সংখ্যার ইতিবৃত্ত – ১

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
136 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

 

 ১

 

গুহার বাইরে একটা হাল্কা শব্দ হতেই সতর্ক হয়ে উঠল সেসা। এতক্ষণ ধরে যে বর্শার পাথরের ফলাটা ঘষে ঘষে ধারালো করছিল সেটাই তার পেশীবহুল হাতে তুলে নিলো সে। একটু পিছিয়ে গিয়ে হাল্কা অন্ধকারের মধ্যে সরে গেলো সে; সেখান থেকে গুহার মুখের দিকে তাক করে রাখল বর্শা। গুহার মুখে মানুষ আসুক বা কোন জন্তু এক নিমেষে বর্শার আঘাতে শেষ। কদিন আগেই বাচ্চা গায়েব করেছে হায়না। তাই সতর্ক সেসা। বাইরের আওয়াজ একটু একটু করে কাছে এগিয়ে এগিয়ে আসছে। জন্তুর শব্দ বলে মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে মানুষ। আশেপাশে আর কোন গোষ্ঠী নেই। তবে কি ভানা ফিরল? কিন্তু প্রথমে সেটা ভাবলে চলবে না। বাইরের কেউ হতে পারে। সতর্ক থাকাই ভালো। গুহার ভেতরের আগুনের আলো সেসার মসৃণ গালে এসে পড়েছে। একটা উৎকণ্ঠা স্পষ্ট তার মুখে। উৎকণ্ঠা হওয়ারই কথা। এতোগুলি লোকের দলনেত্রী সে, সবার ভালো মন্দের একটা দায়িত্ব তার কাঁধে। সেসার হঠাৎ সতর্ক হয়ে ওঠাটা আকুদ গুহার ভেতর থেকে দেখতে পেলো। আওয়াজটা সে শোনেনি। কিন্তু সেসাকে অনুসরণ করে সেও এগিয়ে এগিয়ে এলো, সেসার মতো বর্শা নিয়ে গুহার মুখের দিকে তাক করে দাঁড়িয়ে রইল। সে যুবক, পরনে তার একটা পশুর ছাল, হাতে সেসার মতোই একটা বর্শা, মুখ ভর্তি দাড়ি। শব্দটা এবার তার কানেও আসছে। 

 

আগুনের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল একটা পেশীবহুল তন্বী  নারীমূর্তি।

 

আওয়াজটা গুহার সামনে এসে থেমে গেলো। আগুনের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল একটা পেশীবহুল তন্বী  নারীমূর্তি, হাতে বর্শা, কিন্তু আক্রমণের কোন ভাবনা আছে বলে মনে হল না। সেসা আর আকুদের মতো তারও শুধু কোমরে জড়ানো পশুর ছাল। দেহের ঊর্ধ্বাংশ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। আগুনের আলো তার মুখে পড়তেই আনন্দসূচক শব্দ বেরিয়ে এলো সেসা আর আকুদের মুখ থেকে। ভানা ফিরেছে। সেসা আর আকুদ তাদের বর্শা রেখে ভানাকে নিয়ে গুহার একটু ভেতরের দিকে এসে বসল। সেসা আরেকবার ভেতরে গিয়ে কালকের শিকারের মাংস কেটে এনে তুলে দিল ভানার হাতে। ভানা সেই মাংস খানিকটা কামড়ে ছিঁড়ে নিয়ে চেবাতে শুরু করল, বাকিটা সেঁকতে দিল আগুনে। সামান্য কুশল বিনিময় শেষে, এবার শুরু হল আসল আলোচনা। 
 
আমরা যারা আজকে প্রথমবার সেসাদের দেখলাম তারা জানিনা বিগত কয়েকদিন তাদের ঠিক কিভাবে কেটেছে। সেটা একটু সবিস্তারে বলে নিই। সেসাদের দল পড়েছে একটা সঙ্কটে। দলনেত্রী হিসেবে সেসারই প্রথম ব্যাপারটা খেয়াল আসে। প্রথমেই তার নজরে আসে যে কোনভাবে যেন শিকারে ঘন ঘন যেতে হচ্ছে। সেটা হতেই পারে, দল বড় হচ্ছে বলে। তার নিজেরই তো প্রায়ই বাচ্চা হয়। দলে ভানা আছে, আরও মেয়েরা আছে, তাদেরও বাচ্চা হয়। দল বড় হয়। কিন্তু যেটা মূল সমস্যা সেটা হচ্ছে আগে যেমন ভালো মতো শিকার পাওয়া যেত, এখন সেরকম শিকার পাওয়া যায় না। যে তৃণভূমিগুলোতে সেসারা শিকার করে সেখানে কোনভাবে জন্তু আসা কমে গেছে। সেসা সেটা কোন ভাবেই ঠিক করে বুঝে উঠতে পারছে না। ঠিক কটা জন্তু আছে, আর জন্তু কি সত্যি কমে যাচ্ছে সেটা সেসার বোধের বাইরে, কারণ সেসা গুণতে জানে না। শুধু সেসা নয়, পৃথিবীর কেউ তখন গুণতে জানে না। এটা প্রস্তর যুগের কাহিনী। সংখ্যা তখনও তৈরি হয়নি। 

