স্বপ্নের মধ্যে স্মৃতির পুনঃ জাগরণ এবং সংরক্ষণ

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
187 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

ঘুম এবং তার সংক্রান্ত মস্তিষ্কের পরিবর্তন এবং কীভাবে কখন কোথায় আমাদের সারাদিনের শেখা জিনিস জমা হয় সেসব বলতে গেলে আগে আমাদের মস্তিষ্কের চালক সংকেতের ব্যাপারে জানা উচিত। জার্মান বিজ্ঞানী হান্স বার্গার ১৯২৪ সালে প্রথম মস্তিস্কের সংকেতকে কম্পিউটারে ধরে রাখতে সক্ষম হন, একে ইইজি (Electrophenologram or in short EEG) বলে। ইইজি হল কর্টিকাল অঞ্চলের সম্মিলিত এক্টিভিটি, যাকে নন ইনভেসিভ পদ্ধতিতে রেকর্ড করা সম্ভব। মূলত পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায় মস্তিষ্কের এই সংকেতকে। ১) ডেল্টা সংকেত: এটি একটি ধীর গতির তরঙ্গ, ইহার কম্পাঙ্কের সীমা ০.০১ থেকে ৪ হার্জ। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকার সময় এই ওয়েভটির অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়, ২) থিটা সংকেত: ইহার কম্পাঙ্কের সীমা ৪–৭ হার্জ, তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব, ৩) আলফা সংকেত: ৮–১২ হার্জ, অবসর (Relaxation), চিন্তা করা, ৪) বিটা সংকেত: ১৩–৩০ হার্জ, সক্রিয়, চলাফেরা এবং ৫) গামা সংকেত: ৩০–১০০ হার্জ— মনোযোগ, উপলব্ধি, স্নায়ুজনিত রোগের (schizophrenia, and Alzheimer’s) ক্ষেত্রেও এই তরঙ্গ লক্ষ্য করা যায় (Hailong Liu et al)। ঘুমের মধ্যে এই যে ইইজি সিগন্যাল-এর নানা রকমের তারতম্য লক্ষ্য করা যায় (কম্পাঙ্ক এবং তরঙ্গের বিস্তার(amplitude) অনুযায়ী), তার ভিত্তিতে ঘুমের বিভিন্ন অংশকে পৃথক পৃথক নাম দেওয়া হয়েছে। ১৯৩০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিজ্ঞানী লুমিস ঘুমের সময়ে ব্রেনের বিভিন্ন ইইজি ওয়েভের বিস্তারিত ধারণা দেন, তারপর পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে আস্রিন্সকি এবং কেইলটম্যান (Aserinsky and Kleitman) প্রথম র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট ঘুম (পরের অনুচ্ছেদে বিস্তারিত আলোচনা করেছি) পর্যবেক্ষণ করেন। ১৯৬৮ সালে প্রথম Rechtschaffen and Kales ইইজির ওয়েভের পার্থক্য লক্ষ্য করে ঘুমকে মোট ৫টি বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেন। ২০০৪ সালের পর আমেরিকা অ্যাকাডেমি অফ স্লিপ মেডিসিন ঘুমের ভাগের ব্যাপারে আরও পরিষ্কার ধারণা দেয়; ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ের জন্য শুধুই মস্তিষ্কের সিগন্যাল নয়, হার্ট, চোখ এবং পেশির সংকেত (যথাক্রমে ECG, EOG, EMG) নেওয়াও শুরু হয়। একজন সুস্থ প্রাপ্ত বয়স্কের সারাদিনের পর্যাপ্ত ঘুমের পরিমান ৮ ঘণ্টা ধরে নেওয়া হয়, তার মধ্যে র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) ঘুম মোট ঘুমের ১০-২৫% এবং নন র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (NREM) ঘুম মোট ঘুমের ৫০% (বিস্তারিত আলোচনা করব)। ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন-এর মত অনুসারে, সদ্যোজাত শিশুদের দৈনিক ঘুমের পরিমাপ ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা। এক একটি ঘুমের চক্র মোটামুটি ৯০–১২০ মিনিটের মত হয়। একটি ঘুমের চক্রের মধ্যে চারটি NREM স্টেজ এবং একটি REM পর্যায় বর্তমান (David W. Carley and Sarah S. Farabi et al.)। প্রতিটা ঘুমের পর্যায় কমপক্ষে ৪–৫ বার পর্যাবৃত্ত হয় (মোট ঘুম ৮ ঘণ্টা  ধরে নিয়ে)। প্রতিটি ঘুমের স্তরের নিজস্ব শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই পাঁচ রকম চক্রকে নাম দেওয়া হয় সংকেতের ধর্মের উপর ভিত্তি করে, এবং ৩০ সেকেন্ড ইইজি সংকেতের উপর। সাধারণত জেগে থাকা অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে যে দুটি তরঙ্গের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায় তাদেরকে একত্রে জাগ্রত পর্যায় (wake stage) বলা হয়, এটি সাধারণত দুই প্রকারের হয়; ১) চোখ খোলা অবস্থায় (১৩–৩০ হার্জ-বিটা ওয়েভ) এবং ২) চোখ বন্ধ অবস্থায় (৮–১৩ হার্জ-আলফা ওয়েভ)।  

ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ের জন্য শুধুই মস্তিষ্কের সিগন্যাল নয়, হার্ট, চোখ এবং পেশির সংকেত (যথাক্রমে ECG, EOG, EMG) নেওয়াও শুরু হয়।

 

ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়

১। নন র‍্যাপিড আই  মুভমেন্ট (NREM): এই পর্যায়ে চোখের মনির পরিবর্তন না হয় বললেই চলে। NREM ঘুমকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করা যায় যথাক্রমেNREM N1, NREM N2, NREM N3 এবং NREM N4। অনেক ক্ষেত্রেই N3 এবং N4-কে একত্রে ধীর গতির তরঙ্গ বলা হয়ে থাকে, এবং স্মৃতি একত্রিকরনের (memory consolidation) ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, যে ব্যাপারে পরে আলোচনা করছি।  

ক। নন রেম এন১ (NREM N1): এটি ঘুমের একেবারে প্রথম দিকের ঘটনা, যে মুহূর্তে আমরা তন্দ্রাচ্ছন্ন বোধ করি। ইইজি সংকেতের মাধ্যম দিয়ে বলতে গেলে, ওয়েভটি কিছুটা আলফা তরঙ্গের মতো হলেও পুরোপুরি একে আলফা তরঙ্গও বলা যায় না। এই তরঙ্গটি অনেকটা থিটা তরঙ্গের মতো হয়, সাধারণত উৎসস্থল মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল এবং সেন্ট্রাল অঞ্চল। এই পর্যায়ে চোখের মনির গতি ক্রমশ কমতে থাকে। এই তরঙ্গটির কম্পাঙ্ক সাধারণত ৪–৭ হার্জের মতো থাকে।  

খ। নন রেম এন২ (NREM N2): একজন সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এই স্তরটি ঘুমের মধ্যে সব থেকে বেশি বার অবধি বিরাজ করে। কে-কম্প্রেক্স (K complex) এবং স্লিপ স্পিন্ডেল (sleep spindle) হল এই ধরনের ঘুমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।  স্লিপ স্পিন্ডেলের কম্পাঙ্ক ১২–১৬ হার্জ, প্রশস্ততা (amplitude) ১০০ µV এবং এর স্থায়িত্ব মাত্র ০.৫ থেকে ২ সেকেন্ডের মত। থ্যালামাস থেকে  স্লিপ স্পিন্ডেলের উৎপত্তি। N2-এর আধিপত্য বেশি লক্ষ্য করা যায় ফ্রন্টো সেন্ট্রাল (CZ,FZ) প্রণালী বরাবর। শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে স্লিপ স্পিন্ডেলের সাথে ব্লাড প্রেসারের ওঠানামার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।  

