একদিন জাদুঘরে টেসলা (পর্ব-দুই)

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
589 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~
ভিড়ের মধ্য থেকে এইভাবে এডিশনকে বেরিয়ে আসতে দেখে জাদুঘরের সভায় তখন একটা ভীষণ শোরগোল পরে গেল। কিন্তু ওসব তোয়াক্কা না করেই এডিশন সোজা চলে এলেন মঞ্চের সামনের দিকে। নিউটনবাবুর চেয়ারের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সটান জিজ্ঞাসা করলেন, “এ বিষয়ে আমারও কিছু বক্তব্য আছে। বলতে পারি কি?”  নিউটনবাবুর একবার মনে হল সোজা “না”  বলে দেন। আবার কি মনে হতে বললেন, “ বলুন… তবে মঞ্চে গিয়ে। আর হ্যাঁ, আরও একটা বিষয় মাথায় রাখবেন আজকের সভা কিন্তু আপনার অভিযোগ শোনার জন্য ডাকা হয়নি। ”
 
মঞ্চে উঠে এলেন এডিশন। চোখাচোখি হলো নিকোলা টেসলার সাথে। এই একটি লোক জীবদ্দশায় কি নাকানি চোবানিটাই না খাইয়েছে। পরপারে এসেও এই হয়রানি! বলে কিনা জাদুঘর বিজলীবাতিতে সাজাবে! নাহ্, আর কিছুতেই মেনে নেবেন না তিনি। এবারে শুরু করলেন,
“ আমি থমাস এডিশন। জাদুঘরের পূর্ণরূপ সদস্য। বলে রাখি, আমি আপনাদের বিশেষ সময় নষ্ট করবো না। শুধু একটি বিষয়ে আলোকপাত করবো… আমাদের সতীর্থ শ্রীযুক্ত টেসলা মহাশয় জাদুঘরের সদস্য পদের জন্য আবেদন করেছেন। ভালো কথা। তাঁকে সভ্য  হিসেবে গণ্য করা হোক। আরও ভালো কথা। কিন্তু আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিনা এই জাদুঘরে বিজলীবাতি লাগানোর প্রসঙ্গ এখানে কেনো এবং কিভাবে আসছে!!”
 
এপর্যন্ত বলেই একবার তাকালেন টেসলার দিকে। যিনি তখন কিনা আবার নিজের চেয়ারে ফিরে এসছেন। বাঁ পায়ের ওপর ডান পা তুলে, ডানহাতের তর্জনী দিয়ে আলতো করে থুতনিতে বোলাচ্ছেন। মুখ একেবারেই ভাবলেশহীন। কি ভাবছেন জোর দিয়ে কিছুই বলা যায় না। তাঁর এই উদাসীন মনোভাব দেখে এডিশনের রাগ হল। একটু উত্তেজিত হয়ে আবার শুরু করলেন, 
 
 “আমি এই মহান সঙ্ঘের সদস্য হওয়ার ঠিক কিছুদিন পরেই  প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে এখানকার প্রতিটি ঘরে ঘরে বিজলীবাতির আলো পৌঁছে দেব। আর সেই প্রস্তাব সভাসদগণদের সমর্থনও পেয়েছিলো। তাহলে আজকে এই কথা উঠছে কোথা থেকে! আমি চাই আমার ওপর এবিষয়ে পূর্ণ ভরসা রাখা হোক… মনে রাখবেন আজও আমাকে ‘মেনলো পার্কের যাদুকর’ (The wizard of Menlo Park) বলেই লোকে চেনে। ”
 
“তা এডিশনবাবু, ঠিক কোন কথা থেকে আপনার এ ধারনা জন্মাল যে আপনার সেই পরিকল্পনা আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি?” হঠাৎ নিউটনবাবুর মুখে এই কথা শুনে এডিশন একটু  থতমত খেয়ে গেলেন। তাঁর মুখের ভাব বুঝতে পেরে  সভাপতি মশাই বললেন, “ যাই হোক, সভার প্রথমভাগ এখানেই সমাপ্ত। দ্বিতীয়ভাগ শুরু হবে ঠিক বিকেল ৩টের সময়। ” বলেই ঢং করে ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন। সাথে সাথেই সভায় একটা ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। সভ্যগণেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগলেন। এক এক করে সকলে বেরিয়ে যেতে লাগলেন সভাঘর থেকে। শুধু এডিশন এবং টেসলা একে অপরের দিকে শীতল দৃষ্টি নিয়ে কিছুক্ষণ তাকালেন।
 
