জলের নাটক

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
195 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

(ঘরময় পায়চারি করতে করতে)

পেখম : কি বলছ? বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা শুনে যাও। বৃষ্টির জল — ডাবের জল — নাকের জল — চোখের জল — নাকের জল — ডাবের জল — নাকের জল — নাকের জল….. 

 

(নাটকের স্ক্রিপ্ট হাতে) 

পিপি : কাটা রেকর্ডের মতো এক জায়গায় পাক খাচ্ছিস কেন? জিভের জল, হুঁকোর জল, ফটিক জল, রোদে ঘেমে জল, বাকিগুলো কে বলবে?

 

পেখম : ধ্যাত্তেরি! তুমি আমাকে ‘পথিক’ সাজতে বলেছিলে, আমিই ভাবলাম বৃদ্ধ লোকটার পার্টটা জলের মত সহজ — এখন দেখছি আমার হাতেই “অবাক জলপান”-এর সলিল সমাধি হয়ে যাবে!

 

পিপি : ওইখানেই তো গোলমালটা করে ফেললি! জল নিজেই অতটা সহজ নয়! আর তুই ভাবলি জলের মত সহজ পার্ট করবি?

 

পেখম : কি সব যে বল না তুমি! সব মাথার উপর দিয়ে চলে যায়। (বিড়বিড় করতে করতে) সেদিন মা আমাকে বললো – “চিন্তা করিস না, ঠিক মুখস্থ হয়ে যাবে..”, আর যেই না ঘর থেকে বাইরে গেছি, তোমাকে বললো – ” মেয়েটা নাটকের সংলাপ মনে রাখতে পারবে না, মন এত চঞ্চল….” — আমি সব শুনেছি পর্দার ফাঁক দিয়ে।

    

পিপি : এই–এই–এইটাই। এখানে তোর মা অনেকটা জলের মত ব্যবহার করছে। তুই, টক টক করে কথা বলিস, মানে ধর তুই হলি — টক বা অম্ল। মা তোর সঙ্গে মিশে তোর বিরহ ভাগ করে নিচ্ছে, যেমন করে জল অম্লের সাথে মেশার ক্ষমতা রাখে। আবার আমি রুক্ষ খরখরে মানুষ, ভাবতে পারিস, অনেকটা ক্ষারের মতো। নাওয়া খাওয়া ভুলে তোর পেছনে আমার লেগে থাকা দেখে আমার দুঃখেরও সমব্যথী হচ্ছে তোর মা, অনেকটা যেমন ক্ষার জলে মিশে যায়। আরে বাবা, জল অতটাও সহজ কি? সুযোগ বুঝে জল অম্ল ও ক্ষার, দু’জনের সাথেই ভাব জমাতে পারে। জানিস কি, যারা এরকম অম্ল ও ক্ষার, দুই দলেই মিশতে পারে, তাদের বলে এমফোটেরিক – গ্রিক ভাষায় ‘এমফো’ মানে ‘উভয়’।   

 

পেখম : আরিব্বাস। তাহলে আজকের মতো রিহার্সাল এখন বন্ধ। নাটকের পার্ট মুখস্থ হোক বা না হোক, জলকে আজ জলবৎ তরলং করে জেনেই ছাড়বো! মায়ের সাথে বোঝাপড়া পরে হবে। 

 

পিপি : সেই ভালো। তবে তার আগে চল্ দীপাবলির জমানো মোমের টুকরোগুলো গলিয়ে নতুন মোম বানিয়ে ফেলি! 

(একটা বাটিতে মোমগুলোকে গলিয়ে তার মধ্যে একটা কঠিন মোমের টুকরো ফেলে দিতে দিতে)   

শিগগিরি দেখ! কঠিন মোমটা টুক্ করে ডুবে গেল। এর মানে হলো, কঠিন মোমের ঘনত্ব তরল মোমের থেকে বেশি। আবার পাউরুটিতে যখন মাখন লাগাস, এক ফাঁকে এরকম পরীক্ষা করে দেখবি, মাখনের কঠিন টুকরোগুলো টুপুস্ করে তরল মাখনে ডুব দিচ্ছে। কিন্তু জল আর বরফকে নিয়ে এরকম পরীক্ষা করলে কি পাবি?

