চিকিৎসা প্রসঙ্গে মানুষের কগ্নিটিভ বায়াস বা জ্ঞান সম্বন্ধীয় পক্ষপাত

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
172 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

আমরা জীবনের বিভিন্ন তর্ক-বিতর্ক-আলোচনা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা উদাহরণ টানি। কখনো তা চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে হতে পারে, কখনো জ্যোতিষীর কথা ফলে যাওয়া হতে পারে, রাজনৈতিক মতাদর্শের ক্ষেত্রে হতে পারে, বা আরও অন্যান্য নানা ক্ষেত্রে হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে কিন্তু আমাদের সবার মধ্যেই কিছু না কিছু কগ্নিটিভ বায়াস বা জ্ঞান সম্বন্ধীয় পক্ষপাত কাজ করে, যার ফলে আসল সত্যির বদলে অনেক সময়েই আমাদের মস্তিষ্ক আমাদের পছন্দের ধারণাটিকেই সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর আমাদের সবথেকে বড় কগ্নিটিভ বায়াসটি হল, আমরা ভাবি আমরা কগ্নিটিভ বায়াস কাটিয়ে উঠতে পারি। আর যেহেতু আমরা কগ্নিটিভ বায়াস কাটিয়ে উঠতে পারি না, তাই কঠিন বাস্তবটা এটাই যে আমাদের রোজকার সব আচরণের মধ্যে কগ্নিটিভ বায়াস এতোটাই জড়িয়ে আছে যে আমরা তার অস্তিত্বটা বুঝতে অব্দি পারি না, বা তাকে গুরুত্ব দিই না। যেমন ধরুন, আপনি ট্রেনের যে সিটটায় বসতে পছন্দ করেন সেটা একদিন খালি না থাকলে আপনার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। আচ্ছা, অন্য সিটে বসলে কি আপনাকে হাওড়ার জায়গায় হরিয়ানা নিয়ে যাব? তা তো না, কিন্তু তবু আপনার মন খারাপ হয়ে গেলো। আবার ধরুন, আপনি গাড়ির বিমা রিনিউ করাবেন, আপনি বেশিরভাগ সময়েই আগেরবার যার কাছ থেকে বিমা করিয়েছিলেন তাকে দিয়েই করাতে চান, এটা দেখেন না যে অন্য কোন ভালো কোম্পানি আরও কম দামে আপনাকে বিমা দিচ্ছে। এগুলো খুবই সোজা উদাহরণ। তবে এরকম অনেক উদাহরণ আছে যেখানে এই কগ্নিটিভ বায়াসগুলো বেশ বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ। আপাতত: এরকমই কয়েকটা চিকিৎসা সংক্রান্ত অতি পরিচিত বায়াস আর ফ্যালাসি বোঝাতে আমরা কিছু উদাহরণ দেব। দেখব এই ধরণের বিতর্কে প্রকৃত তথ্যের বদলে কিভাবে আমাদের পক্ষপাত আমাদের জ্ঞানত বা অবচেতনে ব্যবহৃত হয়।

আমাদের সবথেকে বড় কগ্নিটিভ বায়াসটি হল, আমরা ভাবি আমরা কগ্নিটিভ বায়াস কাটিয়ে উঠতে পারি। 

 