জাদুঘরের এই এক নিয়ম। সভার প্রথমভাগ শেষ হয় ঠিক দুপুর একটার সময়। অপরাহ্ণভোজের শেষে আবার সকলে জড়ো হন সভাকক্ষে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অন্য সকলের সাথে বেরিয়ে এলেন নিউটনবাবুও। নিজের ঘরে এলেন। এবেলা খাবার ঘরে আনিয়েই খাবেন ঠিক করেছেন। পরচুলা খুলে মুখ হাত ধুয়ে খেতে বসবেন এমন সময়  মুখঢাকা গুপ্তচর-ক এসে হাজির,
– হুম… বল হে কোনো নতুন খবর?
– আজ্ঞে বাবু, আপনি জানেন সভা ঘরে ওই টেসলাকে দেখে এডিশন ওমনি চটল কেন? আমি তারই হাঁড়ির খবর নিয়ে এসছি।
– বাঃ! বাঃ! মাথাটা তাহলে তোমার মাঝে মধ্যে বেশ ভালোই কাজ করে। কি বলো!
একথা শুনে গুপ্তচর-ক একটু ফিকফিক করে হাসল। মুখ যদিও দেখা গেল না , তবুও আন্দাজ করা গেলো। 
– আহ্! আবার হেসে সময় নষ্ট করে দেখো! বলো বাবা তারাতারি। মধ্যহ্নভোজের বিরতি শেষ না হয়ে যায়!
– আর বাবু সে এক বিশাল কাণ্ড!
 
