আধুনিক মিনার্ভা লরা বাসি

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
166 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

পৃথিবীতে কোন নারী প্রথম বিজ্ঞানে ডক্টরেট পেয়েছিলেন?

কোনো আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানে প্রথম অধ্যাপক হয়েছিলেন কোন মহিলা?

বিশ্বে কোনো সায়েন্টিফিক সোসাইটির প্রথম নারী সদস্য কে? 

উপরের তিনটি প্রশ্নের একটিরও উত্তর মেরি কুরি নয়। তিনটিরই উত্তর এক — লরা মারিয়া ক্যাটেরিনা বাসি। লরা জীবনে আরও অনেক বিস্ময়কর কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন, অথচ তিনি কখনো কোনো স্কুল কলেজে পড়েন নি, বাড়িতে পড়াশোনা করেছিলেন। 

ইউরোপের নবজাগরণ শুরু হয়েছিল ইতালিতে চতুর্দশ শতাব্দীতে। আবার আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মস্থান হিসাবে যদি কোনো একটি দেশকে চিহ্নিত করতে হয়ে, তাহলে অনেকেই গ্যালিলিওর দেশ ইতালিকে বেছে নেবেন। অবশ্য এই দুই ঘটনা মোটেই পরস্পরবিচ্ছিন্ন নয়। নবজাগরণের ঢেউ এসে পুরানো সমাজব্যবস্থার শিকলগুলিকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। জ্ঞানচর্চা তখন অ্যারিস্টটলিয় পদ্ধতির অনুসরণ করতে গিয়ে পুঁথিগত তর্কবিতর্কের কানাগলিতে ঢুকে পড়েছিল। সেখান থেকে তাকে বার করে আনার জন্য দরকার ছিল নতুন পদ্ধতি, যা প্রাচীন শাস্ত্র ও পণ্ডিতদের সাক্ষ্যকে অস্বীকার করে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষানিরীক্ষার উপর জোর দেবে। আধুনিক বিজ্ঞান সেই পথ ধরবে।

ফ্লোরেন্স, পদুয়া, ভেনিস, পিসার মতো ইতালির অন্য শহরগুলির সঙ্গে বোলোনা ছিল সে যুগে মুক্ত চিন্তার একবারে প্রথম সারিতে। মহিলাদের সুযোগ দেওয়ার জন্য বোলোনা বিশেষ পরিচিত ছিল। লরার বাবা জুসেপ্পে বাসি ছিলেন ইতালির বোলোনা শহরের প্রতিষ্ঠিত আইনজীবি। লরার মায়ের নাম রোজা মেরি সিজারি। পাঁচ বছর বয়স থেকে লরাকে বাড়িতে লাতিন, ফরাসি ও গণিত শেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন তাঁর বাবা। এসব বিষয় সহজেই শিখে ফেলেছিলেন লরা, তাই দেখে তার বাবা মেয়ের উচ্চশিক্ষাতে মত দেন। সেই সময় কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের বিজ্ঞান পড়ার সুযোগ ছিল না। বাড়িতেই তেরো বছর থেকে কুড়ি বছর বয়স পর্যন্ত পড়েছিলেন দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র ও বিজ্ঞান। তখন অবশ্য বিষয়টাকে বিজ্ঞান বলা হত না, তা পরিচিত ছিল ন্যাচারাল ফিলোজফি বা প্রকৃতির দর্শন হিসাবে।

মোটামুটি বলা যায় যে অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে ধীরে ধীরে ন্যাচারাল ফিলোজফির বদলে সায়েন্স অর্থাৎ বিজ্ঞান কথাটার ব্যবহার শুরু হয়।

বিজ্ঞান বা সায়েন্স কথাটা কবে থেকে আধুনিক অর্থে ব্যবহার হয় তা নিয়ে অনেকে আলোচনা করেছেন। মোটামুটি বলা যায় যে অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে ধীরে ধীরে ন্যাচারাল ফিলোজফির বদলে সায়েন্স অর্থাৎ বিজ্ঞান কথাটার ব্যবহার শুরু হয়। লরার সময় পর্যন্ত ইতালিতে তাকে প্রকৃতির বিজ্ঞানই বলা হত। লরা কোন যুগের মানুষ?

