সবুজ বাড়ী

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
496 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

এলেবেলের পাঠকদের কাছে বৈদ্যনাথ গুহনিয়োগী ওরফে বদ্যি খুড়ো একটি পরিচিত নাম। আগের দুটি লেখা ‘শিশু যিশু’ ও ‘বিদ্যুত বাঁচিয়ে পরিবেশ বাঁচাও’ পড়া পাঠকদের নিশ্চয়ই সম্যক ভাবে তাঁর সাথে পরিচিতি হয়েছে। অবশ্য খুড়োকে যারা চেনেন না তাঁদের অবগতির জন্য জানাই যে সমবয়স্ক লোকেদের তুলনায় পাড়ার ছেলে ছোকরাদের সঙ্গেই তাঁর আড্ডাটা বেশি। মোড়ের চায়ের দোকানে বা পার্কের মাঠে তার দেখা পাবেন সকাল সন্ধ্যে। আজকেও যথারীতি বৈকালিক আড্ডায় হাজির খুড়ো। তার আগেই মাঠে উপস্থিত হয়েছে শুভাশিস। সে-ই কথাটা পাড়ে “আগের দিন যে তুমি বলেছিলে যে ‘গ্রীন বিল্ডিং’ ব্যাপারটা কি সে সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করবে। তার কি হল? আজকে তো তোমার সময় আছে। তাহলে বলেই ফেলোনা ব্যাপারটা।” খুড়ো একটু ভেবে নিয়ে বলে “দাঁড়া আগে সুবিমলকে আসতে দে। তার আগে মদনের দোকান থেকে তিন কাপ চা নিয়ে আয়।” একটু বাদে হন্তদন্ত  হয়ে সুবিমলের প্রবেশ। চায়ের কাপে একটা বড় চুমুক দিয়ে খুড়ো শুরু করে, “তোরা কি কখনো ভেবে দেখেছিস যে তোদের বাড়ীটা কতখানি পরিবেশ বান্ধব? সেটাকে কি আমরা ‘গ্রীন বিল্ডিং’ বলতে পারি? অথবা একটু ঘুরিয়ে বলছি, তোদের পাড়ায় কি কোনো ‘গ্রীন বিল্ডিং’ আছে?” পাশে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছিল শুভাশিসের ভাইপো বিল্টু। সে হঠাৎ বলে উঠলো “সবুজ বাড়ীতো অনেক দেখেছি— এ আর নতুন কথা কি? আমাদের পাড়ার ভোম্বল দের বাড়ীটাও তো সবুজ রঙের— তাতে কি হ’ল?” খুড়ো এবার হেসে বললেন “না বিল্টু বাবু আমি সেই অর্থে সবুজ বাড়ীর কথা বলিনি— বড় হলে তুমি বুঝতে পারবে। ‘গ্রীন বিল্ডিং’ হচ্ছে সেই বাড়ী যা শুরু থেকেই তৈরি হয় পরিবেশের কথা মাথায় রেখে এবং সেই বাড়ী ব্যবহার হয় পরিবেশ বিঘ্নিত না করে।” সুবিমলের প্রশ্ন “তাহলে গ্রীন বিল্ডিং-এর তকমা লাভের জন্য বিচার্য বিষয় কি কি?” বলছি শোন, “গাছপালা না কেটে, জলাশয় না বুজিয়ে, প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করে, যথা সম্ভব কাঁচের দেওয়াল ও স্কাইলাইট ব্যবহার করে সূর্যের আলোর সাহায্যে প্রাকৃতিক ভাবে ঘর আলোকিত করে, সৌর প্রতিফলক লাগিয়ে জল গরম করে বা রান্নার ব্যবস্থা করে, বৃষ্টির জল জমিয়ে রেখে তা গাছপালায় জলসেচের কাজে ব্যবহার করে বা পাইপ দিয়ে মাটির তলায় পাঠিয়ে দিয়ে, ছাদে সৌর প্যানেল লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপন্ন করে, রাতের বেলায় সাধারণ টিউব লাইটের বদলে এলইডি টিউব লাইট এবং সাধারণ বাল্ব ও সিএফএল ল্যাম্পের পরিবর্তে এলইডি ল্যাম্প ব্যবহার করে আমরা আমাদের বাড়ীকে অনেকটাই পরিবেশ-বান্ধব করে গড়ে তুলতে পারি।