 

পেখম : তাই তো!  বরফ তো ভাসে জলের উপর। আমি পড়েছি, ১/১০ ভাগ বরফ জলের উপরে উঁচিয়ে থাকে। তা’লে, জলের থেকে বরফের ঘনত্ব কম। ঘনত্ব আবার ভর ডিভাইডেড বাই আয়তন, অর্থাৎ একই ভরের জলের আয়তন বরফের আয়তনের থেকে কম। আরে বাহ্! আমি সত্যান্বেষী পেখম হাতেনাতে ধরে ফেলেছি – তাপমাত্রা যত বাড়বে জলের ঘনত্ব তত বেড়ে যাবে! কি, তাই তো পিপি ওয়াটসন?  

 

পিপি : হা হা হা, সত্যান্বেষী পেখম জলের জালে জড়িয়ে পড়েছে! জলের চরিত্র বোঝা কি অত সোজা? বরফের কথা আপাতত ছেড়ে দিচ্ছি, ওখানে পরে আসবো। আপাতত ধর, তুই বরফ গলা জল নিয়ে পরীক্ষা শুরু করলি, একটু একটু করে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে তার ঘনত্বও বাড়তে থাকবে……. 

 

পেখম : সেটাই তো বললাম…… 

 

তোর সত্যান্বেষণ ৩.৯ বা মোটামুটি ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছে এসেই  ডাঁহা ফেল করে যাবে।

 

পিপি : বললি বটে, কিন্তু তোর সত্যান্বেষণ ৩.৯ বা মোটামুটি ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছে এসেই  ডাঁহা ফেল করে যাবে। “হ জ ব র ল”- এ যেমন ৪০ এর পর বয়স আবার উল্টোদিকে হাঁটা দিত, তেমন ভাবেই ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে তাপমাত্রা বাড়াতে থাকলে জলের ঘনত্ব এবার কমতে থাকবে।

 

পেখম : তার মানে ৪ ডিগ্রির উপরে জল অন্যান্য তরলদের মতই ব্যবহার করে, শুধু শুধু ৪ ডিগ্রি অব্দি এরকম ব্যতিক্রমী সেজে লাভ কি হল? 

 

পিপি : সাংঘাতিক লাভ। জানিস কি, বরফ জমা জলাশয়ের নিচেও বিভিন্ন জলচর জীব বেঁচে থাকতে পারে শুধু জলের এই মজাদার বৈশিষ্ট্যটির জন্য।

 

জানিস কি, বরফ জমা জলাশয়ের নিচেও বিভিন্ন জলচর জীব বেঁচে থাকতে পারে শুধু জলের এই মজাদার বৈশিষ্ট্যটির জন্য।

 

পেখম : যাহ!

 

পিপি : বিশ্বাস হল না! শীতের দিনে কোনো একটা জায়গা, যেখানে আছে একটা জলাশয় – ধর, সেখানকার তাপমাত্রা  ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে নিচের দিকে নামছে। পরিবেশের তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে জলের উপরের স্তরের তাপমাত্রা কমবে। তাপমাত্রা কমলে জলের ঘনত্ব বেড়ে যাবে, ফলে সেই জল নিচের দিকে চলে যাবে এবং নীচের অপেক্ষাকৃত গরম বা কম ঘনত্বের জল উপরে উঠে আসবে। আবার সেই জলও ঠান্ডা হয়ে নিচে যাবে। এই ঘটনাটা হল জলের পরিচলন। পরিচলন পদ্ধতিতে জল চেষ্টা করছে সমস্ত জলাশয়কে একই তাপমাত্রা রাখতে। এদিকে, পরিবেশের তাপমাত্রাও কমছে – জলের উপরের স্তরের ঘনত্ব বাড়ছে – সে নিচের দিকে যাচ্ছে – নিচের জল উপরে উঠছে – পরিচলন চলছে। এভাবে একসময় পুরো জলাশয়ের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি হল। এবারে জলের সেই মজাদার ধর্ম খেল দেখাবে। আগেই বললাম যে, ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের জল সবথেকে বেশি ঘন। তাপমাত্রা আরো কমতে থাকলে জলের ঘনত্ব এবার বাড়ার বদলে কমতে থাকবে। 

 

পেখম : তাহলে কেমন করে জলের পরিচলন চলবে এবার? জলাশয়ের উপরিভাগের জলের থেকে নিচের জলের ঘনত্ব বেশি থাকায় উপরের জল নিচে নামতে পারবে না তো!

