বিদ্যুৎ বাঁচিয়ে পরিবেশ বাঁচাও

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
303 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

 

সেদিন একটু তাড়াতাড়িই এসেছেন বদ্যি খুড়ো পার্কের মাঠে। একটু বাদে হাঁপাতে হাঁপাতে সুবিমল ঢুকলো। “আর বোলোনা খুড়ো লোডশেডিং-এর দাপটে একেবারে জেরবার হয়ে গেলাম। কি যে করি, কখন যে কারেন্ট আসবে জানিনা। খুড়ো আনমনে কি ভাবছিলেন, হঠাৎ সুবিমলের কথাটার খেই ধরে বললেন, “কি বললি! লোডশেডিং? কথাটার মানে জানিস?”

কি বললি! লোডশেডিং? কথাটার মানে জানিস?

 

“তা আর জানবো না? ছেলে থেকে বুড়ো সবাই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে”, বলে সুবিমল। সঙ্গে যোগ করে “কারেন্টের যখন সমস্যা থাকে তখন সহজ সমাধান হচ্ছে লাইনটা দাও কেটে ব্যাস্। অর্থাৎ কিনা জোর করে তাৎক্ষণিক চাহিদা খানিকটা কমিয়ে দাও। খুড়ো এবারে প্রশ্ন করেন, “এবারে গোড়ার কথাটা বল্ দেখি, কারেন্টের সমস্যা কেন হয়?” সুবিমল বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে, “এলাম একটু বসে হাওয়া খাবো বলে, তা নয়, তোমার এখনই যত প্রশ্ন!”

খুড়ো এবার পকেট হাতড়ে একটা কড়কড়ে নোট বার করে সুবিমলকে বলে “যা তো, সামনের দোকান থেকে দুটো আইসক্রিম কিনে আন। খেতে খেতে গল্প করা যাবে।” একটু ঠান্ডা হয়ে খুড়ো এবারে শুরু করেন— “এই যে বাড়ীতে বসে সুইচ টিপে আলো জ্বালছিস, পাখা ঘোরাচ্ছিস, সেই বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসে বলতো?” সুবিমল বলে, “জানি, বিলক্ষণ জানি। বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে হাইভোল্টেজ সংবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে তা আসে সাবস্টেশনে। সেখানে ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে তার ভোল্টেজ কমিয়ে আনা হয়। পরে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার অন্তর্গত আরও ছোট ছোট ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে তা বাড়িতে ব্যবহারের উপযোগী ভোল্টেজ স্তরে নামিয়ে এনে সেই বিদ্যুৎ বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়।” খুড়ো খুশি হয়ে বলেন, “বাঃ তুই দেখছি অনেক কিছুই জানিস!”

ইতিমধ্যে আলোচনায় যোগ দিয়েছে শুভাশিস। খুড়ো তাকে প্রশ্ন করেন, “বল্ তো, কত রকম ভাবে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়?” বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে শুভাশিসের জবাব “জল বিদ্যুৎ, স্থল বিদ্যুৎ এবং হাওয়া বিদ্যুৎ।” খুড়ো অবাক হয়ে বলেন, “স্থল বিদ্যুৎ না কি একটা বললি? সেটা আবার কি জিনিস?” শুভাশিস অপ্রস্তুত হয়ে বলে “না, না, সরি তাপ বিদ্যুৎ”। “সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা শুনেছিস?” খুড়ো প্রশ্ন করেন। শুভাশিসের উত্তর “শুনবো কেন, নিজের চোখেই দেখেছি সুন্দর বনে।” এবারে সুবিমল বলে “ইদানীং এই শহরেও অনেক জায়গায় দেখবে রাস্তার আলো জ্বলে সৌর বিদ্যুতে।” আর শুভ যে বায়ুচালিত যন্ত্রের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলেছে তা আমি দেখেছি তামিলনাডু আর গুজরাটের সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে— ওখানে বছরের সবসময়েই খুব হাওয়া থাকে।”