এবারে সুবিমলের প্রশ্ন “এই যে এত কিছু ব্যবহারের কথা বললে, তাতে পরিবেশের উপর তার প্রত্যক্ষ প্রভাব কতটা আমরা কি বুঝতে পারবো?”। খুড়ো বললেন “আমরা সবাই যদি মনস্থ করি যে প্রাকৃতিক সম্পদকে যথাসম্ভব কাজে লাগিয়ে বিদ্যুতের খরচ কমাবো, অপ্রচলিত বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াবো, বাড়ীতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়কারী এয়ারকন্ডিশনার, রেফ্রিজেরাটর, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি নিত্যব্যবহার্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করবো, জলের অপচয় বন্ধ করব এবং আন্তরিক ভাবে শক্তি সংরক্ষণের সকল রকম প্রচেষ্টার প্রতি যত্নবান হব তাহলে সুফল একদিন মিলবেই।”

“তোকে একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই” বললেন খুড়ো। “তোদের ছাদে তো তোর পড়ার ঘর। ঐ ঘরের ছাদে তুই যদি একটা সৌর প্যানেল লাগাতে পারিস— তাহলে যে সৌর বিদ্যুৎ পাবি তাতে তোর সারা বাড়ীর লাইট ও পাখা চলবে। অঙ্কের জটিলতার মধ্যে না গিয়ে মোটামুটি হিসেবে তোর ছাদে যদি ১৫০ বর্গ ফুট জায়গা থাকে তাহলে সৌর প্যানেল থেকে গড়ে ২ কিলো ওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে।অর্থাৎ কিনা সারা বাড়ীর জন্য প্রায় নিখরচায় বিদ্যুৎ। ‘নিখরচায়’ কথাটা অবশ্য বলা ঠিক নয় কারণ এই ফোটো ভোল্টেইক সেল দিয়ে গঠিত সৌর প্যানেল এবং তার আনুষঙ্গিক যন্ত্রাদি এখনো অনেক খরচ সাপেক্ষ এবং আমাদের অনেকেরই সাধ্যের বাইরে। তবে এই নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা ও গবেষণা চলছে। তাই খুব শীঘ্রই দেখবি যে এর দাম হয়তো অনেকটাই কমে যাবে। আর যে ভাবে ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তাতে দেখবি এককালীন যে টাকাটা তুই খরচ করলি তা দুই তিন বছরের মধ্যে উঠে আসবে। তখন আমাদের দেশে বসত বাড়ী, বাণিজ্যিক অফিস, শপিং মল ইত্যাদিতে সৌর বিদ্যুতের ব্যাপক ব্যবহার বাড়বে, কারণ আমাদের দেশের মত খুব কম দেশেই সারা বছরের বেশিরভাগ দিনে আকাশ এমন মেঘ মুক্ত থাকে।” সুবিমল বলে “এই ব্যবস্থায় একটা সুবিধে হবে যে ঘোর বর্ষার দিনে বা শীতের মেঘলা দিনে সৌর বিদ্যুৎ পাবোনা, তাই পড়ার হাত থেকে রেহাই এবং চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোনো যাবে।” খুড়ো বলে “সে গুড়ে বালি— এই সৌর বিদ্যুৎ ব্যাটারীতে সঞ্চিত থাকে যা ইনভার্টারের মাধ্যমে সারা বাড়ীতে সরবরাহ করা হয়। তাই কিছু সময় সূর্যের আলো কম থাকলেও কোনো ক্ষতি নেই। তাছাড়া তোর বাড়ীর বিদ্যুতের লাইন তো থাকছেই যা থেকে প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎ নিতে তো কোনো বাধা নেই”।

ঘোর বর্ষার দিনে বা শীতের মেঘলা দিনে সৌর বিদ্যুৎ পাবোনা, তাই পড়ার হাত থেকে রেহাই এবং চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোনো যাবে।