লরার সঠিক জন্ম তারিখ নিয়ে একটু সন্দেহ আছে, তবে ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতায় তাঁর জন্ম তারিখ লেখা আছে ২৯ অক্টোবর। সালটা ছিল ১৭১১। তাঁকে প্রকৃতির দর্শন শেখাতেন পারিবারিক চিকিৎসক ও বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্যাইতানো তাক্কোনি। তবে শেষ পর্যন্ত শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর ছাত্রীর মতের মিল হয়নি। সেই কথায় আমরা একটু পরে আসব।  

তরুণী বাসির পড়াশোনাতে পারদর্শিতার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল, বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক ও বোলোনার আর্চবিশপ প্রসপারো লরেঞ্জিনি ল্যাম্বের্তিনির কানেও সেই কথা পৌঁছে ছিল। শিক্ষার অনুরাগী ল্যাম্বের্তিনি আলাদা করে লরার বিষয়ে দায়িত্ব নেন। তাঁর সমর্থন লরার খুবই উপকারে এসেছিল। এর পরেই তাঁর উদ্যোগে বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয় চার অধ্যাপকের সঙ্গে লরার বিতর্কের ব্যবস্থা করে। মনে রাখতে হবে মধ্যযুগে, বিশেষ করে ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মের মূল কেন্দ্র ইতালিতে, বিশ্ববিদ্যালয় ও চার্চের সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। ১৭৩২ সালের ১৭ এপ্রিল সেই বিতর্কে লরা সাফল্যের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই ঘটনা মানুষের মনে বেশ সাড়া ফেলেছিল, চিত্রকলা ও কবিতার বিষয়বস্তু হয়েছিল। তার কিছুদিন আগে বোলোনিজ আকাদেমি অফ সায়েন্স তাঁকে নিজেদের সদস্য করেছিল। বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টর অফ ফিলোজফি ডিগ্রি দেয়। সেটা ছিল ১৭৩২ সালের ১২ মে, লরার বয়স তখনো একুশ পূর্ণ হয়নি। এর আগে ১৬৭৮ সালে পদুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলেনা পিস্কোপিয়া দর্শনে ডক্টরেট হয়েছিলেন। লরা বিশ্বের দ্বিতীয় নারী ডক্টরেট, তবে বিজ্ঞানে প্রথম। তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্য বক্তৃতা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে শর্ত ছিল শ্রোতাদের মধ্যে নারী থাকতে হবে, শুধু পুরুষরা থাকলে চলবে না। 

তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্য বক্তৃতা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে শর্ত ছিল শ্রোতাদের মধ্যে নারী থাকতে হবে, শুধু পুরুষরা থাকলে চলবে না। 

কয়েক মাস পরে লরা আবার পদার্থবিদ্যা সংক্রান্ত কয়েকটি থিসিস বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশ করেন। এবার তাঁকে পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞান বা এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিক্স পড়ানোর কাজ দেওয়া হয়। তিনি শুধু যে বিজ্ঞানে প্রথম মহিলা অধ্যাপক তা নয়, সম্ভবত তাঁর আগে পৃথিবীর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো মহিলা পড়ানোর জন্য মাইনে পাননি। সে বছর অক্টোবর মাসে তিনি যখন প্রথম প্রকাশ্য বক্তৃতা দেন, সেই কথা স্মরণে রাখতে এক মেডেল তৈরি করা হয়েছিল। তার এক পাশে ছিল লরার মুখ। অন্য পাশে বিদ্যার রোমান দেবীর মিনার্ভা লরার হাতে প্রদীপ তুলে দিচ্ছেন। লরাকে বলা হত বোলোনার মিনার্ভা। 

