এক নীল আলোর কারসাজি

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
254 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

এক কাঁচের বোতলে পরিস্কার জল। তা নিয়ে গবেষণা করছিলেন এক গবেষক। সেই স্বচ্ছ জলের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন তিনি। বোতলের জল থেকে একটা অদ্ভুত নীলাভ আলোর ছটা বেরিয়ে আসছে! কেন?

 

জলভরা বোতলটা অনেকক্ষণ তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মধ্যে রাখা ছিল। তাহলে এই নীলচে আলো কী সেই বিকিরণেরই কারসাজি? কেন হচ্ছে এই অবিশ্বাস্য ব্যাপার! নিজের চোখকে যেনো বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাই বিশ্বাসকে আরও যুক্তিযুক্ত করার জন্য শুরু করলেন এক কঠোর সাধনা। দিনের কাজ শুরু করার আগে একঘন্টা করে কাটাতে লাগলেন পুরোপুরি অন্ধকার একটা ঘরে। তারপর অনবরত ওই হালকা নীল আলোর দিকে তাকিয়ে থাকা।

শেষে ১৯৩৪ সালে পুরো ঘটনাটার বিবরণ দিয়ে লিখে ফেললেন একটা গবেষণাপত্র। ছেপে বেরোনোর  সাথে সাথেই বিজ্ঞানী মহলে হইচই পড়ে গেল এই পেপার নিয়ে। রাতারাতি সেলিব্রিটি হয়ে উঠলেন রাশিয়ান পদার্থবিদ পাভেল আলেক্সিভিচ চেরেনকভ।

কিন্তু প্রকৃত এই নীল আলোর রহস্য কি, তা নিয়ে সঠিকভাবে উদ্ধার করতে পারেন নি। ১৯৩৭ সালে ওই নীলচে আলোর উৎপত্তির কারণ ব্যাখ্যা করলেন পদার্থবিদ ইলিয়া ফ্র্যাঙ্ক আর ইগর ট্যাম।

তাঁরা দেখালেন কোনো আলোক স্বচ্ছ মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে আধানযুক্ত কোনো কণা আলোর থেকে বেশি বেগে ছুটলেই একমাত্র এরকম নীল আলাে দেখতে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু আমরা জানি এই মহাবিশ্বে আলোর বেগই সর্বোচ্চ বেগ, প্রতি সেকেন্ডে প্রায়  তিন লক্ষ কিলোমিটার। তাহলে তার থেকে বেশি বেগে কণা ছুটবে কীভাবে? আসলে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। আলো যখন ফাঁকা  জায়গা দিয়ে যায় তখন তার বেগ ওই প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড। কিন্তু কোনও মাধ্যমের ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময়ে আলোর বেগ অনেকটাই কমে যায়। মানে স্বাভাবিক ভাবে কোনো মাধ্যমের মধ্য দিয়ে আলো যে বেগে ধাবিত হয়  তার থেকে বেশি বেগে কোনও কণা ছুটতেই পারে। কিভাবে? আসুন জানা যাক। শূণ্য মাধ্যমে আলোর বেগ অবশ্যই c। কিন্তু যখন আলো কোনো মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে চলাফেরা করে, তখন তার গতিবেগ c এর চাইতে কমে যায়। যেমন জলের মধ্যে আলোর গতিবেগ ০.৭৫ C, অর্থাৎ শূণ্য মাধ্যমে আলোর গতিবেগের ৩/৪ অংশ।

 

এখন স্বাভাবিক বুদ্ধিতেই বলে যে, আমরা কোনো ভাবে কোনো বস্তুকণাকে যদি এই বেগের থেকে বেশি বেগে ছোটাতে পারি, তাহলেই এমন কিছু পাওয়া সম্ভব, যার গতিবেগ আলোর থেকে বেশি।

এরকম কি সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব।

যদি উপযুক্ত অন্তরক পদার্থের মধ্যে দিয়ে কোনো তড়িতবাহী কণাকে যথাযথ ভাবে পাঠানো যায়, তবে তার যা গতিবেগ দাঁড়ায় তা ওই মাধ্যমে আলোর গতিবেগের থেকে বেশি হতেই পারে। একটা খুব ভালো উদাহরণ হল জলে ইলেকট্রনের গতি।

