আলো, কোয়ান্টাম, আর কম্পিউটার

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
650 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

গণকযন্ত্র, মানে কম্পিউটারের সম্পর্কে লিখতে লিখতে মহাভারত লিখে ফেলা যায়। আদ্যিকালের অ্যাবাকাস থেকে হালের ‘পরম,’ জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে ভিতরের কার্যপ্রণালী। নানা রকমের কম্পিউটার তৈরি করা হয়েছে আজ অবধি, যার লক্ষ্য মূলত দুটো।। এক হল যন্ত্রের আকার ছোট করা এবং দুই, তার কর্মদক্ষতা বাড়ানো। কর্মদক্ষতা কথাটা কম্পিউটারের ক্ষেত্রে একটু ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় প্রথম যুগের কম্পিউটারে অর্থাৎ ১৯৫০সাল নাগাদ যে সকল যন্ত্র গুলো তৈরি হয়েছিল তাতে অর্ধপরিবাহী ইলেক্ট্রনিকসের ব্যবহার ছিল না, তার বদলে ব্যবহার হত ভ্যাকুয়াম টিউব, যেগুলো দেখত অনেকটা ইলেকট্রিক বাল্বের মত। এই জন্যই কম্পিউটারগুলোর আকার যেমন বড় হত তেমনই সেই মেশিনগুলো কাজ করার সময় গরম হত। তথ্য ইনপুট এবং আউটপুটের জন্য ব্যবহার হত পাঞ্চকার্ড, ম্যাগনেটিক কার্ড, ফলে সামগ্রিকভাবে গণনার পদ্ধতি হয়ে যেত বেশ ধীরগতির।  স্বাভাবিক ভাবে প্রথম যুগের সেই সব কম্পিউটারের কর্ম ক্ষমতা আজকের কম্পিউটারের কাছে কিছুই না। আবার সেই যুগের দুই তিন মেগাবাইটের স্টোরেজ স্পেসএর বিশাল আকার দেখলে হাসি পায়। আজ সেই সব স্টোরেজ স্পেসের লক্ষ গুণ বেশি স্টোরেজের হার্ডড্রাইভের আকার হাতের তালুর সমান। তবে এই আকারের ব্যাপারটা ক্রমবিবর্তনশীল ইলেক্ট্রনিকস প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে আয়ত্তে এসেছে।এখন কম্পিউটিং সংক্রান্ত যে সব বিষয়ে গবেষণা চলছে তার একটা দিক  হল কম্পিউটারের বুনিয়াদি কার্যনীতি। আগে যেসব হিসাব করার যন্ত্র এসেছে তা গতানুগতিক পদার্থবিদ্যা বা ক্ল্যাসিক্যাল জগতের নিয়ম মেনে চলে, সেসব মেশিনের সাথে কোয়ান্টাম জগতের অনিশ্চয়তা নীতি যোগ হয়েছে কমবেশি ৪০ বছর আগে। 