গ। নন রেম এন৩ এবং নন রেম এন৪: গভীর ঘুমে আছন্ন থাকার সময় এই ওয়েভ লক্ষ্য করা যায়, এর অপর নাম ধীর গতির তরঙ্গ অথবা slow wave sleep (SWS) প্রধানতঃ ০.১ থেকে ৪ হার্জ-এর মধ্যে (Delta Wave)-এর কম্পাঙ্ক বিরাজ করে, এর আর একটি বিশেষত্ব হল এর বিস্তার (amplitude) বেশি হয়। 

২। রেম (REM): প্রধানতঃ স্বপ্নের উৎপত্তি এই স্তরেই হয়, এবং এই পর্যায়ে পেশি স্থির থাকে; আমরা কেউ পেশি সঞ্চালন করতে পারি না। এই ঘটনাকে স্লিপ প্যারালিসিস বলে। এই পর্যায়কে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়, Phasic (সমবেদী (sympathetically) চালিত এবং চোখের মনির গতি পরিবর্তিত হয়) এবং tonic (চোখের মনির গতি পরিবর্তিত হয় না)। রেম স্লিপের ইইজি অনেকটা জাগ্রত অবস্থার ইইজির মতই থাকে। এই রেম স্তরটি মোটামুটি ১০ মিনিটের মতো স্থায়ী থাকে। রেম স্টেজটি ক্ষণস্থায়ী অল্প সময়ের ঘুমের মধ্যে দেখা যায় না, দীর্ঘক্ষণ ঘুমের মধ্যেই একমাত্র এই ধরনের ইইজি ওয়েভ দেখা যায়।    

এবার এই দুই রকমের ঘুম স্তরের মধ্যে প্রথম ভাগে নন রেম ঘুমের ভাগ বেশি থাকে, আর ঘুমের শেষের দিকে রেম ঘুমের পরিমান বেশি থাকে। একটি গণনা অনুযায়ী ২০–২৯ বয়সী মানুষের মোট ঘুমের ২১% ধীর গতির ঘুম (SWS), ৪০–৪৯ বছর বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি ৮% এবং ৬০–৬৯  বছর বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি ২%। একটা রেম সাইকেলের পর পুনরায় আবার একটি নন রেম স্টেজ পুনরাবৃত্ত হয়।

এখন প্রশ্ন হল কীভাবে এই সংকেতকে লিপিবদ্ধ করব? ডাক্তারি পরিভাষাতে একটি পরীক্ষা রয়েছে যার নাম polysomnogram; এক্ষেত্রে EEG, EMG, ECG, EOG সবকটি এক সাথেই রেকর্ড করা হয়। এছাড়াও actigraphy (হাত ঘড়ির মতো) বলে এক রকমের পরীক্ষা রয়েছে।  

ঘুমের বিশ্লেষণের (উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে) প্রথমের দিকে মনে করা হত, আমাদের মস্তিস্ককে শুধুমাত্র বিরতি দেওয়া এবং কিছু শারীরবৃত্তীয় কাজের (ব্রেনের তাপমাত্রা ঠিক রাখা, ডিটক্সিফিকেশন) জন্যই ঘুমের প্রয়োজন। পরবর্তীতে কীভাবে স্মৃতিশক্তি সঞ্চিত হয় বা স্মরণ করা হয় তা পর্যালোচনা করার সাথে সাথেই ঘুম সংক্রান্ত গবেষণার একটি নতুন দিক খুলে যায়।  

ঘুমের বিশ্লেষণের (উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে) প্রথমের দিকে মনে করা হত, আমাদের মস্তিস্ককে শুধুমাত্র বিরতি দেওয়া এবং কিছু শারীরবৃত্তীয় কাজের (ব্রেনের তাপমাত্রা ঠিক রাখা, ডিটক্সিফিকেশন) জন্যই ঘুমের প্রয়োজন।

স্মৃতিশক্তির সঞ্চিতকরন (Memory consolidation)

ঘুমের সময় ব্রেন সমস্ত রকম সেনসরি ইনপুট নেওয়া বন্ধ করে দেয়, ব্রেন তখনও সচল থাকে (হিপক্যাম্পাসের sharp-wave ripple-এ, কর্টেক্সে উচ্চ প্রশস্ত যুক্ত slow oscillations)।

