পাহাড়ে উপল: প্লেট টেকটোনিক – দ্বিতীয় পর্ব

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
258 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

 

মুরগির মাংসটা উপলের অন্যতম প্রিয় খাবার, তার সাথে পোলাও পেলে সোনায় সোহাগা। একটা লম্বা যাত্রার পর এরকম মনোরম পরিবেশে এমন মন ভরানো খাবার খেলে সব বাঙালিরই একটু তন্দ্রা আসতে বাধ্য। উপলও মামার সাথে হোটেলের বারান্দায় বসে রোদ মেখে একটু ঝিমুচ্ছে। কিন্তু মনের মধ্যে খাবারের তৃপ্তির চেয়েও মামার কাছ থেকে প্লেট টেকটোনিক-এর বাকি গল্প শোনার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে উঁকি দিচ্ছে। নির্ঝর মামা পায়ের ওপর পা তুলে মুখে মৌরি চিবোতে চিবোতে খবরের কাগজের পাতাটা উল্টাচ্ছে। উপল আর ধৈর্য্য রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই বসলো— তুমি বললে, বাকি গল্পটা খাওয়ার পর বলবে।

তুই তো দেখছি একটু বিশ্রামও করতে দিবি না, বলছি রে বাবা বলছি—  হাসতে হাসতে বললেন নির্ঝর মামা — গাড়িতে যা বলেছিলাম মনে আছে তো? কতদূর যেন বলেছিলাম শেষটায়?

উপল ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললো— হ্যাঁ হ্যাঁ মনে আছে, শেষে বললে পৃথিবীর ওপরের অশ্মমণ্ডল ছোট ছোট টুকরো হয়ে থাকে, যাদের প্লেট বলে।

নির্ঝর মামা এবার বলতে শুরু করলেন— হ্যাঁ, এই প্লেটগুলো জিগ্ স পাজল (Zig shaw puzzle)- এর মতো গোটা পৃথিবীর উপরিভাগকে ঢেকে রেখেছে। একটা বরফের হ্রদকে যদি কিছু দিয়ে আঘাত করে অনেকগুলো টুকরো করে দেওয়া হয়, অনেকটা সেরকম। অশ্মমণ্ডল খুব শক্ত, কিন্তু ঠিক তার নিচের অংশটা অর্থাৎ অশক্তমন্ডল হল তুলনামূলক ভাবে নরম। যার ওপর এই প্লেটগুলো ভাসমান। নরম মানে কিন্তু এটা ভাবিস না যে তা তুলতুলে বা ঘন কোন তরলের মতো। এর সান্দ্রতা প্রায় ১০^১৯ থেকে ১০^২০ পাস্কাল-সেকেন্ড, অর্থাৎ দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে এটি চলমান রূপ ধারণ করে অথবা প্রবাহী পদার্থের (fluid) মতো আচরণ করে।

উপল একটু অবাক হল। তারপর তার মনে পড়ল এই ভাবেই কাঁচকে আমরা তরল হিসেবে ভাবতে পারি। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে এদের চলাচল এতটাই ধীর যে এরা কঠিন পদার্থ হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু, অধিক সময়ের ব্যবধানে বস্তুটি চলমান বা তরলের ন্যায় আচরণ করে। নিজের মনে মনেই এই সব ভেবে নিয়ে উপল আনমনে বলে উঠলো— আচ্ছা বুঝলাম।

পৃথিবীর অভ্যন্তর কিন্তু গভীরতার সাথে সাথে উষ্ণ হতে থাকে। এই উষ্ণতার মূল কারণ হলো তেজস্ক্রিয় পদার্থের বিকিরণ (Radioactive decay)।

নির্ঝর মামা আবার বলতে আরম্ভ করলেন— পৃথিবীর অভ্যন্তর কিন্তু গভীরতার সাথে সাথে উষ্ণ হতে থাকে। পৃথিবীর অভ্যন্তরে তাপশক্তির মূল উৎস হলো তেজস্ক্রিয় পদার্থের বিকিরণ (Radioactive decay)। তুই নিশ্চয় জানিস, তাপ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার জন্য মূলত তিনটি পদ্ধতি অবলম্বন করে, সেগুলো হল পরিবহন (Conduction), পরিচলন (Convection) এবং বিকিরণ (Radiation)। তরল পদার্থের মধ্যে তাপপ্রবাহ সাধারণত পরিচলন পদ্ধতির মাধ্যমে হয়। অতএব অশক্তমণ্ডলে তাপ পরিচলন পদ্ধতিতে ওপরের দিকে পরিবাহিত হয়। এই পদ্ধতিতে তাপ পরিবহনের সময় নিচের উষ্ণ পদার্থ আয়তন বৃদ্ধির ফলে ওপরে উঠে আসে প্লেটগুলির নীচ পর্যন্ত। তারপর ওই স্থান থেকে দুই দিকে চলে যায় প্লেট-এর সমান্তরাল ভাবে। যেতে যেতে উষ্ণতা হ্রাস পায় ও কিছুদূর গিয়ে আবার আস্তে আস্তে নিচে নামতে শুরু করে ঠান্ডা ও ভারী হয়ে। কি রে কিছু বুঝলি?— মামা জিজ্ঞাসা করলেন।

উপল বলল— চা করার সময় যেমন চা পাতাগুলো ওপরে উঠে আসে ও নিচে নামে চক্রাকারে, ঠিক তেমনি তো?