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সম্ভবত ভেবেছিলেন লরার ক্লাস নেওয়াটা নেহাতই একটা আনুষ্ঠানিক ব্যাপার হয়ে থাকবে, কিন্তু লরার পরিকল্পনা ছিল অন্য। তিনি মোটেই তাঁর পড়ানো ও বক্তৃতার উপর চাপিয়ে দেওয়া বিধিনিষেধকে পছন্দ করতেন না, একাধিকবার তিনি তা তুলে নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। নানা ভাবে চেষ্টার পরে তিনি অনেকটা সফল হয়েছিলেন। শুধু তাই নয় ১৭৬০ সাল থেকে বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের মধ্যে তাঁর থেকে বেশি মাইনে কেউ পেত না।  

তিনি ও তাঁর সহকর্মী অধ্যাপক জুসেপ্পে ভেরাত্তি প্রেমে পড়েছিলেন।

অনেক দিক দিয়েই লরা ছিলেন ব্যতিক্রম। বিংশ শতকের গোড়াতেও মহিলা বিজ্ঞানীদের অনেকেই গবেষণার স্বার্থে অবিবাহিত থাকতেন। অথচ লরা তার দুই শতাব্দী আগেও সেই পথে হাঁটেন নি। তিনি ও তাঁর সহকর্মী অধ্যাপক জুসেপ্পে ভেরাত্তি প্রেমে পড়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের অধিকাংশই সেই যুগে বিয়ে করতেন না, কিন্তু সেই সামাজিক রীতিনীতিকে উড়িয়ে দিয়ে তাঁরা দুজনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ১৭৩৮ সালে। তাঁদের আটটি ছেলেমেয়ের খবর পাওয়া যায়। ছেলেমেয়ে মানুষ করার পাশাপাশি অধ্যাপনা ও গবেষণা চালিয়ে গিয়েছিলেন লরা। তাঁদের এক ছেলে পাওলো ভেরাত্তি পরবর্তীকালে বাবা মায়ের অনুসরণে পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করেছিলেন।

বিয়ের পরে লরার কাজেও বিশেষ সুবিধা হয়েছিল। বিধিনিষেধের বেড়াজালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়ার সুযোগ তাঁর ছিল কম। বিয়ের পরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরুষ শিক্ষকদের মতো ক্লাস নেওয়ার সুযোগের জন্য আবার আবেদন জানান। তা গৃহীত হয়নি, কিন্তু তিনি নিজের বাড়ি থেকে পড়ানোর অধিকার পান। বাড়িতে পরীক্ষাগার বানানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিছু অর্থও মঞ্জুর করেছিল। তাঁর ক্লাসে ছাত্ররা ছাড়াও ভিড় করতেন শিল্পী সাহিত্যিক দার্শনিক বিজ্ঞানীরা। স্বামী স্ত্রী পরস্পরকে গবেষণাতে সাহায্য করতেন। অনেক বিজ্ঞানীকে তাঁরা দুজনে বাড়িতে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানাতেন, অবিবাহিত লরার সেই সুযোগ ছিল না। লরার লেখা চিঠি থেকে জানতে পারি বিয়ের আগে ভেরাত্তি কথা দিয়েছিলেন তিনি তাঁর পড়াশোনা ও গবেষণাতে কোনোদিন বাধা দেবেন না। সে কথা যে শুধু অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন তা নয়, তিনি লরার কাজের প্রধান সহায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