“এবারে তুই যদি নতুন কোনো গ্রীন বিল্ডিং তৈরি করতে যাস তাহলে যে প্রধান প্রধান ব্যাপারগুলি মাথায় রাখতে হবে তা হলো: এই  বিল্ডিংয়ের জীবনচক্রের সমস্ত পর্যায়ে শক্তির ব্যবহার হ্রাস করতে হবে, নতুন অথবা সংস্কার করা বাড়ীগুলি আরও স্বাচ্ছন্দ্যযুক্ত হতে হবে এবং বাড়ীতে বসবাসকারী লোকদেরও দক্ষ বা স্মার্ট হতে শিখতে হবে, বিল্ডিংয়ের শক্তি সরবরাহের জন্য পুনর্নবীকরণযোগ্য এবং কম-কার্বন প্রযুক্তিগুলিকে একত্রীকরণ করে তা কাজে লাগাতে হবে, পানীয় ও বর্জ্য জলের দক্ষতাপূর্ণ ব্যবহার এবং ব্যবস্থাপনার উন্নতির উপায়গুলি গ্রহণ করে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমিয়ে বিল্ডিংগুলিতে জলের ব্যবহার হ্রাস করতে হবে, বাড়ী তৈরির সময় আরও টেকসই উপকরণ ব্যবহার করতে হবে যাতে কম বর্জ্য সৃষ্টি হয় এবং পাশাপাশি বর্জ্য পুনরুদ্ধার এবং পুনরায় ব্যবহারের সংস্থান রাখতে হবে, ভিতরে তাজা বাতাস নিয়ে এসে বায়ুচলাচলের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বায়ুর মানের উন্নতি করতে হবে এবং ক্ষতিকারক বা বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি করে এমন সামগ্রী এবং রাসায়নিকগুলির ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বাড়ীতে বসবাসকারীদের স্বাচ্ছন্দ্য এবং তাদের আশেপাশের পরিবেশ উপভোগ করার জন্য প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং সেই সঙ্গে কৃত্রিম আলো কম জ্বালাতে হবে। আমাদের পরিবর্তিত জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য বন্যা, ভূমিকম্প বা অগ্নিকান্ডের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে কাঠামোগত নমনীয়তা এবং স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে যাতে আমাদের বাড়ীগুলি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং বসবাসকারী সকল মানুষ এবং তাদের জিনিসপত্র নিরাপদ থাকে। হাঁটাচলা বা সাইক্লিংয়ের মতো পরিবেশ-বান্ধব বিকল্পগুলিকে উৎসাহ দিতে হবে। আমাদের চারপাশের বিশ্বের সাথে আরও ভাল যোগাযোগের জন্য ‘স্মার্ট’ এবং তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর বিভিন্ন প্রযুক্তির সন্ধান করে তা যথা সম্ভব গ্রহন করতে হবে।” এতো লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে এবারে খুড়ো থামলেন। 

চায়ের কাপে আর এক লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, “গ্রীন বিল্ডিং সার্টিফিকেশন ব্যবস্থার রেটিং সিস্টেম এমন একটি মূল্যায়ন ব্যবস্থা যা পরিবেশগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কোনও বিল্ডিং বা নির্মাণ প্রকল্পের কার্যকারিতা নির্ধারণের জন্য ব্যবহৃত হয়। আমরা জানি যে আমাদের বসতবাড়ীর পরিবেশের উপর প্রত্যক্ষ এবং অপ্রত্যক্ষ প্রভাব আছে। তাদের নির্মাণ, সংস্কার, পুনর্নির্মাণ এবং ভেঙ্গে ফেলার সময় যে শক্তি, জল এবং কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়, যে বর্জ্য পদার্থ উৎপন্ন হয় এবং সম্ভাব্য ক্ষতিকারক গ্যাস বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয় এ সবের পরিবেশের উপর সম্মিলিত প্রভাব মূল্যায়ন করে তার রেটিং নির্ধারণ করা হয়। পরিবেশ-বান্ধব উন্নত প্রযুক্তি বা নকশার মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর নির্মীয়মাণ বা নির্মিত বাড়ীর প্রভাব হ্রাস করার লক্ষ্যে নেওয়া পদক্ষেপ এবং সেই সংক্রান্ত তথ্যগুলি যাচাই করে গ্রীন বিল্ডিং স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী   শংসাপত্র দেওয়া হয়। গ্রীন বিল্ডিংগুলি সত্যই পরিবেশ-বান্ধব কিনা তা যাচাই করতে ভারতে কয়েকটি প্রাথমিক রেটিং সিস্টেম চালু রয়েছে  যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গ্রীন রেটিং ফর ইন্টিগ্রেটেড হ্যাবিট্যাট অ্যাসেসমেন্ট(GRIHA) এবং ইন্ডিয়ান গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (IGBC)।”  

