চুম্বক তবে চুম্বক হল কেন

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
277 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

এই ধরা যাক দুটো কলম। তুলে নিলাম। রেখে দিলাম একে অপরের পাশে। কিছু কি হল? কিচ্ছুই না! এরপরে তুলে নিলাম দুটো পাথর। আবার রাখলাম পাশে। কিছু কি হল? না না, এক্কেবারেই না। আপনারা বলবেন “আরে দেখতেটা কী চাইছ, সেটা তো বল আগে!” তাহলে বলি, দেখতে চাইছি যে এমন কি কোন বস্তু আছে যার দু’টিকে একে অপরের পাশে রেখে দিলে তারা একজন আরেকজনকে নাড়িয়ে দিতে পারে। না ছুঁয়েই! এবারে আপনারা বলবেন “কী বোকা বোকা কথা! এতে এতো ভাববার কী আছে? দুটো চুম্বককে পাশাপাশি রেখে দিলেই তো হয়!” একদম ঠিক। এই এক মজার বিষয়। দুটো চুম্বককের একটিকে আরেকটির কাছে নিয়ে আসলে হয় একজন আরেকজনকে কাছে টানবে, নয়তো ঠেলা মেরে দূরে সরিয়ে দেবে। এই ঘটনা ছোট থেকেই দেখে আসছি। শুধু কী তাই, এই চুম্বক আবার লোহা, নিকেলের মতো বিশেষ কিছু ধাতুকেও আকর্ষণ করে। লোহা সহ এই বিশেষ ধাতুগুলোকে চুম্বক না বললেও, সচরাচর চৌম্বকীয় পদার্থ বলে থাকি। তবে হ্যাঁ, আকর্ষণ তখনই  ভালো ভাবে বোঝা যাবে, যদি তারা চুম্বকটির চুম্বকক্ষেত্রের মধ্যে থাকে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, চৌম্বকক্ষেত্র হল চুম্বকের চারপাশের এমন এক এলাকা যার ভেতরে কোন চৌম্বকীয় পদার্থ বা অন্য আর একখানা চুম্বক রাখলে একে অন্যের প্রভাব টের পাবে। ওই এলাকার বাইরে থাকলে কিচ্ছুটি টের পাবে না। কেউ কেউ আবার জিজ্ঞাসু হতে পারেন এই ভেবে যে ঠিক কতো বড় এই এলাকা! যদি সত্যিকারের সত্যি কথা কেউ জানতে চান, তাহলে বলবো, এই এলাকার বিস্তৃতি অসীম! অর্থাৎ, সোজাসুজি বললে আমার বাড়িতে থাকা ছোট চুম্বক সুদূর আমেরিকার কোন এক রাস্তায় পড়ে থাকা লোহার পেরেককে আকর্ষণ করে! আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই পড়লেন। কিন্তু সেই টান এতোটাই নগণ্য যে ওই পেরেকের পক্ষে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ, রাস্তার ঘর্ষণ, তার অপেক্ষাকৃত কাছে থাকা অন্য চুম্বক ইত্যাদির প্রভাব কাটিয়ে আমার ঘরে ছুটে আসা সম্ভব হয় না। চুম্বক থেকে দূরত্ব যত বাড়ে এই আকর্ষণ বল সেই দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতে পরিবর্তিত হয়। দূরত্বও বাড়বে টানও কমবে। তবে কখনও শূন্য হবে না। তা সে যাই হোক, বাস্তব ক্ষেত্রে চুম্বকের চারপাশের একটি সসীম পরিসরের ভেতরে থাকা লোহাই অন্য সবকিছু কাটিয়ে এই টান অনুভব করে এবং সাড়া দেয়। এর বাইরে থাকা চৌম্বকীয় পদার্থকে এটি আকর্ষণ করলেও তারা ঠিক সাড়া দিতে পারে না। এইবারেই আসল কৌতূহলের জায়গায় আসছি। কই এরকম কোন এলাকা তো পাথর বা কাঠের নেই! প্রশ্ন হল, কাঠ যদি কাঠ হয়, চুম্বক তবে চুম্বক হল কেন? 

 

সোজাসুজি বললে আমার বাড়িতে থাকা ছোট চুম্বক সুদূর আমেরিকার কোন এক রাস্তায় পড়ে থাকা লোহার পেরেককে আকর্ষণ করে!

