বিজ্ঞানের খবর: হিমালয় বিভীষিকা – হড়কা বান

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
192 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

এলেবেলের বিশেষ প্রতিবেদন

কলকাতা, ১৬ই ফেব্রুয়ারী ২০২১ (১৪ই ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে )

প্রকৃতি যেমন আমাদের সবকিছু দিয়ে আগলে রাখে, তেমনই তার রোষ আমাদের ধ্বংস করে দিতে পারে এক নিমেষে। তারই একটি নিদর্শনের সাক্ষী থাকলো উত্তরাখন্ড। নন্দাদেবী হিমবাহের কিছু অংশ ভাঙনের ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা বা হড়কা বান (Flash flood) ভাসিয়ে নিয়ে গেল একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অনেকগুলি গ্রাম। ঘটনাটি ঘটে উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার রেনী গ্রামের কাছে। হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে সৃষ্ট এই হড়কা বান ঋষি গঙ্গার জলপথে অবস্থিত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ভেঙে চুরমার করে দেয় সাথে চাপা পড়ে যায় বহু মানুষ। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী ৫০ জনের মৃতদেহ এখনো অব্দি উদ্ধার করা গেছে, এখনও অনেকে নিখোঁজ। এক সপ্তাহ আগে রবিবারের সকালে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা বার বার মনে করিয়ে দেয় ২০১৩ সালের কেদারনাথে ঘটে যাওয়া এক বিভীষিকাময় ঘটনার, যেখানে মেঘভাঙা বৃষ্টির ফলে হিমবাহসৃষ্ট হ্রদ ভেঙে সৃষ্টি হয়েছিল এমনি এক হড়কা বানের। যা কেড়ে নিয়েছিল ৫০০০-এর বেশি মানুষের প্রাণ এবং আহত হয়েছিল বহু মানুষ। 

প্রকৃতি যেমন আমাদের সবকিছু দিয়ে আগলে রাখে, তেমনই তার রোষ আমাদের ধ্বংস করে দিতে পারে এক নিমেষে।

এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছি আমরা প্রায়শই। আমাদের মানবসভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে আমরা বহু প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে চলেছি। জীবাশ্ম জ্বালানির দহন, কলকারখানার ধোঁয়া সব মিলিয়ে পরিবেশকে দূষিত করে চলেছি। যার ফল স্বরূপ পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই বিশ্বউষ্ণায়নের (Global Warming) দরুন বরফ গলতে শুরু করেছে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে এবং পৃথিবীর অন্যান্য হিমবাহগুলি ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। সংখ্যায় কমে যাচ্ছে মেরু প্রদেশের প্রাণীরা, অনেক প্রাণীই এখন বিলুপ্তির পথে। আমরা এই সমস্ত বিষয় নিয়ে খুব একটা চিন্তান্বিত নই। কিন্তু, যখন এর কু-প্রভাব হঠাৎ করে আমাদের সভ্য সমাজের পরিসরে ঢুকে পরে তখনই কিছু দিনের জন্য আমরা নড়ে চড়ে বসি। খবরের কাগজ, সমাজমাধ্যম, গণমাধ্যমে পরিবেশ নিয়ে ভুড়ি ভুড়ি গুরুগম্ভীর আলোচনা করি। কিন্তু, কিছুদিনের মধ্যে সমস্তটা ভুলে গিয়ে পরিবেশকর্মীদের কথায় কান দেই না।

১৯৭৫ সাল থেকে ২০০০ সালের মধ্যে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে প্রতিবছর প্রায় ০.২৫ মিটার বরফের চাদর উধাও হয়ে গেছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে হিমালয় অঞ্চলে একুশ শতকের শুরু থেকেই হিমবাহের গলন প্রায় দ্বিগুন হয়ে গেছে।

১৯৬০ সালে থেকে হিমালয়ে হিমবাহের পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনা লক্ষ্য করছেন বিজ্ঞানীরা। ১৯৭৫ সাল থেকে ২০০০ সালের মধ্যে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে প্রতিবছর প্রায় ০.২৫ মিটার বরফের চাদর উধাও হয়ে গেছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে হিমালয় অঞ্চলে একুশ শতকের শুরু থেকেই হিমবাহের গলন প্রায় দ্বিগুন হয়ে গেছে। বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত Divecha Centre for Climate Change প্রতিষ্ঠান তাদের একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে উত্তর-পশ্চিম হিমালয়ের উষ্ণতা ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিবছর ০.৬৬ সেন্টিগ্রেড হারে বেড়ে চলেছে। পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ গলা জল দিয়ে হিমবাহ-হ্রদ (Galcier Lake) তৈরী হয়। এই উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়াল অঞ্চলে এমন হ্রদের সংখ্যা ১৯৯০-২০০৯ সালের মধ্যে ৩৩% বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন এই সংখ্যাটা শুধু উত্তরাখন্ড অঞ্চলে নয়, গোটা হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল জুড়ে এমন ঘটনা ঘটছে। চণ্ডিগড়ের Snow and Avalanche Study Establishment (SASE)-এর বিজ্ঞানীদের মতে উত্তর-পশ্চিম হিমালয় অঞ্চল গত ২৫বছর ধরে আরও উষ্ণ ও জলসিক্ত হয়ে চলেছে। হাজার হাজার বছর ধরে যে অঞ্চল অত্যন্ত শীতল অবস্থায় ছিল তা এখন অন্য এক প্রবণতা দেখাতে শুরু করেছে। চামোলির হড়কা বান তাই কেবল সময়ের অপেক্ষা ছিল বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ।

