সংখ্যার ইতিবৃত্ত – ২

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
622 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

পর্ব ১ পড়ুন

নীল নদে একটা ছোট নৌকা ভেসে আসছে। নৌকাতে বসে আছে এক কিশোর। নাম ধরে নিলাম খাবাশ। খাবাশ আপন মনে নাও বেয়ে চলেছে। চোখের সামনে তার প্রায় ৬০০০ – ৭০০০ বছর ধরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটা সভ্যতা। মিশরে তখনও পিরামিড তৈরি শুরু হয়নি। তবে স্থাপত্যবিদ্যায় তারা অনবদ্য হয়ে উঠেছে। খাবাশের বাবা এরকমই একজন স্থপতি। খাবাশেরও ইচ্ছা সেও স্থপতি হবে। কিন্তু তার জন্যে দরকার অঙ্ক। আর সেখানেই সে থমকে গেছে। কোন ভাবেই যেন বাগে আসছে না। সে নামতার মতো একটা জিনিস বারে বারে বলার চেষ্টা করছে, খানিক বলছে, আটকে যাচ্ছে, ভুলে যাচ্ছে, নয় ভুল বলছে। তবে কি সে কোনদিনও পারবে না অঙ্ক করতে? সেই চিন্তাই এখন তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

মানুষ এতদিনে মোটামুটি গুণতে শিখে গেছে। গোনাটা অনেকটা আকুদদের পদ্ধতি মেনেই। দাগ কেটে কেটে গোনা। মানুষ আজও এরকম ভাবে অনেক কিছু গোনে, ট্যালি মার্ক বলে।  খাবাশরাও সেই ভাবেই গোনে, কিন্তু তাদের গোনা ঐ ২০ অব্দি। সেটার কারণ খুব সম্ভবত হাত আর পায়ের আঙ্গুলের সংখ্যার থেকে এসেছে। হাড় বা নুড়ির অভাবে মানুষ সবথেকে সোজা ভাবে আঙ্গুল দিয়ে গুণতে আরম্ভ করেছে। তাই গোনা শুধু ২০ অব্দি। আর ২০-র বেশী হলে? এটা হয়তো আপনিও লক্ষ্য করে থাকবেন, আমাদের দেশে এখনো কিছু বয়স্ক মানুষ বয়স বলে “তিন কুড়ি চোদ্দ,” মানে ৭৪।  খাবাশদেরও সেই পদ্ধতি। সমস্যা হচ্ছে যোগ বিয়োগে। তাই এই নামতার ব্যবস্থা, বারো যোগ পাঁচ, সতেরো; বারো যোগ ছয়, আঠেরো, ইত্যাদি ইত্যাদি। বিয়োগেও তাই, সাত বিয়োগ পাঁচ দুই; সাত বিয়োগ ছয়, এক; সাত বিয়োগ সাত? না, অতোটা এগোবেন না। মিশরীয়রা তখনও ‘শূন্য’ জানে না। মানে, একদম যে জানে না, তা নয়। কিছু না থাকার ধারনাটা আছে, কিন্তু সেটাকে অঙ্কে ব্যবহারটা হয় নি তখনও। সেটা আসতে আরও প্রায় ৪০০০ বছর। আর, সাত বিয়োগ আট? ওটা ঋণাত্বক সংখ্যা, ওর আসতে আরও ৩৫০০ বছর। আশ্চর্য লাগলেও ঋণাত্বক সংখ্যা শূন্যের ব্যবহারের আগেই আসছে। দেরী আছে, সব আস্তে আস্তে খুলে বলবো।

