আধুনিক শল্যচিকিৎসার অগ্রদূত: জোসেফ লিস্টার

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
158 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

 

 

সম্প্রতি করোনার দৌলতে দায়ে পড়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে আমরা সকলেই কম-বেশি ওয়াকিবহাল। নিজেকে অনেক বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হচ্ছে আমাদের, অনেক সময় সহজাত আলস্যকে দূরে ঠেলেও। এর আগে আমাদের একটা ধারণা ছিল যে জীবাণু-মুক্তকরণ প্রধানত হাসপাতাল বা নার্সিং-হোম বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আবশ্যক কর্মসূচি, যাতে সংক্রমণ না ছড়িয়ে পড়ে রোগী বা তার পরিবারবর্গের মধ্যে। যে কারণে চরম সচেতনতা অবলম্বন করা হয় অস্ত্রোপচারের সময়। কিন্তু ভাবলে অবাক লাগবে একটা সময় ছিল যখন এসব কিছুই পালন করা হতো না চিকিৎসাক্ষেত্রে। অস্ত্রোপচারের আগে, পরে বা অস্ত্রোপচারকালীন কোনোরকম নির্বীজন প্রক্রিয়া অবলম্বন করার ধারণা তৈরী হয়নি সেই সময়। এমনকি অস্ত্রোপচারের আগে হাত ধোয়ার চল পর্যন্ত ছিল না। শল্য-চিকিৎসকরা আগে ব্যবহৃত, রক্ত-প্রলিপ্ত অ্যাপ্রন পরিধান করেই তাঁদের কর্ম  সম্পাদন করতেন। চিকিৎসকের পোশাকের অপরিচ্ছন্নতা তাঁর অভিজ্ঞতার মাপকাঠি বলে মনে করা হতো। তাই চিকিৎসকেরা অপরিষ্কার পরিচ্ছদ অঙ্গে ধারণ করেই গর্বের সাথে অস্ত্রোপচার কক্ষে প্রবেশ করতেন।

 

তাই চিকিৎসকেরা অপরিষ্কার পরিচ্ছদ অঙ্গে ধারণ করেই গর্বের সাথে অস্ত্রোপচার কক্ষে প্রবেশ করতেন।

 

আমি বলছি ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ এবং তার আগের কথা। সেই সময় দেখা যেত প্রায় অর্ধেক রোগী মারা যাচ্ছে অস্ত্রোপচারের পর। কারণ রোগীর অস্ত্রচিকিৎসার স্থান থেকে দেহে পচন ধরছে। মনে করা হতো যে অস্ত্রোপচারের ফলে দেহের অনাবৃত স্থান “দূষিত বাতাস”-এর সংস্পর্শে আসার ফলে এমনটা ঘটছে। চিকিৎসকদের দেওয়া রোগী সংক্রান্ত খুবই  নিয়মিত একটা বিবরণ ছিল “অস্ত্রোপচার সফল। কিন্তু রোগী মৃত।” এর থেকে চরম পরিহাস আর কি হতে পারে?— রোগ মুক্তির জন্য চিকিৎসা করা হলো, রোগের কারণ নির্মুল হলো; কিন্তু চিকিৎসার ফলে অন্য একটি হেতুর উদ্ভব হলো— প্রাণটি রক্ষা করা গেলো না। এই অবস্থা শল্যচিকিৎসা-বিজ্ঞানকে চরম প্রশ্ন আর পরীক্ষার মুখে দাঁড় করালো। সেই পরিস্থিতি থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রকে উদ্ধার করে যিনি শল্যচিকিৎসায় বিপ্লব আনেন, সেই ব্যক্তির নাম জোসেফ লিস্টার। তাঁকে “আধুনিক অস্ত্রচিকিৎসা-শাস্ত্রের জনক” বলে মনে করা হলেও তিনি সেই বিজ্ঞানী-সম্প্রদায়ের মধ্যে পড়েন, যাঁদের বৈপ্লবিক অবদানের কথা মানবজাতি সেভাবে মনে রাখেনি।  “কয়েকজন বিখ্যাত বিজ্ঞানীর নাম বলতো দেখি…” বললে লিস্টারের নাম বহু-সংখ্যক সম্ভাব্য তালিকার একটিতেও আসবে না, এ ব্যাপারে আমি মোটামুটি নিশ্চিত। যদিও ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি মানব-কল্যাণে তাঁর অবদান সেই পর্যায়ে কার্যকর, যাতে আরো বেশি খ্যাতি তাঁর প্রাপ্য ছিল। এতে অবশ্য আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, কারণ মানব সভ্যতার ইতিহাস অনেক সময়ই এই ধরণের উপেক্ষা দেখতে অভ্যস্ত।

 

রোগ মুক্তির জন্য চিকিৎসা করা হলো, রোগের কারণ নির্মুল হলো; কিন্তু চিকিৎসার ফলে অন্য একটি হেতুর উদ্ভব হলো— প্রাণটি রক্ষা করা গেলো না।