এবারে শুভাশিসের প্রশ্ন “আজকাল খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ে বিশ্ব উষ্ণায়নের কথা। এই ব্যাপারটা যদি একটু বুঝিয়ে বলো”। খুড়ো বললেন “এই কথাটা আজ সর্বজন বিদিত এবং আমরাও ভালো বুঝতে পারছি যে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমশঃ বাড়ছে। এর অনেক কারণ আছে— তার মধ্যে মুখ্য দুটি কারণ হলো,পৃথিবীর উপরিভাগের ওজোন স্তর ফুটো হয়ে যাচ্ছে এবং পৃথিবীর সব দেশেই গ্রীন হাউস গ্যাসের নিষ্ক্রমণ বাড়ছে। প্রথমটার ফলে অতিবেগুনি রশ্মি কম বাধা পাওয়ায় আরও বেশি করে পৃথিবীর বুকে এসে পড়ছে এবং ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। দ্বিতীয়টার ফলে সূর্য থেকে সংগৃহীত তাপ ভূপৃষ্ঠ পুরোপুরি বিকিরণ করতে পারছেনা, কিছুটা প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসছে, ফলে সমগ্র পৃথিবী ক্রমশঃ উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হচ্ছে। এই অবস্থা বেশীদিন চললে সুজলাং সুফলাং এই ধরিত্রীকে বেশিদিন হয়তো আমরা রক্ষা করতে পারবো না। কে বলতে পারে আমাদের এই উদাসীনতার জন্য ঘরের কাছের সুন্দরবন অথবা পাশের দেশ বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল হয়তো অচিরেই সমুদ্রের অতলে তলিয়ে যাবে এবং আমরা তার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবো।”

কে বলতে পারে আমাদের এই উদাসীনতার জন্য ঘরের কাছের সুন্দরবন অথবা পাশের দেশ বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল হয়তো অচিরেই সমুদ্রের অতলে তলিয়ে যাবে

শুভাশিসের প্রশ্ন “এই অঞ্চলগুলি হঠাৎ কেন সমুদ্রে তলিয়ে যাবে?” “হঠাৎ নয়, দীর্ঘদিনের অবহেলা আর উদাসীনতার প্রতিশোধ এবারে নেবে প্রকৃতি। ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বাড়ার কারণে কোথাও হবে অনাবৃষ্টি, কোথাও অতিবৃষ্টি, মেরু প্রদেশের বরফ যাবে গলে, সমুদ্রের স্তর উঠে আসবে পৃথিবীকে গ্রাস করতে। শেষের সে দিন বড় ভয়ঙ্কর” বললেন খুড়ো। সুবিমল টিপ্পনী কাটে “তাহলে তো আমাদের এখনই নোয়ার আর্ক বানানোর কাজে হাত লাগাতে হয়।” 