নির্ঝর মামা বললেন, একদম ঠিক ধরেছিস। এবার যদি ওই জলে একটা কাগজের টুকরো ফেলে দেওয়া হয় তাহলে কি হবে এ এ?

উপল বলল— কাগজটা জলের গতির সাথে চলতে আরম্ভ করবে ঠিক যেদিকে জল যাচ্ছে।

নির্ঝর মামা বললেন— ঠিক এই রকমটাই হয়। অশক্তমন্ডল ওপরের প্লেটগুলিকে টেনে নিয়ে যায় ঘর্ষণ বলের সাহায্যে (Frictional drag)। অর্থাৎ ভাসমান প্লেটগুলো স্থির নয়, চলমান। প্লেটগুলি যে স্থানে একে অপরের সাথে মেশে তাকে বলে প্লেটের সীমানা বা Plate Boundary। এই প্লেট সীমানা তাদের গতি প্রকৃতির ভিত্তিতে তিন রকমের হয়ে থাকে। যা এবার আমার ব্যাগ থেকে নোটবুক আর পেন্সিলটা নিয়ে আয়।

ছবি: তিন প্রকারের প্লেট সীমানা

প্রথম প্রকারের প্লেট সীমানা হল বিপরীতমুখী প্লেট সীমানা বা Divergent plate boundary।

উপল আলস্য ঝেড়ে ফেলে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো। নিশ্চয় আনবো, এই বলে এক দৌড়ে নোটবুক আর পেন্সিলটা নিয়ে এল। 

নির্ঝর মামা উপলের হাত থেকে নোটবুক আর পেন্সিলটা নিয়ে কিছুটা সময় চুপ করে কি জানি আঁকিবুকি করলেন। তারপর আবার বলা শুরু করলেন— প্রথম প্রকারের প্লেট সীমানা হল বিপরীতমুখী প্লেট সীমানা বা Divergent plate boundary। এই ক্ষেত্রে দুটি প্লেট একে অপরের বিপরীত দিকে চলমান হয়। ঠিক যেখানে বস্তু তাপের প্রভাবে ওপরে উঠে এসে দুই দিকে বিভক্ত হয়ে বিপরীত দিকে চলতে শুরু করে, সেখানে প্লেটগুলিও বিভক্ত হয়ে নিচের স্তরের সাথে বিপরীত দিকে চলতে শুরু করে। এই নির্দিষ্ট সীমানাতে নিচের বস্তু ওপরে উঠে এসে ঠান্ডা হয়ে জমে নতুন প্লেটও তৈরী করে। তাই এই সীমানাকে গঠনমূলক প্লেট সীমানা বা Constructive plate boundary-ও বলা হয়ে থাকে। সাধারণত মহাসাগরীয় প্লেট-এ এই ধরণের সীমানা দেখা যায়। তবে মহাদেশের মাঝেও নতুন করে ফাটল তৈরী হয়ে (Continental rifting) এমন সীমানার সৃষ্টি হতে পারে। এই বারে নোটবুক-এ আঁকা একটা চিত্র দেখিয়ে দিলেন উপলকে।

ছবি: বিপরীতমুখী প্লেট সীমানা বা Divergent plate boundary।

উপল ছবিটা অনেকক্ষণ মন দিয়ে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—আচ্ছা বুঝলাম। আর দুই প্রকার তাহলে কি কি?

দ্বিতীয় প্রকার প্লেট সীমানাকে অভিমুখী প্লেট সীমানা বা Convergent plate boundary বলা হয়ে থাকে।

হ্যাঁ বলব এবার, তার আগে যা দেখি বিকেল তো প্রায় হয়েই এলো, দু কাপ দার্জিলিং চা অর্ডার করে আয়।

উপল আবার ঝটপট উঠে গিয়ে ঘরের ভেতর টেলিফোনটা তুলে রুম সার্ভিসে ফোন করে বলে দিল দুকাপ চায়ের কথা।

নির্ঝর মামা বলতে শুরু করলেন— দ্বিতীয় প্রকার সীমানা ঠিক উল্টোটা। এই সীমানায় দুটি প্লেট একে অপরের দিকে ধেয়ে এসে ধাক্কা মারে। তাই এই প্রকারের প্লেট সীমানাকে অভিমুখী প্লেট সীমানা বা Convergent plate boundary বলা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ধাক্কা মারার সময় যে প্লেটের ঘনত্ব বেশি সেই প্লেটটি অন্য প্লেটের নিচে ঢুকে যায়, এই ঘটনাকে প্লেটের অবনমন বা Plate subduction বলা হয়। সাধারণত মহাসাগরীয় প্লেট (Oceanic plate)-এর ঘনত্ব বেশি হয়, তাই তা মহাদেশীয় প্লেট (Continental plate)-এর নিচে ঢুকে যায়। যে প্লেটটি পৃথিবীর গর্ভে ঢুকে যায় তার বিনাশ ঘটে। তাই এই ধরণের প্লেট সীমানাকে ধ্বংসাত্মক প্লেট সীমানা বা Destructive plate boundary-ও বলা হয়।  নোটবুক থেকে আবার একখানা ছবি দেখালেন উপলকে।