 

জোসেফ লিস্টার ১৮২৭ সালের ৫ই এপ্রিল ইংল্যান্ডের এসেক্স কাউন্টিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জোসেফ জ্যাকসন লিস্টার ছিলেন ইংল্যান্ডের একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এবং রয়্যাল সোসাইটির ফেলো। আলোক অণুবীক্ষণ যন্ত্রের জন্য “অ্যাক্রোমেটিক লেন্স” প্রস্তুতিতে তাঁর বিশেষ অবদান আছে। পিতার কাছ থেকে তিনি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের ব্যবহার শেখেন। কৈশোর লিস্টারের মধ্যে ভবিষ্যতে একজন শল্য-চিকিৎসক হওয়ার অভীপ্সা তৈরি হয়। তিনি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন মেডিকেল স্কুল-এ একজন চিকিৎসা-বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে নথিভুক্ত হন ১৮৪৮ সালে। ১৮৫২ সালে তিনি “ব্যাচেলর অফ মেডিসিন” ডিগ্রী অর্জনসহ স্নাতক হন এবং পরের বছর রয়্যাল কলেজ অফ সার্জনস-এর বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। লিস্টারের প্রথম কর্মক্ষেত্র ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরা। এডিনবরাতে থাকাকালীন তাঁর পরিচয় হয় অ্যাগনেস সাইমের সাথে। চিকিৎসক-সমৃদ্ধ পরিবারে বেড়ে ওঠা অ্যাগনেসের চিকিৎসা-শাস্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা এবং চিকিৎসা-বিষয়ক জ্ঞান তাঁকে মুগ্ধ করে। ১৮৫৬ সালে তাঁরা একসাথে পথ চলার অঙ্গীকার করেন। সেই প্রতিশ্রুতি সফলও হয়েছিল; অ্যাগনেস আজীবন লিস্টারের চিকিৎসা-সংক্রান্ত গবেষণাকে আন্তরিকভাবে সমর্থন করে গেছেন এবং বীক্ষণাগারে তাঁর পাশে থেকে সাহায্য চালিয়ে গেছেন।

 

পাস্তুর এই জীবাণু-দূরীকরণের তিনটি পদ্ধতির উল্লেখ করেন; পরিস্রাবণ, তাপ-প্রয়োগ এবং রাসায়নিকের ব্যবহার।

 

