মরণের পরে

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
489 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

বয়স তখন কত সেটা খেয়াল নেই, তবে একদিন বিকেলে খেলাধুলো করে এসে হঠাৎ মনে হলো যখন বড় হয়ে যাবো সেদিনও কি সেই বন্ধুদের সাথে ঐ বিকেলের মত খেলতে পারবো? আমাদের শেষ খেলা কবে হবে? আর যেদিন হবে, সেই দিনটিই যে শেষ দিন একথা তো জানতেও পারবো না! জানলে না হয় সেদিন একটু বেশিই খেলে আসতাম। কি কুক্ষণে সেই কথা মনে  হয়েছিল কে জানে, কিন্তু সেই শুরু। এই ভাবনা যে ওখানেই শেষ হবার নয় সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিলাম। একদিন তো সবার সাথেই শেষ দেখা হবে, শেষ কথা বলতে হবে এবং তারপর আর কোনও চাওয়া-পাওয়া নেই, থাকবে শুধুই স্মৃতি। একটু বড় হয়ে উপলব্ধি করেছিলাম, এই চিন্তা শুধু আমার নয় সমস্ত বিশ্ব-সংসারের। আমাদের মস্তিষ্কের বিকাশের সাথেই এই চিন্তার উদ্ভব হয় এবং মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে এর প্রভাব অনস্বীকার্য। পশুদের মধ্যেও এই ধরনের চিন্তার বিকাশ হয় কিনা সেটা আলোচ্য বিষয়, কিন্তু এমন অনেক পশু আছে যারা তাদের প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে অর্থাৎ ভবিষ্যতে প্রিয়জনের সাথে দেখা না পাওয়ার অনুভূতিটা তাদের মধ্যেও আছে। 

বিজ্ঞানের যদি কোনও চরম সীমা থাকে তবে তার মধ্যে একটি হবে মৃত্যুকে জয় করা।

বিজ্ঞানের যদি কোনও চরম সীমা থাকে তবে তার মধ্যে একটি হবে মৃত্যুকে জয় করা। যুগ যুগান্তর ধরে মানুষ অনেক কিছুই করে এসেছে এই সীমাকে অতিক্রম করার জন্য, আমি আর সেই গল্পে যাচ্ছি না— শুধু এইটুকুই বলছি সবাই খারাপ ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আমি বরং আপনাদের কিছু উৎসাহ ব্যঞ্জক ব্যর্থতার খবর দিই। উৎসাহ ব্যঞ্জক বললাম তার কারণ হল অন্যান্য চেষ্টার তুলনায় এই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলিকে আরও উন্নত করার সুযোগ সুবিধা আছে এবং তাৎক্ষণিক এই ব্যর্থতা; ভবিষ্যতে সফল হওয়াটা শুধু সময়ের অপেক্ষা। 

চেতনার কেন্দ্রস্থল হচ্ছে মস্তিষ্ক, তাই বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মৃত্যুর পর এই মস্তিষ্ককে সংরক্ষিত করার চেষ্টা চালানো হয়। এই সংরক্ষণ করার পদ্ধতিকে ক্রায়োনিক্স বলা হয়। সহজ করে বললে এই ক্রায়োনিক্স প্রযুক্তিতে মস্তিষ্ককে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে দ্রুত ঠাণ্ডা করে রাখা হয়। এই ভাবে সংরক্ষিত রাখার একটি উদ্দেশ্য হলো, ভবিষ্যতে যখন বিজ্ঞান অত্যাধুনিক স্তরে পৌঁছুবে তখন জৈবপ্রযুক্তি দ্বারা আবার সেই মস্তিষ্ককে যেন পুনরুজ্জীবিত করা যায়। আমেরিকার এলকোর বলে এক জৈবপ্রযুক্তি সংস্থা ইতিমধ্যে এই পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে, এবং তাদের অত্যাধুনিক ক্রায়োনিক্স প্রযুক্তি দিয়ে মানব দেহ থেকে মস্তিষ্ক, মোটামুটি সবকিছুই সংরক্ষিত করা যাচ্ছে। ইচ্ছে হলে আপনারাও তাদের পরিষেবা গ্রহণ করতে পারেন, তবে দেহ সংরক্ষণের জন্য শুধু ১.৪ কোটি ও মস্তিষ্কের জন্য ৫৬ লক্ষ টাকার ইনস্যুরেন্স করাতে হবে। কিন্তু ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতির জন্য এই ইনস্যুরেন্সের অঙ্ক বাড়তেও পারে, তাই মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেলেও ঋণের হাত থেকে নিস্তার অসম্ভব। সংরক্ষণ না হয় করা গেল, কিন্তু পুনরুজ্জীবিত করার উপায়? এখানেই সেই উৎসাহ ব্যঞ্জক গবেষণার কথা বলতে হয়।