আমাদের পৃথিবীর বুকে প্রস্তরীভূত জ্বালানী বা ফসিল ফুয়েল, যাকে আমরা সোজা বাংলায় কয়লা এবং পেট্রলিয়ামজাত জ্বালানী বলে থাকি তার পরিমাণ কিন্তু ক্রমশঃ কমে আসছে।

খুড়ো বললেন, “মন দিয়ে শোন্। আমাদের পৃথিবীর বুকে প্রস্তরীভূত জ্বালানী বা ফসিল ফুয়েল, যাকে আমরা সোজা বাংলায় কয়লা এবং পেট্রলিয়ামজাত জ্বালানী বলে থাকি তার পরিমাণ কিন্তু ক্রমশঃ কমে আসছে। এ দিয়ে আর বেশি দিন চলবে না। তখন এই অতিকায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিকে জ্বালানী যোগাবে কে? তাছাড়া এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি থেকে মারাত্মক দূষণ ছড়ায়, তা জানিস? চিমনি থেকে নির্গত ছাই ছাড়াও সালফার ডাই-অক্সাইড ও ট্রাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইডের মত গ্যাস এবং সীসা, নিকেলের মত ভারী ধাতু ইত্যাদি বাতাসের সঙ্গে মিশে আশেপাশের পরিবেশকে ভীষণ ভাবে দূষিত করে। এবারে তাই সময় এসেছে অপ্রচলিত শক্তির দিকে তাকাবার। এই শক্তি প্রকৃতির দান— প্রকৃতি প্রতিনিয়তই এর যোগান দিয়ে যাচ্ছে; যেমন সূর্যের আলো, জল, বায়ু, সমুদ্রের জোয়ার-ভাঁটা ইত্যাদি। তাই এর আর এক নাম ‘নবায়নযোগ্য শক্তি’ অথবা ‘রিনিউয়েবল এনার্জি’।” 

আজকের দিনে আমাদের দেশে বিদ্যুতের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা মোটামুটি ৩৭৫ গিগা ওয়াটের কাছাকাছি যার প্রায় ৮০ শতাংশই হচ্ছে তাপ বিদ্যুৎ। প্রায় ১৩৭ কোটি মানুষের দেশে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা কিন্তু ক্রমশঃ বাড়তেই থাকবে। যেহেতু এর সিংহভাগই হচ্ছে তাপ বিদ্যুৎ, তাই পাল্লা দিয়ে বাড়বে দূষণ। তাই আমাদের লক্ষ হওয়া উচিত যথা সম্ভব বিদ্যুতের অপচয় রোধ করা, অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং প্রাকৃতিক শক্তিকে আমাদের দৈনন্দিন কাজে কতটা লাগানো যায় সে ব্যাপারে সচেষ্ট হওয়া। 

অতিকায় তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প বা সুপার থারমাল পাওয়ার প্ল্যান্টগুলি যে পরিমান বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে তা কি তোমার এই অপ্রচলিত শক্তির মাধ্যমে মেটানো সম্ভব?

এবারে শুভাশিসের প্রশ্ন, “অতিকায় তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প বা সুপার থারমাল পাওয়ার প্ল্যান্টগুলি যে পরিমান বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে তা কি তোমার এই অপ্রচলিত শক্তির মাধ্যমে মেটানো সম্ভব? খুড়ো বলেন, “তোর প্রশ্ন খুবই যুক্তি সম্মত। বিকল্প একটা আছে বটে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তার দূষণের মাত্রাও নামমাত্র। কিন্তু অসাবধানতা বশতঃ কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তার পরিণতি হবে মারাত্মক এবং পরিবেশ দূষণ হবে ভয়াবহ। “খুড়োর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সুবিমল বলে, “বুঝেছি তুমি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা বলছ। আমেরিকার থ্রি মাইল আইল্যান্ড এবং ইউক্রেনের চের্নোবিল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াবহ দুর্ঘটনার কথা কে না জানে?” খুড়ো বলেন, “দ্যাখ, পারমাণবিক বিদ্যুৎ তৈরির আর একটা সমস্যা হল পরমাণুচুল্লীর জ্বালানী সংগ্রহ। এই জ্বালানী বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয় এবং তার সমস্যাও অনেক। আন্তর্জাতিক চুক্তি মাফিক, অনেক শর্ত সাপেক্ষে তা ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া যায়।” কথা বলতে বলতে খুড়ো আনমনা হয়ে যান, দৃষ্টি তাঁর দূরে নিবদ্ধ, কণ্ঠে জড়তা। “দ্যাখ্ একটা কথা তোদের বলে রাখি যে, সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে পরিবেশের একটা সংঘাত কিন্তু অনিবার্য। শিল্পোন্নত দেশগুলি দূষণ ছড়াচ্ছে কিন্তু তার মূল্য চুকাতে হচ্ছে কাকে? না সমগ্র পৃথিবীকে। এ জিনিস কিন্তু বেশিদিন চলতে পারেনা।” 