মস্তিষ্কের মধ্যে স্মৃতি প্রধানতঃ তিনটি প্রক্রিয়ায় সম্পাদিত হয়, প্রথমেই সংযুক্তিকরণ (Encode: নতুন একটি কাজের সাথে নিজেকে প্রশিক্ষিত করা, নতুন তথ্য গ্রহণ), তারপর সেই তথ্যটির সংরক্ষণ করা (consolidation) NREM ঘুম পর্বে, এবং পরবর্তীতে সঞ্চিত স্মৃতিকে উপযুক্ত ক্ষেত্রে স্মরণ করা হয় (retrieval, একটু পরেই একটি সহজ উদাহরন দিয়ে বোঝাব)। নতুন যখনি কিছু আমরা শিখি, তার সঞ্চয়করনের মাধ্যমে নতুন স্মৃতিটি পুরোনো স্মৃতির সাথে যুক্ত হয়। যখনি আমরা কিছু মনে করতে চাই, তখন আমরা পুরানো জমিয়ে রাখা মেমোরি থেকে উপযুক্ত স্মৃতিকে বের করে নিয়ে আসি। ঘুম আমাদের নতুন স্মৃতিকে স্থায়ী ভাবে মস্তিষ্কের অন্তরজালে যুক্ত হতে সাহায্য করে (Björn Rasch and Jan Born et al)।   

অল্পঘুম বা ঘুম কম হওয়া নানান রকম উপলব্ধির হ্রাস, মানসিক ব্যাধি, হতাশা, ওজন হ্রাস ইতাদির মতো সমস্যার সৃষ্টি করে। ঘুম সাধারণত সমস্ত মেরুদন্ডীদের মধ্যেই (পাখি, মাছ, সরীসৃপ ইত্যাদি) দেখা যায়।  এমনকি অমেরুদন্ডীদের (মৌমাছি, আরশোলা) মধ্যেও ঘুমের মতো অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। মামেলিয়ান হিপোক্যাম্পাল স্মৃতি ক্ষণস্থায়ী ভাবে হিপোক্যাম্পাসে সঞ্চিত হয়, পরবর্তী ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি হিসাবে নিওকর্টেক্সে গিয়ে জমা হয় ধীর গতির ঘুমের পর্বে (SWS-NREM N3)।     

এই স্মৃতিশক্তি সাধারণত দুই প্রকারের হয়, 

১। ডিক্লিয়ারেটিভ (ঘোষণা মূলক): নানান রকমের জ্ঞান, তথ্য। সাধারণত এইটি হিপোক্যাম্পাসে সঞ্চিত হয়, খুব তাড়াতাড়ি মুছে যেতে পারে যদি না দীর্ঘ সময়ের জন্য জমানো হয়। দীর্ঘস্থায়ী ডিক্লিয়ারেটিভ মেমোরি নিওকর্টেক্সের নিউরাল নেটওয়ার্ক-এ জমা হয়; ইহা দুই প্রকারের হয়,  

ক। এপিসডিক(প্রাসঙ্গিক): কিছু নির্দিষ্ট ঘটনা যেগুলো আগে ঘটে গেছে, সেগুলোকে যখন আমরা মনে করতে চাই যেমন তোমার প্রথম পোষ্য, বা মাধ্যমিকের ফলাফলের দিন ইত্যাদি।   

খ। সিম্যানটিক: ছোট বেলা থেকে আমরা যা যা জিনিসপত্র পড়ে আসছি; যেমন রামধনুর সাতটি রঙের নাম, কোন দেশের কি রাজধানী ইত্যাদি। এই ধরনের স্মৃতি হিপোক্যাম্পাসের উপর নির্ভর করে না, যদিও সিম্যানটিক মেমোরিকে কতকগুলো এপিসোডের সমন্বয় ধরে নেওয়া হয়।

২। প্রসেডুরাল (পদ্ধতিগত): এটি এক প্রকার ইমপ্লিসিট মেমোরি। সহজ করে বললে যে জিনিস একবার শিখে যাবার পর সারা জীবনে যখন খুশি করা যায়; যেমন সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো ইত্যাদি।

স্মৃতি আমদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে জমা হয়। কী রকমের স্মৃতি তার উপর ভিত্তি করে, যেমন ইমোশনাল মেমোরি মেডুলাতে সঞ্চয় হয়, মোটর মেমোরি সেরিবেলাম থেকে আসে, এবং তথ্য সংক্রান্ত মেমোরি আসে থ্যালামাস এবং হাইপো থ্যালামাস থেকে। 

 

কীভাবে মেমোরি জমা হয়?

