প্রযুক্তিতে কোয়ান্টাম: ভুতুড়ে যুগলের কারনামা (পর্ব – ৩)

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
558 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

রাত দুটো নাগাদ ঘুমটা ভেঙে গেল বেলা স্যারের। ল্যাপটপটা পেটের ওপর রেখে অনলাইনে স্টার-ট্রেক দেখতে দেখতে কখন ঘুম এসে গেছিল কে জানে! তবে এখন মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। এত বছর পর তাঁকে কিছুটা হলেও সন্তুষ্ট করা গেল তাহলে! একবার মনে মনেই ঝালিয়ে নিলেন সদ্য দেখা স্বপ্নটা। চোখটা লাগতেই দেখতে পেয়েছিলেন নিজেকে; গুপী গায়েনের মত পোশাক পরে জঙ্গলে দাঁড়িয়ে। সামনে ভুতের রাজা এসে যেই বললো ‘অ্যাকশন’, অমনি সামনের জঙ্গল-টঙ্গল পুরো ভ্যানিশ। সামনে একটা দোকান, নাম— ‘কোপেনহেগেন কফি শপ’। সেখানে একটা টেবিলে বসে আছেন দু’জন ভদ্রলোক। একজনের চোখটা বন্ধ। ওয়েটার টেবিলে কফি রেখে গেছে, কিন্তু তিনি চোখ বুঁজে বলেই চলেছেন— “কোথায় কফি? আমি যতক্ষণ না দেখছি, ওখানে কফি আছে এবং নেই। পাশ থেকে দ্বিতীয় ভদ্রলোক বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন— “না না! আপনি ক্লাসিকাল-কোয়ান্টাম আবারও গুলিয়ে ফেলছেন।” প্রথম ভদ্রলোকও নিজের যুক্তিতে অনড়। তিনি চোখ খুলে বললেন, “কিছুতেই হচ্ছে না। তোমরা খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের পাশে স্টার দিয়ে ছোট ফন্টে লেখা ‘শর্তাবলী প্রযোজ্য’র মত আসল ঘটনাটা চেপে যাচ্ছ। তোমাদের দেওয়া কোয়ান্টাম তত্ত্বটা অসম্পূর্ণ। তোমাদের তত্ত্ব আমার আপেক্ষিকতাবাদকেও মানছে না!” স্বপ্নেও কি গায়ে কাঁটা দেয়! অদ্ভুত একটা শিহরণ বোধ করলেন বেলা স্যার। বেলা স্যারের সামনে তখন বচসায় মগ্ন আলবার্ট আইনস্টাইন এবং নিলস বোর। দু’জনের চোখ বেলা স্যারের দিকে পড়তেই দু’জনে প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলেন— “এখুনি তো জঙ্গলে ছিলে দেখলাম? এখানে কেমন করে এলে? ভুতুড়ে ব্যাপার নাকি টেলিপোর্টেশন!” বেলা স্যার একটু আমতা আমতা করে বললেন, “না, মানে এটা ক্লাসিকাল টেলিপোর্টেশন; এখনো কল্পবিজ্ঞান। স্বপ্ন বলেই পারলাম মনে হয়। তবে জানেন কি স্যার, কোয়ান্টাম প্রযুক্তির সাহায্যে তথ্যকে এখন টেলিপোর্ট করা যায়, বাস্তবেও।” তারপরের ঘটনাগুলো একটু ঘোলা হয়ে যাচ্ছে; শুধু মনে পড়ছে ঘুম ভাঙার আগে আইনস্টাইনের ঠোঁটে লেগে থাকা প্রশান্তির হাসিটা। 

কোথায় কফি? আমি যতক্ষণ না দেখছি, ওখানে কফি আছে এবং নেই। 

আপাতত বেলা স্যারের স্বপ্নে তো হানা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না আমাদের, তাই এই কোয়ান্টামের মতবিরোধ আর কল্পলোকের আইনস্টাইনের হাসির মাঝের ঘটনাটা একটু নিজেদের মত করে বোঝার চেষ্টা করি। আগের দুটি পর্বে (পর্ব-১ এবং পর্ব-২) আমরা জেনেছি, কীভাবে কোয়ান্টাম তরঙ্গের উপরিপাতনের (সুপারপসিশন) ধারণাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছিল অ্যালিস ও ববের তথ্য আদান প্রদানের সুরক্ষিত রাস্তা। কিন্তু এই উপরিপাতনের ধারণাটিতে বেজায় আপত্তি ছিল আলবার্ট আইনস্টাইনের। কেন জানেন? 