 

পিপি : সাব্বাস! একদমই তাই। ৪ ডিগ্রির ঘন জল নিচেই থেকে যাবে, ফলে তার তাপমাত্রা কমবে না আর। সেখানে থাকা মাছ, গাছেরা দিব্বি জলকেলি করবে। এদিকে ততক্ষণে হয়তো জলের উপরের স্তরের তাপমাত্রা কমতে কমতে তা বরফে পরিণত হয়ে গেছে। ওপর থেকে বোঝার জো নেই বরফের চাঙড়ের তলায় কি খেলাটাই না চলছে!

পেখম : (বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে) তাই তো জলই জীবন। কিন্তু এই ঘনত্বের কান্ড কারখানা কেন হয়, একটু খুলে বলবে? কেনই বা জল, গাছ-মাছ-অম্ল-ক্ষার-আমি-তুমি সব্বার বন্ধু?

 

পিপি : সেটা জানতে হলে জলকে অণু-পরমাণুর চশমা দিয়ে দেখতে হবে এবার। এটা তো তুইও জানিস যে, জলের একটা অণু দুটো হাইড্রোজেন এবং একটা অক্সিজেন পরমাণু দিয়ে তৈরি হয়। কিন্তু বল তো, এই তিনটে পরমাণু কীভাবে একে অপরের সাথে জুড়ে থাকে?

 

পেখম : এটা আমি জানি। অক্সিজেনের পরমাণুতে ৮ খানা ইলেকট্রন থাকে, যার মধ্যে ৬ টা থাকে বাইরের কক্ষে। এদিকে হাইড্রোজেনে তো একটা করেই ইলেকট্রন থাকে। সব মৌল চায় নিজের গঠনকে আদর্শ গ্যাসগুলির মতো করতে, কারণ আদর্শ গ্যাসগুলো সবথেকে নিষ্ক্রিয় – কারো সাতে পাঁচে থাকে না – একা একা ল্যাদ খায়। হাইড্রোজেনের প্রতিবেশী আদর্শ গ্যাস হিলিয়ামে দুটো ইলেকট্রন, এবং অক্সিজেনের প্রতিবেশী আদর্শ গ্যাস নিওনের বাইরের কক্ষে আছে ৮ টা ইলেকট্রন। অর্থাৎ অক্সিজেন যদি দুটো এবং হাইড্রোজেন একটা ইলেকট্রন জোগাড় করতে পারে, দুজনের খিদেই কমবে। কিন্তু কি করে জানি না! অনলাইন ক্লাসে এতটাই পড়া হয়েছে, তারপর নেট চলে গেছিল।

 

পিপি : হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন যদি নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে নেয়, তাহলে একটা হিল্লে হতে পারে। এমন একটা ব্যবস্থা হল যেখানে অক্সিজেন দুটো হাইড্রোজেনের প্রতিটাতে থাকা একটা করে ইলেকট্রন ব্যবহার করতে পারবে, উল্টোদিকে প্রত্যেকটা হাইড্রোজেনও অক্সিজেনের একটা করে ইলেকট্রনকে নিজের সম্পত্তি ভাবতে পারবে। অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেনের মধ্যে এরকম বোঝাপড়া-যুক্ত বন্ধনকে বলা হয় সমযোজী বন্ধন। এই বন্ধনই জলের অণু তৈরি করার জন্য দায়ী। জলের অণুটা, জানিস তো, দেখতেও বেশ মজাদার। অক্সিজেনটাকে যদি মুন্ডু ভাবিস, দুটো হাইড্রোজেন থাকে মিকি মাউসের কান দুটোর মতন কোণ করে। সে যাই হোক, জলের অণু তৈরি করতে গিয়ে কিন্তু আরেকটা ব্যাপার ঘটে যায়।

পেখম : সেটা আবার কি?

 