ছবি: অভিমুখী প্লেট সীমানা বা Convergent plate boundary

উপল ব্যাপারটা বুঝে নেওয়ার জন্য মন দিয়ে দেখতে লাগলো; এমন সময় কলিং বেলটা বেজে উঠলো। মামা বললেন— ওই বুঝি এসে গেছে দার্জিলিং টী।

তৃতীয় প্রকারের প্লেট সীমানাকে সমান্তরালভাবে গতিশীল প্লেট সীমানা বা Transform plate boundary বলা হয়।

উপলকে কিছু বলার আগেই সে উঠে চলে গেল চা আনতে। চায়ের ট্রেটা মামার হাতে এগিয়ে দিয়ে বলল— এই নাও তোমার দার্জিলিং টী।

নির্ঝর মামা চায়ে চুমুক দিয়ে বাঃ শব্দ করে আবার বলা শুরু করলেন— তৃতীয় প্রকারের প্লেট সীমানা না দূরে সরে যায়, না একে অপরের দিকে ধেয়ে আসে। তারা সমান্তরাল ভাবে বিপরীত দিকে গতিশীল হয়। এই ধরণের প্লেট সীমানাকে সমান্তরালভাবে গতিশীল প্লেট সীমানা বা Transform plate boundary বলা হয়।

উপল বলল— সমান্তরাল-বিপরীতমুখী ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না।

নির্ঝর মামা তখন বললেন— ধর পাশাপাশি রেল লাইন-এ দুটি ট্রেন বিপরীত দিকে গেলে যেমন হবে ঠিক তেমনই। এই দেখ না ছবিটা বলে, নোটবুকটা এগিয়ে দিলেন।

আচ্ছা বল দেখি হিমালয় সৃষ্টি এর মধ্যে কোন ধরণের সীমানাতে হয়েছে।

উপল ছবি দেখে জিনিসটা পরিষ্কার করে নিলো, তারপর বললো— এখানে তো কেউ ওপরে উঠছে না, কেউ নিচেও নামছে না, তাহলে এটা গঠনমূলক নাকি ধ্বংসাত্মক?

নির্ঝর মামা একটু মুচকি হেসে বললেন— একদম ঠিক ধরেছিস। এক্ষেত্রে প্লেটের ধ্বংসও হচ্ছে না আবার সৃষ্টিও হচ্ছে না, তাই এটি রক্ষণশীল প্লেট সীমানা বা Conservative plate boundary নামে পরিচিত।

ছবি: সমান্তরালভাবে গতিশীল প্লেট সীমানা বা Transform plate boundary

আচ্ছা বল দেখি হিমালয় সৃষ্টি এর মধ্যে কোন ধরণের সীমানাতে হয়েছে।

উপল একটু ভেবে বলল— আমি তো শুনেছিলাম প্লেটে প্লেটে ধাক্কা লেগে হিমালয় তৈরী হয়েছে। তার মানে অভিমুখী প্লেট সীমানা। কিন্তু, হিমালয় ধ্বংসাত্মক সীমানায় সৃষ্টি হলো কি করে?

নির্ঝর মামা বেশ অবাক হলেন, এই প্রশ্নটাও যে উপল করবে সেটা বুঝতে পারেননি। আবার উপলকে নিয়ে যে গর্ব তিনি করেন তার সার্থকতায় বুঝতে পারলেন। বললেন— খুব ভালো প্রশ্ন, কিন্তু এর উত্তর আমি এখন দেব না। তুই নিজে একটু ভাব তারপর আমাকে বলিস।

উপল বললো— আচ্ছা তাই হবে।

ইতিমধ্যে পাহাড়ি শহরে ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে এলো। জোনাকির মতো আলোগুলো পাহাড়ের গায়ে জ্বলে উঠলো। উপল এতক্ষণে লক্ষ্য করলো কি সুন্দরই না লাগছে দেখতে পাহাড়ি শহরটাকে।

নির্ঝর মামা বললেন— চল ম্যাল থেকে ঘুরে আসি, বাকিটা পরে হবে।

উপল উৎসাহের সাথে উঠে আবার চলল ঘরের দিকে তৈরী হয়ে নেওয়ার জন্য। নির্ঝর মামা চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে সামনে তাকিয়ে এক দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন অপরূপ “জোনাক পোকা”।

আগের পর্বটি না পড়ে থাকলে ক্লিক করুন: https://www.elebele.org/2021/02/plate-tectonics-1.html

—————————–

~ কলমে ও আঁকিবুকি এলেবেলে উদ্দালক ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।