 

মানব সভ্যতার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ কি?

 

যা হোক একটা অনুমান তো করতে হবে। কোনও ভাবে বুঝতে হবে যে জন্তু বাড়ছে না কমছে? সেসা তাই শেষ অব্দি একটা বুদ্ধি করল। একদিন দূর থেকে চারণভূমিকে সারাদিন ধরে লক্ষ্য করল। একটা জন্তু দেখতে পেলেই মাটি থেকে একটা করে ছোট নুড়ি তুলে নিয়ে জমা করতে থাকল। এভাবে যে নুড়িগুলো জমলো, সেগুলো গুহাতে ফিরে এসে সযত্নে গুছিয়ে রাখল। আবার বেশ কয়েকদিন কেটে গেলে সে ঐ একই ভাবে আবার চারণভূমিতে গিয়ে জন্তু দেখে দেখে নুড়ি কুড়িয়ে আনল। দিয়ে আগের নুড়ির স্তূপ আর এবারের নুড়ির স্তূপকে মাটিতে জমা করে দুটোর  আকারের দিকে তাকাতেই তার কপালে ভাঁজ পড়ে গেলো। স্তূপের আকার ছোট হয়ে গেছে। মানে স্পষ্ট যে খাবার কমে আসছে। তাহলে উপায়? এখনো মানুষে চাষ কাকে বলে জানে না। মুল খাবার বলতে শিকার করা মাংস। কিন্তু খাবার কমে গেলে কি হবে? কিছুই হবে না, বছরের পর বছর ধরে তারা যা করে আসছে তাই করতে হবে। আবার নতুন চারণভূমি খোঁজা, নতুন গুহা খোঁজা, এতোগুলো লোককে নিয়ে পায়ে হেঁটে সেখানে যাওয়া, রাস্তায় হাজার ঝামেলা, হিংস্র পশুর আক্রমণ। সেসা নেত্রী হওয়ার পরও এরকম বেশ কয়েকবার করতে হয়েছে কিন্তু এবারে একটা বড় সমস্যা আছে। জুল কয়েকদিন আগে শিকারে গিয়ে উরুতে একটা বড়সড় আঘাত পেয়েছে। আজকের দিনে হলে বলতাম ওর ফিমার বোন ভেঙেছে। সারতে প্রায় ৬ সপ্তাহ লাগবে। তারপরেও সে ঠিক ভাবে চলতে পারবে কিনা কেউ জানে না। আপনাকে যদি জানতে চাই যে মানব সভ্যতার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ কি? আপনি হয়তো বলবেন আগুন আবিষ্কার, বা চাকা আবিষ্কার। আমি বলবো এই যে একটি অসুস্থ মানুষের কথা তার দলের লোক ভাবছে এটা। পশুদের জগতে ফিমার ভাঙার মানে মৃত্যু। সে না পারবে শিকার করতে, না পারবে আত্মরক্ষা করতে। কিন্তু জুল আজ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত তার দলের ভেতরে, তার খাবার দলের লোক এনে দেয়, তাকে ভাঙা হাড়কে ঠিক করার সুযোগ দেয়, এটাই সভ্যতা। সেসা চিন্তায় যে জুল এতোটা ধাক্কা নিতে পারবে কিনা কে জানে? কিন্তু সকলের স্বার্থে যেতে তো হবেই। আর কদিন নয় বিশ্রাম নিয়ে যাবে। কিন্তু কোনদিকে যাবে সেসা পুরো দলবল নিয়ে? সেসার পরেই দলে স্থান আকুদ আর ভানার। দুজনেই অসম্ভব ভালো শিকারি। আকুদ খুব দ্রুত দৌড়তে পারে, আর ভানা পারে ভালো পাহাড় চড়তে। সেসা গিয়ে সব খুলে বলল তাদের। 
 