 

এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেতে, এক খণ্ড, দণ্ড চুম্বক তুলে নেব। আর তার চুলচেরা তদন্ত চালাবো। তবে এক্ষেত্রে চুলচেরা না বলে ‘অণু-পরমাণু চেরা’ তদন্ত বললেই বোধ হয় যথাযথ হবে। অর্থাৎ, এর কারণ জানতে, যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণাগুলো দিয়ে চুম্বক   তৈরি সেই পর্যায়ে পৌঁছে যেতে হবে। আর পৌঁছালেই দেখতে পাব যে এর এক একটি পরমাণুও যেন এক একটি ছোট্ট ছোট্ট দণ্ড চুম্বক! এদেরও উত্তর-দক্ষিণ মেরু আছে। পরমাণুগুলোর এই চৌম্বকীয় ধর্ম মাপতে একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ব্যবহার করা হয়। যার নাম চৌম্বকীয় ভ্রামক। যার চৌম্বকীয় ভ্রামকের মান যত বেশি, চৌম্বকক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার, বা চৌম্বক্ষেত্রকে প্রভাবিত করার প্রবণতাও তার বেশি। এরপরেও কৌতূহল থেকে যায়… পরমাণুগুলো চুম্বকের মতো ব্যবহারই বা করছে কেন? তার উত্তর জানতে পরমাণু কেটে দেখতে হবে তার ভেতরে ঠিক কি ঘটনা ঘটছে। আর তা যদি সত্যি সত্যিই করতে পারি তাহলে জানতে পারবো এই সমস্ত কিছুর জন্যই দায়ী পরমাণু গঠনকারী এককগুলো। অর্থাৎ, ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রন। প্রথমে আসা যাক ইলেকট্রনের কথায়। এটি একটি ঋণাত্মক আধানবিশিষ্ট কণা। দিব্যি আপন কক্ষপথ ধরে পরমাণুর মাঝে থাকা নিউক্লিয়াসকে চতুর্দিকে ঘিরে রেখেছে মেঘের মতো। সেই মেঘও আবার গতিশীল! আবার আধানযুক্ত মেঘের চুপচাপ না বসে থেকে ঘুরে বেড়ানোর কারণেই তড়িৎপ্রবাহ শুরু হয়। এখানেও একই ঘটনা। আর তড়িৎ বয়ে যাওয়া মানেই তাকে ঘিরে চৌম্বকক্ষেত্র গজিয়ে ওঠা। নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্রে রেখে গতিশীল এই ইলেকট্রনের চারপাশে এরকমই একটি চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়। অর্থাৎ, ইলেকট্রনটি ঘুরন্ত অবস্থায় একটি চুম্বকের ন্যায় আচরণ করে। বিজ্ঞানের ভাষায় বললে, ইলেকট্রনের একটি চৌম্বকীয় ভ্রামক উৎপন্ন হয়। তবে যদি কিছু মনে না করেন তাহলে বলি, একটি পরমাণু সামগ্রিকভাবে চুম্বকের ন্যায় ব্যবহার করবে কিনা তাতে এই এখনি যে চৌম্বকীয় ভ্রামকের কথা বললাম, তার বিশেষ কোন হাত নেই! (একটু আধটু হাত যদিও আছে, তবে সে প্রসঙ্গে পরে আসছি) তাহলে?? এখানেই আছে আসল চমক। ইলেকট্রনের আরেকটি মজার বৈশিষ্ট্য আছে। এর নিজের একটি বিশেষ স্বতঃস্ফূর্ত চুম্বকের ন্যায় আচরণ বা স্বতঃস্ফূর্ত চৌম্বকীয় ভ্রামক আছে। যাকে আমরা ঘূর্ণন চৌম্বকীয় ভ্রামক বলে থাকি। এই বিশেষ আচরণ “কোথা থেকে এল? কেন এল?” যদি জানতে চান তাহলে বলবো এর উত্তর কেউ জানেনা! বলতে পারেন প্রকৃতির অসীম রহস্যের মধ্যে এটি একটি। আবার, এই ধর্ম শুধু ইলেকট্রনেরই নয় প্রোটন, নিউট্রন সকলেরই আছে। সোজা ভাষায় বললে একটি সত্যিকারের চুম্বকের কাছে এদের নিয়ে এলে এরা প্রভাবিত হবে। এদিকে আবার নিউট্রন এবং প্রোটনের চৌম্বকীয় ভ্রামকের মান ইলেকট্রনের চেয়ে অনেক অনেক কম। কেননা এদের ভর ইলেকট্রনের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। ফলে সামগ্রিকভাবে একটি পরমাণু বা অণুর চৌম্বকীয় ধর্ম নির্ণয়ে নিউট্রন বা প্রোটনের তেমন কোন কৃতিত্ব নেই। সব দায়ভার একা ইলেকট্রনেরই। তাহলে আবার ফিরে আসা যাক ইলেকট্রনে। একটি পরমাণুতে নিউক্লিয়াসের চারপাশে ইলেকট্রনগুলি এক পর্যায়ক্রমিক ধারায় বিন্যস্ত থাকে। কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী সাজানো থাকে কিছু বিশেষ শক্তির স্তর বা Energy Shell। এদের “n” দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। n-এর মান ১ মানে প্রথম স্তর; n-এর মান ২ মানে দ্বিতীয় স্তর… ইত্যাদি। প্রতিটি শক্তির স্তরে আবার কিছু উপস্তর বা Sub-shell আছে। এদের ‘l‘ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। n-এর কোন নির্দিষ্ট মানের জন্য l-এর মান ০ থেকে (n-১) পর্যন্ত হবে। n=১ হলে তার l=০ অর্থাৎ n=১ স্তরে একটিমাত্র উপস্তর থাকা সম্ভব। আবার, n=২ হলে তার জন্য l=০,১ হবে। বোঝা গেল, n=২ হলে তার দুটি উপস্তর থাকবে। তাহলে এতক্ষণে জেনে গেছি যে, কোন শক্তি স্তরের ক্রমসংখ্যা n-এর মান জানলে তাতে উপস্থিত উপস্তর সংখ্যা কীভাবে গুনব। কিন্তু, গল্প এখানেই শেষ নয়! প্রতিটি উপস্তরে সাজানো থাকে কক্ষ বা Orbit, যাদের “m” দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। ইলেকট্রনগুলি এই কক্ষেই সাজানো থাকে। একটি নির্দিষ্ট n-এর একটি নির্দিষ্ট l-এর জন্য m-এর মান -l থেকে +l পর্যন্ত হয়। নীচের তালিকায় দেখানো হয়েছে কোন শক্তিস্তরের n-এর মান জানলে তার সম্ভাব্য উপস্তরের ক্রমসংখ্যা l ও কক্ষের ক্রমসংখ্যা m-এর মান কি কি হবে।    