ধরা যাক, একটা ইলেকট্রন আছে। এই ইলেকট্রনের একটা বিশেষ ধর্ম হল ঘূর্ণন (স্পিন)। ঘূর্ণন বলতে, ইলেকট্রনটা যে বাঁইবাঁই করে শক্তিমানের মত নিজের অক্ষের ওপর ঘুরছে; ঠিক তেমনটা নয়। তবে ইলেকট্রনের একটা সহজাত কৌণিক ভরবেগ আছে, যা তাকে একধরণের বিশেষ ধর্ম প্রদান করে, যাকে আমরা ঘূর্ণন বলে ভাবতে পারি (পরে না হয় একদিন কোয়ান্টাম কণার ঘূর্ণন নিয়ে গুছিয়ে আলোচনা করা যাবে)। এই ইলেকট্রনের ঘূর্ণনের দুটো অভিমুখ থাকতে পারে, ঊর্ধ্বমুখী (↑) এবং নিম্নমুখী (↓)। কিন্তু কোয়ান্টামের তত্ত্ব কী বলে? আমি যতক্ষণ না সেটা মাপব, একটা ইলেকট্রন ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী অবস্থার উপরিপাতন হিসেবেই অবস্থান করবে। এখানেই বাধ সাধলেন আইনস্টাইন। তিনি আরো দুই সহকর্মী পোডোলস্কি এবং রোজেন-কে নিয়ে করে ফেললেন আস্ত একটা চিন্তন পরীক্ষা। সেই পরীক্ষার মূল চরিত্রে অভিনয় করল দুটো আণুবীক্ষণিক কণা। কণা দুটোকে এমন ভাবেই সৃষ্টি করা হল, যাতে একজনকে ছাড়া অন্য জন সম্পূর্ণ না হতে পারে। অনেকটা এক জোড়া মোজার মত। যেমন, আলমারিতে ডান পায়ের মোজাটা খুঁজে পেলে চোখ বুঁজে বলতে পারি আরেকটা মোজা বাড়ির যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, সেটা বাম পায়ের মোজাই হবে। এখানেও একটা কণার ঘূর্ণন যদি হয় ঊর্ধ্বমুখী (↑) প্রকৃতির, তাহলে এর সঙ্গী কণাটি ব্রহ্মান্ডের যে প্রান্তেই লুকিয়ে থাকুক, তার ঘূর্ণন হবে নিম্নমুখী (↓) প্রকৃতির। এই ধরণের অবিচ্ছেদ্য কণা-যুগল, যাদের অদৃষ্ট, থুড়ি ওয়েব ফাংশান, একে অপরের সাথে এমন ভাবে জড়িয়ে যে, মধ্যিখানের দূরত্ব এদের মধ্যে বিচ্ছেদ আনতে পারে না। এই কণা-যুগলকে বলা হয় বিজড়িত (এন্ট্যাংগলড) কণা। 

এই ধরণের অবিচ্ছেদ্য কণা-যুগল, যাদের অদৃষ্ট, থুড়ি ওয়েব ফাংশান, একে অপরের সাথে এমন ভাবে জড়িয়ে যে, মধ্যিখানের দূরত্ব এদের মধ্যে বিচ্ছেদ আনতে পারে না।