১) যেমন অনেকেই বলেন যে “আমার নিজের চোখে দেখা, মনের জোর না থাকলে, বাঁচার ইচ্ছে না থাকলে হাজার চিকিৎসাতেও কোন কাজ হয়না।” এখানে কেউ ওষুধই খাচ্ছেন না, চিকিৎসা করাচ্ছেন না, বা প্রায়োপবেশন করছেন, সেক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রসঙ্গ আসছেই না। তাই সেটা বাদ রাখছি। কিন্তু চিকিৎসা চলছে, সেই রোগের ক্ষেত্রে জীবন শৈলীর জন্য যা করণীয়, তা করা হচ্ছে, তবুও সেরে ওঠার মত রোগ সারছেনা, এটা একটু বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু ধরলাম, যিনি বলছেন, তিনি সত্যিই এটা দেখেছেন। এঁর ক্ষেত্রে কিন্তু ভীষণ ভাবে একটা বায়াস কাজ করছে। উনি কোথাও শুনেছেন যে “বাঁচার ইচ্ছে না থাকলে হাজার চিকিৎসাতেও কোন কাজ হয়না।” সেটা মনে মনে বিশ্বাসও করেছেন। এরপর উনি যেখানেই দেখেছেন, কোন চিকিৎসাযোগ্য রোগে রুগী মারা গেছেন (সব সময় চিকিৎসাযোগ্য রোগে যে রুগী বেঁচে ওঠে তা নয়) তখনি ধরে নিয়েছেন যে তাঁর বাঁচার ইচ্ছে ছিল না, বা হয়তো কোন রুগী বলেছেন “বাঁচার আর ইচ্ছে নেই” এবং মারা গেছেন, উনি সেগুলোকে নিয়ে নিজের ধারনাকে পরিপুষ্ট করেছেন। এমন রুগী যাঁরা বলেছেন “বাঁচার আর ইচ্ছে নেই” এবং তারপরেও সুস্থ হয়ে উঠেছেন সেগুলো ওঁর মনে দাগ কাটেনি, বা ভুলে গেছেন, বা ভেবেছেন মুখে বললেও আসলে বাঁচার ইচ্ছে ষোল আনাই ছিল। এই ক্ষেত্রে মূলত যে কগ্নিটিভ বায়াসটি কাজ করছে, সেটি হল কনফার্মেশন বায়াস। কনফার্মেশান বায়াসের আরেকটা জলজ্যান্ত উদাহরণ— যাঁরা জ্যোতিষে বিশ্বাস করেন, তাঁদের ভাবনার ক্ষেত্রেও। জ্যোতিষীর দশটা কথার মধ্যে দুটো মিলেছে, বাকি আটটা মেলেনি, কিন্তু কনফার্মেশান বায়াসের ফলে তিনি মনে রাখবেন, যেগুলো মিলেছে সেগুলোই। আবার যেমন টেলিপ্যাথি আমি বছরে ৯৯ বার বন্ধুর কথা ভাবলাম, কিন্তু সে ফোন করলো না; ১০০ বারের বেলায় সে যেই ফোন করল অমনি আমার মনে সেটা দাগ কেটে গেলো। আমার টেলিপ্যাথিতে বিশ্বাস আরও পোক্ত  হল।  

মনের জোরে বিখ্যাত সাইক্লিস্ট ল্যান্স আর্মস্ট্রং-র মেটাস্টেসিস হবার পরেও ক্যান্সার মুক্ত হয়েছিলেন