সুবিমল খানিকটা অধৈর্য হয়েই বলে ফেলে, “খুড়ো তুমি কিন্তু লোডশেডিং থেকে ব্যাপারটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলে। খুড়ো হেসে বলেন, “না রে, আমি তো এতক্ষণ ভূমিকা করছিলাম। আসল কথাটা এবারে শুরু করব। মজার কথাটা কি বুঝলি, বিদ্যুৎ এমনি একটা জিনিস যা মজুত করা যায় না। তাই তার উৎপাদন আর চাহিদার মধ্যে সমতা বিঘ্নিত হলেই হয় লোডশেডিং না হয় উৎপাদন ছাঁটাই। কোন এক সময়ে বিদ্যুৎ যতটা উৎপন্ন হবে ঠিক সেই সময়েই তা বিদ্যুৎ বন্টণ ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে খরচ করার জন্য— এর ব্যতিক্রম ঘটলে তার প্রভাব গিয়ে পড়বে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেনারেটর এবং টার্বাইনের ওপর। জেনারেটর এবং টার্বাইন কাকে বলে তা আশা করি তোদের বুঝিয়ে বলতে হবে না। “শুভাশিস বলে আমাদের এতটা অজ্ঞ ভেবোনা খুড়ো। বয়লারে কয়লা জ্বালিয়ে বাষ্প তৈরি হয়; সেই বাষ্প কাজে লাগিয়ে টার্বাইন ঘোরানো হয়। যেহেতু টার্বাইনের শ্যাফট বা দন্ডের সঙ্গে জেনারেটর শ্যাফট গীয়ারের মাধ্যমে যুক্ত থাকে, তাই টার্বাইনের সঙ্গে জেনারেটরও ঘুরতে থাকে এবং তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।” 

খুড়ো বলেন, “বাঃ ভালই বলেছিস। এবারে শোন। জেনারেটর যখন তার নির্দিষ্ট গতিবেগে ঘোরে তখন তার ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্ক হয় ৫০ হার্জ। এবারে উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বাড়লে জেনারেটরের গতিবেগ যায় কমে এবং বয়লার থেকে আরও বাষ্প বাড়িয়ে টার্বাইন ও জেনারেটরেকে তার নির্ধারিত গতিবেগে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকলে সেটা আর সম্ভব হয়না। তখন ফ্রিকোয়েন্সি  ৫০ হার্জ থেকে ক্রমশঃ কমতে থাকে। ভারতীয় বিদ্যুৎ আইন অনুযায়ী এই ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্কর তারতম্য +/- ৩ % এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে— অর্থাৎ তা থাকবে  ৪৮.৫ এবং ৫১.৫ এর মধ্যে। ফ্রিকোয়েন্সির এই কমে যাওয়াটা কিন্তু জেনারেটরের পক্ষে খুব ক্ষতিকর।” এবারে সুবিমলের প্রশ্ন, “তাহলে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কি ভাবে সম্ভব?” খুড়োর উত্তর, “এই পরিস্থিতিতে জেনারেটরকে বাঁচাতে এক মাত্র উপায় তাকে বিদ্যুতের গ্রীড থেকে বিচ্ছিন্ন করা। কিন্তু এর ফলে বিদ্যুতের জোগান যাবে আরো কমে, ফ্রিকোয়েন্সির পতনের হার যাবে বেড়ে এবং ভোল্টেজ যাবে কমে। তার ফলে অন্যান্য জেনারেটরকেও পর্যায়ক্রমে বিচ্ছিন্ন করতে হবে গ্রীড থেকে— যার ফলে শেষ পর্যন্ত গ্রিডের সমূহ পতন অবশ্যম্ভাবী। এরকম ঘটনা অনেক আগে বার দু’য়েক ঘটেছে তোর মনে আছে নিশ্চয়।” “তাহলে এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বাঁচার উপায় কি?” প্রশ্ন করে সুবিমল।” “ফিডার অর্থাৎ প্রতিটি লাইনের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী এক এক করে তা বিচ্ছিন্ন করা” খুড়োর নিঃস্পৃহ উত্তর। “আগে এই কাজটা হতো কন্ট্রোল রুমের অপারেটর দ্বারা। বর্তমানে কম্প্যুটার চালিত লোড ডেস্প্যাচ সেন্টারের মাধ্যমে ফিডার গুলি বিচ্ছিন্ন করা হয় যতক্ষণ না বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয় সাধন হচ্ছে”— খুড়োর সংযোজন।