স্মৃতি তৈরির জনপ্রিয় দ্বিস্তরী মডেল রয়েছে, নতুন মেমরির দ্রুত সংগ্রহ এবং দীর্ঘস্থায়ী সঞ্চয়করনে তাই প্রমাণ হল কনসলিডেশন থিওরি; আত্তিকরনের উপর ভিত্তি করে একে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, ক্ষণস্থায়ী স্মৃতি (খুব দ্রুত সঞ্চয় হয় অল্প সময়ের জন্য) এবং এই ক্ষণস্থায়ী স্মৃতির ধীর গতিতে দীর্ঘস্থায়ী রূপে সঞ্চয়করন। ডিক্লিয়ারেটিভ মেমোরি শেখা এবং স্মরণ করা আমাদের জ্ঞানত ভাবেই হয় এবং ঘুমের উপর নির্ভর করে, কিন্তু প্রসেডুরাল মেমরির ব্যাপারে আমাদের সেই রকম কোন স্পষ্ট ধারণা নেই। পরীক্ষার দ্বারা দেখা গেছে যে স্মৃতির সংযুক্তিকরন এবং স্মৃতিচারণের আগে যদি সাবজেক্টকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ভাল ভাবে মনে করতে পারলে পুরস্কার পাওয়া যাবে, সেক্ষেত্রে দেখা গেছে ঘুম একটি গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা গ্রহণ করেছে, এবং এক্ষেত্রে আরও দেখা গেছে যে ইইজির slow wave oscillation তুলনামুলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভবিষ্যতের কোন পরিকল্পনা slow wave ঘুমের পর্বে সংগঠিত হয়। এই সংঘটন পদ্ধতিটি খুবই সিলেকটিভ; যে মেমোরিটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটিই ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় হয়।  কোন মেমোরি বেশি গুরুত্বপূর্ণ এটি ঠিক করে প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্স। প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্সে slow wave লক্ষ্য করা যায়। slow wave ঘুমের স্পিন্ডেল স্পষ্ট স্মৃতিকে ভাসা স্মৃতিতে পরিবর্তনে ভূমিকা নেয়।   

এই স্মৃতির যে রূপান্তর হয়, তা জানার জন্য দু’টি ভীষণ জনপ্রিয় পরীক্ষা রয়েছে (Relational memory task, Serial reaction time task)। 

এই স্মৃতির সংগঠন দুই ভাবে হতে পারে,

ক। system colsolidation: দৈনিক স্মৃতির পুনঃ জাগরণ এবং নিউরাল নেটওয়ার্কের পুনঃ বিভাজনের মাধ্যমে এবং পুনঃ প্রচার, NREM Slow wave sleep পর্যায়ে system consolidation হয় (Jens G. Klinzing et al.)। 

খ। synaptic consolidation: সাইন্যাপটিক কানেকশন শক্তিশালী করার মাধ্যমে, REM sleep পর্যায়ে synaptic consolidation হয়।

আমরা এটা জানি যে নতুন নিউরন তৈরি হয় না, কিন্তু আমদের ব্রেন খুবই নমনীয়, নিউরনগুলো একে অপরের সাথে নতুন যোগাযোগ গঠন করতে পারে বা পূর্ববর্তী সাইন্যাপটিক পথগুলোকে আর শক্তিশালী করে তুলতে পারে, এমনকি অদরকারী স্মৃতিকে মুছেও ফেলতে পারে। 

 