এই বলে গুপ্তচর শুরু করল। আর নিউটনবাবু এসব শুনতে শুনতে খেতে লাগলেন।
“ মার্কিনমুলুকে আজকের সভার এই দুজন এডিশন আর টেসলা বিদ্যুৎ নিয়ে খুব একটা শোরগোল পাকিয়ে এসছে।  একরকমের যুদ্ধই বলা চলে। ‘War of Current’ অর্থাৎ কিনা তড়িৎ নিয়ে লড়াই! এডিশন  একজন আবিষ্কারক হওয়ার সাথে সাথে একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। টেসলা আজকে যে আর্কবাতির কথা বলল, তাতে খুব উচ্চ তড়িৎবিভব চাই। তা প্রায় ৩০০০ ভোল্টের মত। এর পরিবর্ত হিসেবে এডিশন ততদিনে নিজের কোম্পানিতে অন্যধরনের বৈদ্যুতিক বাতি তৈরি করে ফেলেছেন।  যাকে বাল্ব বলা হয়ে থাকে। মোটামুটি ১১০ ভোল্ট তড়িৎবিভবই এই বাতি জ্বালানোর জন্য যথেষ্ট।” বলেই থামলো গুপ্তচর, বাবুর কাছ থেকে কোনো ‘হা’, ‘হু’ না শুনে।
– আহা থেমোনা থেমোনা। আমি শুনছি। বলো বলো।
“হ্যাঁ তো এই আবিষ্কারের পর। এডিশন ও তাঁর কোম্পানি চাইছে তখন মার্কিনমুলুকের সমস্ত বড় বড় শহরগুলো আলোর মালায় সাজিয়ে দেবেন। কিন্তু এই বিজলীবাতির বিজলীর জোগান দিতে গিয়েই বাধল বিপদ। আসলে এই বাল্ব এর জন্য চাই একমুখী তড়িৎ। তার জন্য হয় ঘরে ঘরে  তড়িৎকোষ রাখতে হয়। যাকিনা খুব সহজেই ফুরিয়ে যাবে অতি অল্প সময়ে। নতুবা চাই একটি বিদ্যুৎ তৈরির কারখানা। মানে ওই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আরকি। যেখানে তৈরি বিদ্যুৎ আশেপাশের বাড়িঘর অফিস আদালতে বিদ্যুতের জোগান দেবে। কিন্তু বিপদ তাতেও। এডিশনের মাথায় যেসব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের পরিকল্পনা ঘুরছে তা সবই একমুখী তড়িৎ তৈরি করবে তাও ১১০ ভোল্টের চেয়ে বেশি নয়। যাতে অসুবিধা হল ওই কারখানা থেকে খুব দূর দূর জায়গায় বিদ্যুৎ চালান করা যাবেনা। এগুলো তো কম পাওয়ারের বিদ্যুৎ তৈরির কারখানা। তাই খুব বেশি হলে কারখানা থেকে আধ মাইল দূরত্বের জায়গাগুলোতেই তড়িৎ সরবরাহ হওয়া সম্ভব। মানে সোজা কথায় বলতে গেলে প্রতি পাড়ায় পাড়ায় অন্তত একটি করে তড়িৎ উৎপাদনকেন্দ্র থাকতে হবে।”
– কেন কেন? তার চেয়ে বেশি দুরে কেন তড়িৎ পাঠান যাবে না কেন?
– কম পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্র তো?
– তো?
– তো পথেই তার তার গরম হয়ে বেশিরভাগ শক্তিই নষ্ট হয়ে যাবে । বাড়ি পর্যন্ত আর পৌঁছাবে না।
– ওহ! তো  বেশি শক্তি উৎপন্নকারী কারখানা বানালেও তো হয়। 
গুপ্তচর-ক একটু মাথা চুলকে বলল,
– ওই শুনলাম সেখানেও তার প্রচণ্ড গরম হয়ে গিয়ে নাকি অনেক তড়িৎশক্তি তাপশক্তিতে পরিবর্তিত হয়ে যায়। আর তড়িৎশক্তির অপচয় হয়।
এই শুনে নিউটনবাবু মনে মনে একটু ভাবতে লাগলেন, “ আচ্ছা তবে তড়িৎবিভব আর তড়িৎপ্রবাহের অনুপাত হল রোধ। অর্থাৎ কিনা যে বস্তু তারের মধ্যয় দিয়ে তড়িৎ প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করে। আবার উৎপন্ন হওয়া তড়িৎশক্তি হল তড়িৎবিভব ও তড়িৎপ্রবাহের গুণফল। এখন, কারখানা থেকে উৎপন্ন তড়িৎশক্তি সবসময় একই থাকবে। সুতরাং,  কম ভোল্ট চাইলে, তড়িৎপ্রবাহ বেশি হয়ে যাবে।  আর ১১০ ভোল্ট, যাকিনা এডিশনের দরকার ছিল, সে তো সত্যিই খুবই কম। অর্থাৎ  কিনা এক্ষেত্রে তড়িৎশক্তি একই রেখে এরকম কম তড়িৎবিভব তৈরি করতে গেলে তড়িৎপ্রবাহের মান প্রচণ্ড রকমের বেশি হতে হয়।  আবার তড়িৎপ্রবাহের মান বেশি মানেই তারের গরম হয়ে যাওয়া… ওহ তাহলে এজন্যই এই কম ভোল্টের তড়িৎকে বেশিদূর টানতে পারছেনা ।”… উম। তাহলে তাহলে… আচ্ছা উচ্চতড়িৎবিভব হলেই সমস্যার সমাধান হত। কিন্তু ওদের যন্ত্রগুলোতে তো অত দরকারই নেই! … হ্যাঁ ওই টেসলা কি একটা ট্রান্সফরমার নামের যন্ত্রের কথা বলছিল না , যাতে তড়িৎবিভব ইচ্ছেমত বাড়ানো বা কমানো যায়! ওটা ব্যবহার করলেই তো হয়… ওহো ওটা তো আবার বিবর্তিত তড়িৎপ্রবাহের জন্য! আচ্ছা মুস্কিল… আচ্ছা এরকম হলে হত যে একটি বিবর্তিত তড়িৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে উচ্চতড়িৎশক্তি তৈরি করে, একটা ট্রান্সফরমার লাগিয়ে উচ্চবিভবের বিবর্তিত তড়িৎ অনেক দূর থেকে লোকের বাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া যেত। এতে তড়িৎপ্রবাহের মানও খুব কম রাখা যেত। ফলে তারের গরম হওয়ার সমস্যাও কমিয়ে দেওয়া যেত। তারপরে বাড়িতে বাড়িতে আর একটি ট্রান্সফরমার লাগিয়ে দিয়ে ইচ্ছেমত ভোল্টেজ কমিয়ে নেওয়া হত। শেষমেষ সেই কম ভোল্টের বিবর্তিত তড়িৎ থেকে কম ভোল্টের একমুখী তড়িৎ তৈরি করে বাড়ির আলো জ্বালান যেত!… ঠিক ঠিক! এটা করলেই কেল্লা ফতে!” 
 