আগে এই কাজটা হতো কন্ট্রোল রুমের অপারেটর দ্বারা। বর্তমানে কম্প্যুটার চালিত লোড ডেস্প্যাচ সেন্টারের মাধ্যমে ফিডার গুলি বিচ্ছিন্ন করা হয় যতক্ষণ না বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয় সাধন হচ্ছে।

সুবিমল খানিকটা স্বগতোক্তির স্বরে বলে, “লোডশেডিং-এর ব্যাপারটা তাহলে অতো সহজ নয়— বেশ জটিল দেখছি।” খুড়ো এই সঙ্গে একটা আশার বাণীও শোনালেন— “আজকাল নিশ্চয়ই লক্ষ করেছিস যে এই লোডশেডিং ব্যাপারটা আগের থেকে অনেকটাই কমেছে। তার কারণ কি জানিস? দেশের অতিকায় তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি বর্তমানে ২২০ কেভি এবং ৪০০ কেভি ট্রান্সমিশন বা বিদ্যুৎ সংবহন লাইন দ্বারা বিভিন্ন আঞ্চলিক গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত। এই আঞ্চলিক গ্রিডগুলি আবার পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে জাতীয় গ্রিড গঠন করেছে। কোন এক অঞ্চলে বিদ্যুতের ঘাটতি হলে জাতীয় গ্রিডের মধ্য দিয়ে অন্য অঞ্চল থেকে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ এনে সেই ঘাটতি পূরণ করা হয়। এই আন্তঃরাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন ব্যবস্থা পরিচালিত হয় কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশন দ্বারা।

শুভাশিস বলে, “লোডশেডিংয়ের দাপট সন্ধ্যে বেলাতেই সবচেয়ে বেশি কেন বলতো খুড়ো।” “খুবই সহজ— এটা বুঝলি না? কারণ বিদ্যুতের চাহিদা সন্ধ্যে বেলাতেই সবচেয়ে বেশী থাকে। মোটামুটি সন্ধ্যে ৬ টা থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত— এই সময়টাকে বলে ‘পিক আওয়ার’ বা ‘ব্যস্ত সময়’ যখন বিদ্যুতের চাহিদা তুঙ্গে থাকে। আবার গভীর রাতে অর্থাৎ ‘অফ পিক আওয়ার’ বা ‘মন্দা সময়ে’ দেখবি কিছু কলকারখানা ছাড়া বিদ্যুৎ খরচ করার জন্য কোন গ্রাহকই খুঁজে পাবিনা” বলেন খুড়ো। সুবিমলের প্রশ্ন, “তাহলে রাতে কিছু জেনারেটর বন্ধ করে দেওয়া হয় না কেন?” খুড়ো হেসে বলেন, “এটা কি তোর পাড়ার জেনারেটর যে যখন খুশি চালাবি আর যখন খুশি বন্ধ করে দিবি? তবে বিদেশের কিছু কিছু জায়গায় যেখানে প্রাকৃতিক গ্যাস সহজলভ্য, সেখানে গ্যাস টার্বাইন চালিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সংস্থাগুলি তাদের উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম। আবার প্রয়োজন না হলে তা বন্ধ করে উৎপাদন কমিয়েও দিতে পারে। এই জেনারেটরগুলি ‘স্পিনিং রিজার্ভের’ কাজ করে।”