উদাহরণ: সারা দিনে আমরা যে যে কাজ করি, রাতে ঘুমানোর পরে সেগুলোই মনে করতে থাকি। একটা পরীক্ষার কথা বলি; ইঁদুরের ছক কাটা ঘরের মধ্যে হেঁটে চলা (maze): এই পরীক্ষা চলাকালীন ইঁদুরটির ব্রেনের প্লেস সেলগুলো উত্তেজিত হয়, তারপর ইঁদুরটির ঘুমানোর পরে গভীর ঘুমে (slow wave sleep) একই রকম ফায়ারিং প্যাটার্ন লক্ষণীয় হয় (Gordon B. et al)।  

অপর একটি পরীক্ষা, finger tapping। কিছু মানুষকে একটি বিশেষ নমুনাকে (pattern) বারবার পুনরাবৃত্তি করানো হয়, তারপর তাদের মধ্যে অর্ধেক সংখ্যক মানুষকে আঙুল চালানো (finger tapping) শেখানোর পর ঘুমাতে দেওয়া হয় এবং অর্ধেক জনাকে জাগিয়ে রাখা হয়। পরের দিন একই পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করানো হয়। তাতে দেখা যায়, যারা ঘুমতে গেছিল তারা একই প্যাটার্ন যারা ঘুমোয়নি তাদের থেকে বেশি ভাল ভাবে রপ্ত করতে পেরেছে, শতকরার হিসাবে প্রায় ৩৩%। আরও একটি বিশেষত্ব হল, এই finger tapping এক প্রকার প্রসেডুরাল মেমরি, এবং যাদেরকে ঘুমাতে দেওয়া হয়েছিল তাদের রেম স্লিপ সাধারনের তুলনায় দীর্ঘ। এই দুই পরীক্ষা থেকেই জানা যায় যারা রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যায় তারা ডিক্লিয়ারেটিভ মেমোরি তাড়াতাড়ি শিখতে পারে, এই ডিক্লিয়ারেটিভ মেমোরির (episodic memory) জন্য ধীর গতির ঘুম (slow wave sleep, NREM-N3) দায়ী, আর যারা রাতে দেরি করে ঘুমাতে যায় তাদের প্রসেডুরাল মেমোরি তাড়াতাড়ি রপ্ত হয় (REM Sleep)।   

দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতির জন্য মস্তিষ্কের বিশেষ রকমের অন্তজালিকা অবস্থিত, যে সময়ে গভীর ঘুমে (NREM N3) আছন্ন থাকি তখনি আমাদের ক্ষণস্থায়ী মেমোরি স্মৃতিগুলো জেগে ওঠে, এবং দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতির জালিকার সাথে যুক্ত হয়। 

এই যে সারা দিনের নানান ঘটে যাওয়া জিনিসপত্র ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ভেসে ওঠে slow wave sleep -এ, এর যে নির্দিষ্ট সিগনেচার ইইজি তরঙ্গের মধ্যেও লক্ষ্যনীয় হয় (হিপোক্যাম্পাসের তীক্ষ্ন(Sharp) ওয়েভ রিপিল এবং thalamo cortical স্পিন্ডেল), আমরা আগেই  জেনেছি হিপোক্যাম্পাস কোন কিছু শেখার বা মনে রাখার জন্য বিশেষ ভাবে দায়ী, ঘুম শুধুই গতকালের স্মৃতিকে সঞ্চয়ই করে না, ঘুমের সাথে হিপোকাম্পাসের নতুন মেমোরি এনকোডের ও পসিটিভ কোরিলেশন রয়েছে, অর্থাৎ ভাল ঘুম পরের দিনের এনকোড ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি করে। এছাড়াও বিভিন্ন রকমের মোটর কার্যক্রম বৃদ্ধি পায় ঘুমের পর (পারালালি ইমেজিং স্টাডি (FMRI, EEG ইত্যাদি) করেও দেখা গেছে ঘুমের মধ্যে ব্রেনের নির্দিষ্ট কিছু অংশ পুনঃ সক্রিয় হয়)। রেম স্লিপে আবার দেখা যায় যুক্তিগত চিন্তা থেকে ইমশনাল চিন্তার বেশি প্রাদুর্ভাব ঘটে। 

 

কীভাবে স্মৃতি ঘুমের মধ্যে সক্রিয় হয় তার একটি পরীক্ষা (Memory re-activation during sleep)