এসব নিউটনবাবু নিজেই বোঝার জন্য বিড়বিড় করে বলছিলেন। পাশ থেকে গুপ্তচর শুনে এতই অবিভূত হয়ে পড়ল যে ভক্তিভরে একটু পায়ের ধুলো মাথায় নিল।
– আরে আরে করছোটা কি!!
– বাবু একদম ঠিক ধরেছেন। বিবর্তিত তড়িৎপ্রবাহের এই গুণগুলো বিচার করেই ইউরোপ জুড়ে এই তড়িৎ সম্পর্কে উৎসাহ বাড়ছিল। আর ঠিক এসময়েই গল্পে আসলেন নিকোলা টেসলা। বেশকিছুদিন এডিশনের কোম্পানিতে কাজও করেছিলেন। কিন্তু সেখানে বিবর্তিত তড়িৎপ্রবাহ সংক্রান্ত তাঁর গবেষণাগুলো কোন আমলই পেল না! ব্যাস, চাকরি ছেড়ে দিলেন। সেসময়ে এমনকি উনি নাকি মাটি কাটার কাজও করেছিলেন! ঠিক ওই সময় আর একজন মার্কিন প্রযুক্তিবিদ এবং উদ্যোক্তা জর্জ ওয়েস্টিংহাউস বুঝতে পেরেছিলেন বিবর্তিত তড়িতের গুরুত্ব। এসবের মধ্যেই নিকোলা টেসলাও তখন বিবর্তিত তড়িৎচালিত একটি মোটর তৈরি করেছেন। ১৮৮৮ সালে সেখানকার আমেরিকান ইন্সটিটিউট অব ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ এই আবিষ্কার সংক্রান্ত একটি বিবৃতি দিতে গিয়ে তিনি চোখে পরে যান ওয়েস্টিংহাউসের। ব্যস, দুজনে মিলে লেগে পরলেন এই বিশেষ তড়িৎ দিয়ে মার্কিন মুলুকের শহরগুলোকে আলোয় আলো করার স্বপ্নে… কিন্তু এতে অসুবিধা হল অন্য একজনের। তারা যদি সত্যি এক্ষেত্রে সাফল্য পান এডিশনের এত পরিশ্রম সব পণ্ড হবে। তাই তাঁর কোম্পানি, জনৈক হেরল্ড ব্রাউন নামের একজন প্রযুক্তিবিদকে মুখ করে নেমে পড়লেন বিবর্তিত  তড়িৎপ্রবাহের বিরুদ্ধ প্রচারে!
– অ্যাঁ, বল কি হে!!!
– বাবু একটুও বানিয়ে বলছিনা। বিশ্বাস করুন। হেরল্ড ব্রাউন সেসময়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের টাকা দিয়ে রাস্তার কুকুর ধরে আনাতো। আর করত কি, উচ্চবিভবযুক্ত একমুখী ও বিবর্তিত তড়িৎ পাঠিয়ে ওগুলোকে মারত। জনসমক্ষে এটা প্রমাণ করার জন্যে যে  বিবর্তিত তড়িৎ আসলে অনেক অনেক ভয়ঙ্কর এবং লোকে যেন নিজের বাড়িতে এই মারাত্মক তড়িতের ব্যবহার না করে!
 