সুবিমল বলে “আচ্ছা খুড়ো— এই ওজন স্তর কেন ফুটো হয় তা তো বললে না? আর এই গ্রীন হাউস গ্যাসগুলিই বা কি?” “আমাদের বাড়ীতে আগে যে রেফ্রিজারেটর ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রন যন্ত্র ব্যবহৃত হত তার মধ্যে যে গ্যাস থাকত তার নাম ক্লোরোফ্লুওরো কার্বন বা সংক্ষেপে CFC । এই গ্যাসের ব্যবহার এখন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তবে ডিওডেরেন্ট ইত্যাদিতে যে এরোসল স্প্রে ব্যবহৃত হয় তাতেও CFC  থাকে যা পৃথিবীর উপরিভাগের ওজোন স্তরকে ক্ষয় করে দেয়।” খুড়োর জবাব। গ্রীন হাউস গ্যাস সম্পর্কে খুড়োর ব্যাখ্যা, “এই শ্রেনীর গ্যাসের মধ্যে প্রধানতঃ আছে পরিবেশ দূষণকারী কার্বন-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন ইত্যাদি। এইরকম নামকরনের কারণটা কি বলতে পারিস?” এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে দেখে খুড়ো বুঝতে পারলো যে ব্যাপারটা ওদের জানা নেই। তবে শোন, “গ্রীন হাউস তৈরি করা হয় চাষবাসের সুব্যবস্থার জন্য— যাতে স্বচ্ছ আচ্ছাদনের মধ্যে সংরক্ষিত পরিবেশে পোকামাকড় থেকে বাঁচিয়ে শাক-সব্জী ফলানো যায়। সূর্যের আলো এর স্বচ্ছ আচ্ছাদনের মধ্য দিয়ে চাষের জায়গায় প্রবেশ করে কিন্তু তাপ বেরোতে পারেনা। এই পরিবেশ শীতের দেশে চাষের ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ। এই যে তাপ না বেরোতে পারার ব্যাপারটা একেই বলে ‘গ্রীন হাউস এফেক্ট’। গ্রীন হাউস গ্যাস গুলি সাধারনতঃ বাতাসের থেকে ভারী হওয়ায় মাটির কাছাকাছি সঞ্চিত থাকে এবং মাটির তাপ উপরের বায়ুমন্ডলে পরিচালিত এবং বিকিরিত হতে দেয়না। ফলে ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বাড়তেই থাকে।”

“এই  গ্রীন হাউস গ্যাস সৃষ্টির জন্য জঙ্গলে আগুন বা দাবানলের অবদানও কিন্তু কম নয়। ভারতে এই  আগুন মূলত মানুষের ক্রিয়াকলাপ দ্বারা সৃষ্ট হয়। বনের আশেপাশে বসবাসকারী লোকেরা প্রায়শই পশুচারণের জন্য, ফসল বপনের পূর্বে অথবা নতুন ঘাস যাতে দ্রুত জন্মায় তার জন্য পুরনো চারণ ভুমি বা আগাছাপূর্ণ জমিতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এটি অনেক সময় আবাসস্থলের প্রয়োজনে, কীটপতঙ্গ দূর করতে, শুকনো কাঠ, গাছের ডাল এবং আক্রমণাত্মক আগাছা নষ্ট করার জন্য পূর্ব পরিকল্পিত ভাবে করা হয়ে  থাকে। কখনও কখনও আদিবাসী প্রধান অঞ্চলে জমি পরিষ্কার করে যাতে মহুয়া ফুল সহজেই সংগ্রহ করা যায়, তার জন্যও এ ধরনের আগুন লাগানো হয়, কিন্তু পরে তা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।” শুভাশিস বলে “কিছু বনের অগ্নিকাণ্ড তো প্রাকৃতিক কারণেও হয় যেমন বাজ এবং শুকনো বাঁশের ঘর্ষণ থেকে হতে পারে। দাবানলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে গ্রীষ্মে শুকনো পাতা, আগাছা এবং গুল্ম জ্বালানীর কাজ করে। তাই আগুনের মরশুম শুরুর আগে বনকে জ্বালানী মুক্ত রাখা স্থানীয় মানুষ এবং বন বিভাগের দায়িত্বের মধ্যে থাকা উচিত তাই না?” খুড়ো বলেন “একদম ঠিক বলেছিস।”

“তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে যে গ্রীন হাউস গ্যাসের সৃষ্টি হয় সে কথা তো আগেই বলেছি। পেট্রোল এবং ডিজেল চালিত গাড়ী থেকে যে পরিবেশ দূষিত হয় সে তো আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। তোদের খেয়াল আছে নিশ্চয় এই কিছু দিন আগে করোনা জনিত লকডাউনের কারনে যখন গাড়ীঘোড়ার ব্যবহার অনেক কমে গিয়েছিলো তখন অনেক বড় বড় শহরে বাতাসের গুনমান সূচক বা এয়ার কোয়ালিটি ইন্ডেক্স-এর অনেক উন্নতি হয়েছিল।” সুবিমল যোগ করে “উত্তরবঙ্গের কিছু শহর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা তখন পরিষ্কার দেখা গিয়েছিলো যা স্মরণকালের মধ্যে কখনো চোখে পড়েনি।”