কিন্তু গণিতে তাঁর জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

১৭৭৬ সালে শেষ পর্যন্ত লরার উপর আরোপিত সমস্ত বিধিনিষেধ উঠে যায়। বোলোনা আকাদেমির ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্সে পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন পাওলো বাত্তিস্তা বালবি, ১৭৭২ সালে তাঁর মৃত্যুর পরে অধ্যাপকের পদ ফাঁকা হয়। বালবির সহকারী ছিলেন জুসেপ্পে ভেরাত্তি, স্বাভাবিক ভাবেই তাঁকেই ঐ পদে নিয়োগের কথা আসে। কিন্তু গণিতে তাঁর জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। লরা আবেদন করেন, এবং দীর্ঘ আলোচনার পরে আকাদেমি তাঁকেই মনোনীত করে। জুসেপ্পে তাঁর স্ত্রীর সহকারী হতে আপত্তি করেননি, সেই যুগের পটভূমিকায় দাঁড়িয়ে তাঁর এই উদারতা আমাদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে। এর পরে লরা মাত্র দু’বছর জীবিত ছিলেন, সেই সময় পুরুষ অধ্যাপকদের সমান সমস্ত অধিকার তিনি ভোগ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর স্বামী ওই পদে বসেন। লরা ও জুসেপ্পে সে যুগে ছিলেন এক বিরল দম্পতি যাঁরা একই বিষয়ে কাজ করতেন, স্ত্রীর খ্যাতি ছিল অনেক বেশি, অথচ দাম্পত্য জীবনে কোনো ফাটল দেখা দেয় নি। আজও এই উদাহরণ সুলভ নয়।

ক্যাথলিক ধর্মের সর্বোচ্চ পদাধিকারী হলেন পোপ। পোপ চতুর্দশ বেনেডিক্ট ১৭৪৫ সালে চব্বিশজন পণ্ডিতকে নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করেছিলেন, সেটি বেনেডেট্টিনি আকাদেমি নামে পরিচিত। চতুর্দশ বেনেডিক্ট আর কেউ নন, লরার পূর্বপরিচিত আর্চবিশপ ল্যাম্বের্তিনি; ১৭৪০ সালে তিনি পোপ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। লরার আত্মবিশ্বাস ছিল অসামান্য, তিনি বেনেডেট্টিনি আকাদেমির সদস্য হওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। আকাদেমির সদস্যদের মধ্যে কয়েকজন লরার বিরোধিতা করেছিলেন, আবার কয়েকজন তাঁর সমর্থকও ছিলেন। স্বয়ং পোপের আগ্রহে লরার আবেদন গৃহীত হয়; আকাদেমির পঁচিশতম পণ্ডিত হলেন লরা বাসি ভেরাত্তি। তবে দুপক্ষের আপোস রফাতে আকাদেমিতে তাঁর ভোটাধিকার ছিল না। তিনি মোট একত্রিশটি বার্ষিক রিপোর্ট আকাদেমিতে পাঠিয়েছিলেন। 

নানা বিষয় পড়াতেন লরা। তার মধ্যে যেটা সব থেকে বেশি উল্লেখযোগ্য তাকে আমরা আজকের যুগে পদার্থবিজ্ঞান বলব। বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাধ্যাকর্ষণ, গতিবিদ্যা, তরলের প্রবাহ ইত্যাদি নানা বিষয়ে বাসির মোট আঠাশটি গবেষণাপত্রের খবর পাওয়া যায়, যদিও তার মধ্যে মাত্র চারটি ছাপা হয়েছিল। পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে লরা ছাপতে চাইতেন না; সে জন্যই হয়তো আধুনিক যুগে তিনি খুব পরিচিত নন। 

গবেষণাতে অসাধারণ কোনো মৌলিকত্বের পরিচয় লরা দেন নি। তবে অধিকাংশ বিজ্ঞানীই আজও অবশ্য সেই দলেই পড়বেন যাঁরা কখনো চোখ ধাঁধানো গবেষণা করেননি, কিন্তু ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যান। পরিবেশ ও পরিস্থিতির কথা ভাবলে লরার কাছে এর থেকে বেশি কিছু আশা করা হয়তো অবাস্তব। লরার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব কিন্তু গবেষণার ক্ষেত্রে নয়। গ্যালিলিওর মৃত্যু হয়েছিল প্রায় এক শতাব্দী আগে ১৬৪২ সালে। আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মস্থান ইতালিতে কিন্তু তার পরে সেখানে বিজ্ঞান চর্চা পিছিয়ে পড়েছিল। পদার্থবিজ্ঞানের ভরকেন্দ্র তখন সরে গেছে অন্যত্র। আমরা যে সময়ের কথা বলছি, তাকে বলা হয় আলোকপ্রাপ্তি বা এনলাইটেনমেন্টের যুগ। ব্রিটেনে তখন আইজ্যাক নিউটনের হাত ধরে পদার্থবিজ্ঞান সাবালকত্ব লাভ করেছে। নিউটনের মৃত্যু হয়েছিল ১৭২৭ সালে, নিউটনের আগের যুগের ও সমসাময়িক বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্রিটেনে রবার্ট বয়েল, রবার্ট হুক, এডমন্ড হ্যালি, ফ্রান্সে রেনে দেকার্তে, জার্মানিতে গটফ্রিড লিবনিৎজের নাম করা যায়। 