 পুরনো কম্পিউটারের সাথে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কাজ করাতে বিশেষ পার্থক্য নেই, দুইই কাজ করে বাইনারি সিস্টেমে, অর্থাৎ ০ এবং ১ দিয়ে। সহজ ভাবে বলতে গেলে চিরাচরিত কম্পিউটারে এগুলো আসলে সার্কিটের মধ্যে হাই ভোল্টেজ এবং লো ভোল্টেজ। মানে সাধারণ যোগ, বিয়োগ, গুণ,  ভাগ থেকে মহাবিশ্বের জটিলতম সমস্যার সমাধান, কম্পিউটার এই দুই সংখ্যার বাইরে বেরোতে পারবে না।তবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার এই শূন্য এবং এক ব্যবহার করে অন্য ভাবে। এক্ষেত্রে অনেক সময় ব্যবহার করা হয় একটি পরমাণু। কোয়ান্টাম জগতের প্রাথমিক ধারনায় একটি পরমাণুর একাধিক শক্তিস্তর থাকতে পারে, এখন এই শক্তিস্তরকেই ব্যবহার করা হয় ০ এবং ১ পাওয়ার জন্য। একটা উচ্চ শক্তি স্তর হল ১ আর তার নিচেরটা হল ০। কিন্তু পরমাণুটি কোন শক্তি স্তরে আছে, তা কি আগে থেকে জানা সম্ভব? একেবারেই না, কারণ হল “একাধিক কোয়ান্টাম অবস্থার উপরিপাতন”, এই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আছে “কোয়ান্টাম কড়চা- পর্ব ৩”এ। আর একই কোয়ান্টাম জগতের অনিশ্চয়তা নীতিই চিরাচরিত কম্পিউটারের থেকে কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে যে কোন সমস্যা সমাধানে যোগ্যতর করেছে। অবশ্য সেই পরমানুর দুটি শক্তিস্তর কিভাবে ব্যবহার হতে পারে এটা অনেক জটিল একটা বিষয়। এতো ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্যসীমাকে নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব না হলেও বেশ ব্যয়সাপেক্ষ, কারণ আমাদের পরমাণুদেরকে একটা জায়গায় ধরে রাখতে হবে লেসার ব্যবহার করে, এবং এমনভাবে তাদেরকে সজ্জিত করতে হবে যাতে তাঁদের মধ্যবর্তী দূরত্ব এমন হয় যে আমরা প্রত্যেকটা পরমানুকে আলাদা আলাদা ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। মানে আমরা সাধারণ চোখে যেভাবে কম্পিউটারকে দেখে অভ্যস্ত, সে ভাবে দেখাটা বেশ পকেটে টান পড়া ব্যাপার হয়ে যাবে এই নীতিতে চললে। আর একভাবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করা যায়, তা হল অতিপরিবাহি বা সুপারকন্ডাক্টারের সাহায্যে। সুপারকন্ডাক্টার হল সেই জিনিস যার মধ্যে দিয়ে তড়িৎ বিনা বাধায় চলতে পারে আর এমন একটা সুন্দর একটা ব্যাপার যাতে ঘটে তার জন্য ব্যবহার করতে হবে তরল হিলিয়াম, তাপমাত্রা নামাতে হবে মাইক্রোকেল্ভিনে। এত কম তাপমাত্রা দরকার, তার শুধু একটাই কারণ, উচ্চ তাপমাত্রায় কোয়ান্টাম জগতের নীতিগুলো আর কার্যকর হয় না। সেই তাপমাত্রা তৈরি করা গবেষণাগারে তৈরি সম্ভব হলেও বাড়িতে বা অফিসের টেবিলে তৈরি করা বেশ কষ্টকর।

জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে চিরাচরিত কম্পিউটারের থেকে অনেক কম সময় নেবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। জটিল সমস্যা সমাধানের যে পথ অর্থাৎ অ্যালগরিদম তার আকারের উপর নির্ভর করে কত সময়ে সেই সমস্যাটি সমাধান করা সম্ভব হবে। এখন সমাধানের সময়(t) এবং অ্যালগরিদমের আকার x হলে, চিরাচরিত কম্পিউটারের ক্ষেত্রে t∝ e^x, কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ক্ষেত্রে এই সময়ের নির্ভরশীলতা হয় অনেকটা t∝x^2 । উদাহরণ নিয়ে দেখা যাক। x যদি 2 হয়, কোয়ান্টাম কম্পিউটারের t হচ্ছে 4, আর চিরাচরিত কম্পিউটারের t হল 7.38। আবার, x যদি 99 হয়, তবে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের t দাঁড়ালো 9801, আর চিরাচরিত কম্পিউটারের t হল 9.889✕10^42। ২ থেকে ৯৯ এ সময় কতটা বেশি লাগতে পারে বোঝা যাচ্ছে, তাহলে এই সংখ্যাটা  ৯৯৯৯৯ এর জন্য যে কতটা বেড়ে যাবে সেটা সহজেই অনুমেয়। এই জন্যই জটিল গণনায় দরকার কোয়ান্টাম কম্পিউটার। 