খুড়ো বলেন “এবারে আরো একটা কথা তোদের জিজ্ঞাসা করছি ‘রেন ওয়াটার হারভেস্টিং’ কথাটা শুনেছিস কখনো?” সুবিমল অম্লান বদনে বলে “কেন শুনবো না? বৃষ্টির জলকে চাষের কাজে ব্যবহার করা।” খুড়ো বলেন “তোরা দেখছি আমার নামটাই ডোবাবি। ভালো করে শোন— বৃষ্টির জল সংগ্রহ করে পরে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করাই হচ্ছে ‘রেন ওয়াটার হারভেস্টিং’-এর মূল কথা। সাধারণতঃ বৃষ্টির জল কোনও কাঠামো বা ছাদ থেকে সংগ্রহ করা হয়। বৃষ্টির জল বয়ে আনার জন্য ছাদের কিনারা দিয়ে লম্বা একটা পাইপ বসানো হয় যেটা সমস্ত জল নিয়ে এসে খাড়া পাইপের সাহায্যে নীচে কোন জলের ট্যাঙ্ক অথবা ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠে সঞ্চয় করে।” সুবিমল বলে “হ্যাঁ, এইরকম ব্যবস্থা আমি দার্জিলিঙের গ্রামের দিকে এবং ভূটানে দেখেছি।” “ঠিকই বলেছিস তুই। এইসব পাহাড়ী অঞ্চলে জলের খুব সমস্যা তাই তারা বাধ্য হয়ে বাঁচার তাগিদে সুষ্ঠু ভাবে বৃষ্টির জলের সংরক্ষণ করে থাকে। জলের ট্যাঙ্ক থেকে জল নিয়ে আমরা বাসন মাজা, ঘর ধোয়া অথবা বাগানে গাছে জল দেবার কাজে ব্যবহার করতে পারি। আর ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠে যে জল সঞ্চিত হয় সেটা আমরা মাটির তলে পাঠিয়ে ভূগর্ভের জলতলের ক্ষয়কে পূরণ করতে পারি।” খুড়োর সংযোজন।

“ভূগর্ভের জলতল ক্ষয় হয় কেন?” প্রশ্ন সুবিমলের। খুড়োর জবাব “এটা খুব ভালো প্রশ্ন করেছিস। তোরা  আজকাল দেখেছিস নিশ্চয় শহরের বহুতলগুলিতে সাবমারসিবল পাম্পের বহুল ব্যবহার চলছে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলের চাষীরা শ্যালো পাম্প দিয়ে মাটির তলা থেকে জল তোলে চাষের জন্য। এতে যে ভূগর্ভের জলতল ক্রমশঃ নেমে যাচ্ছে সেটা কি ভাবে পুরণ করা যায় সেটা ভাবার সময় এসে গেছে। তাই বৃষ্টির জল সংগ্রহ করে তা আমাদের প্রয়োজনের কাজে ব্যবহারের পর তা মাটির নিচে পাঠিয়ে দেওয়া একটি কার্যকরী বিকল্প হিসেবে স্থান পেয়েছে। কারণ শহর অঞ্চলে খোলা মাঠ বা পুকুর নালা ইত্যাদির বড় অভাব। বেশির ভাগ খোলা জায়গাই পীচে মোড়া বা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। তাই মাটি বৃষ্টির জল শুষে নেবার অবকাশ পায়না। বেশির ভাগ জলই ড্রেন বা ম্যানহোল দিয়ে বেরিয়ে যায়। বৃষ্টির থেকে কতটা জল আমরা সংগ্রহ করতে পারি তার একটা মোটামুটি হিসেব হল ১০০০ স্কোয়ার ফুট অঞ্চলে যদি ১ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয় তাহলে প্রায় ২৪০০ লিটার জল আমরা সংগ্রহ করতে পারি। এই পরিশুদ্ধ জল আমরা প্রকৃতির থেকে বিনামূল্যে পেতে পারি— এটা কি কম কথা?”