এডিনবরার পর্যায় শেষ করে লিস্টার গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে শল্যচিকিৎসার অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন ১৮৬১ সালে। সেখানে কর্মরত অবস্থায় অস্ত্রচিকিৎসার পর সংক্রমণে প্রায় ৫০ শতাংশ রোগীর মৃত্যু তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। সেই সময় প্রচলিত “দূষিত বাতাস”-এর ধারণা তিনি গ্রহণ করেননি। সেটা ছিল ১৮৬৫ সাল, যখন তিনি বিখ্যাত ফরাসী বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের অণুজীব-তত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত হন। লুই পাস্তুর এই মতবাদ উত্থাপন করেন যে, আমাদের চারপাশে বেশ কিছু প্রকার আণুবীক্ষণিক জীব উপস্থিত, যাদের চোখে দেখা না গেলেও, তারা উৎসেচন এবং রোগ-সৃষ্টির ক্ষমতা রাখে। লিস্টারের বিশ্বাস জন্মাল এই অদৃশ্য জীববর্গই ক্ষতস্থানে সংক্রমণ সৃষ্টি করছে। পাস্তুর এই জীবাণু-দূরীকরণের তিনটি পদ্ধতির উল্লেখ করেন; পরিস্রাবণ, তাপ-প্রয়োগ এবং রাসায়নিকের ব্যবহার। প্রথম দুটি প্রণালীর প্রয়োগ তো রোগীর ক্ষতস্থানে করা যাবে না, সুতরাং বাকি থাকে তৃতীয় উপায়। সেই সময় কাঠের পচন রোধে এবং সুয়েজ খালের জল পরিশোধনে কার্বলিক অ্যাসিড ব্যবহারের কথা জানা ছিল। রসায়নবিদ ফ্রিইদলিব ফার্ডিনান্ড রুংগে সর্বপ্রথম ১৮৩৪ সালে কোল টার থেকে কার্বলিক অ্যাসিড— যার রাসায়ানিক নাম ফেনল, নিষ্কাশন করেন। লিস্টার স্থির করলেন তিনি এই ফেনল অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করবেন। অস্ত্রোপচার কক্ষে উপস্থিত সমস্ত সহকারী শল্যচিকিৎসকদের নির্দেশ দেওয়া হলো অস্ত্রোপচারের আগে এবং পরে ফেনলের ৫% জলীয় দ্রবণে সযত্নে হাত ধোয়ার, পরিষ্কার পোশাক পরিধান করার এবং অস্ত্রচিকিৎসা চলাকালীন গ্লাভস ব্যবহার করার। অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিও ওই একই দ্রবণে পরিশোধন করা হলো এবং চিকিৎসা কক্ষেও কার্বলিক অ্যাসিড ছেটানো হলো। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, অস্ত্রোপচারের পর রোগীর চিকিৎসা স্থান পরিষ্কার করে, ফেনল দ্রবণ প্রয়োগ-সহ ব্যান্ডেজ বাঁধা এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর এই পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি, যাকে আমরা এখন “ড্রেসিং” বলে জানি— তার চল শুরু হয়। লিস্টার এই আধুনিক পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচারের সূচনা করেন ১৮৬৫ সালের  শেষার্ধে। প্রথম প্রয়োগেই এই নতুন কার্যধারার সাফল্য প্রকাশিত হল। তিনি চিকিৎসাক্ষেত্রে এই পদ্ধতির উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যান, এবং তাঁর গবেষণালব্ধ ফল ছয়টি ধারাবাহিক নিবন্ধে চিকিৎসা-বিজ্ঞানের বিখ্যাত পত্রিকা “দ্য ল্যানসেট“-এ প্রকাশ পায় ১৮৬৭ সালে। তো কীভাবে কাজ করে এই জীবাণু-নিরোধক? আণুবীক্ষণিক রোগ-সৃষ্টিকারী জীবের দেহে যে উৎসেচক প্রোটিন থাকে, তারাই প্রধানত জীবাণুর কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। জীবাণু-নাশকের কাজ হচ্ছে জীবাণুর দেহে প্রবেশ করে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এইসব প্রোটিনের প্রকৃতিগত ধর্মকে নষ্ট করে ফেলা, যার ফলে অণুজীবেরা আর তাদের ক্ষতিকারক ক্রিয়া সম্পাদন করতে পারবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাসায়নিক পচন-নিবারক, জীবাণুর কোষপর্দা ধংস করে অথবা কোষপর্দার মধ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় পদার্থের সঞ্চলন রোধ করে, জীবাণুর সক্রিয়তা বিনাশ করে। ১৮৬৫ থেকে ১৮৬৯ সালের মধ্যে দেখা গেলো জীবাণুমুক্তকরণ প্রক্রিয়ায় অস্ত্রোপচারের ফলে অস্ত্রচিকিৎসার পর রোগীর মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশের কাছাকাছি থেকে ১৫ শতাংশে এসে দাঁড়ালো। লিস্টারের প্রদর্শন করা অস্ত্রচিকিৎসা পদ্ধতি প্রভূত সাফল্য লাভ করলেও, যে কোনো নতুন মতধারা প্রতিষ্ঠার প্রথমদিকে যেমন সমালোচনার মুখে পড়তে হয়, এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তবে সময়ের সাথে তাঁর  প্রস্তাবিত অস্ত্রচিকিৎসা-পদ্ধতি সার্বিক ভাবে গৃহীত হয়। বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন প্রচলিত বিষয়ের মান-উন্নয়নের ক্রমাগত প্রচেষ্টা চলে, তেমন ভাবেই লিস্টারের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চেষ্টা চালিয়ে গেছে আরো কার্যকর জীবাণুনাশক খুঁজে বের করার। কার্বলিক অ্যাসিডের ব্যবহার ফলপ্রসূ হলেও, এই রাসায়নিকের প্রভাবে অনেক সময় রোগীর ফুসফুস-সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দেয়। সেই কারণে অস্ত্রচিকিৎসায় প্রয়োগ করা অণুবীজ-নিরোধকও নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। সম্প্রতিকালে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত জীবাণুনাশক হলো আয়োডোফোর অথবা ক্লোরহেক্সিডিন গ্লুকোনেট-এর জলীয় বা অ্যালকোহলীয় দ্রবণ।
 
 
 
১৮৯৩ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পর লিস্টার নিয়মিত পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। যদিও বেশ কিছু সময় পরে তিনি ব্রিটেনের রাজপরিবারে অভিজ্ঞ শল্যচিকিৎসক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯১২ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি কেন্ট কাউন্টিতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবেতে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। একথা সত্য জীবনের শেষ ভাগে নিজের দেশে তিনি যথেষ্ট সম্মান ও খ্যাতির সাথে দিন অতিবাহিত করেছিলেন। তবুও তাঁর দেখানো আধুনিক শল্যচিকিৎসার পথ সারা বিশ্ব জুড়ে এখনও পর্যন্ত প্রতিদিন অনুসৃত হলেও, মানবজাতির বিশ্রুতির ইতিহাসে চিকিৎশাস্ত্রে বৈপ্লবিক অবদান রেখে যাওয়া মানুষটি প্রায় বিস্মৃত।
——————————–
~ কলমে এলেবেলের অতিথি মৌপ্রিয়া দাস  ~

 

মৌপ্রিয়া জার্মানির ম্যাক্স প্লান্ক ইনস্টিটিউট ফর দ্য ফিসিক্স অফ কমপ্লেক্স সিস্টেমসে কর্মরত বিজ্ঞানী।

 
 

 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।