“তাহলে এই ‘ব্যস্ত সময়’ কালের লোডশেডিং থেকে বাঁচবার কি কোন রাস্তাই নেই?” প্রশ্ন শুভাশিসের। খুড়ো বলেন “আছে রে আছে, নিশ্চয়ই আছে। সেই কথাটাই বলতে যাচ্ছি তোদের। টাইম অফ ডে বা সংক্ষেপে TOD tariff বা শুল্ক ব্যবস্থা অনুযায়ী দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দামে বিদ্যুৎ বিক্রীর একটা ব্যবস্থা চালু আছে। এর ফলে কোন কলকারখানায় সন্ধ্যে বেলায় বিদ্যুৎ খরচ করলে তার জন্য চড়া দাম দিতে হয়, কিন্তু মাঝরাতে সেই বিদ্যুৎই আবার পাওয়া যায় স্বল্প খরচায়। এর ফলে ‘পিক আওয়ার‘ বা ‘ব্যস্ত সময়’ কালের বিদ্যুতের ব্যবহারের উপর খানিকটা লাগাম টানা সম্ভব হয়েছে।” সুবিমল ফোড়ন কাটে “তোমার এই TOD শুল্ক ব্যবস্থাটা কেমন জানো? যেমন কালীপুজোর সময় যে ফুলকপিটার দাম কুড়ি টাকা সেটাই আবার সরস্বতী পুজোর সময় বিকোয় পাঁচ টাকায়।” খুড়ো হেসে বলেন, “হ্যাঁ ঠিকই ধরেছিস। এই শুল্ক ব্যবস্থার সুবিধাটা কাজে লাগিয়ে জাপানী প্রযুক্তির সাহায্যে আমদের রাজ্যে তৈরি হয়েছে ‘পাম্প স্টোরেজ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প’ সে খবর রাখিস?” সুবিমল আর শুভাশিসের মুখের ভাব দেখে হতাশ হয়ে তিনি বলেন, “সে খবর আর রাখবি কেন? খবরের কাগজ খুলেই তো যত মারামারি, খুনোখুনি আর সিনেমার খবর এই সব গিলবি! আমাদের ঘরের কাছে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে এই রকম একটা প্রকল্প তৈরি হয়েছে।” “হ্যাঁ হ্যাঁ খুড়ো মনে পড়েছে! অযোধ্যা পাহাড়ে আপার ড্যাম আর লোয়ার ড্যাম দেখেছিলাম মনে আছে।” “এই আপার ড্যাম বা পাহাড়ের মাথায় তৈরি কৃত্রিম জলাধার থেকে পিক আওয়ারে জল ছেড়ে জলবিদ্যুৎ তৈরি হয় যা ঐ সময়কার ঘাটতি মেটাতে কিছুটা সহায়ক হয় এবং সেই সঙ্গে বিক্রীও হয় চড়া দামে। ঐ জল সঞ্চিত হয় লোয়ার ড্যামে বা পাহাড়ের পাদদেশের জলাধারে এবং পাম্প চালিয়ে তা উপরে তোলা হয় মাঝ রাতে যখন বিদ্যুতের দাম অনেক কম থাকে।”

পাম্প চালিত সঞ্চিত-জল দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদন

“মজার কথা হল যে টার্বাইন এবং জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে, সেই জেনারেটরই আবার উল্টোদিকে ঘুরে মোটর হিসেবে চলবে এবং টার্বাইন পাম্পের কাজ করবে। রাত্রি বেলায় এই পাম্প চলার ফলে ‘অফপিক আওয়ার’ বা মন্দার সময়েও অনেকটাই বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে। তার ফলে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির পরিচালনাগত কার্যকারিতা এবং দক্ষতা অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে।”