স্মৃতির পুনঃ জাগরণ মেমরি কন সলিডেশানের অন্যতম চাবিকাঠি, কিন্তু কীভাবে স্মৃতি ঘুমের মধ্যে ভেসে ওঠে তা মাপা খুবই কঠিন; এমনকি প্রায় অসাধ্য বললেও কম কিছু বলা হবে না। কিন্তু বিজ্ঞানের অশেষ কৃপায় এই পুনঃ জাগরনকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে ঘুমের মধ্যে ব্রেনের সংকেতকে রেকর্ড করার মধ্য দিয়ে, একটা খুব জনপ্রিয় পরীক্ষার দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছি, শেখার সময় অংশগ্রহণকারীকে কতক জটিল নমুনা (pattern) রপ্ত করতে হয় (বিভিন্ন আঙুল দিয়ে প্রেস করে)। প্রতিটি আঙুল প্রেস করার সাথে সাথেই নির্দিষ্ট শব্দ এবং ছবি দেখানো হত (প্রতিটি আঙুলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শব্দ এবং ছবি)। তার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের ইইজি ওয়েভকে লিপিবদ্ধ করা হতো, প্রত্যেকটি শব্দ এবং তার সাথে সাথে আঙুলের গতির সাহায্যে মেশিন লারনিং আলগোরিদিমের (অত্যাধুনিক কমপিউটারের বুদ্ধিমত্তা) সাহায্যে বানানো মডেলকে প্রশিক্ষিত করা হয়।   

এরপর অংশগ্রহণকারী যখন ঘুমত (আরও পরিষ্কার করে বললে যখন ঘুমের NREM স্তরে) তখন ওই একই শব্দ শোনানো হত, এবং মাথার ইইজিও লিপিবদ্ধ করা হত। এইটি হল স্মৃতির পুনঃ জাগরণ পরীক্ষা, বিজ্ঞানের ভাষায় একে targeted memory reactivation (TMR) বলে (Boyu Wang et al)।  

এবার ইইজির ঘুমের তথ্যকে ওই শেখানো ধাঁচে (train model) দেওয়া হয়, এবং যাচাই করা হয় ঘুমের মধ্যে শব্দ শুনে প্রতিটি আঙুলের জটিল নমুনা কতটা পুনঃ উদ্ধার করতে পেরেছে। অপর একটি পরীক্ষায় FMRI বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আবেগপূর্ণ (emotional) স্মৃতির পরীক্ষা করানোর পর যখন পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারীকে ঘুমোতে দেওয়া হয়, তার মিডিয়াল প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স বেশি সক্রিয় থেকেছে স্মৃতির সক্রিয় করনের সময়।    

তথ্যসূত্র:

[1] Hailong Liu 1, Jue Wang, Chongxun Zheng, Ping He,Study on the effect of different frequency bands of EEG signals on mental tasks classification,DOI: 10.1109/IEMBS.2005.1615695

[2] David W. Carley and Sarah S. Farabi,Physiology of Sleep,doi: 10.2337/diaspect.29.1.5,

[3] Björn Rasch and Jan Born,About Sleep’s Role in Memory,doi: 10.1152/physrev.00032.2012

 

[4] Jens G. Klinzing, Niels Niethard,Jan Born ,Mechanisms of systems memory consolidation during sleep,Nature Neuroscience ,1598–1610(2019)

[5]Gordon B.Feld12Jan ,Sleep EEG Rhythms and System Consolidation of Memory,DOI: 10.1016/B978-0-12-384995-3.00009-5

[6] Boyu Wang, James W. Antony, Sarah Lurie, Paula P. Brooks, Ken A. Paller and Kenneth A. Norman,Targeted Memory Reactivation during Sleep Elicits Neural Signals Related to Learning Content

 

 

——————————-

 

~ কলমে এলেবেলের অতিথি সায়ন ঘোষ ~

সায়ন ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ টেকনলজি মাদ্রাসে গণনীয় মস্তিষ্ক বিদ্যা ও সংকেত বিশ্লেষণে গবেষণারত 

 

 

 

 

 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।