ইতালিতে কিন্তু সেই সময়ে সমতুল্য কোনো পদার্থবিজ্ঞানীর কথা পাওয়া যায় না।

ইতালিতে কিন্তু সেই সময়ে সমতুল্য কোনো পদার্থবিজ্ঞানীর কথা পাওয়া যায় না। ইতালিতে যে পদার্থবিজ্ঞান পড়ানো হত, তা ছিল রেনে দেকার্তের অনুসারী। দেকার্তের পদ্ধতিতে দর্শনের ভূমিকা ছিল অনেক বেশি, গণিতের ভূমিকা ছিল খুবই কম। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান মূলত গণিত নির্ভর, এবং তার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান যাঁর তিনি আইজ্যাক নিউটন। নিউটনের বই পড়ে লরা তাঁর মতের অনুসারী হয়ে পড়েন। সেই নিয়েই দেকার্তের মতাবলম্বী গৃহশিক্ষক তাক্কোনির সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ হয়েছিল। লরা বাসিই ইতালির কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নিউটনের অনুসরণে পদার্থবিদ্যা পড়ানো শুরু করেছিলেন। তাই ইতালিতে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের চর্চা শুরুর পিছনে তাঁর বিরাট অবদান আছে।

সারা জীবন নিজেকে শিক্ষিত করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। বুঝেছিলেন যে অঙ্ক শেখার ব্যাপারে তাঁর ঘাটতি আছে; তাই অধ্যাপনা শুরুর পরেও ক্যালকুলাস শেখার জন্য তিনি বিখ্যাত গণিতবিদ গ্যাব্রিয়েল মানফ্রেডির সাহায্য নিয়েছিলেন। মনে রাখতে হবে ক্যালকুলাসের তখন একেবারেই শৈশব অবস্থা। একইভাবে পদার্থবিজ্ঞান শেখার জন্য তিনি বিজ্ঞানী জ্যাকোপো বেক্কারির সহকারী হয়েছিলেন। মানফ্রেডি ও বেক্কারি দুজনেই ছিলেন ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটির সদস্য। ক্যাথলিক চার্চ কিছু বইকে সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল, কারণ বাইবেলের সঙ্গে তাদের বিরোধ ছিল। অবশ্য পণ্ডিতরা আবেদন করলে অনুমতি মিলত, তবে মহিলারা সাধারণত সুযোগ পেতেন না। লরার আবেদনের পরে ১৭৩৫ সালে তাঁকে সেই সমস্ত বই পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়।

তাঁর ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত সম্ভবত লুইজি গ্যালভানি যিনি প্রবাহী তড়িৎ আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত।

লরার পড়ানোর ক্ষমতা ও নিউটনিয় বিজ্ঞানে দখল নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত সম্ভবত লুইজি গ্যালভানি যিনি প্রবাহী তড়িৎ আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত। আর এক ছাত্র লাজ্জারো স্প্যালাঞ্জানি সবসময় লরা সম্পর্কে বলতেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক যাঁর কাছে তিনি সবচেয়ে বেশি শিখেছেন। স্প্যালাঞ্জানি পরবর্তীকালে শরীরতত্ত্বে মৌলিক অবদান রেখেছিলেন। লরার খ্যাতি দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। দেশবিদেশের অনেক বিজ্ঞানীর সঙ্গে তাঁর চিঠি মারফত যোগাযোগ ছিল। বোলোনাতে কোনো বিজ্ঞানী এলে তিনি অবশ্যই লরার সঙ্গে দেখা করতেন। বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক ভল্টেয়ার বিজ্ঞানেও বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। তিনি লরাকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন ইংল্যান্ডে নিউটনের জন্ম বটে, কিন্তু তিনি ইংল্যান্ডের থেকে বাসির আকাদেমির সদস্য হওয়া বেশি পছন্দ করবেন, কারণ লন্ডনে কোনো বাসি নেই। 