এবার আসি আইনস্টাইনের আপত্তির জায়গাটায়। প্রথমত, কোয়ান্টাম কণাটির স্টেট বা অবস্থা যদি মাপার আগে একাধিক অবস্থার উপরিপাতন হিসেবেই থেকে থাকে, তাহলে একটা কণাকে মাপা মাত্রই সেটি একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় চলে আসবে; এখানে ধরে নিলাম ঊর্ধ্বমুখী (↑) প্রকৃতির ঘূর্ণন অবস্থায় চলে এল কণাটি। তৎক্ষণাৎ মহাবিশ্বের অন্য কোনও প্রান্তে বসে থাকা বিজড়িত কণাটিও এই খবরটি পেয়ে যাবে। ফলে সেও ঊর্ধ্বমুখী (↑) এবং নিম্নমুখী (↓) অবস্থার উপরিপাতন থেকে বেরিয়ে আসবে এবং ধরা দেবে শুধুমাত্র নিম্নমুখী (↓) ঘূর্ণন নিয়ে। কিন্তু আপেক্ষিকতাবাদের মূল স্তম্ভ দাঁড়িয়ে যে শর্তের উপর, তা বলে আলোর গতিবেগ একটি সসীম সংখ্যা। অর্থাৎ, এক বিন্দু থেকে আলো বা কোনও তথ্য অন্য আরেকটি বিন্দুতে পৌঁছাতে কিছুটা সময় নিতে বাধ্য। কিন্তু এখানে তো একটা কণাকে মেপে ফেললেই তৎক্ষণাৎ অন্য বিজড়িত কণাটার ঠিকুজি জেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তাহলে কি কোয়ান্টাম তত্ত্ব আপেক্ষিকতাবাদের বুনিয়াদকেই বিরোধিতা করছে? 

তাহলে কি কোয়ান্টাম তত্ত্ব আপেক্ষিকতাবাদের বুনিয়াদকেই বিরোধিতা করছে?

এই ঘটনাটাকে আইনস্টাইন ব্যাখ্যা করতে চাইলেন একটু অন্যভাবে। তিনি ভাবলেন এই ‘ভুতুড়ে’ ঘটনাটার পেছনে আছে অন্য কোনও রাশি বা ‘হিডেন ভেরিএবলস’, যার কথা হেইজেনবার্গ-নিলস বোরের কোয়ান্টাম তত্ত্ব, যা ‘কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন’ নামে পরিচিত, জানায়নি। তাই এই ইন্টারপ্রিটেশন ‘অসম্পূর্ণ’। আইনস্টাইন এভাবে বোঝার চেষ্টা করলেন ঘটনাটা। ধরা যাক, দুটো একই রকম দেখতে বাক্সের একটায় আছে লাল বল, অন্যটায় নীল বল। একটা বাক্স খুলে আমি যদি লাল বলটাকে খুঁজে পাই, অন্য বাক্স যেখানেই থাকুক, সেখানে নীল বল থাকতে বাধ্য। অর্থাৎ আমি দেখি কিংবা না দেখি, একটা বাক্সে প্রথম থেকেই ছিল লাল বল, অন্যটায় নীল। যেহেতু কোয়ান্টামের আণুবীক্ষণিক পরিসর দেখা বা মাপার আগে অব্দি কোনও বস্তুর অবস্থাকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পারে না, বোঝাই যাচ্ছে আইনপর্ব-২স্টাইনের ব্যাখ্যা কোয়ান্টাম উপরিপাতনের ধারণাকে অস্বীকার করে। 

কোয়ান্টামে জগতের অস্পষ্টতা, উপরিপাতন উনি মানতে পারলেন না জীবনের শেষ অব্দি। আইনস্টাইনের মৃত্যুর প্রায় এক দশক পরে, ১৯৬৪ সালে জন স্টুয়ার্ট বেল নামে এক পদার্থবিদ আইনস্টাইনের এই ‘হিডেন ভেরিএবলস’-এর যুক্তি পরীক্ষার মাধ্যমে খণ্ডন করলেন। তবে আইনস্টাইনের কোয়ান্টাম-সংক্রান্ত ধারণাটি ধোপে না টিকলেও, বেল এবং তাঁর উত্তরসূরিদের পরীক্ষাতেও পাওয়া গেল বিজড়িত কণাদের ‘ভুতুড়ে’ লং-ডিসট্যান্স রিলেশনশিপ। কোয়ান্টামের এই কারনামা কোয়ান্টাম জট (কোয়ান্টাম এন্ট্যাংগলমেন্ট) নামে পরিচিত। এইরকম ‘ভুতুড়ে’ যুগলকে ব্যবহার করেই একটি কোয়ান্টাম তথ্যকে এক জায়গা থেকে ‘ভ্যানিশ’ করে অন্য জায়গায় ‘টেলিপোর্ট’ করা সম্ভব।