২) যখন কোন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ করে (‘সারিয়ে’ বা ‘মুক্ত হয়ে’ কথাটা সচেতন ভাবে বাদ রাখলাম, কারণ ক্যান্সার মুক্ত বা সারিয়ে ওঠা নিশ্চিত ভাবে কখনওই বলা যায়না বলে) পূর্বের জীবনে ফেরত আসেন, সেক্ষেত্রে সংবাদ মাধ্যমে বেশিরভাগ সময়েই ক্যান্সারের ক্ষেত্রে তাঁদের লড়াকু মনোভাবের কথা লেখা হয়। বিশেষতঃ ক্রীড়াবিদ ও অভিনেতাদের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা জনগণ বিশ্বাস করতে ভালোওবাসে। যেমন, একটা বিশ্বাস “মনের জোরে বিখ্যাত সাইক্লিস্ট ল্যান্স আর্মস্ট্রং-র মেটাস্টেসিস হবার পরেও ক্যান্সার মুক্ত হয়েছিলেন”। এবার বেশির ভাগ মানুষই সিনেমা, সাহিত্য, কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সার চিকিৎসার সাথে যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রচারে ভাবেন, ক্যান্সার মানেই অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু; কিন্তু সেটা মোটেই পূর্ণসত্য নয়। যেমন ল্যান্স আর্মস্ট্রং-র যে ক্যান্সার হয়েছিল, সেক্ষেত্রে সারভাইভাল রেট ৯৫%। ল্যান্সের একাধিক অপারেশন হয়েছিল, যা সৌভাগ্যক্রমে সফল হয়েছিল এবং তীব্র কেমো চলেছিল। আর কেমোতে এই ধরণের ক্যান্সারে খুবই ভাল ফল পাওয়া যায়। কিন্তু যিনি এগুলো জানেন না, কোন তথ্যও নেই তাঁর কাছে, অথচ তিনি ভাবছেন ল্যান্সের মত লড়াকু মনোভাব থাকলেই যে কোন ক্যান্সারের থেকে বেঁচে ফেরা যায়, দরকার শুধু লড়াকু মনোভাবের। এক্ষেত্রে যুক্ত বায়াসটি মূলত সারভাইভারশিপ বায়াস। মূলত, তথ্যের অভাবে এই বায়াস তৈরি হয়। ল্যান্সের কেমো, সার্জারি, ওই ক্যান্সারে বেঁচে ওঠার সম্ভবনা এগুলো আপনাকে জানান হয় না। জানেন আপনি শুধু তিনটি শব্দ ক্যান্সার, বেঁচে ওঠা, আর লড়াকু মনোভাব। এর থেকে কেবল একটাই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়— ক্যান্সারের থেকে বেঁচে ফেরা যায়, দরকার শুধু লড়াকু মনোভাবের; আপনার দোষ তাতে বিশেষ নেই। সারভাইভারশিপ বায়াসের খুব বড় আরেকটা উদাহরণ কোন বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতিতে দুরারোগ্য ব্যাধি সেরে যাবার অভিজ্ঞতা বর্ণনার ক্ষেত্রে। কোন একজনের হয়তো কোনভাবে বাঁচার কথা শুনেছেন, বা দেখেছেন, কিন্তু তলিয়ে পুরোটা হয়তো জানেনও না, বা এই বিকল্প চিকিৎসা করাতে গিয়ে কত লোক আদৌ সুস্থ হয়নি, সে সম্বন্ধে কোন তথ্য নেই। উনি খালি একজন-দুজনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ওই বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতিটির দুরারোগ্য রোগ সারাবার ক্ষমতার ওপরে বিশ্বাস আরোপ করেছেন। এ ব্যাপারে ব্যক্তির ভূমিকা প্রধান হলেও বিখ্যাত ব্যক্তিদের সেরে ওঠার ক্ষেত্রে বায়াস তৈরিতে ব্যক্তির চেয়ে সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকাই বেশি। সেক্ষেত্রে  দেখার বিষয় তারা কিভাবে খবরটা পরিবেশন করছে। তারা কি পুরো বিষয়টা উল্লেখ করেছে, না চেরি পিকিং ফ্যালাসি অনুসরণ করে বাকি তথ্য ও পরিসংখ্যান না দিয়েই ল্যান্স আর্মস্ট্রং-র লড়াকু মনোভাব, মনের জোরের এসবই খালি উল্লেখ করেছে! চেরি পিকিং ফ্যালাসি হল, যেটুকু তথ্য নিজের পছন্দের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে শুধু সেইটুকুই উল্লেখ করা, বাকিটা চেপে যাওয়া। কনফার্মেশন বায়াসের মত হলেও একটাই সূক্ষ্ম পার্থক্য, কনফার্মেশন বায়াসের ক্ষেত্রে আমাদের মস্তিষ্ক আমাদের ইচ্ছানিরপেক্ষ ভাবেই তথ্যটা সেভাবে প্রস্তুত করে, চেরি পিকিং-র ক্ষেত্রে আমরা জেনে বুঝে স্বেচ্ছায় করি। 

এবার যদি কেউ সব জেনেও বলেন যে  “মনের জোরে বিখ্যাত সাইক্লিস্ট ল্যান্স আর্মস্ট্রং-র মেটাস্টেসিস হবার পরেও ক্যান্সার মুক্ত হয়েছিলেন, “সেক্ষেত্রে এটি আরেকটি লজিক্যাল ফ্যালাসি, যাকে বলে টেক্সাস শার্পশুটার ফ্যালাসি। অর্থাৎ, আগে গুলি করে, গুলির গায়ে চাঁদমারি এঁকে নিজের নিশানা নির্ভুল প্রমাণের চেষ্টা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ল্যান্সের চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য আছে, কিন্তু তথ্যগুলোকে সেই নির্দিষ্ট ক্যান্সারের (যার সারভাইবাল রেট ৯৫%) ক্ষেত্রে বিচার না করে সচেতন ভাবে অন্য কঠিন ক্যান্সারের (যেগুলোর বাঁচার হার খুবই কম) পরিসংখ্যানের সাথে ফেলে বিচার হচ্ছে। আমরা নিশ্চয়ই সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বর আর টাইফয়েডের জ্বর একই রোগ হিসেবে দেখি  না, কিন্তু এক্ষেত্রে সেরকমই দেখা হচ্ছে। এবং এই ফ্যলাসির দ্বারা ল্যান্সের বেঁচে ওঠার একটা কারণ হিসেবে নিজের ধারণা অনুযায়ী ‘মনের জোর’কেই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংবাদ মাধ্যমের এখানে একটা বিরাট ভূমিকা আছে, বুঝতে হবে, তারা কি তথ্য কিভাবে আমাদের কাছে পৌঁছতে চাইছে

