মধুমেহ মধুর নহে

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
179 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

“অ্যাই, কি ভাবছিস এত? তাড়াতাড়ি খেয়ে নে, ওটি  আছে তো”, পাশ থেকে সোহিনী খোঁচা মারলো।

 সৃজা গুম হয়ে বসে আছে।

“কীরে, শরীর খারাপ নাকি? না মুড অফ?” সোহিনী একটু অবাক হল, সৃজা তো চুপ করে বসে থাকার মেয়ে না, নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে! পাঁচ বছর হলো একই হসপিটাল, একই হোস্টেলের, এক ঘরের সঙ্গী ওরা, একেবারে অন্তরঙ্গ আত্মা যাকে বলে।

“আজ কাকুর কথা খুব মনে পড়ছে রে।” সৃজা কেমন যেন অন্যমনষ্ক।

সোহিনী কি বলবে বুঝতে পারল না, আজ ডায়ালিসিস ওয়ার্ডে ডিউটি ছিল ওদের, খুব সম্ভবত তাই ই। কাকু গত হয়েছেন প্রায় সাড়ে চার বছর হল, ওদের জয়েন্ট ফ্যামিলি, আর কাকু ছিল ওর সবচেয়ে কাছের মানুষ। ছোট থেকে যত আব্দার মেটানোর মানুষটি ছিলেন তিনিই । ১৫ বছরের ডায়াবেটিস, দিব্যি ভালোমানুষ, হঠাৎ করেই শ্বাসকষ্ট হাত-পা ফুলতে শুরু করলো, কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ। দুটো কিডনিই খারাপ হয়ে গিয়েছিল, প্রথম ডায়ালিসিসই নিতে পারেননি। কাকু চলে যাওয়ার পর প্রায় পাগলের মত হয়ে গিয়েছিল সৃজা। ওর সবচেয়ে বড় আফসোস ছিল যে আর যদি ৫টা বছর হাতে পেত ও, তবে হয়তো আজও কাকু থাকতেন ওদের মধ্যে।

“একটা অন্যরকম কিছু করতে চাই, আর তোর সাহায্য ছাড়া সেটা একেবারেই সম্ভব না, পাশে থাকবি তো?” নীরবতা ভেঙে সৃজা বলে উঠলো।

“আমি সবসময় তোর পাশে আছি রে পাগলি…! বল কিভাবে সাহায্য করতে পারি?” সোহিনী বেশ আগ্রহের সাথে জানতে চাইলো।

“কাকুর কথা তো জানিস ই, যদি আমরা একটু সতর্ক হতাম তবে হয়তো কাকুকে হারাতাম না। যে কোন রোগের ক্ষেত্রে নিয়মিত চেকআপ ওষুধের পাশাপাশি, ডায়েট, এক্সারসাইজ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আজ বুঝি, মেডিকেল পড়তে এসে। একটু আগেই ডায়ালিসিস রুম এ একটি মেয়েকে দেখে এলাম, বয়স তোর আমার মতোই। ওর সামনে গোটা জীবনটা পরে আছে, কিন্তু… যাই হোক আমি যেটা বলছিলাম, আমি চাইছি, কোনোভাবে আমরা যদি মানুষকে বিভিন্ন রকম রোগের সম্পর্কে  সতর্ক ও সচেতন করে তুলতে পারি তবে হয়তো অনেক মানুষ কে মৃত্যুর হাত থেকে ফেরাতে পারবো, আর একজন ডাক্তার হিসেবে সেটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি হবে।” বলতে বলতে সৃজার চোখ চক চক করে উঠলো, এক অজানা স্বপ্নে।

“বাহ্! এতো দারুন প্রস্তাব, আমি দু পায়ে খাড়া। কিন্তু কিভাবে করব আমরা এসব? একটা প্লাটফর্ম তো দরকার!” সোহিনীকে একসাথে বেশ আনন্দিত আর চিন্তিত দেখালো।