এইরকম ‘ভুতুড়ে’ যুগলকে ব্যবহার করেই একটি কোয়ান্টাম তথ্যকে এক জায়গা থেকে ‘ভ্যানিশ’ করে অন্য জায়গায় ‘টেলিপোর্ট’ করা সম্ভব।

আগের পর্বে আমরা জেনেছিলাম, ক্লাসিকাল কম্পিউটারে সমস্ত তথ্য জমা হয় ‘শূন্য’ এবং ‘এক’— এই দু’টি সংখ্যার মাধ্যমে। এই ‘শূন্য’ এবং ‘এক’-এর প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ এক একটা ঘর; যাদেরকে আমরা ‘বিট’ বলে চিনি। এই বিটই ক্লাসিকাল কম্পিউটারের ক্ষুদ্রতম একক। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ক্ষুদ্রতম ঘরটি হল কোয়ান্টাম বিট বা কিউবিট। একটা কিউবিট ঘর ‘শূন্য’ এবং ‘এক’-এর মিশ্রণকে (যাকে আমরা বলি কোয়ান্টাম অবস্থার উপরিপাতন) আশ্রয় দিতে পারে। অনেকে সহজভাবে বোঝার জন্য এই মিশ্রণটিকে একটা টস করা কয়েনের সাথে তুলনা করে থাকেন— উড়ন্ত অবস্থায় যেমন একটা কয়েন একই সঙ্গে ‘হেড’ এবং ‘টেইল’ অবস্থায় থাকে। কিন্তু কোয়ান্টাম বিটকে এই উদাহরণে ধরা সম্ভব নয়। একটু ভাবলেই বোঝা যাবে, কয়েনকে টস করি বা না করি, তার একদিকে হেড, অন্যদিকে টেইল; এটা অমোঘ সত্য। কিন্তু কিউবিট-এর ঘরে বসে থাকা উপরিপাতন অবস্থাটির পক্ষে মাপার আগে পর্যন্ত ‘এক’ বা ‘শূন্য’ হিসেবে কখনই পরিচিতি লাভ করা সম্ভব নয়। যাই হোক, ফিরে যাই আমাদের টেলিপোর্টেশন-এর গল্পটায়।  

ধরা যাক, গিরিডির প্রফেসর শঙ্কুর কাছে একটা গোপন ওষুধের ফর্মুলা আছে, যার এক ডোজ খেলেই অপবিজ্ঞানের ভুত মাথা থেকে নেমে যাবে। অতি সত্ত্বর সেই ফর্মুলা ভীষণ সন্তর্পণে পাঠাতে হবে ক্যাপ্টেন নিমোকে। প্রশান্ত মহাসাগরের তলায় নিজের সাবমেরিনের মধ্যে তৈরি করেছে বিশাল এক গবেষণাগার ক্যাপ্টেন নিমো। অথচ পারদর্শী তথ্য-দস্যুর প্রযুক্তি-চোখের নজরদারি এড়িয়ে এই তথ্যকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পরিবহন করা একদমই সুরক্ষিত নয়।

উপায় একটাই। ভুতের ‘যেথায় খুশি যাইতে পারি’ বর— টেলিপোর্টেশন।                                                                     

(চলবে…………)

পুনশ্চ: বেলা স্যার স্বপ্নে কীভাবে আইনস্টাইনের ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি আনলেন, সেই গল্প তোলা রইল পরের পর্বের জন্য।  

————————————-

~ কলমে এলেবেলে চিরশ্রী ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

One thought on “প্রযুক্তিতে কোয়ান্টাম: ভুতুড়ে যুগলের কারনামা (পর্ব – ৩)

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।