আগেই বলা হয়েছে যে জলে আলোর গতিবেগ কমে দাঁড়ায় ০.৭৫c তে। যদি উপযুক্ত অন্তরক মাধ্যম ব্যবহার করা হয় তাহলে জলে ইলেকট্রন আলোর থেকে দ্রুত ছুটবে। এবং তাই হয়-ও। পারমাণবিক চুল্লিতে এই ঘটনা অহরহ দেখা যায়, আগেও যেত। প্রথম এই ঘটনা লক্ষ্য করেন মেরি কুরি স্বয়ং। কিন্তু তিনি বিষয়টিকে অত আমল দেননি।

যখন কোনো তরঙ্গ উৎপাদনকারী বস্তুকণা সেই মাধ্যমে উৎপাদিত তরঙ্গের চাইতেও বেশি গতিবেগে ছোটে, তখন একধরণের ঘটনা দেখা যায়। যেমন বায়ুমন্ডলে যখন কোনো বিমান যেমন কনকর্ড,  শব্দতরঙ্গের চাইতেও বেশি বেগে ধাবমান হয়, তখন “সনিক বুম” শোনা যায় এবং এই ঘটনাকে খালি চোখে প্রত্যক্ষ করা যেতে পারে।

একইরকম ঘটনা ঘটে জলের মধ্যে ইলেকট্রনের দ্রুত যাওয়ার ফলে। প্রচন্ড গতিতে ধাবমান ইলেকট্রন জলের মধ্যে আলোর গতিবেগের থেকেও বেশি গতিবেগে ধাবমান হয়। প্রচন্ড গতিতে ধাবমান ইলেকট্রন জলের ইলেক্ট্রনগুলিকে উত্তেজিত করে এবং ইলেকট্রনগুলি পূর্বাবস্থায় ফিরে আসার সময় একটি করে ফোটন কণা নিঃসারিত করে। এখন আলোর তরঙ্গরূপ বিবেচনা করলে এটা ভাবা যাবে যে, যে যে বিন্দু থেকে ফোটন নিঃসৃত হল, সেই সেই বিন্দু আলোর বিন্দু উৎস, এবং তার থেকে গোলকাকার তরঙ্গ  রূপে আলো নির্গত হচ্ছে। ইলেকট্রনের দ্রুত গতির কারণে এবং আলোর অপেক্ষাকৃত ধীর গতির কারণে সেই সনিক বুমের মতো একই ঘটনা ঘটে। এখানেও তরঙ্গ উৎপন্নকারী বস্তুকণা তরঙ্গের থেকে দ্রুত গতি লাভ করে। এবং সনিক বুমের ক্ষেত্রে যা ছিল শব্দতরঙ্গের শঙ্কু আকৃতিতে ছড়িয়ে পড়া, এখানে তা হয় আলোকতরঙ্গের ছড়িয়ে পড়া। তার রঙ নীল হয়। তার মানে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে ছিটকে আসা আহিত কণা জলের মধ্যে দিয়ে ছুটে যাওয়াতেই দেখা গিয়েছিল ওই নীলাভ আলোর ছটা। চেরেনকভকে সম্মান জানিয়ে তাই এই ঘটনার নাম রাখা হল ‘চেরেনকভ এফেক্ট’ বা চেরেনকভ বিকিরণ। 

১৯৫৮ সালে চেরেনকভ পেলেন পদার্থবিদ্যার নোবেল, সঙ্গে অবশ্যই ট্যাম আর ফ্র্যাঙ্ক।

চেরেনকভ বিকিরণ নানাভাবে কাজে লাগানো গেছে। 

১. জীবনবিজ্ঞানের গবেষণায় চিহ্নিত জৈবপরমাণু খুঁজে পেতে।

২. পারমাণবিক চুল্লিতে গবেষণার নিরাপত্তার কাজে।

৩. কণাপদার্থবিদ্যার গবেষণার নানা ক্ষেত্রে এই চেরেনকভ এফেক্টকে কাজে লাগানো হয়েছে।