পুরো ৩৬ ঘণ্টা এই মস্তিষ্কগুলোকে সজীব রাখা হয়। 

চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে মস্তিষ্কে যদি ৩ মিনিটের বেশী রক্ত চলাচল বন্ধ থাকে তবে মৃত্যু অবধারিত, তারপর মস্তিষ্ককে পুনরুজ্জীবিত করা অসম্ভব। সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী Nenad Sestan। প্রথম যেদিন আমি এই গবেষণাপত্রটি পড়ছিলাম, মনে হচ্ছিল কোনও কল্পবিজ্ঞানের গল্প পড়ছি। Nenad Sestan-এর ল্যাবের পাশেই এক কসাইখানা আছে, একদিন তিনি সেই পথ দিয়ে যাবার সময় কিছু শুয়ারের কাটা মুণ্ডু দেখে নিজেকেই প্রশ্ন করলেন ‘ঐ মাথাগুলোকে কি তিনি তার ল্যাবের জৈবপ্রযুক্তি দিয়ে আবার পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন?’ শুরু হলো প্রচেষ্টা, আর ধন্যি তার ল্যাবের অধ্যবসায়। ৩২ খানা শুয়ারের মস্তিষ্ক নিয়ে তারা দেখালেন যে কসাইখানায় মৃত্যুর ৪ ঘণ্টা বাদে তাদের তৈরি বিশেষ কক্ষে এবং রাসায়নিক দ্রবণ দ্বারা নির্জীব সেইসব মস্তিষ্কে স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া ও জৈবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে, মস্তিষ্ক আবার গ্লুকোজ থেকে শক্তি উৎপাদন শুরু করছে, কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস তৈরি হচ্ছে, এবং মস্তিষ্কের রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থাপনা আবার সক্রিয় হয়ে গেছে। পুরো ৩৬ ঘণ্টা এই মস্তিষ্কগুলোকে সজীব রাখা হয়। তবে রাসায়নিক দ্রবণের মধ্যে বিশেষ কিছু উপাদানের জন্য হয়ত স্নায়বিক প্রতিক্রিয়াকে পুরোপুরি সক্রিয় করা যায়নি; তাই ঐ সব মস্তিষ্কে আপাতত চেতনার অভাব লক্ষ্য করা গেছে। Nenad Sestan কিন্তু খুব আশান্বিত যে পরবর্তী গবেষণায় আরো বেশি সময় ধরে তারা তথাকথিত মৃত মস্তিষ্ককে সজীব রাখতে পারবেন, ফলে তাদের মধ্যে স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া ও জৈবিক বিক্রিয়ার পরিবর্তনকে অধ্যয়ন করা যাবে; ক্রমে চেতনার আভাসও যাতে তাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয় তার চেষ্টাও করা হবে। একটা কথা মনে রাখা দরকার যে এই সব গবেষণা এখনো মানুষের মস্তিষ্কের উপর করা হয়নি, অন্তত বৈজ্ঞানিক মহলে তা প্রকাশ্যে আসেনি।