 খুড়োর সংযোজন; “এবারে তোদের আরেক রকম tariff বা শুল্ক ব্যবস্থার কথা বলব।” “তুমি যেরকম ট্যারিফের পর ট্যারিফের হিসেব দিয়ে যাচ্ছ তাতে তোমাকে তারিফ্ না করে পারছিনা” বলে শুভাশিস। “এবারে যে ট্যারিফের কথা বলব তার নাম availability based tariff বা সংক্ষেপে ABT। এই শুল্ক ব্যবস্থা অনুযায়ী বিদ্যুতের উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা বেড়ে গেলে অর্থাৎ ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্ক ৫০ হার্জ থেকে নীচে নেমে গেলে বিদ্যুতের কেনা ও বেচা দুটোই হবে চড়া দামে। আবার চাহিদা কমে গেলে ফ্রিকোয়েন্সি যখন বেড়ে ৫০ হার্জ-এর উপরে উঠে যাবে তখন বিদ্যুতের কেনা ও বেচা দুটোই হবে সস্তা দামে। যেখানে এই ABT ব্যবস্থা চালু আছে সেখানে কিন্তু এর সুফল ইতিমধ্যেই পাওয়া গেছে, অর্থাৎ সঙ্কটের সময় অধিক বিদ্যুৎ নেবার প্রবণতা অনেকটাই কমেছে।”  

সুবিমল মুচকি হেসে বলে “নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখার দুটোই মাত্র রাস্তা আইন আর ফাইন। ঠিক কিনা বলো খুড়ো।” খুড়ো গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে সায় দেন “হ্যাঁ তাইতো দেখছি। তবে একটা কথা মনে রাখিস, এই যে দুটো শুল্ক ব্যবস্থার কথা আলোচনা করলাম তা কিন্তু কলকারখানা বা বিদ্যুতের বড় উপভোক্তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য— আমাদের বাড়ীর জন্য নয়।”

“বিদ্যুৎ (ক্রেতা সুরক্ষা) আইন ২০২০ যেটা সম্প্রতি বিজ্ঞাপিত হয়েছে তাতে ক্রেতার ক্ষমতায়নের সম্পর্কে বেশ কয়েকটা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য হল, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলি গ্রাহকদের কাছে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবার জন্য দায়বদ্ধ থাকবে, অন্যথায় তারা গ্রাহককে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। তাহলে তোরা বুঝতে পারছিস যে লোডশেডিং না কমাতে পারলে বিদ্যুৎ সংস্থাগুলির ব্যবসাও মার খাবে। দ্বিতীয় একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হল Producer বা উৎপাদক এবং Consumer বা গ্রাহক এই দুইয়ে মিলে তৈরি হল এক নতুন সংজ্ঞা— Prosumer যার বাংলা প্রতিশব্দ আমরা ‘হাঁসজারুর’ অনুকরণে রাখতে পারি ‘উৎপাহক’। এই বিশেষ শ্রেনীতে তারাই গন্য হবে যারা একাধারে বিদ্যুৎ কেনে ও বেচে।” “ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। একটু খুলে বলবে?” সুবিমলের প্রশ্ন। একটানা অনেকক্ষণ বকবক করে  খুড়োর গলা শুকিয়ে গেছে তাই খুড়োর আদেশে সুবিমল আর শুভাশিস পাশের মদনের দোকান থেকে চা আনতে গেল। চায়ে গলা ভিজিয়ে নিয়ে খুড়ো আবার শুরু করেন। “ধর তোরা বাড়ির ছাদে একটা সৌর প্যানেল লাগালি। তা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ খরচ করেও কিছু উদ্বৃত্ত থাকলো। তখন সেই  উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ তুই যে সংস্থার কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনেছিলি তাদেরই আবার বিক্রি করতে পারবি। এর ফলে লোকের মধ্যে অপ্রচলিত বিদ্যুৎ তৈরির প্রবণতা বাড়বে আর পরিবেশও বাঁচবে। কি এবারে বিষয়টা পরিষ্কার হল তো?”

আমরা যখন দেখছি যে আমাদের দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন চাহিদার কাছাকাছি পোঁছতে পারছে না তখন আমরা চাহিদা কমানোর দিকে কি দৃষ্টি দিতে পারিনা?

