সৌরশক্তি: উজ্জ্বল ভবিষ্যত

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
226 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

সৌরশক্তি সর্বাধিক এবং প্রচুর পরিমাণে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস꠰ এই নিয়েই আমার গবেষণা। প্রচলিত নানান যৌগ, মৌল এবং তাদের মিশ্রিত উপাদানের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ (material chemist) এবং সর্বোপরি সৌরশক্তি উৎপাদনে তাদের ভূমিকা পর্যালোচনা করাই হচ্ছে আমার বর্তমান গবেষণার প্রাথমিক কাজ꠰

এলেবেলেতে তাই আজকে খুব সংক্ষেপে গুছিয়ে সরল বাংলায় বোঝানোর চেষ্টা করব কী করে সৌরশক্তি থেকে আমরা সর্বোচ্চ স্তরে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারি এবং কী কী প্রক্রিয়া (mechanism), ধারণা (theory) আছে এই শক্তি উৎপাদনের পেছনে! 

সূর্যালোক দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এর অবদান বর্তমান সমাজে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রথমত সৌরশক্তি থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ তথাকথিত কোনরকম দূষণ তৈরি করে না বা কোনরকম দূষণের জন্য দায়ী নয়꠰ দ্বিতীয়ত, অত্যন্ত কম খরচে এই বিদ্যুৎ খুব সহজভাবে তৈরি করা সম্ভব꠰

সৌরশক্তি থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ তথাকথিত কোনরকম দূষণ তৈরি করে না বা কোনরকম দূষণের জন্য দায়ী নয়꠰

আরেকটা বিষয় বলে রাখি যে, সূর্যালোক কিন্তু সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায় এবং এটাকে আয়ত্ত করতে, বা বলা যেতে পারে সৌরশক্তি পেতে আমাদের কোনো পরিশ্রম বা সেই অর্থে কোনও খরচ/ বিনিয়োগ করতে হয় না। সর্বোপরি সূর্যালোক অফুরন্ত; শেষ হয়ে যাওয়ার বা ফুরিয়ে যাওয়ার কোনও ভয় নেই꠰

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? কেন সৌরশক্তি আজও প্রচলিত শক্তিগুলিকে টেক্কা দিতে পারছে না?

বিষয়টা গাছের ক্ষেত্রে কিন্তু সরল꠰ তারা সালোকসংশ্লেষ-এর মাধ্যমে বিষয়টিকে রপ্ত করতে পারে এবং সূর্যের আলো থেকে সরাসরি রাসায়নিক শক্তি (ATP) উৎপন্ন করে।

এর দু’টি উত্তর:

১. সূর্যালোক তো অফুরন্ত, কিন্তু সেই সূর্যের আলোকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করার যে কৌশল, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া বা photoelectric effect), সেগুলো কিন্তু অত্যন্ত সীমিত। তবে বিষয়টা গাছের ক্ষেত্রে কিন্তু সরল꠰ তারা সালোকসংশ্লেষ-এর মাধ্যমে বিষয়টিকে রপ্ত করতে পারে এবং সূর্যের আলো থেকে সরাসরি রাসায়নিক শক্তি (ATP) উৎপন্ন করে। কিন্তু মানুষের/প্রাণীদের ক্ষেত্রে কিন্তু এই সূর্যের আলোর ব্যবহার এবং এই আলোকে অন্য কোনও শক্তিতে রূপান্তরিত করার কোনও উপায় নেই꠰

২. খুব গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হল, এই সূর্যালোকের বিতরণ, যা সমগ্র পৃথিবী জুড়ে এক নয়। যেমন ধরুন, ভারত বা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে বেশি সূর্যালোক, উল্টোদিকে আমরা যদি ইউরোপীয়, মেরু অঞ্চলের দেশগুলোর দিকে যাই সেখানে কিন্তু সূর্যালোকের প্রভাব কম। ফলস্বরূপ সূর্যালোক অফুরন্ত থাকলেও সেখান থেকে শক্তি উৎপাদন করা কিন্তু রীতিমতো বিজ্ঞানীদের কাছে দ্বন্দ্বের এবং আগামী দিনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং꠰