পিপি : দ্যাখ, অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেন – দু’ ধরণের পরমাণুই কিন্তু আধান বিহীন। কারণ এদের মধ্যে থাকা তড়িৎ ধনাত্মক প্রোটন(+) এবং ঋণাত্মক ইলেকট্রন(-) কণার আধানের পরিমান এবং সংখ্যা সমান। হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনে যথাক্রমে দুটো এবং আটটা করে প্রোটন – ইলেকট্রন আছে। কিন্তু এদের ‘আদর্শ’ জীবন যাপনের চক্করে আধানের হিসেবে একটু গোলমাল পাকিয়ে যায়। আসলে কি বল তো, আমরা মুখে যতই বলি – আজি হতে হ’ল ভাগ সমান সমান, ভাগাভাগির বোঝাপড়ায় সবার জোর সমান হয় না। সমযোজী বন্ধনের ক্ষেত্রেও দুই পরমাণুর জোর একই ভাবে খাটে না। অক্সিজেন একটু দাদাগিরি করে হাইড্রোজেন-দ্বয়ের ইলেকট্রনদের নিজের দিকে একটু বেশি আকর্ষণ করে। এই স্বভাবটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ইলেক্ট্রো-নেগেটিভিটি। যার যত বেশি ইলেক্ট্রো-নেগেটিভিটি, তার জোর খাটানোর প্রবণতা তত বেশি। বুঝতেই পারছিস, অক্সিজেন পরমাণু হাইড্রোজেনের তুলনায় বেশি ইলেক্ট্রো-নেগেটিভ হওয়ায় ভাগের ইলেকট্রনের ওপরে তার দখলদারি সামান্য হলেও বেশি হয়। ফলে অক্সিজেন পরমাণু সামান্য তড়িৎ ঋণাত্মক(-) এবং হাইড্রোজেন দুটো হয়ে যায় সামান্য তড়িৎ ধনাত্মক(+)। এই দুইয়ে মিলে তৈরি জলের অণু আধানবিহীন হলেও, অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেনে আধানগুলো অসম ভাবে বিন্যস্ত থাকে। তড়িতের এহেন অসম বিন্যাস-বিশিষ্ট অণুদেরকে বলা হয় পোলার অণু। এই পোলারিটির কারণেই সামান্য ধনাত্মক(+) হাইড্রোজেনটি প্রতিবেশী অণুর ঈষৎ ঋণাত্মক(-) অক্সিজেনের প্রতি আকর্ষণের বন্ধনে জড়িয়ে যায় – আমরা এই ধরণের বন্ধনকে হাইড্রোজেন বন্ধন বলি। এই বন্ধনের সাহায্যেই কিন্তু জলের অণুগুলো হাত ধরাধরি করে থাকে।  

 

পেখম : কিন্তু এর সাথে ঘনত্বের কি সম্পর্ক?

 

পিপি : বরফের মধ্যে যদি জলের অণুগুলোর সজ্জা তুই দেখতে পাস, দেখবি অণুগুলো হাইড্রোজেন বন্ধন-রূপী অদৃশ্য হাত ধরাধরি করে একটা ষড়ভুজ সজ্জা ধারণ করেছে। এই সজ্জার জন্য বরফের গঠনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা থেকে যায়। তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে এই ষড়ভুজ গঠনটি ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে, ফলে অণুগুলো একে অপরের কাছাকাছি আসতে থাকে। আমরা এর ফলস্বরূপ দেখতে পাই জলের ঘনত্বের বৃদ্ধি। ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতে সমস্ত ষড়ভুজাকৃতি গঠন পুরোপুরি ধসে যায় এবং জলের অণুরা সবথেকে কাছাকাছি থাকায় এখন জলের ঘনত্ব হয় সবথেকে বেশি। কিন্তু এর পরে তাপমাত্রা বাড়ালে কি হবে বল তো? জলের অণুগুলোর গতিশক্তি বাড়তে থাকবে, ফলে তারা একে অপরের থেকে আবার দূরে সরে যেতে চেষ্টা করবে। ফলস্বরূপ, তাপমাত্রা বাড়লে এবারে ঘনত্ব আবার কমতে থাকবে। আর একটা মজার কথা শুনবি? জলের যে ভাই বোনেরা আছে, মানে অক্সিজেন পরিবারের অন্যান্য হাইড্রাইড সদস্য, তারা ঘরের তাপমাত্রায় সবাই গ্যাসীয়। ব্যতিক্রমী – জল। কেন জানিস? জলের অণুগুলো তোর মতই চঞ্চল – গতিশীল, খুব তাড়াতাড়ি পুরনো অণু-বন্ধুর হাত বা হাইড্রোজেন বন্ধন ছাড়িয়ে নতুন অণুর সাথে হাইড্রোজেন বন্ধন বানিয়ে নিতে পারে। একটা জলের অণুর সাথে আরেকটা অণু প্রায়  ২ x ১০-১৩ সেকেন্ড পর পরই ছাড়াছাড়ি করে নতুন অণুর সাথে ভাব জমায়। তুই যেমন এক্ষুনি আমার কথার বন্ধন ছাড়িয়ে অন্যমনস্ক হয়ে গেলি!

