পাহাড়ে উপল- প্লেট টেকটনিক তৃতীয় পর্ব

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
156 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

ম্যাল জায়গাটা বেশ ভালোই লেগেছে উপলের। হোটেলে ফিরে এসে মনের মধ্যে রোমন্থন করে নিচ্ছে সন্ধ্যেবেলার উপভোগ করা মুহূর্তগুলো। এই ঠান্ডায় বসে ধোঁয়া ওঠা কফি খাওয়ার যে কি আনন্দ তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়, শুধু অনুভব করা যায়। নির্ঝর মামা আবার বারান্দায় গিয়ে বসেছেন, ফোনে আগামীকালের জন্য গাড়ি বুক করে নিচ্ছেন। আগামীকাল ‘টাইগার হিল’ দেখতে যাওয়ার কথা। সেখান থেকে সূর্যোদয় দেখে ফিরে আসার পথে চা বাগান ভ্রমণ, এরকমটাই প্ল্যান আপাতত।

নির্ঝর মামা বললেন— কালকে খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে বুঝলি! চল রাতের খাওয়াটা সেরে ফেলি। 

অর্ডার মতো খাবারটা চলেও এলো। দুজনেই রাত্রে চিকেন থুকপা দিয়ে রাতের খাওয়াটা সেরে ফেললো। খাবার পর খানিক পায়চারি করে শুয়ে পড়লো উপল। মনের মধ্যে আবার উদয় হলো সেই প্রশ্নটা, হিমালয় তৈরী হলো কিভাবে? তাও আবার ধংসাত্মক প্লেট সীমানায়। বেশ আশ্চর্যের বিষয় তো! আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলো সে। ভাবতে ভাবতে ঘুম এসে গেল তার,  ক্লান্ত শরীর স্বপ্নের দেশে হারিয়ে গেল।

পাউরুটির মাঝে থাকা জ্যামটা দুই পাউরুটির মাঝে চাপা পরে বাইরে বেরিয়ে এলো এই রকমই কিছু কি হয়েছে হিমালয় সৃষ্টির ক্ষেত্রে? দুটি প্লেটের মাঝে কিছু তুলনায় নরম বস্তু চাপা পড়ে ওপরের দিকে উঠেছে?

কিরে ওঠ এবার, নাহলে কিন্তু সূর্যোদয়ের আগে পৌঁছাতে পারবো না। টাইগার হিলে গাড়ির প্রচন্ড ভিড় হয়, লম্বা লাইন পড়ে —খানিক চেঁচিয়ে বললেন নির্ঝর মামা। 

উপল ধড়ফড় করে উঠে বসলো বিছানায়। চোখ মুছতে মুছতে বললো— খুব দেরি হয়ে গেছে বুঝি?

নির্ঝর মামা একটু আশ্বাস দিয়ে বললেন— না এখনো হয় নি তবে আর কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলে হবে বইকি।

উপল উঠে তৈরী হয়ে প্রাতরাশে জ্যাম স্যান্ডউইচ অর্ডার করলো। স্যান্ডউইচ খাবার সময় দুটি পাউরুটিতে একটু চাপ দিতেই জ্যামটা বাইরে বেরিয়ে এসে পড়লো কিছুটা উপলের গায়ে। উপল সেদিকে খেয়াল না করে, কি জানি কি একটা ভাবতে লাগলো। 

এমন সময় নির্ঝর মামা বললেন— কিরে শেষ কর খাবারটা এবার। 

উপল ভাবনা থেকে বেরিয়ে এক গ্রাসে খাবারটা মুখে পুড়ে বললো— এইতো শেষ। চলো এবার। 

গাড়িতে উঠে মামাকে বললো— আচ্ছা, দুটো শক্ত বস্তুর মাঝে যদি তুলনায় তরল বস্তু চাপা পড়ে তাহলে তা বেরিয়ে আসে, যেমনটা একটু আগেই হলো। পাউরুটির মাঝে থাকা জ্যামটা দুই পাউরুটির মাঝে চাপা পড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো এই রকমই কিছু কি হয়েছে হিমালয় সৃষ্টির ক্ষেত্রে? দুটি প্লেটের মাঝে কিছু একটা তুলনায় নরম বস্তু চাপা পড়ে ওপরের দিকে উঠেছে?

