গন্ধ-বিচার, সালোকসংশ্লেষ আর কোয়ান্টাম বায়োলজি

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
480 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

সময়টা ১৯৪৪। আরউইন স্রোডিংজার, যিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জনক, লিখলেন এক যুগান্তকারী বই “What is life?”। সেখানে তিনি বললেন জীবিত কোষের মধ্যে থাকা অণুগুলি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ভাবে থাকে অথচ এই অণুগুলিই কোষের বাইরে বাহ্যিক পরিবেশে এসে চরম বিশৃঙ্খল হয়ে এলোমেলো আচরণ করে। বিশৃঙ্খল অণুগুলিকে পরমশূন্য উষ্ণতার (০ কেলভিন) কাছাকাছি নিয়ে গেলে তাদের আচরণ যেমন হওয়া উচিত, কোষের ভেতর তারা সেই রকম আচরণ করে। যেহেতু হিমাঙ্কের বহু নিচে কোয়ান্টাম এফেক্টের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তাই স্রোডিংজার বলেন, আণুবীক্ষণিক কোষের মধ্যেও আছে কোয়ান্টাম মেকানিক্স। 

স্রোডিংজার বলেন, আণুবীক্ষণিক কোষের মধ্যেও আছে কোয়ান্টাম মেকানিক্স। 

কিন্তু বলা যতটা সহজ প্রমাণ করা তার থেকে ঢের শক্ত। বিজ্ঞান আর কল্পবিজ্ঞানের মাঝের রাস্তাটি বড়ই দুর্গম। ১৯৪৪ এর সেই দূরদর্শী চিন্তাভাবনা কি করে আজকের বিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হল তা জানতে হলে আমাদের কোয়ান্টাম বিশ্বের বেশ কয়েকটি নিয়ম জানতে হবে। যেমন কোয়ান্টাম টানেলিং। তোমার কাছে যদি একটা বল থাকে আর সেই বলটিকে একটা দেওয়াল অতিক্রম করে উল্টোদিকে থাকা তোমার বন্ধুর কাছে পৌঁছাতে হয় তাহলে তোমায় যথেষ্ট শক্তি প্রয়োগ করে বলটিকে দেওয়ালের ওপর ওঠাতে হবে। কোয়ান্টাম টানেলিং-এর নীতি অনুযায়ী তোমায় শুধু বলটিকে দেওয়ালের দিকে ছুঁঁড়তে হবে। তাহলে একটা সম্ভাবনা থাকবে যে ম্যাজিকের মত বলটি দেওয়ালের উল্টোদিকে থাকা তোমার বন্ধুর কাছে পৌঁছে যাবে। ৭০ এর দশকের আগে অব্দি জীবিত কোষে কোয়ান্টাম টানেলিং সম্ভব সেটা কষ্টকল্পনা ছিল, যদিও সূর্যের মধ্যে হাইড্রোজেন গ্যাসের হিলিয়ামে রূপান্তরিত হওয়াতে কোয়ান্টাম টানেলিং-এর প্রমাণ মিলেছিল। ৭০এর দশকে কিছু কিছু পরীক্ষার ফলাফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশিত হতে থাকে, যা থেকে উৎসেচকের কর্মপদ্ধতিতে কোয়ান্টাম টানেলিং এর ভূমিকা আছে বলে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। কোষের মধ্যে হওয়া যেকোনো বিক্রিয়াকে কয়েক লাখগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে উৎসেচক। কিন্তু কি করে? বিজ্ঞানীরা বললেন, কোয়ান্টাম টানেলিং এর মাধ্যমে মুহূর্তের অনেক অনেক কম সময়ে ইলেকট্রনদের এক অণু থেকে আরেক অণুতে পাঠিয়ে দেয় উৎসেচকরা। কোয়ান্টাম টানেলিং-এর সাহায্যে আমাদের ঘ্রাণেন্দ্রিয় কি ভাবে কাজ করে তারও সঠিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। গন্ধযুক্ত পদার্থের অণুগুলির মধ্যকার বন্ড এক বিশেষ এনার্জিতে অনুনাদ করে এবং তা কোয়ান্টাম টানেলিং-এর মাধ্যমে নাকের রিসেপ্টারের মধ্যেকার  ইলেকট্রনকে মুহূর্তের মধ্যে অন্য প্রান্তে পাঠিয়ে মস্তিস্কে খবর পাঠানোর কাজ শুরু করে। বিভিন্ন অণুর ভাইব্রেশানাল এনার্জি আলাদা হওয়ার জন্য আমরা পচা ডিম আর গোলাপের গন্ধ আলাদা করে চিনতে পারি।    