১০০০ স্কোয়ার ফুট অঞ্চলে যদি ১ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয় তাহলে প্রায় ২৪০০ লিটার জল আমরা সংগ্রহ করতে পারি।

“আমাদের দেশ নদীমাতৃক দেশ। এই নদীর উপরেই কত লোকের রুজি রোজগার নির্ভর করে সে কথা আশা করি তোদের বলে দিতে হবেনা। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে আজ চরম অবহেলা আর নির্লিপ্ততার কারণে এই নদীগুলির মধ্যে অনেক গুলিই হেজে মজে গেছে, দূষণের শিকার হয়েছে, বর্জ্য পদার্থতে পরিপূর্ণ। অনেক নদী বিলুপ্তি আর বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে। এর জন্য কিন্তু আমরা সবাই দায়ী— পরবর্তী প্রজন্ম কিন্তু এজন্য আমাদের ক্ষমা করবেনা, এটা জেনে রাখিস।” ক্ষোভের সুর খুড়োর গলায়।

খুড়ো বলেন “একটা কথা ভেবে দ্যাখ যে ইট, কাঠ, কংক্রীটের জঙ্গলে বাস করলেও আমাদের কিন্তু প্রকৃতির উপর টানটা রন্ধ্রে মজ্জায় বা সঠিক ভাবে বলতে গেলে আমাদের জিনের মধ্যে রয়ে গেছে। তাই সুযোগ বা সময় পেলে আমরা আমাদের আশেপাশে গাছ লাগাই সেগুলির পরিচর্যা করি। এটা আমাদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য উভয়ের জন্যই জরুরী। তোরা স্কুলের বইতে নিশ্চয়ই পড়েছিস ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের কথা। এটি প্রাচীন পৃথিবীর সাতটি আশ্চর্যের মধ্যে একটি ছিল। রাজা দ্বিতীয় নবুচাদনেজার আনুমানিক ৬০০ খৃষ্টপূর্বে এই ঝুলন্ত উদ্যান তৈরি করেছিলেন যা ছিল সেই সময়কার প্রযুক্তির এক বিস্ময়কর কীর্তি। তাতে বিভিন্ন ধরণের গাছ, গুল্ম এবং লতা ছিল যা ধাপে ধাপে উঠে এক বিশাল সবুজ পাহাড়ের মত বাগানের সৃষ্টি করেছিলো। কথিত আছে রানী অ্যামিটিস তাঁর গ্রামের সবুজ পাহাড় এবং উপত্যকার অভাব অনুভব করে মনঃকষ্টে ছিলেন। তাই রাজা এক সুদৃশ্য প্রাসাদ  নির্মাণ করে দেন যেখান থেকে এই ঝুলন্ত বাগানটির শোভা উপভোগ করা যায়। যদিও আজ অবধি এই ঝুলন্ত উদ্যানের কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এই অঞ্চলে পাওয়া যায় নি। হতে পারে এই প্রাসাদ আর ঝুলন্ত বাগানটি সময়ের সাথে সাথে ইউফ্রেটিস নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।”

কথিত আছে রানী অ্যামিটিস তাঁর গ্রামের সবুজ পাহাড় এবং উপত্যকার অভাব অনুভব করে মনঃকষ্টে ছিলেন।

শুভাশিস বলে “খুড়ো তোমাকে বাড়িয়ে বলছিনা, তুমি যদি সুবিমলের বাড়ির ছাদে যাও তাহলে দেখবে ছাদে ও ব্যালকনিতে ও যে সুন্দর গাছপালা, লতাপাতা লাগিয়ে বাগান বানিয়েছে তা ব্যাবিলনের বাগানের থেকে কোনও অংশে কম নয়। ওর বাড়ির ছাদের ওপরে ড্রোন উড়িয়ে ফটো তুলে তোমাকে দেখালে তুমি বুঝতে গ্রীন বিল্ডিং বা সবুজ বাড়ী কাকে বলে!”

 

————————

~ কলমে এলেবেলের অতিথি দেবাশীষ দাশগুপ্ত ~

দেবাশীষ একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রযুক্তিবিদ

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।