তো খাবাশ এই নামতাটাই মুখস্ত করার চেষ্টা করে চলেছে, পুরোদমে। ২০ অব্দি হয়ে গেলে, এক কুড়ি, ২ কুড়ি এগুলোও আছে। আমার মতো লোক, যে জীবনে ১০ এর ওপর নামতা মুখস্ত করতে পারেনি, গুণ করে মেরে দিত, সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে খাবাশ কি গেরোয় পড়েছে, পাঠকও নিশ্চয়ই খানিকটা উপলব্ধি করতে পারবেন। খাবাশের নজর গেলো নদীর পাড়ের দিকে। ওখানে একটা জায়গায় জলের স্রোত বেশ কম, কয়েকটা শালুক ফুল ফুটে আছে, খানিক দুরে একজন দড়ি দিয়ে নিজের নৌকা বাঁধছে, একটা ব্যাঙ মনে হয় লাফিয়ে পড়ল জলে, নদীর পাড়ের কাছেই কারুর একটা বাড়ির খিলানের সামনে কি একটা যেন দেখছে একজন। হঠাৎ, করে যেন সব নামতা ব্যাপারটা অপ্রয়োজনীয় লাগলো তার কাছে। কি দরকার? সব সংখ্যাগুলোকে এক একটা চিহ্ন দিয়ে দেখালেই তো হয়। মুখস্তই করবো না, আগেকারদিনের মতো দাগ কেটে কেটে যোগ বিয়োগ করবো। সাত যোগ পাঁচ মানে, সাতটা দাগ তারপর পাঁচটা দাগ, দিয়ে গুণে নেবো। কিন্তু, নামতাটার একটা কারণ তো আছে, একটা বড় অঙ্ক হলে তো দাগ টানতে টানতেই বেলা গড়িয়ে যাবে, গুনব তো পরে। তারপর দাগ টানায় আর গোনায় ভুল হলে? বাড়ি তো বাঁকা টেরা হয়ে যাবে, সে তো স্থপতি হবে। তাহলে? সরলীকরণ দরকার। কি দিয়ে? ঐ যা দেখতে পাচ্ছি তাই দিয়ে। এক থেকে নয়, দাগ টেনে টেনে করলাম, দশ হয়ে যাক বাড়ির খিলান, এগারো হচ্ছে খিলান আর একটা দাগ, বারো খিলান আর দুটো দাগ, একুশ দুটো খিলান আর একটা দাগ। এবার যোগ সোজা, খিলানে খিলানে যোগ, দাগে দাগে যোগ। বিয়োগেও তাই। সাতাশ যোগ চৌত্রিশ? (এই সংখ্যাগুলো যদিও খাবাশ এক কুড়ি সাত আর এক কুড়ি চোদ্দই বলেছিল, তবু আমার সুবিধার্থে আমি আজকের হিসেবেই বললাম এবং আগেও বলবো)  মানে, দুটো খিলান আর সাতটা দাগ যোগ তিনটে খিলান আর চারটে দাগ, মানে মোট পাঁচটা খিলান আর এগারোটা দাগ। ও আচ্ছা! এগারোটা দাগতো আবার হবে না, ওটা একটা খিলান আর একটা দাগ। মানে দাঁড়াল। ছটা খিলান আর একটা দাগ।  

এক মুহূর্তও আর দাঁড়ালো না সে। সোজা পাড়ে নৌকা বেঁধে দে দৌড়। কাজে যাওয়ার আগে বাবা যে অঙ্ক দিয়ে গেছে তার সব কটা সে এখনই করে ফেলবে, এক নিমেষে। আমরা কিন্তু বুঝে গেলাম যে নিজের অজানতেই খাবাশ একক আর দশক সৃষ্টি করে ফেলল। আর, খিলানকে দাগের আগে বসিয়ে সে যা তৈরি করল তা যুগ যুগ ধরে মানুষ ব্যবহার করে যাবে, অর্থাৎ, দশকের অঙ্ক এককের অঙ্কের বাম দিকে বসবে।  

এদিকে খাবা পড়েছেন একটু ধন্ধে। খুশিও হচ্ছেন, আবার চিন্তাতেও পড়ছেন। তাঁর ছেলে, খাবাশ, হঠাৎ অঙ্কে এতো উন্নতি করল কি করে? কদিন আগেও যাতা রকমের ভুল করতো, অথচ এখন সব একদম ঠিক ঠাক। এক কুড়ির থেকে ওপরের সংখ্যার অঙ্কও নির্ভুল করে দিচ্ছে। অন্য কারুর সাহায্য নিচ্ছে না তো? একটু সরে জমিনে তদন্ত করা দরকার। ডেকে পাঠালেন উনি খাবাশকে। সোজা প্রশ্ন, “নামতা বল।” বেচারা বলতে পারে না, যেই কে সেই। সামনে বসিয়ে অঙ্ক দিলেন, একেবারে নির্ভুল। ব্যাপারটা কি? একটু চাপ দিতেই সত্য বেরিয়ে পড়ল। খাবা দেখলেন এতো দারুণ ব্যবস্থা। উনি বুদ্ধিমান লোক, বুঝে গেলেন যে বাচ্চা একবার এই সোজা রাস্তা পেয়ে গেছে, সে জীবনেও আর ঐ নামতা মুখস্ত করবে না। আর তার দরকারও তো নেই। না হয়, তার অঙ্ক করতে একটু সময় লাগবে, কিন্তু অঙ্ক তো হবে নির্ভুল। খাবা তাই ব্যাপারটাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেন। সোজাসুজি খাবাশকেই জানতে চাইলেন, “এরকম করে তো নয় নিরানব্বই অব্দি হল, নটা খিলান আর নটা দাগ। তারপর কি করবি?”

