ভূকম্পনের নতুন মাত্রা

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
547 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

ভূকম্পন মাপার ক্ষেত্রে পুরোনো রিখটার মাত্রা মাপকের পরিবর্ত হিসেবে এলো আরও নিখুঁত এবং উন্নত মাপক। সেটা হল চিলির ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট রিসার্চ সেন্টারের গবেষক রঞ্জিত দাস ও তাঁর দলবল কর্তৃক আবিষ্কৃত Generalised Moment Magnitude Scale (Mwg) বা “Das Magnitude Scale”।

এই তো কয়েক বছর আগে হঠাৎ করে কেঁপে উঠলো মাটি। প্রথমটাই অনেকেই ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি, এটা কি তার নিজের মাথার ব্যামো হলো? নাকি অন্যকিছু।

এই তো কয়েক বছর আগে হঠাৎ করে কেঁপে উঠলো মাটি। প্রথমটায় অনেকেই ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি, এটা কি তার নিজের মাথার ব্যামো হলো? নাকি অন্যকিছু। একটু পরেই যখন লক্ষ্য হল আশেপাশের সমস্ত দরজা জানালা, আসবাবপত্র সবকিছু নড়াচড়া করতে শুরু করেছে তখন আর বুঝতে বাকি রইলো না যে এটা ভূমিকম্প। ২০১৫ সালের ১৫ই এপ্রিল একের পর এক ভূকম্পের আঘাতে কেঁপে উঠেছিল নেপাল, সাথে আশেপাশের দেশগুলিতেও তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি কলকাতাতেও অনুভূত হয়েছিল সেই কম্পন। নেপালের রাজধানী শহর কাঠমাণ্ডুর বহু বাড়িঘর ও ঐতিহাসিক কাঠামো ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। প্রাণ যায় ৯০০০-এর ও কিছু বেশি মানুষের। এরপর থেকে এক ভয়াবহ আতঙ্ক বাসা বাঁধে মানুষের মনে। তাদের আতঙ্ক কে সত্যি প্রমাণ করে সেই বছরই একের পর এক ভূমিকম্পের পরবর্তী অভিঘাতে (Aftershock) কেঁপে ওঠে নেপাল সহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলি।

ঝড়ের ভয়াবহতা কতটা? বৃষ্টি কতটা হল? এসব জানার জন্য যেমন নানান মাপক রয়েছে, ভূকম্পনকে মাপার জন্যও তেমন রয়েছে ভূকম্পন মাত্রা মাপক।

ভূকম্পন এমন এক অমোঘ শক্তি যা এক মুহূর্তে তছনছ করে দিতে পারে সাজানো নগর, গ্রাম ও গঞ্জ। ঝড়ের ভয়াবহতা কতটা? বৃষ্টি কতটা হল? এসব জানার জন্য যেমন নানান মাপক রয়েছে, ভূকম্পনকে মাপার জন্যও তেমন রয়েছে ভূকম্পন মাত্রা মাপক (Magnitude Scale)। কোনও ভূকম্পন হলেই আমরা বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমে পর্দায় মাঝে মাঝে ফুটে উঠতে দেখি সেই ভূকম্পনের মাত্রা ঠিক কতখানি ছিল।

ছবি: চার্লস এফ রিখটার-এর “Elementary Seismology” বই থেকে

আমরা সকলেই অল্প বিস্তর অবগত ভূকম্পন মাপার জন্য রিখটার মাত্রা মাপকের ব্যবহারের কথা সম্পর্কে। ১৯৩৫ সাল নাগাদ ক্যালিফোর্নিয়া প্রযুক্তিবিদ্যা প্রতিষ্ঠান (California Institute of Technology) -এর ভূকম্পবিদ (Seismologist) চার্লস এফ রিখটার প্রথম ভূকম্পনের আকার মাপার কথা বলেন। ভূকম্পন মাপনী যন্ত্র বা Seismograph-এর মাধ্যমে ভূকম্প তরঙ্গের যে প্রশস্ততা (Amplitude) মাপা হতো সেটিই প্রধান ছিল রিখটার মাপক-এর ক্ষেত্রে। যা অনেক অর্থেই কোনও বড় আকারের ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে সঠিক মাত্রা মাপতে ব্যর্থ হতো। এরপর নানাভাবে এই মাপনী পরিবর্তন করেছেন বিজ্ঞানীরা। ১৯৭৯ সালে অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটি এনেছিলেন বিজ্ঞানী টমাস হাঙ্ক ও হিরু কানামোরি। তারা যে মাপকের কথা উল্লেখ করেন তাতে প্রশস্ততার সাথে সাথে ভূকম্পনের ফলে সৃষ্ট চ্যুতির ক্ষেত্রফল ও যে ধরণের পাথরের মধ্যে ভূকম্পন হচ্ছে তার নমনীয়তাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা Moment magnitude scale বা Mw Scale নামে পরিচিত।