এতো হল যারা ভাল হয়ে ফেরেন তাঁদের কথা। আমাদের দেশে অনেক বিখ্যাত মানুষই ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে অ্যামেরিকায় চিকিৎসা করান। কেউ ভাল হয়ে ফেরেন, কেউ হননা। যাঁরা ফিরলেন তাঁদের লড়াইয়ের কথা লোকে সংবাদ মাধ্যমের দ্বারা জানতে পারে, কিন্তু যাঁরা ফিরলেন না, তাঁদের ফাইটিং স্পিরিটের গল্পটা স্বজন ছাড়া আর কেউ জানতে পারেননা। যেহেতু সেটা মানুষ জানতে পারেনা, তাই এক্ষেত্রেও একটা সারভাইভারশিপ বায়াস তৈরি হয়। যেমন, ধরা যাক, কেউ চিকিৎসাযোগ্য ক্যান্সারে পয়সার অভাবে উপযুক্ত চিকিৎসা করাতে পারলেন না এবং মারা গেলেন। কিন্তু এক্ষেত্রে চিকিৎসার বৈষ্যম্যটা কেউ খেয়াল না করে খবর কাগজে পড়া কোন সেলিব্রিটির একই ক্যান্সারের উদাহরণ দিয়ে বলে, ওর আসলে ফাইটিং স্পিরিটটাই ছিলনা, তাই হেরে গেল ক্যান্সারের কাছে। বা ধরা যাক, উপযুক্ত চিকিৎসা হয়েছিল, কিন্তু কোন শারীরবৃত্তীয় বা জেনেটিক কারণে, চিকিৎসায় সাড়া দেননি, বা ক্যান্সারটাই হয়তো আলাদা। সেটা না জেনেই ফট করে আগের মত ফাইটিং স্পিরিটের অভাবে হেরে যাবার কথা বলা হল। দুক্ষেত্রেই এটা সারভাইভারশিপ বায়াসের উদাহরণ। যেহেতু, যাঁরা মারা যান তাঁদের ফাইটিং স্পিরিট সংক্রান্ত কোন তথ্য দেখানো হয় না, তাই যাঁরা বেঁচে যান, তাঁদের বাঁচার কারণটাই হয়ে দাঁড়ায় ‘ফাইটিং  স্পিরিট।’ আবার, কেউ যদি চিকিৎসার বৈষ্যম্যটা সচেতন ভাবে এড়িয়ে গিয়ে শুধু সেলিব্রিটির কেসটা তুলে ধরে ‘ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ফাইটিং স্পিরিট’ প্রমাণ করতে চান, সেক্ষেত্রে এটা আবার চেরি পিকিং ফ্যলাসি; শুধু সেই তথ্যই দেখানো হচ্ছে, যেটা আমি প্রমাণ করতে চাই। আগেই যেমন বললাম, সংবাদ মাধ্যমের এখানে একটা বিরাট ভূমিকা আছে, বুঝতে হবে, তারা কি তথ্য কিভাবে আমাদের কাছে পৌঁছতে চাইছে, বা তারা ঠিক কি ধরনের বায়াস লোকের মধ্যে তৈরি করতে চাইছে। যেমন এরকম একটা খবরের উদাহরণ, মহিলা টেনিস তারকা সেরেনা উইলিয়ামস মা হওয়ার তিনমাসের মধ্যে কোর্টে ফিরলেন। কি বায়াস তৈরি করতে এটা ব্যবহৃত হতে পারে? যে মহিলারা মা হবার দুমাসের মধ্যেই দিব্যি কাজে ফিরতে পারে। অর্থাৎ মাতৃত্বকালীন ছুটির দরকার নেই। এটাই কর্পোরেট স্টাইল। কেউ একবারও এটা বললেন না যে সেরেনা এই কদিন ছুটি নিলেও, এত জন টেনিস তারকা কিন্তু এত এত মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়েছেন। বা কেউ এটা প্রতিবেদনে দেখাল না যে সেরেনার ফিটনেস, তাঁর প্রশিক্ষণ, বাচ্চা জন্মাবার আগের বা পরের দিনগুলোতে তাঁর পেছনে ক’টা দল প্রতিনিয়ত কাজ করে গেছে; যেটা একজন সাধারণ মা কোনদিন কল্পনাই করতে পারবেন না। তাঁকে শুধু বোঝানো হল যে, মা হওয়ার তিনমাসের মধ্যে তোমাকে কাজে ফিরতে হবে। সেরেনা পেরে থাকলে তুমিও পারবে। এখানে এটা ভেবে ভুল করবেন না যে আমরা মহিলাদের কাজ করা, বা তাঁদের কর্মক্ষমতা নিয়ে কোন সন্দেহ প্রকাশ করছি। আমরা শুধু বলছি মাতৃত্বকালীন সময়ে একজন মহিলাকে যথেষ্ট মানসিক ও শারীরিক পরিশ্রম ও পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সেক্ষেত্রে তিনি যদি সেটা সুস্থভাবে কাটিয়ে ওঠার জন্যে ছুটি চান, সেখানে কারুর কিছু বলার থাকতে পারে না। 