আলোক শক্তিকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার পদ্ধতির নাম হল আলোক-বিভব ক্রিয়া (Photovoltaic Effect); উল্টোভাবে বলতে গেলে, আলোর সংস্পর্শে আসা কোনও উপাদানের বিভব পার্থক্য (ভোল্টেজ) এবং তড়িৎ প্রবাহের (কারেন্টের) উৎপাদন꠰ কারণ আমরা জানি শক্তির নিত্যতা সূত্র অনুযায়ী শক্তি অবিনশ্বর; শক্তিকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায়না, শুধুমাত্র এক শক্তি আরেক শক্তিতেই স্থানান্তরিত বা রূপান্তরিত হয়꠰ এবার এই শক্তির স্থানান্তিকরণ যত বেশি হবে (efficiency), অর্থাৎ ধরুন ১০০% -এর দিকে যত বেশি যাবে, সেই শক্তি ততবেশি কার্যকারী꠰

ব্যাপারটা আরেকটু সহজ করে বললে, বর্তমানে আমরা সিলিকন সৌর কোষের (Solar Cell) ব্যবহার প্রায় সর্বত্রই দেখতে পাচ্ছি꠰ একটি অপ্রচলিত শক্তির অন্যতম নিদর্শন হিসেবে সিলিকন সৌর কোষের এই আগমন এবং তার বহুল প্রচলিত ব্যবহার কিন্তু সত্যিই জনমানসে নতুন শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু এখন যেটা বিষয়, সেটা হল একক সিলিকন সৌর কোষের এখনো পর্যন্ত রিপোর্ট পাওয়া সর্বোচ্চ কার্যকারিতা হচ্ছে ২৮%, তার মানে ভাবুন বাকি ৭২% কিন্তু কোনও না কোনও ভাবে সূর্য থেকে আমরা হারাচ্ছি꠰

একক সিলিকন সৌর কোষের এখনো পর্যন্ত রিপোর্ট পাওয়া সর্বোচ্চ কার্যকারিতা হচ্ছে ২৮%, তার মানে ভাবুন বাকি ৭২% কিন্তু কোনও না কোনও ভাবে সূর্য থেকে আমরা হারাচ্ছি꠰

এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, একটি একক পি-এন সংযোগ ফোটোভোল্টেইক কোষ (p-n junction photovoltaic cell) সর্বোচ্চ ৩৩.৭% (under 1 SUN) কার্যকারিতা দেখতে পারে, যাকে আমরা Shockley-Queisser limit বলি꠰ তাই বিজ্ঞানীদের কাছে চ্যালেঞ্জ হল সর্বোচ্চ ভাবে গৃহীত সূর্যালোকের ক্ষয় যতটা সম্ভব কমানো যেতে পারে, কারণ আমরা যত বেশি গৃহীত সূর্যালোককে হারাবো তত কম শক্তি পাব। তাহলে এই ক্ষয়রোধের বা বলা ভালো আরো বেশি কার্যকারিতা বা শক্তি উৎপাদন করার উপায় কি?

অবশ্যই পর্যায়সারণির মৌলগুলি সেই সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা তৈরি করে। মৌলগুলির ভৌত ধর্ম, তাদের নিষিদ্ধ পটি অঞ্চল (band gap), শোষণ (absorption), দ্যুতি (luminescence)-এর মতন নানান ধর্ম আমাদেরকে বলা যেতে পারে ইঙ্গিত দেয় আলোক-বিভব সক্রিয়তা (photovoltaics)-র ব্যাপারে ꠰ Si, As, Ge, Cd, Te, Pb -এর মত নানান পর্যায় সারণির মৌল বিভিন্ন সময় আলোক-বিভব সক্রিয়তা (photovoltaics) ধর্মকে দারুণভাবে দেখিয়েছে꠰ যেখানে ২৮% কার্যকারিতা পাওয়ার জন্য সিলিকন সৌর কোষ (Silicon solar cells) বিগত ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে লড়াই করে চলেছে, সেখানে মাত্র দশ বছরে পেরভস্কাইট ভিত্তিক সৌর কোষ (perovskite solar cell) এখনো পর্যন্ত প্রায় ২৬% কার্যকারিতা দেখিয়ে ফেলেছে꠰ নতুন উপাদানের গুরুত্ব এখানেই꠰