সুবিমল এই প্রসঙ্গে একটা প্রস্তাব রাখে “আমরা যখন দেখছি যে আমাদের দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন চাহিদার কাছাকাছি পোঁছতে পারছে না তখন আমরা চাহিদা কমানোর দিকে কি দৃষ্টি দিতে পারিনা? এই বিষয়ে কি আমাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই?” খুড়ো খুশি হয়ে বলেন “খুবই ভাল প্রস্তাব তোর। এই রকম একটা চিন্তা যে তোর মাথায় এসেছে তার জন্য তোকে সাধুবাদ না জানিয়ে পারছিনা। তুই যে কথাটা বললি সেটা হচ্ছে চাহিদা পরিচালনা বা ডিমান্ড সাইড ম্যানেজমেন্টের মূল কথা। আমাদের ভাববার সময় এসেছে যে বিদ্যুতের ব্যয় সংকোচনে আমরা কতটা আন্তরিক! আমরা কি আমাদের বাড়ীতে যথাসম্ভব বিদ্যুৎ অপচয় রোধক যন্ত্রপাতি বা এনার্জি এফিসিয়েন্ট গ্যাজেট ব্যবহার করছি? আমরা কি প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার বাড়িয়ে দিনের বেলায় কৃত্রিম আলোর ব্যবহার কমাতে পেরেছি? আমরা কি বৈদ্যুতিক গীজারের পরিবর্তে সৌর শক্তি পরিচালিত জল গরম করার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছি? সর্বোপরি আমাদের বাড়ী কতখানি পরিবেশ-বান্ধব যাতে তাকে গ্রীন বিল্ডিং-এর আখ্যা দেওয়া যায়?” শুভাশিস বলে, “খুড়ো আজকাল এই গ্রীন বিল্ডিং কথাটা খুব শুনি। একটু ভেঙ্গে বলবে?” “দ্যাখ্, অনেকগুলি প্যারামিটার বা পরিমাপক বিশ্লেষণ করে একটা বিল্ডিংকে গ্রীন বিল্ডিং-এর মর্যাদা দেওয়া হবে কিনা তা ঠিক করা হয়। সাধারণতঃ নতুন কোন বাড়ী যেগুলো এইসব মানদণ্ডের কথা মাথায় রেখে তৈরি হয় সেগুলিই এই তকমা পেতে পারে। পরে কোনো দিন সময় সুযোগ মত এই নিয়ে আলোচনা করা যাবে।”

“একটা কথা মনে রাখিস, এক ইউনিট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অর্থ হল এক ইউনিট বিদ্যুতের চাহিদা কমল, যা এক ইউনিট কম বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমার্থক। যার অর্থ আনুপাতিক হারে পরিবেশ দূষণকারী গ্যাসের পরিমান কমল, পৃথিবীর ওজোন স্তরের ক্ষয় কিছুটা কমল, পৃথিবী কিছুটা শীতল হল। আমাদের সবার ছোট ছোট প্রচেষ্টার সম্মিলিত ফল কিন্তু সুদূর প্রসারী। দেশের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভেবে আমরা কি এইটুকু সচেতন হতে পারি না?”

—————————–

~ কলমে এলেবেলের অতিথি দেবাশীষ দাশগুপ্ত ~

দেবাশীষ একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রযুক্তিবিদ

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

2 thoughts on “বিদ্যুৎ বাঁচিয়ে পরিবেশ বাঁচাও

  • February 27, 2021 at 4:03 am
    Permalink

    লেখাটিতে খুব ভালোভাবে বক্তব্যকে উপস্থাপিত করা হয়েছে। সুন্দর লেখাটি উপহার দেওয়ার জন্য সাধুবাদ জানাচ্ছি লেখককে। আরো আরো লেখা পেতে উৎসুক রইলাম ভবিষ্যতে।

  • February 27, 2021 at 7:24 am
    Permalink

    ধন্যবাদ। ভবিষ্যতে সুযোগমত আরো লেখার ইচ্ছা রইলো।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।