এই বিশেষ আচরণ “কোথা থেকে এল? কেন এল?” যদি জানতে চান তাহলে বলবো এর উত্তর কেউ জানেনা! বলতে পারেন প্রকৃতির অসীম রহস্যের মধ্যে এটি একটি।

n

l= ০,১,২…, n-১

m= -l,-l+১…,+l

-১,০,১

-১,০,১

-২,-১,০,১,২

 

m চিহ্নিত এই কক্ষগুলি অনেকটা ঘরের মতো। কোন কক্ষের n,l,m-এর মান জেনে যাওয়া মানে সেই ঘরের ঠিকানা জেনে যাওয়া। এরকম এক একটি ঘরে সর্বোচ্চ দুটি ইলেকট্রন থাকতে পারে, যাদের ঘূর্ণন চৌম্বকীয় ভ্রামকের মান একে অপরের বিপরীত। একটু সোজা করে বললে দু’জন দু’দিকে মুখ করে থাকবে। এবারে আমরা জানি যে প্রতিটি মৌলের আধান বিহীন পরমাণুতে নির্দিষ্ট সংখ্যক ইলেকট্রন থাকে। যেমন, হাইড্রোজেন পরমাণুতে একটি, অক্সিজেন পরমাণুতে আটটি। প্রকৃতপক্ষে মৌলের এই ইলেকট্রনগুলি এই m চিহ্নিত কক্ষ বা ঘরগুলোতেই সাজানো থাকে। সাজানো হয় এমনভাবে যাতে নীচের শক্তিস্তরগুলি (যেখানে n-এর মান কম), আগে পূর্ণ হয়। যেমন, হাইড্রোজেন-এর একটি ইলেকট্রন থাকে n=১, l= ০,  m=০ কক্ষে। অক্সিজেনের আটটি ইলেকট্রনের প্রথম দুটি থাকে n=১, l= ০,  m=০ তে। তারপরের দুটি থাকে n=২, l= ০,  m=০ তে। তারপরের দুটি n=২, l= ১,  m=-১ এ। এরপর একটি n=২, l= ১,  m=০ তে, শেষেরটি n=২, l= ১,  m=১ এ। অর্থাৎ এখানে দুটি ইলেকট্রন একা একা আছে। সাথীর খোঁজে কিন্তু শেষের দুটি ইলেকট্রন একসাথে থাকবে না। এখানেও ওই কোয়ান্টাম তত্ত্বের কারসাজি। ইলেকট্রনগুলোকে ঘর দেওয়ার সময়, একটি নির্দিষ্ট n-এর একটি নির্দিষ্ট l-এর জন্য বরাদ্দ m গুলোর প্রতিটিতে প্রথমে ১ টি করে ইলেকট্রন যাবে। তারপরেও যদি ইলেকট্রন অবশিষ্ট থাকে তবে ওই m কক্ষগুলিতে আর একটি করে ইলেকট্রন যাবে। আরও একটু স্পষ্ট করে বলা যাক,