“আজকাল মানুষের কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে সোজা রাস্তা হলো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট । ফেসবুক বা ইউটিউব এর মাধ্যমে আমরা যদি নিয়মিত কিছু ভিডিও এবং এই সংক্রান্ত লেখা শেয়ার করি, তবে হয়তো সহজেই আমরা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবো। ফেসবুকে এলেবেলে বলে একটা পেজ আছে, ওখানে বিজ্ঞানভিত্তিক নানারকম বিষয়ে নিয়মিত লেখা, অডিও স্টোরি, ভিডিও, এমনকি ছোটো ছোটো অনেক মজার তথ্য দেওয়া হয়। ওদের কাজ আমার ভীষণ ভালো লাগে। আমরা কিন্তু ওদের কে অনুরোধ করতে পারি, আমাদের ও লেখার সুযোগ দেওয়ার জন্য। যেহেতু ওদের ফলোয়ার অনেক বেশি তো, ওদের মাধ্যমে আমরা অনেক বেশী মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবো।” সৃজা বেশ আশাবাদী।

“সাব্বাস! এটা কিন্তু দারুণ আইডিয়া। বেশ, তবে আজ রাত্রে হোস্টেল এ ফিরে এই বিষয়ে আলোচনা করব আমরা, কী বিষয়ে প্রথম লিখব, সেটাও  ঠিক করা যাবে তখনি।” সোহিনী ও বেশ উৎসাহী।

– – – – – – – – – – – – – – – – – – – –

এলেবেলের পাতায় আজ ওদের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছে। সৃজা আর সোহিনী ভীষণ খুশি, যা করতে চেয়েছিলো তার কিছুটা হয়তো সফল ওরা। বহু মানুষ ওদের লেখা পড়ছেন, অনেকের অনেক প্রশ্ন, অনেকে সাধুবাদ ও জানিয়েছেন ওদের এই উদ্যোগ কে। সৃজা তো বার বার করে নিজেদের লেখা পড়ছে, কিছু তথ্য মিস করে ফেলেনি তো ওরা?

……………………

সারা পৃথিবীতে মোট ৪৬,৩০০০০০০ জন মানুষ ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত। 

> ২০১৯ সালে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে মোট ৪৬,৩০০০০০০ জন মানুষ ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত। সেই সংখ্যাটা ২০৪৫ সালে বেড়ে প্রায় ৭০,০০০০০০০ তে পৌঁছবে!

> ২০১৬ সালে মোট ১৬০০০০০ জন মানুষ শুধুমাত্র ডায়াবেটিস এর কারণে মারা যান!

> বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অন্ধত্ব, কিডনি খারাপ হয়ে যাওয়া, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, শরীরের নিম্নাঙ্গচ্ছেদ ইত্যাদির জন্য দায়ী ডায়াবেটিস ই!

উপরের তথ্যগুলি ভীতিকারক এবং আতঙ্কের হলেও, এটা সত্যি যে সঠিক আহার, নিয়মিত শরীরচর্চা, সঠিক সময়মতো চিকিৎসার দ্বারা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা এবং এর কারণে ঘটা রোগগুলি ও এড়ানো সম্ভব।

কিভাবে হয়?/ডায়াবেটিস আসলে কি?

আমরা সারাদিনে যা কাজকর্ম করি তার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন হয় তার প্রধান উৎস হলো রক্তের গ্লুকোজ যা কিনা খাবার থেকে আসে। একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের প্যানক্রিয়াসের মধ্যে অবস্থিত বিটা সেল থেকে ক্ষরিত হয় ইনসুলিন হরমোন, যা শরীরের মধ্যে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। রক্তের মধ্যে থাকা গ্লুকোজকে শরীরের কোষের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজের পরিমাণ হ্রাস করায় ইনসুলিন হরমোন। খাদ্য গ্রহণের পরে খাবারের মধ্যে থাকা গ্লুকোজ সরাসরি শোষিত হয়। যার ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এইবার এই বার্তা মস্তিষ্কে পৌঁছালে, প্যানক্রিয়াসের বিটা সেল থেকে ইনসুলিন ক্ষরিত হয় এবং মাংসপেশি ও যকৃতের ওজন বাড়িয়ে দেয়। যার ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক জায়গায় ফিরে আসে। কোষের মধ্যে গ্লুকোজ শক্তি উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়, এছাড়া কিছু গ্লুকোজ ফ্যাট অথবা গ্লাইকোজেন রূপে সঞ্চিত থাকে দেহের মধ্যে। গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক হলেই ইনসুলিন ক্ষরণ বন্ধ হয়ে যায়। যদি প্যানক্রিয়াস থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ইনসুলিন ক্ষরণ না হয় যা রক্তের মধ্যে থাকা গ্লুকোজকে কোষের মধ্যে সঞ্চারিত করতে না পারে অথবা দেহের কোষগুলি ইনসুলিন এর উপস্থিতিতে সাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেয় সেক্ষেত্রে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ অত্যধিক হারে বৃদ্ধি পায়। সাথে সাথে কোষের মধ্যেও গ্লুকোজের পরিমাণ পর্যাপ্ত না থাকায় ডায়াবেটিস রোগ বিকাশ পায়।

