমার এই যন্ত্র?

– রেডিও সংকেত উৎপন্ন করতে পারে। সত্যি কথা বলতে এই আবিষ্কারের মৌলিক অধিকারও পাই আমি।

– বাহ! আর কিছু বলবে কি?

– বিবর্তিত তড়িৎ এর প্রয়োগ সংক্রান্ত আমার এই পরের বক্তব্যের সার কথা হল, কি করে অল্প খরচে লোকের ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক সুযোগ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া যায়। এমনকি আমি আপনার এই জাদুঘরও ঝাঁ চকচকে করতে পারি এই পরিকল্পনা দিয়ে।

“সেটি অত সোজা নয়!” হঠাৎ ভিড় থেকে কেউ একজন বলে উঠল।আর সাথে সাথেই সভার  সকলেই খুঁজতে লাগল বক্তার মুখ। এরপর ভিড় ঠেলে যিনি সামনে বেড়িয়ে এলেন তিনি হলেন এডিশন। থমাস এডিশন, টেসলার চির প্রতিদ্বন্দ্বী। বললেন, “আমি ইতিমধ্যে সেই দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছি।”                                                                                                                         (ক্রমশ)

————————————–

~ কলমে এলেবেলে মেঘদীপা ~

এলেবেলে দলবল 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 


লেখাটি পঠিত হয়েছে Web Hits বার

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।