  1. অক্সিজেনের মোট ৮ টি ইলেকট্রন।

  2. শক্তিস্তরের এক্কেবারে নীচে আছে n=১, l= ০, m=০ ঘর। সর্বমোট ২ টি ইলেকট্রন থাকতে পারে। সুতরাং দুটি ইলেকট্রন এখানে চলে গেল। পরে থাকল ৬ টি।

  3. এরপরের শক্তিস্তর n=২। এখানে দুটি উপস্তর। l=০ এবং l=১।

  4. l=০ তে একটিমাত্র কক্ষ, m=০। এখনেও দুটি ইলেকট্রন চলে গেল। পরে রইল আরও ৪ টি।

  5. এর পর আসছে l=১। এখানে তিনটি কক্ষ m=-১,০,১ আছে। বাকি ৪ টি ইলেকট্রনের প্রথমটি যাবে m=-১, দ্বিতীয়টি m= ০, তৃতীয়টি m=১। তিনটি কক্ষের প্রতিটিতে একটি করে ইলেকট্রন চলে গেল। বাকি পরে রইল মাত্র একটি। সেটি চলে যাবে m=-১। সুতরাং, শুধু m=-১ এ দুটি ইলেকট্রন আছে। বাকি দুটি কক্ষে একটি একটি করে আছে। অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে অক্সিজেনের দুটি বেজোড় ইলেকট্রন আছে, যারা পরমাণুটির চুম্বকের ন্যায় ধর্মের জন্য দায়ী! ভাবছেন “অক্সিজেনও কি চৌম্বকীয় নাকি!” আমি বলছি হ্যাঁ। এর কারণও বলছি যথা সময়ে।  

 

ভাবছেন “অক্সিজেনও কি চৌম্বকীয় নাকি!” আমি বলছি হ্যাঁ।

 

যাই হোক তবে বোঝা গেল কোয়ান্টাম তত্ত্বের বিধিনিষেধ মেনে যে কোন মৌলের পরমাণুতে ইলেকট্রনগুলি শৃঙ্খলাবদ্ধ ভাবে সজ্জিত থাকে। একটু আগেই বললাম যে, যে কক্ষগুলোতে জোড়ায় জোড়ায় ইলেকট্রন থাকে সেখানে মোট ঘূর্ণন চৌম্বকীয় ভ্রামকের মান শূন্য। কিন্তু যে কক্ষগুলোতে বেজোড় ইলেকট্রন আছে সেখানে তাদের ঘূর্ণন চৌম্বকীয় ভ্রামকগুলি সম্মিলিত ভাবে পরমাণুটিকে একটি চৌম্বকীয় ভ্রামক প্রদান করে। সামগ্রিকভাবে পরমাণুটি একটি ছোট চুম্বকের ন্যায় আচরণ করে। 