 

পেখম : না! কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা। এই যে আমরা মিনারেল জল কিনে খাই — সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম –আরো কত রকম নিউট্রিয়েন্ট, এগুলো জলে মেশে কি করে?  

 

পিপি : কিছুক্ষণ আগে এই যে পোলারিটির কথা বললাম না, এর জন্যই কিন্তু জল এত ভালো দ্রাবক। অন্য কোনো পোলার অণু বা আয়ন, ধর সোডিয়াম বা পটাশিয়ামের আয়ন, শুধু এই পোলারিটির জন্যই জলের সাথে সংযুক্ত হতে পারে। আর আমরা পেয়ে যাই মিনারেল জল। বুঝছিস – জল কেন এত অতুলনীয়! 

 

পেখম : কিন্তু একটা জিনিস বুঝলাম না – সব কিছুর তুলনা করতে জলকে কেন খামোখা টানি আমরা?

 

পিপি : আগে তুই আমাকে বল, সেঁক দিতে জলের বদলে গরম দুধ বা তেল ব্যবহার না করে জল কেন নিস?

 

পেখম : কিসের মধ্যে কি, পান্তা ভাতে….. 

 

পিপি : জল — ১ ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়ানোর জন্য সবথেকে বেশি তাপ ভক্ষণ করে তোর এই সহজ সাধাসিধে জল। অন্য যে কোনো তরলের থেকে বেশি তার তাপীয় খিদে। এর একটা সুবিধা হলো – জলের পেট অনেকক্ষণ ভরা থাকে — গরম জল তাই অন্য তরলের থেকে বেশিক্ষণ তাপ ধারণ করে রাখতেও পারে। সেঁক দিতে তাই জল অব্যর্থ। এবার আসি তুলনার কথায়। অন্য তরলের তাপ ভক্ষণের পরিমাপ করতে যে মাপ বা বাটখারা আমরা ব্যবহার করি তা হলো – জল। ১ গ্রাম জলের তাপমাত্রাকে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়াতে যে পরিমান তাপ লাগে, তা হলো প্রায় ৪.১৮৬ x ১০আর্গ বা ৪.১৮৬ জুল — বা ১ ক্যালোরি। এই ক্যালোরিই হচ্ছে সি জি এস পদ্ধতিতে তাপের একক। যদিও, ১০ এবং ৯০ ডিগ্রিতে পাশাপাশি রাখা দু’টো পাত্রের জলের তাপমাত্রা বাড়িয়ে যথাক্রমে ১১ এবং ৯১ ডিগ্রি করতে যে একই পরিমান তাপ লাগবে – মানে ওই ৪.১৮৬ জুল – তা কিন্তু নয়! তাই ক্যালোরিকে নির্ভুল ভাবে বোঝাবার জন্য, অনেক রকম সংজ্ঞার প্রচলন আছে। তবে তাপীয়-রাসায়নিক বা থার্মোকেমিক্যাল সংজ্ঞার বিচারে আমরা আপাতত ৪.১৮৬ জুলকেই ১ ক্যালোরি বলতে পারি। আপাতত আমরা সংখ্যা-সংজ্ঞার এত মারপ্যাঁচে বিশদে না ঢুকলেও, এটুকু নিশ্চই বুঝতে পারছিস যে তাপের যে স্কেল বা মাপনী, তা গোটাটাই তৈরি জলের তাপীয় – খিদের নিরিখে। (হাই তুলতে তুলতে) যার ভিত্তিতে তুলা – সে তো তুলনায় আসবেই বাবা!

 

পেখম :  তুলনা — তুলো না –আর হাই তুলো না — আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসে গেছে! সুকুমার রায়ের ‘পথিক’ একটু বিশ্রাম নিক, আমরা বরং এবারের নাটক জলের নাটুকে চরিত্রকে নিয়েই লিখে ফেলি! নাম হবে — জলের নাটক। 

 

পিপি : তাই হোক! তবে আপাতত আমার “একটু জল না পেলে আর চলছে না”!

 

========================

~ কলমে এলেবেলে চিরশ্রী ~

 

এলেবেলে দলবল 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

লেখাটি পঠিত হয়েছে web counter বার

 

 

One thought on “জলের নাটক

  • December 10, 2020 at 6:27 am
    Permalink

    খুব সুন্দর লেখা। আমি দু বার পড়েছি। লিখতে থাকুন। আমিও বাংলায় বিভিন্ন বিষয়ে লেখার চেষ্টা করছি। আপনার লেখাটা আমার কাছে একটা মডেল।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।