একটা সম্ভাবনা থাকবে যে ম্যাজিকের মত বলটি দেওয়ালের উল্টোদিকে থাকা তোমার বন্ধুর কাছে পৌঁছে যাবে।

কোয়ান্টাম বিশ্বের আরেকটি নীতি হল কোয়ান্টাম কোহেরেন্স; যার মূল বক্তব্য হল যেকোন  কোয়ান্টাম অণু তরঙ্গের মত আচরণের মাধ্যমে শুধুমাত্র এক স্থান থেকে আরেক স্থানে না গিয়ে একস্থান থেকে একাধিক স্থানে একই সময় বিচরণ করতে পারে। তোমায় যদি বলা হয় এক্ষুনি দশ মাইল দৌড়ে, দুটো চ্যাপ্টার পড়ে, একটু গিটার বাজিয়ে রান্না করতে, তুমি পারবে না। কিন্তু তোমার যদি চারটে ক্লোন থাকত তাহলে একই সাথে এই চারটে কাজ তুমি করতে পারতে। কোয়ান্টাম কোহেরেন্সে বস্তু তরঙ্গধর্ম কাজে লাগিয়ে মাল্টিটাস্কিং করতে সক্ষম। সালোকসংশ্লেষে  সূর্যের ফোটন কণা পাতায় থাকা ইলেকট্রনের সাথে ধাক্কা খায়, এর ফলে উত্তেজিত ইলেকট্রন ক্লোরোপ্লাস্টের রিয়্যাকশন সেন্টারে গিয়ে অতিরিক্ত শক্তির সাহায্যে এটিপি অণু তৈরি করে। চিরায়ত (ক্ল্যাসিকাল) পদার্থবিজ্ঞানের ধারণা অনুযায়ী চললে এই প্রক্রিয়ার দুটো সমস্যা ধরা পড়ে। প্রথমত, ইলেকট্রনের ক্লোরোফিল অণু থেকে রিয়্যাকশন সেন্টারে যেতে যতটা সময় লাগা উচিত তার থেকে অনেক কম সময়ে ইলেকট্রন পৌঁছে যায়। দ্বিতীয়ত, পৌঁছানোর পথে ইলেকট্রন অল্প পরিমান শক্তিও তাপশক্তি রূপে বিকিরণ করে না। ২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার একদল বিজ্ঞানী প্রমাণ করেন ইলেকট্রন, কোয়ান্টাম কোহেরেন্সের মাধ্যমে রিয়্যাকশন সেন্টারে পৌঁছাবার জন্য একই সাথে একাধিক পথ অনুসরণ করে, যাতে কিনা সবথেকে কম দূরত্বের পথটিকে বেছে নিতে পারে। এই পদ্ধতি সঠিক ভাবে বোঝা গেল সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া কয়েকশ গুন বেশি কর্মদক্ষ হবে। মুহূর্তের মধ্যে বজ্রপাত থেকে শক্তি আহরণেরও স্বপ্ন দেখতে পারে বিশ্ববাসী।           

কোয়ান্টাম কোহেরেন্সে বস্তু তরঙ্গধর্ম কাজে লাগিয়ে মাল্টিটাস্কিং করতে সক্ষম।

এতেই শেষ না, পাখিদের দিক নির্ণয় থেকে ক্যান্সার বা মিউটেশনের মত বিভিন্ন জটিল সমস্যায় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভূমিকা সামনের সারিতে চলে এসেছে। ইউনিভার্সিটি অফ সারে ২০১৭ তে বিশ্বের প্রথম কোয়ান্টাম বায়োলজি সেন্টার স্থাপন করে। অদূর ভবিষ্যতে জীবনের বহু রহস্যের সমাধান যে কোয়ান্টাম বায়োলজি করবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।  

(ক) একটি ইলেকট্রন নাসিকা রিসেপ্টারের ডোনার কম্পোনেন্টে বসল, (খ) ও (গ) সুগন্ধি অণুর ভাইব্রেশানাল শক্তির সাহায্যে ইলেকট্রনের কোয়ান্টাম টানেলিং এর মাধ্যমে অ্যাকসেপ্টার কম্পোনেন্টে প্রবেশ (ঘ) ইলেকট্রনের অ্যাকসেপ্টার কম্পোনেন্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়া।      

চিত্র ঋণ:

Danko Georgiev MD, CC BY-SA 3.0 via Wikimedia Commons

Medium.com

Physical Review Letters 98, 038101 (2007).

——————————-

~ কলমে এলেবেলের অতিথি অরিন্দম রায় ~

 

অরিন্দম  সুইস ফেডারেল ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি লসানে কর্মরত গবেষক। 

 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

লেখাটি পঠিত হয়েছে Web Hits বার

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।