চলনে বা গমনের নির্দেশ কিভাবে তৈরি হয় (প্রথম পর্ব)

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
181 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

প্রতিদিনই আমরা নানারকম ভাবে এদিক ওদিকে চলাফেরা করি। বেসাল গ্যাংলিয়া হাত পায়ের মসৃণ গতি তৈরি করতে এবং অবাঞ্ছিত চলাচল প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে। 

বেসাল গ্যাংলিয়া মস্তিষ্কের একাধিক অংশের সমন্বয়ে গঠিত। নিচের চিত্রে বেসাল গ্যাংলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো দেখানো হয়েছে। 

আসুন সেইসব বিভিন্ন অংশগুলির সাথে একটু পরিচয় করে নেওয়া যাক। কডেট নিউক্লিয়াস দেখতে C আকৃতির হয়, তার করনাল বিভাগ (একটি কাল্পনিক উলম্বরেখা যেটি শরীরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে(ছবি দেখুন)) করলে দুটি অংশে বিভক্ত হয় (কডেট নিউক্লিয়াস (দেহ) এবং কডেট নিউক্লিয়াস (লেজ))। 

এমআরআই (MRI Scan) দেখলে সাবস্ট্যান্সিয়া নাইগ্রাকে বেশ সুন্দরভাবে দেখা যায় (কালো রঙের)। সাবস্ট্যান্সিয়া নাইগ্রা থেকে ডোপামিন ক্ষরিত হয়, পারকিন্সন রোগের ক্ষেত্রে ডোপামিনের মাত্রা কম থাকে বা কম মাত্রায় ক্ষরিত হয়। সাবথ্যালামিক নিউক্লিয়াস থ্যালামাসের নিচে থাকে। গ্লোবাস প্যালিডাস দুটি ভাগে বিভক্ত (ভিতরের অংশ এবং বাহিরের অংশ)। কডেট এবং পিউটামেনকে একত্রে স্ট্রায়েটাম বলে। বেসাল গ্যাংলিয়ার সাথে স্পাইনাল কর্ডের সরাসরি সম্পর্ক নেই, এরা উদ্দিপনা গ্রহণ করে সেরিব্রাল কর্টেক্স থেকে এবং উদ্দীপনা প্রেরণ করে মস্তিষ্কের কান্ড (Brain stem) এবং থ্যালামাসের মাধ্যমে।  

কিছু বিশেষ রাসায়নিক প্রেরনের মাধ্যম দুটি নিউরন পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করে এবং বার্তা পাঠায় (যে নিউরনটি সংকেত প্রেরণ করে তাকে প্রি সাইন্যাপটিক নিউরন এবং যে নিউরনে সংকেতটি গৃহীত হয় তাকে  পোস্ট সাইন্যাপটিক নিউরন বলে)। এই দুই ধরনের নিউরন সাইন্যাপসের মাধ্যমে একে অপরের সাথে কথা বলতে পারে। প্রি সাইন্যাপটিক নিউরন থেকে এক ধরনের বিশেষ রাসায়নিক সাইন্যাপসে এসে মুক্ত হয়। তাকে আমরা নিউরোট্রান্সমিটার বলি। আমাদের সাধারনত দুই ধরনের নিউরন বর্তমান (উত্তেজক এবং বাধা প্রদানকারী)। বাধা প্রদানকারী নিউরন (Inhibitory Neuron) সাইন্যাপসে গাবা (GABA) নিউরোট্রান্সমিটার মুক্ত করে এবং অপর প্রান্তের পোস্ট সাইন্যাপটিক নিউরনকে নিষ্ক্রিয় করে রাখে (ক্রিয়াকলাপ বন্ধ করে দেয়)। অপর দিকে, উত্তেজক নিউরন গ্লুটামেট নিউরো ট্রান্সমিটার নিঃসরণ করে এবং অপর দিকের পোস্ট সাইন্যাপটিক নিউরনকে সক্রিয় এবং উত্তেজিত করে।  

আমাদের দুটি জিনিস মাথায় রাখতে হবে; চলাফেরা করা এবং না করার নির্দেশ তৈরি করাই বেসাল গ্যাংলিয়ার মূল কাজ। যে পথটি চলাচল করার নির্দেশ তৈরি করে তাকে সরাসরি পথ (ডাইরেক্ট পাথওয়ে) এবং যে পথটি চলাচলে বাধা দেয় বা কখন চলাচল বন্ধ করতে হবে তা ঠিক করে, তাকে পরোক্ষ পথ (ইনডাইরেক্ট পাথওয়ে) বলে। এবং এই দুটি পথকে একত্রে বেসাল গ্যাংলিয়ার পথ বলা হয়।  

সাধারনত থ্যালামাস মোটর কর্টেক্সকে নির্দেশ দেয় কখন হাত পায়ের পেশিগুলোকে উত্তেজিত করবে, এবার থ্যালামাস অবধি নির্দেশ (চলন বা গমন হবে কি হবে না, হলেও কখন তাকে থামাতে হবে) কিভাবে পৌছায় সেটা আমরা পরে আলোচনা করছি।   