পরমাণু স্তরের এই ছোট চুম্বকগুলো যদি নিজে থেকেই হাতে হাত ধরে একমুখ করে (উত্তর দিকে মুখ করে) বসে থাকে, অর্থাৎ সকলের চৌম্বকীয় ভ্রামকগুলি একই দিকে সাজানো থাকে, তাহলে একটি বড় চুম্বক তৈরি হয়। কারণ সেক্ষেত্রে এদের ছোট্ট ছোট্ট আকর্ষণ বিকর্ষণের ক্ষমতাগুলো জোটবদ্ধ হয়ে বড় আকার নেয় (চিত্র-ক)। কিন্তু লোহা জাতীয় পদার্থগুলোর ক্ষেত্রে তাদের পরমাণুগুলির কিছু কিছু দলে ভাগ হয়ে থাকে। এক একটি দল একটি দিকে মুখ করে থাকে (চিত্র-খ)। ওই একটি বিশৃঙ্খল ক্লাসের দুষ্টু ছাত্রদের মতো। কয়েকটি জোটে ভাগ হয়ে গিয়ে নিজেদের মতো গল্প করছে। আর শুধুমাত্র সেই কারণে এদের সকলের বিন্দু বিন্দু ক্ষমতাগুলো জোটবদ্ধ হতে পারছে না। ওই সকলে মিলে কাজ না করার ফল! কিন্তু এরই ফাঁকে যদি ক্লাসে মাস্টারমশাই চলে আসেন? তবে চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায় মুহূর্তেই পুরো কক্ষ শৃঙ্খলাবদ্ধ। প্রতিটি জটলার বালক বালিকারই সামনের দিকে মুখ করে বসে। শুধু সেইসব সুবোধ ছাত্র ছাত্রীদেরই কিছু করতে হয় না, যারা আগে থেকেই সামনের দিকে ঘুরে বসেছিল। আর ঠিক এই ঘটনাই ঘটে লোহার কাছে চুম্বকের ধরলে। সেই দলটি, যেটির সজ্জা বাইরের চুম্বকের আকর্ষণের অভিমুখে রয়েছে তারা ওই একই দিকে রয়ে যায়। অন্যান্য দিকে ঘুরে থাকা পরমাণুর দলও সেই দিকেই সজ্জিত হয়। তৈরি করে ফেলে একফালি চুম্বক! কিন্তু চুম্বক সরাতেই আবার এরা আগের দশায়। অর্থাৎ যে যার মতো এদিক ওদিক। এবারে ধরা যাক ক্লাসঘরে যে মাস্টারমশাই এলেন তিনি খুব কড়া করে সকলকে বকে দিয়ে গেলেন। তাহলে তিনি চলে যাবার পরও কিছুক্ষণ ছাত্রছাত্রীরা চুপচাপ যেরকম বসেছিল, তেমনি ভাবেই থাকবে। তারপর ধীরে ধীরে নিজেদের বিশৃঙ্খল অবস্থায় পৌঁছে যাবে। এখানেও একই অবস্থা। যে চুম্বককে লোহার সামনে ধরা হল, তা যদি বেশ শক্তিশালী হয়, তবে এমনকি চুম্বক সরিয়ে নেওয়ার পরেও পরমাণুগুলো শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকবে। সোজা ভাবে বললে লোহার খণ্ডটি কিছুক্ষণ চুম্বকের মতই আচরণ করবে। এরপরে ধীরে ধীরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। লোহা জাতীয় এই পদার্থগুলি যাদের চুম্বকের ন্যায় পরমাণুগুলি দলে দলে সাজানো থাকে তাদের অয়শ্চৌম্বক বলে। চুম্বকের উপস্থিতিতে এদের আচরণ খালি চোখেও দারুণভাবে চোখে পরে। এছাড়াও আছে পরাচৌম্বকীয় পদার্থ। এদের ছোট ছোট চুম্বকের ন্যায় পরমাণুগুলি সাধারণ অবস্থায় যে যার মতো এদিক ওদিক ঘুরে থাকে। বাইরের চুম্বক সেরকম শক্তিশালী না হলে, এদের কিছু কিছু একদিকে সজ্জিত হয় বটে, তবে সকলে মিলে একদিকে ঘুরতে পারে না। চুম্বক সরিয়ে নেওয়ার সাথে সাথেই আবার এরা বিশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরে যায়। সাধারণ চুম্বকের সামনে এর ব্যবহার লোহার মতো অত তীব্র নয়। যে কোন মৌলের পরমাণুতে অন্তত একটি বেজোড় ইলেকট্রন থাকলেই সেই মৌলটি সামগ্রিকভাবে পরাচুম্বকের মতো আচরণ করে। যেমন, অ্যালুমিনিয়াম। আর এক ধরনের চৌম্বকীয় পদার্থ আছে যাদের তিরশ্চৌম্বক বলে। এই পদার্থ গঠনকারী পরমাণুগুলোতে কোন বেজোড় ইলেকট্রন থাকেনা। ফলে চৌম্বকক্ষেত্রে এদের আচরণ ইলেকট্রনের ঘূর্ণন চৌম্বকীয় ভ্রামক দ্বারা নির্ধারিত হয় না। বরং নিউক্লিয়াসের চারদিকে এর গতিবিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই গতিবিধি এমনই যে এর জন্য উৎপন্ন হওয়া চৌম্বকীয় ভ্রামক বাইরের চুম্বকের আকর্ষণের ঠিক বিপরীত অভিমুখী হয়। ফলে চুম্বকের যে কোন মেরুর সামনেই এই ধরনের পদার্থকে ধরা যাক না কেন এরা চুম্বকের থেকে সবসময় দূরে পালিয়ে যেতে চায়! উদাহরণস্বরূপ বলা যায় গ্রাফাইট, যা কিনা পেন্সিলের শিষে দেখতে পাই। প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার যে, পদার্থ মাত্রেই তার মধ্যে তিরশ্চৌম্বকীয় ধর্ম বিদ্যমান। কিন্তু যাদের যাদের পরমাণুতে বেজোড় ইলেকট্রন থাকে তাদের ঘূর্ণন চৌম্বকীয় ভ্রামকের কারসাজিতে তিরশ্চৌম্বকত্ব কাটিয়ে কেউ হয়ে ওঠে অয়শ্চৌম্বক কেউ বা পরাচৌম্বক। যাদের বেজোড় ইলেকট্রনটি নেই তারা তিরশ্চৌম্বক হয়েই রয়ে যায়। অর্থাৎ, শুধু লোহা বা নিকেলই নয়, সকল পদার্থই কম বেশি চুম্বকের দ্বারা প্রভাবিত হয়।  