লরা পরীক্ষানিরীক্ষা বেশি করেছিলেন স্থিরতড়িৎ বিষয়ে, নিজে কিছু যন্ত্রও সে জন্য বানিয়েছিলেন। চিকিৎসাতে তড়িতের ব্যবহার নিয়ে স্বামীস্ত্রী দুজনেই কাজ করতেন। কিন্তু তাই নিয়ে কোনো গবেষণাপত্র লরা ছাপাননি। তা হলেও তাঁর কাজের কথা বিজ্ঞানীরা জানতেন। বাসি ও তাঁর স্বামী মার্কিন বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের স্থির তড়িৎ সংক্রান্ত পরীক্ষানিরীক্ষার কথা জানতেন। ফ্রাঙ্কলিনের বন্ধু চিকিৎসক জন মর্গান বোলোনাতে তাঁদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের ল্যাবরেটরির পরিদর্শন করেন। অনেক তরুণ গবেষক তরুণ বয়সে তাঁদের গবেষণার ফল বাসিকে পাঠিয়ে সাগ্রহে তাঁর মতামত জানতে চাইতেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত নিঃসন্দেহে ব্যাটারির আবিষ্কারক আলেসান্দ্রো ভোল্টা। ভোল্টাকে লেখা বাসির একটিই চিঠি পাওয়া গেছে, প্রৌঢ় বয়সেও ভোল্টার গবেষণা বিষয়ে বাসির আগ্রহ পাঠককে বিস্মিত করে। গ্যালভানির কথা আগেই বলেছি।

১৭৭৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি লরার মৃত্যু হয়। সমাধিস্থলে তাঁর শবাধার বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর সহকর্মীরা। বোলোনার সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালভানির সমাধির পাশে আজও তাঁর সমাধি দেখতে পাওয়া যায়। জীবৎকালেই বোলোনাতে লরা বিশেষ সম্মানের অধিকারী হয়েছিলেন। শহরের সমস্ত বড় অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি প্রত্যাশিত ছিল। তিনি এই সব অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা শোনাতেন। তিনি যখন প্রিজম ব্যবহার করে আলোর বর্ণালীবিশ্লেষণের নিউটনের সেই বিখ্যাত পরীক্ষা প্রকাশ্যে করে দেখিয়েছিলেন, তা নিয়ে কবিতা লেখা হয়েছিল। ১৭৩৭ সালে তাঁকে নিয়ে জার্মানিতে এক পত্রিকার এক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। জার্মানির প্রথম মহিলা ডাক্তার ডরোথিয়া লেপোরিনের প্রেরণা ছিলেন বাসি। মৃত্যুর এত বছর পরেও আমরা তাঁকে পুরোপুরি ভুলিনি। বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিউজিয়ামে তাঁর তৈলচিত্রটি আজও শোভা পায়। তাঁর নামে পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য এক বৃত্তি চালু হয়েছে। শুক্র গ্রহের বুকে এক গহ্বর লরার নাম বহন করে। অষ্টাদশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের ইতিহাসে লরা বাসি এক অনন্য নক্ষত্র। 

——————————-

~ কলমে এলেবেলের অতিথি গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় ~

 

গৌতম পেশায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবজ্ঞানের অধ্যাপক। লেখালেখি করতে ভালো বাসেন। কয়েকটি গল্প ও প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের কর্মসচিব
 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 


লেখাটি পঠিত হয়েছে Web Hits বার

 

 

 

One thought on “আধুনিক মিনার্ভা লরা বাসি

  • December 6, 2020 at 6:14 am
    Permalink

    ভীষণ ভালো লাগলো লরা বাসির কথা পড়ে। ধন্যবাদ লেখককে।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।