আলোচনায় স্থির হল আকুদ যাবে যেদিকে সূর্য ওঠে তার উল্টো দিকে। ওদিকে তৃণভূমি যতদূর দেখা যায় ততদুর বিস্তৃত। তাকে দেখতে হবে ওদিকে গুহা আছে কিনা, জল আছে কিনা, আর সর্বোপরি শিকার কিরকম আছে। ভানা সামনের পাহাড়টা পেরিয়ে ওদিকে যাবে। পাহাড়ের ওপারে ভালো তৃণভূমি থাকতে পারে, তাতে থাকতে পারে ভালো শিকার। আর পাহাড় থাকলে গুহা তো থাকবেই। জল আছে কিনা সেটাও দেখা দরকার। সব যখন ঠিকঠাক তখন ভানা করে বসল একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। “দুদিকেই যদি ভালো শিকার থাকে তাহলে কোন দিকে যাবো?” প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে এক জায়গায় গেলাম, আবার কদিন পরে আবার নতুন জায়গা। না, সেটা ঠিক নয়। বেশী সময় গুহার বাইরে কাটানো ঠিক নয়। যা হয় একবারেই করতে হবে। দুদিকের জন্তুর সংখ্যার একটা তুলনা থাকা দরকার। সেসা এবার নুড়ি কোড়ানোর কথাটা বলল, যটা পশু তটা নুড়ি। কিন্তু পশু বেশী হলে? কতোগুলো নুড়ি হবে কেউ জানে না। নুড়ি বাড়লে ভার বাড়বে। হাঁটা, চলা, দৌড়নোয়, অসুবিধা। তাহলে উপায়? এবার বুদ্ধি এলো আকুদের মাথায়। “যদি এমন করি যে বড় হাড় নিয়ে গেলাম। আর যখনি দেখবো নতুন পশু তখনি এই হাড়ের ওপরে এটা দিয়ে ছোট দাগ কেটে দেবো।” বলে কোমর থেকে একটা পাথরের তৈরি ছুরির মতো অস্ত্র বের করে আনল। এটা আসলে ব্যাবহার হয় মৃত পশুর ছাল ছাড়াতে, আজ একটা অন্য কাজে ব্যবহার হবে। পুরো ব্যাপারটা তিন জনের খুব মনে ধরে গেলো। পরের দিন সূর্য উঠতেই ভানা আর আকুদ বেরিয়ে পড়ল নিজেদের গন্তব্যে। সাথে নিলো লম্বা লম্বা কটা হাড়। 

 

এই ঘটনা ঘটছে আজ থেকে প্রায় ৪০০০০ বছর বা তারও আগে।

 

আকুদ ফিরে এসেছে কিছু সময় আগে, ভানার ফিরতে বেশ খানিকটা দেরী হল। এবার তিনজনে দুটো হাড়ের ওপর কাটা দাগ দেখে ঠিক করবে কোন দিকে পশু বেশী, কোনদিকে যাওয়া যায় পুরো দলবল নিয়ে। এই ঘটনা ঘটছে আজ থেকে প্রায় ৪০০০০ বছর বা তারও আগে। এখনো মানুষ গুণতে জানে না। 
———— 
 
নীল নদে একটা ছোট নৌকা ভেসে আসছে। নৌকাতে বসে আছে এক কিশোর। নাম ধরে নিলাম খাবাশ। খাবাশ আপন মনে নাও বেয়ে চলেছে। চোখের সামনে তার প্রায় ৭০০০ বছর ধরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটা সভ্যতা। মিশরে তখনও পিরামিড তৈরি শুরু হয়নি। তবে স্থাপত্যবিদ্যায় তারা অনবদ্য হয়ে উঠেছে। খাবাশের বাবা এরকমই একজন স্থপতি। খাবাশেরও ইচ্ছা সেও স্থপতি হবে। কিন্তু তার জন্যে দরকার অঙ্ক। আর সেখানেই সে থমকে গেছে। কোন ভাবেই যেন বাগে আসছে না। সে নামতার মতো একটা জিনিস বারে বারে বলার চেষ্টা করছে, খানিক বলছে, আটকে যাচ্ছে, ভুলে যাচ্ছে, নয় ভুল বলছে। তবে কি সে কোনদিনও পারবে না অঙ্ক করতে? সেই চিন্তাই এখন তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। 
 

 

========================

~ কলমে এলেবেলে প্রত্যয় ~

 

এলেবেলে দলবল 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

লেখাটি পঠিত হয়েছে Web Hits বার

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।