পক্ষপাত বা বায়াস অনেক সময় বিপদ বাড়িয়ে তুলতে পারে।

যদিও কারো পক্ষেই কগ্নিটিভ বায়াস সম্পূর্ণ কাটিয়ে ওঠা শক্ত, তবু চিকিৎসা ক্ষেত্রে আমাদের উচিত যথাসাধ্য তথ্যাদি যোগাড় করে নৈব্যক্তিক ভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করা। কারণ, এক্ষেত্রে পক্ষপাত বা বায়াস অনেক সময় বিপদ বাড়িয়ে তুলতে পারে। সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে ভারতে যেটি ঘটে সেটি এর একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ। ভারতে প্রতি বছর সাপের কামড় খায় গড়ে প্রায় আঠাশ লক্ষ মানুষ, মারা যায় প্রায় পঞ্চাশ হাজার। পঞ্চাশ হাজার সংখ্যা হিসেবে বিরাট হলেও শতাংশ হিসেবে ২% এর মত মাত্র, অর্থাৎ বাঁচার হার ৯৮% এরও বেশি। এখানে ওঝার কোন কেরামতি নেই, ৯৮% মানুষ বেঁচে যায়, কারণ নির্বিষ সাপের কামড়। কিন্তু মানুষের মাথায় থাকে ওঝার সাফল্যের হার ৯৮%, ফলে  বিষধর সাপে কামড়ালে ওঝার ওপর ভরসা রেখে অনেক প্রাণ যায়। মূলত, এক্ষেত্রে কনফার্মেশান ও সারভাইভারশিপ দুরকম বায়াসই কাজ করে। যাঁরা পরিজনকে ওঝার কাছে নিয়ে যাচ্ছেন, তাঁরা না জেনেই নির্বিষ সাপের কামড়ে বেঁচে যাওয়াকে ওঝার কৃতিত্ত্ব ভেবেছেন, তাঁরা বিষধর সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে ওই ওঝার ব্যর্থতার কথাটা মাথায় রাখেননি বা হাজারটা উল্টো যুক্তি ভেবেছেন— ওঝার কাছে নিয়ে যেতে দেরী হয়ে গেছিল, বা ওটা কালনাগ ছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে কনফার্মেশান বায়াস পরিজনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল। বা, উল্টোদিকে যে কজন বেঁচেছে (আসলে এমনিই বাঁচত,  নির্বিষ সাপ বলে), সে কজনের কথাই মনে রেখে, বাকি কত জন মারা গেছে, সে ব্যাপারে কোন ধারণা না রেখেও ওঝার কাছে যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। ফলস্বরূপ, এই দুই বায়াসের কারণে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার প্রাণ প্রতি বছর। প্রায় একই জিনিস ঘটে, জটিল রোগের ক্ষেত্রে হাতুড়ে চিকিৎসকদের পাল্লায় পড়ে। যখন বোঝা যায়, বেশির ভাগ সময়েই অনেক দেরি হয়ে যায়। 

————————————-

~ কলমে এলেবেলে প্রত্যয় ও এলেবেলে নির্মাল্য ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।