এই দুটো পথ ছাড়া অন্য একভাবে বিজ্ঞানীরা এগিয়েছেন, তা হল আলোর পথ। কোয়ান্টাম ফিজিক্স অনুযায়ী আলো আসলে একরাশ কণা, যার পোশাকি নাম ফোটন। এই ফোটনের শক্তি আলোর রঙের সাথে পরিবর্তিত হয়। এই ফোটন কণার সাথে যোগ হল আরেকটা সাধারণ যন্ত্র যাকে বলে বিমস্প্লিটার। এর কাজ তেমন জটিল না। আদতে এটা একটা আয়না, কিন্তু এটির উপর আলো ফেললে তার অর্ধেক সে প্রতিফলিত করে এবং অর্ধেক  পাঠিয়ে দেয় বিপরীত পাশে। 

এখন আমরা যদি এমন একটা আলোকউৎস ব্যবহার করি যার থেকে একটা করে ফোটন বের হবে এবং সেটা আমরা একটা বিম স্প্লিটারের উপর ফেলি তবে হয় ফোটনটা প্রতিফলিত হবে না হয় বিপরীত পাশে যেতে পারবে, যে কোন একটা ঘটনা ঘটার সম্ভাবনাই সমান। এখানে দুই দিক থেকে আমরা বিম স্প্লিটারের উপর সমপ্রকৃতির দুটো ফোটন ফেলতে পারি আবার দুই দিক থেকে দুটো বিষম প্রকৃতির দুটো ফোটন ফেলতে পারি, দুটো সমপ্রকৃতির ফোটন হয় প্রতিফলিত হবে,না হয় বিপরীত পাশে যাবে, কি হবে তা আমরা আগে থেকে বলতে পারব না। আর যদি বিষম প্রকৃতির ফোটন হয় তবে দুটি ফোটনের প্রতিফলিতও হতে পারে বিপরীত পাশেও যেতে পারে, তবে দুটি ফোটনের গতিপথই একদম স্বাধীন হবে। এখানে হতে পারে কথাটা গুরুত্বপুর্ন কারণ কোয়ান্টাম জগতে সবটুকুই সম্ভাবনার খেলা, আদতে কি হবে তা যখন মাপব, তখনই জানতে পারব। এটাকে বলাই যায় সম্ভাবনাময় আউটপুট।এই নীতিটিকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা বিমস্প্লীটারের একটা নেটয়ার্ক বানাতে সক্ষম হয়েছেন। এখন বিমস্প্লিটারের সংখ্যা বেশি হওয়ার জন্য ইনপুট অনেক কম হলেও, সম্ভাবনাময় আউটপুট কিন্তু হাজার হাজার গুণ বেশি। এই রকম নেটওয়ার্ক ফোটন পাঠিয়ে ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বিজ্ঞানীরা এমন একটি গণনা  করেছেন যা করতে আজকের সাধারণ কম্পিউটারের সময় লাগার কথা মোটামুটি ৩০০ কোটি বছর। সেটা করতে এই নেটয়ার্কে সময় লেগেছে চার মিনিট মত সময়। বোঝাই যাচ্ছে এই প্রক্রিয়াটি কতটা ঐতিহাসিক।

শুধুমাত্র আলোর ব্যবহার করে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং করতে পারা যা্য়, এবং  এটা বিজ্ঞানীদের কাছে বেশ নতুন একটা পথ। দেখা যাক এই পথে চলে কম তাপমাত্রা ছাড়াও বিশ্ব কোয়ান্টাম কম্পিউটার পাবে কি না!

তথ্যসুত্রঃ

https://arstechnica.com/science/2020/12/un-computable-quantum-maze-computed-by-quantum-maze-computer/

Quantum Computation and Quantum Information: Nielsen and Chuang

চিত্রসুত্রঃ Xiaogang Qiang/University of Bristol

———————–

~ কলমে এলেবেলে ঋত্বিক ~

 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

লেখাটি পঠিত হয়েছে Web Hits বার

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।