চুম্বকের যে কোন মেরুর সামনেই এই ধরনের পদার্থকে ধরা যাক না কেন এরা চুম্বকের থেকে সবসময় দূরে পালিয়ে যেতে চায়!

তাহলেই বোঝা যায় পদার্থের এক্কেবারে গভীরে ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রনের সঠিক ব্যাখ্যা জানলেই একমাত্র চুম্বকের চুম্বক হওয়ার কারণ জানা সম্ভব। আর বিংশ শতাব্দীতে আমরা জেনেছি যে শুধুমাত্র কোয়ান্টাম তত্ত্বই পারে সে ব্যাখ্যা দিতে। সনাতন গতিবিদ্যা কিছুতেই এর কোন মীমাংসা করতে পারে না। সুতরাং, বলা যায় কোয়ান্টাম তত্ত্বের একটি জলজ্যান্ত উদাহরণই হল চুম্বক!    

কোয়ান্টাম তত্ত্বের একটি জলজ্যান্ত উদাহরণই হল চুম্বক!

মনে পড়ে যায় সেই গ্রীক কিংবদন্তির কথা। খ্রিস্টের জন্মের ৬০০ বছর আগের কোন এক দুপুরে ম্যাগ্নেশিয়ায় মেষপালক ম্যাগ্নাস তার ভেড়ার পাল নিয়ে ইতস্তত ঘুরছেন। তাঁর হাতে একটি লাঠি, যার আগা লোহা দিয়ে তৈরি। চলতে চলতে কোথাও বা থামছেন। বিশ্রাম করতে। আবারও হাঁটছেন। হঠাৎ তাঁর লাঠি আটকে গেল একটি পাথরে। সেটাকে ছাড়াতে যেই পাথরটিতে পা দিলেন। জুতো সুদ্ধ পাটাও আটকে গেল ওতে! দেখে শুনে বোঝা গেল তাঁকে নয়, পাথরটি টানছে তাঁর জুতো জোড়ায় লেগে থাকা লোহার পেরেকগুলোকে এবং তাঁর হাতের লাঠির নীচে লেগে থাকা লোহার অংশটিকে! সেই প্রথম জানা গেল একটি একটি রহস্যময় পাথরের কথা, যা কিনা লোহা টেনে ধরে! জায়গার নাম অনুসারে ওই বিশেষ পাথরের নাম রাখা হল ম্যাগ্নেসাইট বা লোডস্টোন। একে বলা যেতে পারে প্রাকৃতিক চুম্বক। আর যে কোন পদার্থ যার এরকম বিশেষ ক্ষমতা আছে তাদেরকেই বলা হল ম্যাগ্নেট বা চুম্বক। ভাবা যায় প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে আবিষ্কার হওয়া এই পাথরের ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব হয়েছে কেবলমাত্র এই বিগত শতাব্দীতে!

 

 

————————–

 

~ কলমে এলেবেলে মেঘদীপা ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 
লেখাটি পঠিত হয়েছে web counter বার

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।