এরইমধ্যে কে একজন দরজার বাইরে সজোরে আঘাত করতে লাগল। ভেতরে ঢুকতে অনুমতি দিতেই একজন কর্মচারী ঘরের মধ্যে ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে যা বললো তা শুনে নিউটনবাবু কর্মচারী, গুপ্তচরসহ প্রায় দৌড়েই ভোজনকক্ষে এলেন। এদিকে সে এক দক্ষযজ্ঞ বেধে গেছে সেখানে! ঘরের একদিকের খাওয়ার টেবিলে টেসলা দাঁড়িয়ে ও অন্যদিকের একটি টেবিলে এডিশন। দুজন দুদিক থেকে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের দলও দুটো ভাগ হয়ে। থেকে থেকে তারাও চেঁচিয়ে উঠছেন। 
 
শুধু প্রবীণদের একটি দল শুধু এক কোনে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে। সেখানে খোঁজ নিয়ে যেটুকু জানা গেল তা এইরকম-
তখন সভার প্রথমার্ধ শেষ হতেই যে যার মত সভাকক্ষ ছেড়ে ভোজনকক্ষে উপস্থিত হয়েছিলেন। টেসলা এবং এডিশন কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে কটমট করে চেয়েছিলেন বটে, তবে সেটা সে পর্যন্তই। সমস্যা বেধেছে হাত ধোয়ার সময়। হাত ধোয়ার জায়গাটি একটু অন্ধকারই বটে। এমনকি দিনের বেলাতেও। টেসলা অন্য একজন সতীর্থের কাছে একটা দেশলাই চাইছিলেন নিভে যাওয়া মোমটা জ্বালাবেন বলে। এমন সময় পেছন থেকে এডিশন বলে ওঠেন, “তোমার বিবর্তিত তড়িৎচালিত একটা আলো লাগিয়ে দিলেই তো পার!” ব্যাস, ওর পরেই এক কথায় দুকথায় এখন এই পরিস্থিতি। 
 
টেসলা- “ তুমি ভেবেছটা কি! যা খুশি বললেই হল নাকি। মেনলো পার্কের যাদুকর না ছাই!”
এডিশন- “আমাদের মার্কিন রসিকতা বোঝার ক্ষমতা তোমার  অন্তত নেই!” আর সাথে সাথেই একদল বিজ্ঞানী হৈহৈ করে উঠল। এডিশনও তাঁদের দিকে তাকিয়েএকটু চোখ টিপলেন।
– “রসিকতা বোঝার ক্ষমতা নেই কিন্তু তোমার নাকের ডগা থেকে নায়াগ্রা-চুক্তি পাওয়ার ক্ষমতা আছে ” এবারে টেসলার দলের লকজন চেঁচামেচি করতে লাগল।
 
প্রবীণদের সাথে এক কোনে বসে নিউটনবাবুও তখন এসব কাণ্ড দেখছেন। পাশেই গুপ্তচর দাঁড়িয়ে। কানে কানে বলল, “নায়াগ্রা জলপ্রপাতের বিশাল জলস্রোত থেকে ‘নায়াগ্রা ফলস ক্যাটারাক্ট কন্সট্রাকসন কোম্পানি’ তখন প্রচুর বিবর্তিত তড়িৎ উৎপন্ন করছিল। এই তড়িৎ সেখান থেকে পার্শ্ববর্তী শহরগুলোতে পাঠানোর জন্য ওরা অন্য কোম্পানিকে চুক্তি দিতে চেয়েছিল। যার দায়িত্ব শেষমেশ টেসলাসহ ওয়েস্টিংহাউসের কোম্পানি পায়।” ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন নিউটন বাবু।
 
এডিশন- “ আর বিবর্তিত তড়িৎ, বিবর্তিত তড়িৎ করে যে মাথাটা খারাপ করে দিচ্ছ, তোমাদের এই চালাকির জন্য মানুষের জীবনের কথা একবারও ভেবে দেখেছ কি? ” টিম এডিশন চেঁচিয়ে উঠল, “ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ!”
 