নির্ঝর মামা খুব অবাক দৃষ্টিতে উপলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। উপলের ভাবনার ধরণ নিয়ে বেশ আশ্চর্য হয়ে তিনি বললেন—একদম ঠিক ধরেছিস, খানিকটা ওই রকমই ঘটনা ঘটেছে এবং এখনও ঘটে চলেছে। টাইগার হিল পৌঁছতে এখনও বেশ খানিকটা দেরি আছে। তাহলে একটু খুলেই বলি তোকে গল্পটা।

চিত্র: মহাদেশীয় সংগঠন প্যাঞ্জিয়া

আজকে এখন আমরা যেখানে হিমালয় পর্বতমালা দেখছি, সেই স্থানে একসময় ছিল টেথিস মহাসাগর।

আজকে এখন আমরা যেখানে হিমালয় পর্বতমালা দেখছি, সেই স্থানে একসময় ছিল টেথিস মহাসাগর। অর্থাৎ তখন এই জায়গায় ছিল মহাসাগরীয় প্লেট। এখন থেকে প্রায় ২০-২৫ কোটি বছর আগে সমস্ত মহাদেশ একজায়গায় অবস্থান করতো। এই কথা বলে মোবাইল থেকে একটা চিত্র দেখালেন তিনি। 

 উপল দেখলো চারিদিকে সাগরে ঘেরা একটাই মাত্র স্থলভাগ রয়েছে।

নতুন মহাসাগরীয় বেসিনের সৃষ্টি ও বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই চক্রাকারে চলতে থাকা ঘটনাকে উইলসন চক্র বলা হয়ে থাকে।

নির্ঝর মামা বললেন— মহাদেশের এই সংগঠনকে একত্রে প্যাঞ্জিয়া বলা হয়। এখন থেকে প্রায় ১৬-১৭ কোটি বছর আগে এই মহাসংগঠন ভাঙতে শুরু করে। প্লেটগুলি তাদের সীমানা বরাবর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; মহাদেশের মাঝে ভাঙ্গনের (Rifting) মাধ্যমে বিপরীতমুখী প্লেটসীমানার সৃষ্টি হয়। দুটি মহাদেশীয় প্লেটের মাঝে নতুন মহাসাগরীয় প্লেটের উৎপত্তি হয়। আবার অন্যদিকে মহাসাগরীয় প্লেট কোনো অভিমুখী প্লেট সীমানায় ধ্বংস হতে থাকে। পৃথিবী সৃষ্টির কিছুকাল পরে যখন থেকে প্লেট টেকটোনিক শুরু হয় তখন থেকে এই ভাবেই চক্রাকারে মহাসাগরীয় প্লেটের সৃষ্টি ও বিনাশ হয়ে আসছে। নতুন মহাসাগরীয় বেসিনের সৃষ্টি ও বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই চক্রাকারে চলতে থাকা ঘটনাকে উইলসন চক্র (Wilson cycle, বিজ্ঞানী জন টুজো উইলসনের নাম অনুসারে এই চক্রাকার ঘটনার নামকরণ করা হয়েছে) বলা হয়ে থাকে।

চিত্র: উইলসন চক্র

উপল একটু উশখুশ করছিলো দেখে নির্ঝর মামা বুঝলেন ওর বোধহয় বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে, তাই আবার মোবাইল ফোনের পর্দায় ইন্টারনেট থেকে ধার করা একটা চিত্র দেখিয়ে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন। 

হিমালয় অঞ্চল টেকটোনিক ভাবে সক্রিয়, যা মাঝে মাঝে জানান দেয় ভূমিকম্প সৃষ্টির মাধ্যমে।