 কিন্তু ক্যান্সার চিকিৎসাতেও যে একে কাজে লাগানো সম্ভব সেটা এতদিন বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না। জানালেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা নিকোলে একারম্যান। জীবদেহের ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলোকে খুব তাড়াতাড়ি খুঁজে বের করার একটা নতুন উপায় বের করেছেন একারম্যান আর তার সহযোগীরা। তারা এই পদ্ধতিটার নাম দিয়েছেন ‘চেরেনকভ লিমুনিসেন্স  ইমেজিং’। আসলে ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলোকে চেনার জন্য দরকার পড়ে একটা উপযুক্ত অ্যান্টিবডির। চিকিৎসকের কাজ গ্লুকোজের সঙ্গে ওই অ্যান্টিবডিকে জুড়ে দিয়ে ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলােতে পৌঁছে দেওয়া। ক্যান্সার আক্রান্ত কোষ যেহেতু খুব দ্রুত সংখ্যা বৃদ্ধি করে, তাই তাদের প্রচুর পরিমাণে গ্লুকোজের দরকার হয়। ফলে অ্যান্টিবড়ি আর গ্লুকোজের ব্যবস্থাপনা খুব তাড়াতাড়ি ক্যান্সার আক্রান্ত কোষের  ঘাড়ে চেপে বসতে পারে। 

একারম্যান আর তার দলবল এক ফন্দি আঁটলেন ”তেজস্ক্রিয় গ্লুকোজ” বানানোর জন্য। একটা তেজস্ক্রিয় আইসোটপকে (অ্যাক্টিনিয়াম-২২৫) তারা গুঁজে দিলেন ওই গ্লকোজ অনুর ভিতরে। এই তেজস্ক্রিয় আইসোটপের বিঘটনে যে ঋনাত্মক চার্জের বিটা কণা বেরিয়ে আসে সেটা আগেই জানা ছিল। আর জীবদেহের কোষ-কলার বেশির ভাগ অঞ্চলই যে জলে ভরা সে তো বিজ্ঞানীদের সবারই জানা। সুতরাং জলের মধ্যে দিয়ে ঋনাত্মক চার্জের বিটা কণাগুলো যাওয়ার সময়ে বেরিয়ে আসবে চোরেনকভের সেই নীল আলো। ওই নীল আলোতে ক্যান্সার আক্রান্ত অঞ্চলের ছবি তুলে রাখার ব্যবস্থাও হল। অ্যান্টিবডি আর তেজস্ক্রিয় গ্লুকোজের সিস্টেমের সঙ্গে একারম্যান জুড়ে দিলেন ছোট্ট  একটা ক্যামেরা, যার পোষাকি নাম ‘চার্জড় কাল্ড ডিভাইসেস’, সংক্ষেপে ‘সিসিডি’।

পুরো ব্যাপারটার কার্যকারিতা দেখার জন্য একারম্যান আর তার সহকর্মীরা মানুষের দেহের ক্যান্সার আক্রান্ত কিছু কোষ ঢুকিয়ে দিলেন কয়েকটা ইঁদুরের শরীরেও। এবারে ওই তেজস্ক্রিয় গ্লুকোজকে ঢুকিয়ে দেওয়া হল ইঁদুরগুলোর শরীরে। একারম্যান দেখালেন যে তিন মিনিটের মধ্যেই ইদুরের দেহে চার থেকে পাঁচটা ক্যান্সার আক্রান্ত কোষকে চেনা যাচ্ছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে আক্রান্ত কোষগুলােকে চিনে নেওয়ার এই ব্যাপারটাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। একারম্যানের দাবি,ক্যান্সারের শিকার কোনো  রোগীর  অপারেশন চলাকালীনই ডাক্তারবাবু দেখে নিতে পারবেন রােগীর শরীরের আর কোনো  ক্যান্সার কোষ আছে কী না। কত তাড়াতাড়ি এই পদ্ধতি দুরারোগ্য ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহার করা শুরু হবে এখন শুধু তার অপেক্ষাতেই অধীর আগ্রহে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকা।

তথ্যসূত্র:

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Cherenkov_radiation#:~:text=Cherenkov%20radiation%20(%2Ft%CA%83%C9%99%CB%88,of%20light%20in%20that%20medium.

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Nobel_Prize_in_Physics

https://www.britannica.com/science/Cherenkov-radiation

http://large.stanford.edu/courses/2014/ph241/alaeian2/

https://medicalxpress.com/news/2015-02-cherenkov-effect-therapy-patients-cancer.html

 

———————–

~ কলমে এলেবেলের  অতিথি  পঞ্চানন মণ্ডল ~

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

লেখাটি পঠিত হয়েছে Web Hits বার

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।