খাবাশ মানসচক্ষে ফিরে গেলো সেদিনের ঘটনাতে। কি যেন দেখতে দেখেছে তার মাথায় বুদ্ধিটা এলো? কি যেন? কি যেন? ও হ্যাঁ, একটা বাড়ির খিলান। আর কি দেখেছিল যেন সে? একটা লোক হাতে দড়ি নিয়ে কি একটা করছিল। “একশ তবে দড়ি হোক, একটু নয় পেঁচিয়ে আঁকব। বাকি সব নিয়ম আগের মতোই। প্রথমে দড়ি, তারপর খিলান, তারপর দাগ।”

খাবা পরপর বেশ কয়েকটা অঙ্ক করে মিলিয়ে নিলেন, একেবারে নির্ভুল।

– এবার হাজার হবে… কি হবে? কি হবে? কিরে খাবাশ কি হবে?

খাবাশ ততক্ষণে মজা পেয়ে গেছে। সে সেদিনের দৃশ্য থেকে তুলে নিলো শালুক ফুল।

খাবা বললেন, “দশ হাজার তবে হাতের একটা আঙ্গুল হোক।”

খাবাশ রাজি।

-এক লাখ?  

খাবাশ একটু মুচকি হেসে বলল, “ব্যাঙ।”

খাবাও একটু হেসে সায় দিলেন। দিয়ে বললেন “দশ লাখ?”

এবার খাবাশ একটু অবাক। “এতো বড় সংখ্যা হয় নাকি?”

– এখনও হয় না, তবে হতে পারে খুব শিগগির। একটা বিরাট সমাধি তৈরি হওয়ার কথা মাঝে মাঝেই আলোচনা হচ্ছে। হয়তো এখনই হবে না, কিন্তু হতেও তো পারে। তাতে যা পাথর লাগবে, সেটা দশ লাখ হওয়া বিচিত্র নয়।

– আশ্চর্য! তবে ওটা হোক একটা লোক আশ্চর্য হয়ে গেছে।

– হোক।

ব্যাস! সেই দিন থেকে শুরু হয়ে গেলো মিশরীয় সংখ্যাপদ্ধতি। দশক, এককের বাম দিকে বসলেও, দড়ি, শালুক এসবই বসানো হল ওপরের লাইনে। শূন্যের কোন সংকেত তারা দিল না, সেটার কথা পরে বলবো। আজকের যে ঘটনা সেই ঘটছে আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগে, মিশরে তখনও পিরামিড তৈরিও শুরু হয়নি।

তবে আজ যাওয়ার আগে আরেক দুর্ভাগার কথা বলে যাওয়া দরকার। ঠিক এই সময়েই ব্যাবিলনে বসে আছে উরুক নামে খাবাশের সমবয়সী এক কিশোর খাবাশের মতোই ফাঁপরে পড়েছে। খাবাশ তো তবু এক কুড়ি, দু কুড়ির নামতা নিয়েই হিমসিম। উরুকের হিসেব এক ষাট, দুই ষাটের, তার এই সমস্যার সমাধান হবে অনেক অনেক দিন পর।

————————-

পূর্ণ সংখ্যার গল্প এবার শেষ হল। এবারের গল্পের প্রেক্ষাপট বেশ আন্তর্জাতিক। মিশর, গ্রীস, ভারত সব মিলেই হবে এবারের কাহিনী। শুরু মিশরেই। আমেনেমহেট ১-র পিরামিড তৈরি হচ্ছে। হাজার হাজার ক্রীতদাস লেগেছে সেই কাজে। পাবাশা আছে তাদের মধ্যাহ্নভোজন দেওয়ার দায়িত্বে। একটা মোটা রুটির মতো খাবার, একটায় খেতে পারে ৩ জন। তাহলে কটা রুটি নিয়ে আসবে সে? সেই নিয়ে তার ধন্ধ।  

 

========================

~ কলমে এলেবেলে প্রত্যয় ~

 

এলেবেলে দলবল 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

লেখাটি পঠিত হয়েছে Web Hits বার

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।