সাধারণত থ্যালামাস সর্বদা প্রতিরোধমূলক (নিষ্ক্রিয় বা স্থির অবস্থায়, যখন আমাদের চলন বা গমনের প্রয়োজন পড়ে না, ছবিতে ঋণাত্মক চিহ্ন দ্বারা উল্লেখিত) অবস্থায় থাকে আভ্যন্তরীণ গ্লোবাস প্যালিডাসের দ্বারা। অন্যথা আমরা কোনদিনই স্থির ভাবে বসে থাকতে পারতাম না (ঘুমাতে পারতাম কিনা সন্দেহ আছে!)। সুতরাং সরাসরি পথের (Direct Pathway) উদ্দেশ্য হল থ্যালামাসকে পুনরায় সক্রিয় করা। সুতরাং তখন থ্যালামাস মোটর কর্টেক্সের সাথে কথা বলে, যা অবশেষে পেশীগুলিকে চলাচলের নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে পরোক্ষ পথ পেশির গতিকে প্রতিহত করে।        

পারকিন্সন রুগীর ক্ষেত্রে সরাসরি পথের (Direct Pathway) সক্রিয়তা কমে যায়, হানটিনটং রোগের ক্ষেত্রে (পেশির লাগামছাড়া গতি) ক্ষেত্রে ইনহিবিটরি পথের (পরোক্ষ পথ) সক্রিয়তা কমে যায়।   

ডায়েরেক্ট পথ (উত্তেজক পথ) 

প্রথমে কর্টেক্সের কাছে চলন বা গমনের বার্তা এসে পৌছায়, মোটর কর্টেক্স সরাসরি স্ট্রাইটামে বার্তা পাঠায় যে আমাকে এখনি গতির সৃষ্টি করতে হবে (গ্লুটামেট নিউরোট্রান্সমিটার ক্ষরণের মাধ্যমে)!  

একটু সহজ উদাহরন দিয়ে স্ট্রায়েটামের নিউরনের গল্প বলি, মোটর কর্টেক্স থেকে স্ট্রায়েটামে আগত উত্তেজনা অনেকটা নদী বাঁধের অতিরিক্ত মাটির মতই। যত অতিরিক্ত মাটি দেওয়া হয় ততই যেমন বাঁধ আরও পুরু হয়, ঠিক তেমন মোটর কর্টেক্স থেকে স্ট্রায়েটামে যত উত্তেজনা আসতে থাকে ততটাই স্ট্রায়েটাম অপর প্রান্তের নিউরনকে বাধা দিতে থাকে। বাধা প্রদানকারী নিউরনের ধর্মই হল তার সাথে যুক্ত পরবর্তী নিউরনকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা, সুতরাং তারা সাবস্টেন্সিয়া নাইগ্রা পার রেকটিকুলেটা এবং আভ্যন্তরীণ গ্লোবাস প্যালিডাসকে আগের চেয়ে আরও বেশি নিষ্ক্রিয় করে রাখে। সাধারণত আমরা আগেই দেখেছি যে আভ্যন্তরীণ গ্লোবাস প্যালিডাস থ্যালামাসের ক্রিয়াকলাপটিকে বন্ধ বা বাধাপ্রাপ্ত করে রাখে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ গ্লোবাস প্যালিডাস নিজে নিষ্ক্রিয় থাকার জন্য পুনরায় থ্যালামাসের ক্রিয়াকলাপকে আটকে রাখতে পারেনা এবং পর্যাপ্ত পরিমান নিউরোট্রান্সমিটারও পাঠাতে পারে না।

আভ্যন্তরীণ গ্লোবাস প্যালিডাস থেকে থ্যালামাসে গাবা নিউরোট্রান্সমিটার ক্ষরিত হয়, কিন্তু আভ্যন্তরীণ গ্লোবাস প্যালিডাস নিজে নিস্ক্রিয় থাকার দরুন বেশি পরিমান গাবা পাঠাতে পারে না। তার ফলে থ্যালামাস সক্রিয় হয়ে ওঠে। চলন বা গমনের জন্য থ্যালামাসের সক্রিয় থাকা একান্ত প্রয়োজন।  

তারপর থ্যালামাস থেকে উত্তেজক বার্তা কর্টেক্সে যায়, এবং একটি চক্র যেন সম্পন্ন হয়। এবং নির্দিষ্ট পেশিতে সংকেত বার্তা যায় (মটর কর্টেক্স থেকে স্পাইনাল কর্ড হয়ে), এবং চলন বা গমনের সৃষ্টি হয়। 

(ক্রমশ পরবর্তী পর্বে চোখ রাখুন)

তথ্যসুত্রঃ

১। V Srinivasa Chakravarthy, Denny Joseph, Raju S Bapi, What do the basal ganglia do? A modeling perspective

২। Alexander GE, Crutcher MD, DeLong MR (1990) Basal ganglia-thalamocortical circuits: parallel substrates for motor, oculomotor, prefrontal and limbic functions. Prog Brain Res 85:119–146

৩। Jyotika Bahuguna,corresponding author1,3 Ad Aertsen,1,2 and Arvind Kumar,  Controlling the Go / No-Go decision threshold in the striatum, doi: 10.1186/1471-2202-14-S1-P228

—————————————–

~ কলমে এলেবেলের অতিথি সায়ন ঘোষ ~

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।