পশ্চিম হিমালয়ে বৃষ্টি ও তুষারপাতের পরিবর্তন চিত্রসূত্র: Kulkarni et al. (2018), based on data by Negi et al. (2018)

গত ৭ই ফেব্রুয়ারীর ঘটনার পর আরও একটি নতুন হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে…… যেখান থেকে দ্বিতীয়বার প্লাবনের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ভাবে অনুমান ছিল অত্যধিক তুষারপাতের ফলে  হিমবাহ অঞ্চলে তুষার ধসের সৃষ্টি হয়, যা কোনো হিমবাহ-হ্রদে গিয়ে পরে অর্থাৎ, গত রবিবারের হড়কা বান হিমবাহ-হ্রদ বিদারণ প্লাবনের (Glacier Lake Outblust Flood-GLOF) ফলে সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, গত ৭ই ফেব্রুয়ারীর ঘটনার পর আরও একটি নতুন হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানাচ্ছে National Diaster Response Force (NDRF) ও Defence Research and Development Organisation (DRDO)। হিমবাহ ভাঙনের স্থান থেকে ৫ কিমি ও তপোবন উদ্ধার কেন্দ্র থেকে ১৭ কিমি দূরে এই হ্রদের সন্ধান পাওয়া যায়, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৩৮৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত, প্রায় ৩৫০মিটার লম্বা (দুটি ফুটবল মাঠের সমান) ও ৬০ কিমি গভীর প্রাকৃতিক বাঁধ দ্বারা বন্ধ। এই হ্রদের জল ও আকার প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখান থেকে দ্বিতীয়বার প্লাবনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে ভারত সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নিরীক্ষণের পর জানিয়েছে আপাতত ভয়ের তেমন কারণ নেই, তবুও তারা সেই হ্রদের দিকে শ্যেন  দৃষ্টি রেখে চলেছেন তাঁরা। 

চিত্রসূত্র: Times of India

দেরাদুনের Wadia Institute of Himalayan Geology (WIHG)-এর একটি বিজ্ঞানীদল ট্রেক করে হিমবাহের ভাঙনস্থলে পৌঁছন, প্রাথমিক বিশ্লেষণের পর তারা জানিয়েছেন রন্থী (Ranthi) হিমবাহ এলাকার তুষার ও পাথর আনততল বরাবর পর্যায়ক্রমে নিচে নেমে এসে পর্বতের একটি খাড়া প্রান্তের (cliff) কাছে জমতে থাকে যা এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটায়। রন্থী (Ranthi) ও মৃগথুনী (Mrigthuni) এই দুই হিমবাহের মাঝামাঝি অঞ্চলে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৬০০ মিটার উচ্চতা থেকে হিমবাহ ধস শুরু হয়, যা ৩৭° আনততল বরাবর ৩ কিমি নিচে নেমে আসে, ৩৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত রন্থী গাদের নদীর বুকে। এই ঘটনার ফলে ওই নদীর ওপর একটি প্রাকৃতিক বাঁধের সৃষ্টি হয়। হড়কা বানের দিনের পূর্বে ৩দিন আবহাওয়া পরিষ্কার থাকায় বরফের জমাট বাঁধা ও গলন প্রক্রিয়া ক্রমান্বয়ে চলতে থাকে, ফলস্বরূপ ঢালের বিচ্যুতি (Slope failure) হয় এবং প্রাকৃতিক বাঁধে জমে থাকা জল, বরফ ও পাথরের টুকরের সংমিশ্রণ নেমে আসে ঋষি গঙ্গার পথ বেয়ে হড়কা বান হিসেবে। 

সেপ্টেম্বর ২০১৫তে তোলা রন্থী শৃঙ্গ চিত্র সৌজন্য: রাজকুমার খোসলা।
০৯ ফেব্রুয়ারী,২০২১ আর্মি চপার থেকে তোলা রন্থী শৃঙ্গ চিত্র সৌজন্য: জন রাওয়াত ভায়া রাজকুমার খোসলা।
গুগল আর্থ চিত্র ঘটনাস্থল চিত্র সৌজন্য: রাজকুমার খোসলা।

যদিও WIGH-এর বিজ্ঞানীগণ প্রারম্ভিক হিমবাহের ধসের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত ভাবে কিছু জানাননি, যে সেই ঘটনার পেছনে মানুষ্যসৃষ্ট দূষণজনিত উষ্ণায়নের হাত রয়েছে নাকি ঘটনাটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক।        

—————————–

~ কলমে এলেবেলে উদ্দালক~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

One thought on “বিজ্ঞানের খবর: হিমালয় বিভীষিকা – হড়কা বান

  • February 18, 2021 at 4:31 am
    Permalink

    ভালো হয়েছে লেখাটা। লেখককে ধন্যবাদ।🙏😊🙏

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।