চিত্র: ভারতীয় প্লেটের চলন

আবার তিনি বলা আরম্ভ করলেন— আমাদের ভারত মহাদেশীয় প্লেটটিও ওই মহাসংগঠন প্যাঞ্জিয়ার একটি অংশ ছিল। বর্তমান আফ্রিকা মহাদেশের ঠিক পূর্ব দিকের অংশে ভারতবর্ষের পশ্চিমদিকটি জুড়ে ছিল। আর ভারত মহাদেশীয় প্লেটের পূর্বদিকে জুড়ে ছিল অস্ট্রেলিয়া ও আন্টার্কটিকা। প্যাঞ্জিয়ার ভাঙ্গনের সময় থেকে ভারত মহাদেশীয় প্লেটটি উত্তর-উত্তরপূর্ব (NNE) দিকে চলতে শুরু করে। ভারত মহাদেশীয় প্লেট ও ইউরেশিয়ান মহাদেশীয় প্লেটের মধ্যবর্তী নিও টেথিয়ান মহাসাগরীয় প্লেটটি ইউরেসিয়ান প্লেটের নিচে অবনমিত (subduction) হতে থাকে। টেথিয়ান সাগরে জমে থাকা পলল ইউরেশিয়ান প্লেটের প্রান্ত বরাবর স্তূপীকৃত (accretion) হতে থাকে। লাঠি-ঝাঁটা দিয়ে যেভাবে গাছের তলায় পড়ে থাকা পাতা একসঙ্গে জমা করা হয় খানিকটা সেইরকমই। এইভাবে চলতে চলতে একসময় সমগ্র মহাসাগরীয় প্লেটটি চলে যায় ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে। এবারে তৈরী হয় একটি সমস্যা। মহাসাগরীয় প্লেটের ঘনত্ব মহাদেশীয় প্লেটের তুলনায় বেশি, তাই সে অবনমিত হয়ে তলায় ঢুকে যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেট দুটিও মহাদেশীয় প্লেট, তাই এদের ঘনত্ব প্রায় একই। এই কারণে একে অপরকে ধাক্কা মারে (continent-continent collision)। মাঝের পললরাশি প্রচন্ড চাপে ওপরে উঠে যায়। পরবর্তীকালে মহাসাগরীয় প্লেটের টানে ভারতীয় প্লেট কিছুটা ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে ঢুকতে থাকে। বর্তমানেও এই ঘটনা ঘটে চলেছে। ভারতীয় প্লেট উত্তরদিকে বছরে প্রায় ৫ সেন্টিমিটার গতিতে চলমান। অন্যদিকে ইউরেশিয়ান প্লেটের দক্ষিণ প্রান্ত ভারতীয় প্লেটের ওপরে চেপে যাচ্ছে (up thrusting)। দুই প্লেটের মাঝখানে বিশাল অঞ্চল জুড়ে হিমালয় পর্বতমালা তৈরী হয়েছে ঠিক এই ভাবেই। এই জন্যই হিমালয় অঞ্চল টেকটোনিক ভাবে সক্রিয়, যা মাঝে মাঝে জানান দেয় ভূমিকম্প সৃষ্টির মাধ্যমে। 

চিত্র: হিমালয় সৃষ্টি

উপল মন দিয়ে শুনলো গোটা গল্পটা। এর পর নির্ঝর মামা আরও কতগুলো ছবি দেখালো উপলকে। তাতে করে আরো খানিকটা পরিষ্কার হয়ে গেল মনের মধ্যে জমে থাকা প্রশ্নগুলো। কিন্তু তার মনে আরও একটা নতুন প্রশ্নের উদয় হলো। সে বলল— আচ্ছা মামা এই যে এতো কিছু চলাচলের ২০-২৫ কোটি বছর আগের ঘটনা তুমি বললে এর কোনোটাই তো কেউ চোখে দেখেনি। তাহলে এগুলো জানা যায় কিভাবে? মানে বলতে চাইছি এই যে এই মহাদেশ কোটি কোটি বছর আগে কোথায় ছিল আর এখন এখানে এল, এইসব কিভাবে জানতে পারেন ভূতত্ত্ববিদগণ?

মামা বললেন— সেটাও একটা বড় গল্প, সময় লাগবে বলতে। অন্যদিন বলবো না হয়, কিভাবে এই প্লেট টেকটোনিক তত্ত্ব আবিষ্কার হলো এবং কিভাবেই বা এই প্লেটের চলাচলের কথা জানা গেলো। এখন চল প্রায় চলেই এসেছি টাইগার হিল। 

সামনে লম্বা লাইন, খানিকটা পথ হেঁটেই দুজনে পৌঁছলো টাইগার হিলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্যোদয় হলো হিমালয়ের বুকে, আর সামনে জেগে উঠলো তুষারাবৃত পর্বতমালা, যা নতুন সূর্যের আলোয় ঝলমলিয়ে উঠলো। পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা চিনিয়ে দিলো উপলকে নির্ঝরমামা। উপল হিমালয় তৈরির গল্পটা মনে মনে ভাবতে ভাবতে দেখতে লাগলো সদ্য সূর্যকিরণস্নাত পর্বতমালা।

 

আগের দুটি পর্ব না পড়ে থাকলে নিচে দেওয়া লিঙ্ক-এ ক্লিক করুন-

প্রথম পর্ব: https://www.elebele.org/2021/02/plate-tectonics-1.html

দ্বিতীয় পর্ব: https://www.elebele.org/2021/03/blog-post_27.html

—————————–

~ কলমে এলেবেলে উদ্দালক ~

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।