সেক্ষেত্রে জেনে রাখা দরকার ভূকম্পনের মাত্রা ১ মান বৃদ্ধির ফলে ভূমিকম্পের শক্তি কিন্তু ৩২ গুন বৃদ্ধি পায়।

ভূকম্পনের এই ভ্রামক মাত্রা মাপক (Moment Magnitude scale)-ও কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে ততটা নিখুঁত নয়। ডঃ দাস তাঁর Bulletin of the Seismological Society of America নামক পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন যখন বেশি মাত্রার ব্যাপ্তিতে Mw মাপক ব্যবহার করা হচ্ছে তখন তা অন্যান্য মাপনীর সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ মাত্রা দিলেও ব্যাপ্তি ছোট হয়ে গেলে মাত্রার বিচ্যুতি ঘটছে। এছাড়াও এই Mw মাপকের ভৌগোলিক স্থান এর ওপর নির্ভরতাও অনেকটা বেশি। এই ত্রুটিগুলি সংশোধন করে ডঃ দাস প্রস্তাব করেন এক নতুন মাপকের যা হল Mwg মাপক। ডঃ দাস ও তার সহকারী বিজ্ঞানীগণ মুকুটলাল শর্মা, দীপঙ্কর চৌধুরী, হান্স রাজ ওয়াসন ও গ্যাব্রিয়েল গঞ্জালেজ-এর “A Seismic Moment Magnitude Scale” শীর্ষক গবেষণাপত্রে ১৯৭৬ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ঘটে যাওয়া সারা পৃথিবী ব্যাপী ২৫৭০৮ টি ভূমিকম্পের পর্যালোচনা করেন। যেখানে দেখা গেছে Mwg মাপকের মাত্রা অন্যান্য মাপক মাত্রার সাথে যে কোনো ব্যাপ্তিতেই সামঞ্জস্য পূর্ণ থাকছে। এছাড়াও এই নতুন মাত্রা মাপক থেকে প্রাপ্ত মানের, ভূমিকম্পের কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরত্ব ও ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভরতাও অনেক কম। এখন প্রশ্ন হল এই মাপক নিখুঁত হওয়া কতটা প্রয়োজনীয়? সেক্ষেত্রে জেনে রাখা দরকার ভূকম্পনের মাত্রা ১ মান বৃদ্ধির ফলে ভূমিকম্পের শক্তি কিন্তু ৩২ গুন বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ মাপক যত নিখুঁত হবে ভূমিকম্পের শক্তি সম্পর্কে ততটাই সঠিক ভাবে জানা সম্ভবপর হবে। পৃথিবীর নানা জায়গায় বিজ্ঞানীরা এখন এই মাপকের ব্যবহার শুরু করেছেন।  

আরও বিশদে জানতে হলে, গবেষণাপত্রটির লিঙ্ক: https://pubs.geoscienceworld.org/ssa/bssa/article-abstract/109/4/1542/571958/A-Seismic-Moment-Magnitude-ScaleA-Seismic-Moment?redirectedFrom=PDF

—————————–

~ কলমে এলেবেলে উদ্দালক~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

লেখাটি পঠিত হয়েছে web counter বার

 

 

 

One thought on “ভূকম্পনের নতুন মাত্রা

  • January 10, 2021 at 8:34 am
    Permalink

    The author has explained so lucidly, a few intricate details related to the measurement of tremors during earthquake. I would like to congratulate him for such an excellent endeavor. We want more academic inputs in future from his esteemed end.

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।