কিন্তু এই সকল মৌলদের ক্ষেত্রে অনেক সময় যে সমস্যা দেখা দেয় তা হল, তারা কতটা প্রাকৃতিক ভাবে লভ্য কিংবা কতটা স্বাস্থ্যকর এবং ব্যবহারযোগ্য꠰

যেখানে ২৮% কার্যকারিতা পাওয়ার জন্য সিলিকন সৌর কোষ (Silicon solar cells) বিগত ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে লড়াই করে চলেছে, সেখানে মাত্র দশ বছরে পেরভস্কাইট ভিত্তিক সৌর কোষ (perovskite solar cell) এখনো পর্যন্ত প্রায় ২৬% কার্যকারিতা দেখিয়ে ফেলেছে꠰

অপরদিকে সৌরশক্তির বেশিরভাগ অংশই কিন্তু অবলোহিত (Infrared-IR, low energy) শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত; ফলে আমরা যে সকল মৌল, যৌগ উপাদান ব্যবহার করি না কেন, বেশিরভাগটাই কিন্তু অবলোহিত বা ইনফ্রারেড (IR) তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে শোষণ করে না, বা করলেও <১৬০০ nm (NIR), ফলে আমরা শুরুতেই অনেকটা সূর্যালোক হারিয়ে ফেলি꠰

গবেষকদের কাছে এটা বিশেষ চ্যালেঞ্জিং বিষয়— যতটা বেশি পরিমাণে বা যতটা সর্বোচ্চ স্তরে আমরা সূর্যের অবলোহিত IR আলো শোষণ করাব, অর্থাৎ উপাদানটি যত বেশি IR শোষণ করবে ততবেশি আমরা ফোটন পাব আলোক-বিভব ক্রিয়ার (photovoltaic effect) জন্য꠰ শোষিত ফোটনই দায়ী ইলেকট্রন এবং হোল (hole) তৈরি করার জন্য যা কিনা পরবর্তীকালে আদতে তড়িৎ উৎপাদন করে (photoelectrochemical cell)꠰

সুতরাং এমন উপাদান তৈরি করতে হবে যা সূর্যের সবরকম তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে সর্বোচ্চ স্তরে শোষণ (absorb) করতে পারে꠰ এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের জৈব রঞ্জক (organic dyes), অথবা অজৈব-জৈব মিশ্রিত উপাদান (inorganic-organic mixed compound) CH3NH3PbI3 বর্তমানে এই IR শোষণ করার বিষয়ে বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিস্তৃতির (broad) বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে꠰

এই ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, যত দ্রুত এই ইলেকট্রন এবং হোল (hole) তৈরি হবে এবং উভয়েই যত তাড়াতাড়ি তড়িৎ বর্তনীর (সার্কিট) মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারবে, তত বেশি কার্যকারিতা আমরা পাব꠰

বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় একবার ইলেকট্রন এবং হোল তৈরি হবার পরে দ্বিতীয়বার সম্পূর্ণরূপে তৈরি হতে পারে না (redox/regeneration) বা কোনভাবে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে (luminescence, trap state)꠰ তবে বিভিন্ন মৌল হোক কিংবা যৌগ, তাদের ধর্মের নির্দিষ্ট সীমা আছে; সুতরাং যে কোনও কিছুকেই কিন্তু আলোক-বিভব ক্রিয়ার জন্য নির্বাচিত করা যায় না꠰

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, Concentrating Photovoltaic (CPV) ꠰ 