এখানে আমাদের মস্তিষ্কে কীভাবে চেতনার উদ্ভব হয়ে থাকে সেই বিষয়ে কিছু সাম্প্রতিক গবেষণার কথা বলা যেতেই পারে। স্নায়ুবিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে এবং সহজ করে বললে মস্তিষ্কের বিভিন্ন কার্যকরী অংশের (যেমন motor, sensory, emotional এবং decision making system) অন্তর্গত নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের মধ্যে খুব সূক্ষ্ম এবং যৌথ আন্তঃসংযোগের ফলে চেতনার উদ্ভব দেখা যায়। তবে পুরো ব্যাপারটা খুবই জটিল, কারণ আমাদের মস্তিষ্কে প্রায় ৮০ লক্ষ কোটি স্নায়ু আছে এবং এই প্রতিটি স্নায়ু অন্যান্য স্নায়ুকোষের সাথে গড়ে প্রায় ১০০০ টি সংযোগ করতে পারে, অনেক ক্ষেত্রে আবার এক বিশেষ অংশের স্নায়ুগোষ্ঠী সরাসরি কোনও সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও পরোক্ষভাবে অন্য অংশের স্নায়ুগোষ্ঠীকে বিভিন্ন তরঙ্গের (মুখ্যত ৫ রকমের তরঙ্গ হয়— Delta, Theta, Alpha, Beta, এবং Gamma) মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। চেতনার এই দুরূহ কার্যপ্রণালীকে বোঝার চেষ্টাও হচ্ছে অপরিসীম গতিতে। ‘Allan Brain Map’ বলে এক প্রকল্পে আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়ুর জেনেটিক প্রকারভেদ, তাদের নিজেদের মধ্যে আন্তঃসংযোগ, মস্তিষ্কের বিকাশ ও রোগ নিয়ে নিয়মিত কাজ হচ্ছে। ২০১৩ সালে European Commision ‘Human Brain Project’ নামের এক বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের সূচনা করে, এর উদ্দেশ্য ছিল আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়ু সংযোগকে সম্পূর্ণ ভাবে কম্পিউটারে বা ডিজিটালি অনুকরণ করা। এই প্রকল্প যদি সফল হত তাহলে ভবিষ্যতে আমরা হয়ত কোনও প্রিয়জনের স্নায়ু সংযোগকে অনুকরণ করে তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিসত্তাকে ডিজিটালি সংরক্ষণ করে রাখতে পারতাম। কিন্তু যৎসামান্য সফলতা বাদ দিয়ে এই প্রকল্প আজ ব্যর্থ হয়েছে। আমরা যতই বর্তমান যুগের কম্পিউটারের ক্ষমতা নিয়ে গর্ব করি না কেন, এই ব্যর্থতার প্রধান কারণ হিসাবে অপর্যাপ্ত কম্পিউটারের শক্তিকেই তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের মস্তিষ্কের জটিলতা, ক্ষিপ্রতা ও তার বিভিন্ন অংশের একসাথে সূক্ষ্ম ভাবে কাজ করার কৌশলকে অনুকরণ করার ক্ষমতা আপাতত কোনও কম্পিউটারের নেই। কিন্তু সেটা যে নিকট ভবিষ্যতেই সম্ভবপর হবে সে বিষয়ে বৈজ্ঞানিকরা একপ্রকার নিশ্চিত।

আমরা যতই বর্তমান যুগের কম্পিউটারের ক্ষমতা নিয়ে গর্ব করি না কেন, এই ব্যর্থতার প্রধান কারণ হিসাবে অপর্যাপ্ত কম্পিউটারের শক্তিকেই তুলে ধরা হয়েছে। 

চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী মৃত্যু কি এবং কখন একজনকে মৃত বলে ঘোষণা করা যাবে এই ধরনের গবেষণা আবার নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। দেহহীন মস্তিষ্কে চেতনার সঞ্চার করা অথবা অনুকরণ করা গেলে তার নৈতিক, আইনি, ও দার্শনিক প্রভাব কি হবে সেটা আপাতত মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠেনি। তবে ক্রায়োনিক্স, সঞ্জীবনী ও অনুকরণ প্রযুক্তি এখনো অবধি আলদা আলাদা পথে বিকশিত হলেও, অনুমান করা যায় ভবিষ্যতে তাদের সংযোগ অবধারিত। মস্তিষ্কে চেতনার সঞ্চার অদূর ভবিষ্যতেই হলেও, দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সংরক্ষণ, তাদের পুনরুজ্জীবিত করার পদ্ধতি ও প্রতিস্থাপন বিষয়ে যে প্রভূত উন্নতি হবে, সেটা নিশ্চিত ভাবে বলাই যায়।

 

 তথ্যসূত্রঃ

১। https://www.alcor.org/

২। Vrselja Z, et. al. Restoration of brain circulation and cellular functions hours post-mortem. Nature. 2019

৩। The Neurology of Consciousness, Cognitive Neuroscience, and Neuropathology. Second Edition. Elsevier

৪। Allan Brain Map (http://portal.brain-map.org/)

৫। Abbott A. Documentary follows implosion of billion-euro brain project. Nature. 2020

৬। Makin S. The four biggest challenges in brain simulation. Nature. 2019

 

———————————— 

~ কলমে এলেবেলের অতিথি অভিজিৎ চক্রবর্তী ~ 

গাণিতিক জীববিজ্ঞানী অভিজিৎ Indian Institute of Chemical Biology, কোলকাতা থেকে Ph.D এবং বর্তমানে La Jolla Institute for Immunology, San Diego, USA তে গবেষক বিজ্ঞানী। 

 

 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।