রোগের লক্ষণ:

বেশিরভাগ মানুষ বুঝতেই পারেননা যে তিনি ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন।

ডায়াবেটিস রোগের ক্ষেত্রে রোগের লক্ষণ নানারকম ভাবে দেখা দেয়, অধিকাংশ লক্ষণই  খুব সাধারণ হওয়ায়, বেশিরভাগ মানুষ বুঝতেই পারেননা যে তিনি ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তাই নিম্নলিখিত লক্ষণ গুলির কোনোটি আপনি অনুভব করলে, অবশ্যই রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করিয়ে নেবেন-

১) শরীরের যে কোনো কাটা জায়গা বা ঘা সহজে না শুকনো।

২) অহরহ জল পিপাসা।

৩) ঘনঘন মূত্রত্যাগ।

৪) প্রায়শই ক্ষুধাভাব।

৫)দৃষ্টিশক্তি ক্রমশ আবছা হয়ে আসা।

৬)খুব সামান্য কাজের পরই ক্লান্তি অনুভব করা আর ঘুম ঘুম ভাব ইত্যাদি।

এছাড়াও টাইপ ২ ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে প্রায়শই মেজাজের পরিবর্তন, রাগ, বিরক্তি ইত্যাদির প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় এবং যারা টাইপ ১ ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত, তাদের হাত পা কাঁপুনি, বিষন্নতা ইত্যাদি দেখতে পাওয়া যায়।

প্রকারভেদ:

টাইপ ১:

টাইপ ১ ডায়াবেটিস যে কোনও বয়সে বিকাশ লাভ করতে পারে। তবে শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। টাইপ ১ ডায়াবেটিস এর রোগীদের দেহে খুব কম বা একেবারেই ইনসুলিন তৈরি হয়না। ইনসুলিন হল একটি হরমোন যা আমাদের রক্তে শর্করার মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই ইনসুলিন পর্যাপ্ত পরিমাণে দেহের মধ্যে উৎপন্ন না হলে ইনসুলিন ইনজেকশন নেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। 

টাইপ ২:

এই ধরনের ডায়াবেটিস সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস এই ধরনের হয়। টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের দেহে পর্যাপ্ত পরিমাণে ইনসুলিন হরমোন তৈরি হলেও দেহের কোষেরা সেই হরমোনকে ব্যবহার করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রেই শরীরের মধ্যে ইনসুলিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সৃষ্টি হয়।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস:

গর্ভবতী অবস্থাতেও একজন মহিলা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারে। শতকরা ৩-৯ জন মহিলা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত হন। যে কোনো মহিলা এরূপ ডায়াবেটিস আক্রান্ত হতে পারেন, তবে যাদের ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে। এই ধরনের ডায়াবেটিস এর ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় মহিলাদের দেহে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে অনেকাংশে বৃদ্ধি পায় যা গর্ভে থাকা ভ্রূণ এবং মা দুজনের ক্ষেত্রে বিপদজনক হতে পারে। জন্ম নেওয়া শিশুর পরবর্তীকালে টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।

কারণ:

টাইপ ১ ডায়াবেটিস আংশিকভাবে জন্মগত এবং একাধিক জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এছাড়া কিছু পরিবেশগত উপাদানও এই ধরনের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। যথাযথ কারণ এখনও না জানা গেলেও মনে করা হয় আমাদের শরীরের অনাক্রম্যতা প্রদানকারী কোষেরা অনেক সময় ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলিকে ধ্বংস করে দেয় যার ফলে এই ধরনের ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। এছাড়া ভাইরাসের সংক্রমণ এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণেও হতে পারে এই রোগ। 

টাইপ ২ ডায়াবেটিস মূলত জীবনধারন জনিত কারণ এবং কিছু বংশগত উপাদানের কারণে হয়ে থাকে। অতিরিক্ত স্থূলতা, শারীরিক কার্যকলাপের অভাব, খারাপ খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত স্ট্রেস এই ডায়াবেটিস এর অন্যতম কারণ। খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে শর্করাযুক্ত খাবার ও নরম পানীয় এই রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