টেসলা- “মরে গেলে তবু মিথ্যা প্রচার থামালে না। বাহ! আচ্ছা বলতো হেরল্ড ব্রাউন সেসময়ে রাস্তার কুকুরগুলোকে বিদ্যুৎপৃষ্ট করে মারল। শুধুমাত্র এটা প্রমাণ করতে যে বিবর্তিত তড়িৎ ভয়ঙ্কর। তাতে তোমার কম্পানি থেকে কোন সাহায্য যায়নি? তাতেও যখন যুক্তিতে টিকলো না, একটা আস্ত ঘোড়াকেই জনসমক্ষে মেরে ফেললে তোমারই ওয়েস্ট ওরেঞ্জ পরীক্ষাগারে! এখানেই শেষ নয়। ১৯০৩ সালে টোপ্সি নামের হাতিটাকে যখন মারা হল একই উপায়ে তোমার কোম্পানি দলবল নিয়ে ছুটল তার চলচ্চিত্র তৈরি করতে। সেখানেও তোমার প্রচ্ছন্ন সম্মতি ছিলনা বলছো?” টিম টেসলা গলা ফাটিয়ে বলে উঠল “লজ্জা, লজ্জা, লজ্জা!” 
 
এডিশন- “সেই তর্কে যদি নাও যাই। অন্তত তুমি এটা তাহলে মানছ জানোয়ারগুলো মরেছিল। অর্থাৎ্‌, তোমার বিবর্তিত তড়িৎ আসলেই একটি মারণাস্ত্র।”
 
এইবারে টেসলা হেসে ফেললেন, “এইটুকু ভেবেই সুখ পেতে চাইলে, তাই নাহয় ভাবো। তবে আজকে নিউ ইয়র্কে, শিকাগোতে ঘরে ঘরে  আলো জ্বলছে, কোথাও বা মাথার ওপরে পাখা ঘুরছে। তাতে তোমার কি মনে হয়, লাখ লাখ লোক মারা গেছে? নাকি এই কৃতিত্ব শুধুই একমুখী তড়িতের?” এই বলে এক লাফে টেবিল থেকে নেমে এলেন টেসলা, “আয়ত্বে রাখতে জানলে যাকে তুমি মারাত্মক বলে চালাতে চাইলে তারও শুধু ভালোটাই শুষে নিতে পারতে। তবে, হ্যাঁ আয়ত্বে রাখার মুন্সিয়ানা থাকা চাই। শুধু মেনলো পার্কের যাদুকর হলেই চলবে না!”  
 
  
কথাটা শুনে নিউটনবাবুও না হেসে পারলেন না!
  
 
 এরপরেই কোত্থেকে যেন ঢং ঢং ঢং আওয়াজ আসতে লাগল। চারিদিকে কেমন যেন একটা কোলাহল শুরু হল। সবকিছুই অস্পষ্ট হইয়ে যেতে লাগল। কে যে কোথায় যাচ্ছে, কে যে কি বলছে কিচ্ছুই আর বোঝা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে ঘরময় সোঁ সোঁ করে হাওয়া বইতে লাগল। এরই ফাঁকে এক এক করে নিউটন, এডিশন, টেসলা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। ঘরে পরে রইল শুধু একজন। সে হল সেই মুখ ঢাকা গুপ্তচর-ক। হঠাৎ সে মুখের কাপড় সরিয়ে চিৎকার করে উঠল, “ কিরে টুব্লু ac currecnt আর dc current এর পার্থক্য কি বল দেখি?” … আরে এ তো লালটুদা! আমাদের লালটু মাষ্টার!!
 
“টুব্লু, টুব্লু! আরে এই টুব্লু!… ওঠ! আরে ওঠ না। ৬ টা বাজে!… কিরে! লালটুর আসার সময় হইয়ে গেল!” মায়ের চিৎকারে ঘুমখানা শেষমেশ ভেঙেই গেল। 
 
আহ্! কি একটা স্বপ্ন! দুই হাত আয়েশ করে মাথার নিচে রেখে অতঃপর চোখ খুলল টুব্লু। মাথার ওপর ফ্যানটা তখনও ঘুরছে!  
 
(সমাপ্ত)
 

 

————————————–

 

~ কলমে এলেবেলে মেঘদীপা ~

এলেবেলে দলবল 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

লেখাটি পঠিত হয়েছে Web Hits বার  

 

 

 

 

 

2 thoughts on “একদিন জাদুঘরে টেসলা (পর্ব-দুই)

  • December 18, 2020 at 6:30 pm
    Permalink

    according to you if potential is decreased then current will increase to make resistance constant
    But as per my knowledge R=V/I
    then if potential is decreased then to make resistance constant the value of current must be decreased
    if potential is decreased and current is increased then value of resistance will also be changed

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।