CPV-এর ধারণা হল, আতস কাঁচ-এর মাধ্যমে সূর্যরশ্মিকে একত্রিত করা, বলা যেতে পারে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ফোটন কণা বা সূর্যরশ্মি থেকে আরও অনেকটা বড় বা অনেক সংখ্যক ফোটন কণা তৈরি করা꠰ এই প্রক্রিয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য হল— বিশেষ করে যেখানে সূর্যালোক কম, সেখানে খুব ভালো মতো CPV সিস্টেম কাজ করে꠰ CPV সিস্টেমগুলির মুখ্য বৈশিষ্ট্য হল উচ্চতর সৌর ঘনত্ব রপ্ত করা। পুরোটাই আলোকবিদ্যার (optics) বিভিন্ন অংশ যেমন প্রতিসরণ, প্রতিফলন, অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। লেন্স বা আয়নার মাধ্যমে একটি স্বল্প ক্ষেত্রস্থানে সৌর ঘনত্বকে ঘনীভূত (concentrated) করা হয়, যার ফলস্বরূপ কম সূর্যালোকেও বেশি সূর্যালোক, যা সৌর কোষগুলির কার্যকারিতা বাড়ানোর অন্যতম উপায় এবং এই CPV-এর মাধ্যমে পাওয়া যায়। আবার বৃহৎ আকার বা আয়তন যুক্ত সৌর কোষ (solar cell) স্থাপন করার থেকে অবগত থাকা  যায়, কারণ অনেকটা জায়গা জুড়ে বা বড় আকারের সৌর কোষ (solar cell)-গুলির রক্ষনাবেক্ষন অনেকটা ব্যয়বহুল ও একই সাথে কম কার্যকরী হয়। এই CPV সিস্টেমের আরও একটি বৈশিষ্ট হল এই যে, একটি নির্দিষ্ট অংকের সৌরশক্তি পেতে যত সংখ্যক সৌর কোষ (solar cell) ব্যবহার করতে হয়, CPV ব্যবহারের ফলে সেই সৌর কোষ (solar cell) ব্যবহারের সংখ্যাটা তাৎপর্যপূর্ণভাবে হ্রাস পায়। বর্তমানে চেষ্টা করা হচ্ছে tandem ও multi-junction সৌরকোষগুলি (solar cell)-কে CPV-এর সাথে অন্তর্ভুক্ত করার, কারণ উল্লেখিত সৌর কোষ (solar cell)-গুলি বর্তমানে অনেকটাই সৌরশক্তি উৎপাদনে এগিয়ে, সেখানে tandem ও multi-junction সৌরকোষগুলি যুক্ত করলে সম্মিলিত সৌরশক্তি উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার প্রভূত সম্ভবনা রাখে।

কিন্তু ওই যে Shockley-Queisser limit বলছে কোনও একটি সৌর কোষের পক্ষে ৩৩.৭% অতিক্রম করা সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে আমাদেরকে এক বা ততোধিক সৌর কোষ যুক্ত করতে হবে যার আক্ষরিক নাম Multi-Junction/Tandem-Solar Cells. National Renewable Energy Laboratory-এর সার্টিফাইড পরিসংখ্যান (data) বলছে প্রায় ৪৭% কার্যকারিতা এই মুহূর্তে রয়েছে four-point multi-junction solar cell-এর, তবে এখনো বাজারে আসেনি꠰ সর্বশেষে এইটুকুই বলতে পারি, আমরা কিন্তু ক্রমশই ১০০%-এর দিকে এগিয়ে চলেছি দূষণহীন অপ্রচলিত শক্তি উৎপাদনে, পুরোটা না পারি (second law of thermodynamics) কিন্তু সর্বোচ্চ ভাবে যতটা পারা যায় এটাই আমাদের প্রয়াস আগামীদিনের গবেষণার꠰

—————————–

~ কলমে এলেবেলের অতিথি অনুরাগ রায় ~

 

অনুরাগ বর্তমানে পোস্ট ডক্টরাল গবেষক হিসেবে The University of Exeter, ব্রিটেনে কর্মরত। পিএইচডি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে।

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।