গর্ভকালীন অবস্থায় প্লাসেন্টা নামক একটি অঙ্গের দ্বারা মানবদেহ থেকে অক্সিজেন এবং পুষ্টিরস গর্ভের শিশুর দেহে স্থানান্তরিত হয়। এই প্লাসেন্টা বেশকিছু হরমোন তৈরি করে। এদের মধ্যে  ইট্রোজেন, কর্টিসল এবং হিউম্যান প্লাসেন্টাল ল্যাকটোজেন হরমোন ইনসুলিনকে অবরুদ্ধ করে দেয়। এর ফলে গ্লুকোজ রক্ত থেকে শরীরের কোষে মিশতে পারে না। স্বভাবতই রক্তে শর্করার মাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে, যা গর্ভে থাকা ভ্রূণ এবং মা দুজনের ক্ষেত্রে বিপদজনক হতে পারে।

ঝুঁকির কারণ:

টাইপ ১ ডায়াবেটিস

যদিও টাইপ ১ ডায়াবেটিসের সঠিক কারণটি অজানা, তবুও যে কারণগুলি বর্ধিত ঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে সেগুলির মধ্যে রয়েছে: 

পারিবারিক ইতিহাস:

আপনার পিতামাতা বা সহোদরের ক্ষেত্রে টাইপ ১ ডায়াবেটিস থাকলে আপনার ঝুঁকি বাড়বে।

পরিবেশগত কারণ:

বিশেষ কিছু ভাইরাসের সংক্রমণ এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

অনাক্রম্যতা:

আমাদের শরীরের কোনো অটো অ্যান্টিবডির উপস্থিতি এই রোগের অন্যতম কারণ। কখনও কখনও টাইপ ১ ডায়াবেটিসের রোগীদের পরিবারের সদস্যদের ডায়াবেটিস অটো অ্যান্টিবডির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

ভৌগোলিক অবস্থান:

ফিনল্যান্ড এবং সুইডেনের মতো নির্দিষ্ট কিছু দেশে টাইপ ১ ডায়াবেটিসের হার বেশি।

ওজন: 

দেহে চর্বির পরিমাণ যত বেশি হবে কোষগুলির ইনসুলিনের প্রতি প্রতিরোধী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তত বাড়বে।

নিষ্ক্রিয়তা:

শারীরিক কার্যকলাপ ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, শক্তি হিসাবে গ্লুকোজ ব্যবহার করে এবং দেহের কোষগুলিকে ইনসুলিনের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এই রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস

পারিবারিক ইতিহাস:

পারিবারিক ইতিহাসে এই রোগের রোগী থাকলে তা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য ঝুঁকির কারণ। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তবে টাইপ ২ ডায়াবেটিস শিশু, কিশোর এবং কম বয়স্কদের মধ্যেও বাড়ছে।

গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস:

গর্ভকালীন অবস্থায় যদি ডায়াবেটিস বিকাশ লাভ করে তাহলে পরবর্তীকালে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। অত্যধিক ওজনের শিশুর জন্ম দিলেও  টাইপ টু ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম:

মহিলাদের ক্ষেত্রে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম থাকা একটি সাধারণ অবস্থা যা অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত চুলের বৃদ্ধি এবং স্থূলত্ব দ্বারা চিহ্নিত ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

উচ্চ রক্তচাপ:

140/90 মিলিমিটার পারদ (mmHg) এর বেশি রক্তচাপ থাকা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সাথে যুক্ত।

অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা:

উচ্চ-ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন (এইচডিএল) বা “ভালো” কোলেস্টেরল কম থাকলে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি থাকে। উচ্চ মাত্রায় ট্রাইগ্লিসারাইডযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি থাকে।

জটিলতা:

ডায়াবেটিসকে আমরা বলি নীরব ঘাতক।

ডায়াবেটিসকে আমরা বলি নীরব ঘাতক, যা কিনা ধীরে ধীরে মানব শরীরের চোখ, হৃদপিণ্ড, কিডনি, শ্বাস যন্ত্র, পা ইত্যাদি অঙ্গের কোনো না কোনো ক্ষতি করে বসে। কিন্তু কিভাবে একটিমাত্র রোগের কারণে এতগুলো অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্থ হয়? এর উত্তর জানলে হয়তো আমরা অনেকেই অনেক বেশি সতর্ক হবো। আমাদের শরীরে উপস্থিত রক্তবাহী নালী যথা শিরা ধমনী এবং রক্তজালিকার মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেন যুক্ত রক্ত এবং পুষ্টিরস সরবরাহ হয়, আর ঐ সমস্থ অঙ্গে তৈরী হওয়া কার্বন-ডাই-অক্সাইড যুক্ত রক্ত ও দূষিত জৈব এবং অজৈব উপাদান অপসারিত হয়।

দীর্ঘদিন ধরে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকলে তা ধীরে ধীরে রক্তবাহী নালিগুলির ক্ষতি সাধন করে। রক্তের প্রোটিন এবং ফ্যাট গ্লুকোজের সাথে সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে অর্থাৎ গ্ল্যাইকেটেড হয়ে অ্যাডভান্সড গ্ল্যাইকেটেড এন্ড প্রোডাক্ট বা AGE উৎপন্ন করে। সেটি রক্তবাহী নালির মধ্যে জমতে জমতে, সেগুলিকে ক্রমশ সরু করে দেয়। আর যেহেতু রক্তবাহী নালিগুলি সমস্ত শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেন যুক্ত রক্ত সরবরাহ করে, ফলে রক্তবাহী নালিগুলি ক্ষতিগ্রস্থ হলে বিভিন্ন অঙ্গে বিশুদ্ধ  রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয়। ফলে অঙ্গগুলি ধীরে ধীরে কম অক্সিজেন এ কাজ করতে করতে কর্মক্ষমতা হারায়। ঠিক এই কারণেই ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তির স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক এর সম্ভাবনাও  বহুগুণ বেড়ে যায়, কারণ রক্তবাহী নালিগুলিতে ব্লকেজ বা অবরোধ তৈরী হয়।

ডায়াবেটিসের দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করে। অবশেষে, ডায়াবেটিসের জটিলতাগুলি জীবনঘাতীও হতে পারে। সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে রয়েছে:

কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ:

ডায়াবেটিস বুকে ব্যথা (এনজাইনা), হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং ধমনীর সংকীর্ণতা (এথেরোস্ক্লেরোসিস) সহ বিভিন্ন কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। ডায়াবেটিস হলে হৃদরোগ বা স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

স্নায়ুর ক্ষতি (নিউরোপ্যাথি):

রক্তে অতিরিক্ত শর্করা স্নায়ুদের পুষ্ট করা ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলির প্রাচীরকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে। এর ফলে অসাড়তা, জ্বলন বা ব্যথা হতে পারে যা সাধারণত পায়ের আঙ্গুলে শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে উপরের দিকে ছড়িয়ে যায়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করা হলে অঙ্গ প্রতঙ্গ গুলি অনুভূতি হারাতে পারে। হজমের সাথে জড়িত স্নায়ুর ক্ষতি বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি ইরেক্টাইল ডিসফাংশান সৃষ্টি করতে পারে।

কিডনির ক্ষতি (নেফ্রোপ্যাথি):

কিডনিতে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র রক্তনালী এক জায়গায় জড়ো হয়ে থাকে (গ্লোমেরুলি) যা রক্তের ​​বর্জ্য পদার্থ সংশোধন করে। ডায়াবেটিস এই সূক্ষ্ম ফিল্টারিং সিস্টেমকে ক্ষতি করতে পারে যা কিডনির ব্যর্থতা বা মারাত্মক কিডনি রোগের রূপ নিতে পারে, যার ফলে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।

চোখের ক্ষতি (রেটিনোপ্যাথি):

ডায়াবেটিস রেটিনার রক্তনালীদের ক্ষতি করতে পারে, যা ডেকে আনতে পারে অন্ধত্ব দিকে। ডায়াবেটিস গ্লুকমার মতো অন্যান্য গুরুতর রোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তোলে।

পায়ের ক্ষতি:

পায়ে নার্ভের ক্ষতি বা পায়ে রক্তের প্রবাহ দুর্বল হওয়ায় বিভিন্ন পায়ের জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। ঘা বা অন্য কোন ক্ষত চট করে সারে না অনেকসময়, যা থেকে অঙ্গের পচন শুরু হতে পারে। এই সংক্রমণের জন্য শেষ পর্যন্ত পায়ের আঙ্গুল বা পা বিচ্ছেদ প্রয়োজন হতে পারে।

ত্বকের অবস্থা:

ডায়াবেটিস ব্যাকটিরিয়া এবং ছত্রাকের সংক্রমণ সহ ত্বকের সমস্যার জন্য ত্বক কে আরও বেশি সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।

শ্রবণ বৈকল্য:

শ্রবণ সমস্যা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

আলঝ্যাইমার রোগ:

টাইপ ২ ডায়াবেটিস আলঝ্যাইমার রোগের মতো স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

বিষণ্ণতা:

টাইপ ১ এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে হতাশার লক্ষণ দেখা যায়।

গর্ভবস্থা কালীন সমস্যা: 

যে সমস্ত মহিলারা গর্ভবতী অবস্থায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয় তাদের গর্ভের শিশুর কিছু স্বাস্থ্যসম্পর্কিত জটিলতা দেখা দিতে পারে।

জরায়ুর মধ্যে শিশুর বৃদ্ধি ধীর গতিতে হয়। 

 

এক্ষেত্রে জরায়ুর মধ্যে শিশুর বৃদ্ধি ধীর গতিতে হয়। এছাড়া এই সমস্ত শিশুরা হৃৎপিণ্ড, রক্তনালী, মেরুদণ্ড এমনকি মস্তিষ্কের ত্রুটি নিয়েও জন্মগ্রহণ করতে পারে। কখনো কখনো বাচ্চাদের শ্বাসকষ্টের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। সাবধানতা বসত গর্ভকালীন অবস্থায় ডায়াবেটিক মায়েদের সঠিক পর্যবেক্ষণ এর মধ্যে থাকা উচিত এবং গর্ভের বাচ্চার নিয়মিত নিরক্ষণ প্রয়োজন।

প্রতিরোধ:

টাইপ ১ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায় না। তবে, কিছু স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার পদ্ধতি টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিস চিকিৎসা করতে সহায়তা করে তাদের প্রতিরোধ করতেও সহায়তা করতে পারে।

স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে। চর্বি ও ক্যালোরি কম এবং বেশি ফাইবার যুক্ত খাবারগুলি চয়ন করুন। ফল, শাকসবজি এবং শস্য জাতীয় খাবার বেশি করে খাওয়ার চেষ্টা করুন। শারীরিক ক্রিয়াকলাপে নিযুক্ত হন, স্থিতিশীল জীবনযাত্রা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ডেকে আনে।

আপনার ওজনকে স্বাস্থ্যকর পরিসরে রাখার জন্য, আপনার খাদ্যাভাস এবং অনুশীলনের অভ্যাসের উপর জোর দিন। এক্ষেত্রে আবারও উল্লেখ করা প্রয়োজন নিয়মিত শরীরচর্চা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভীষণভাবে কার্যকরী। প্রত্যহ ৩০ মিনিট বা সাপ্তাহিক ১৫০ মিনিটের শরীরচর্চা টাইপ ২ ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা অনেকটা  কমিয়ে দেয়।

নিয়মিত শরীর চর্চা,

১) রক্তে শর্করার পরিমাণ কমায়।

২) ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা বাড়ায় অর্থাৎ ইনসুলিন সঠিকভাবে কাজ করতে সক্ষম হয়।

৩) নিয়মিত শরীরচর্চা মানসিক দুশ্চিন্তা, হতাশা ইত্যাদি কমায়, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

৪) হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরল ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ড ভালো রাখে ও হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা কমায়, আর দেহে রক্ত সংবহন উন্নত করে।

ওষুধ:

সঠিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি কখনও কখনও ওষুধও ব্যবহার করা হয়। ওরাল ডায়াবেটিক ওষুধ যেমন মেটফরমিন (গ্লুমেটজা, ফোর্টামেট ইত্যাদি) টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে।

———————–

~ কলমে এলেবেলে অর্চিষ্মান ও এলেবেলে সোমাশ্রী ~

 

এলেবেলের দলবল 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

লেখাটি পঠিত হয়েছে Web Hits বার

 

 

 

 

One thought on “মধুমেহ মধুর নহে

  • December 17, 2020 at 4:51 pm
    Permalink

    ভীষণ তথ্যবহ। দারুণ।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।