সবে মিলে করি বাস

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
184 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

সারা পৃথিবীতে কত প্রজাতির জীব বাস করে! পরিসংখ্যান বলে এই বিশ্বে ৮.৭ মিলিয়নের কাছাকাছি প্রজাতি আছে। তাদের একে অপরের সাথে সম্পর্ক কেমন? এক প্রজাতি আরেক প্রজাতির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে কিনা, বা কে কার শত্রু সেটা আজ আমরা আলোচনা করব। মানুষের ক্ষেত্রে যেমনটা হয়ে থাকে আর কি… আমাদের চারপাশের মানুষদের সবার সাথে কি আমাদের একই রকম সম্পর্ক? নিশ্চয়ই তা নয়। কেউ হয়তো আমাদের এতই কাছের হয় যে কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই তাকে আমরা ভালোবেসে যাই, কারো কারো সাথে সম্পর্কটা নিতান্তই প্রয়োজন ভিত্তিক! ‘একটু তুমি সাহায্য করো, আমিও করব’ গোছের। আবার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই অন্যের ক্ষতি করার লোকও সমাজে থেকে যায়! তেমনভাবেই পৃথিবীতে বসবাসকারী প্রজাতির নিজেদের সম্পর্কটাও নানা ধরনের।

কেউ হয়তো আমাদের এতই কাছের হয় যে কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই তাকে আমরা ভালোবেসে যাই; কারো কারো সাথে সম্পর্কটা আবার নিতান্তই প্রয়োজন ভিত্তিক! তেমনভাবেই পৃথিবীতে বসবাসকারী প্রজাতির নিজেদের সম্পর্কটাও নানা ধরনের। 

প্রথমেই বলা যাক Predation বা শিকারিত্বের কথা। Trophic লেভেলে থাকা উচ্চ শ্রেণীর প্রাণীরা নিম্ন শ্রেণীর প্রাণীকে তাদের শিকারের জন্য ব্যবহার করে তা থেকে পুষ্টিলাভ করে। এখানে একটি বিশেষ প্রজাতির জন্য অপর প্রজাতির প্রাণীটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেমন, বাঘ, সিংহ, সাপ, তিমি, হাঙর, এরা সবাই শিকারি। তারা যেসব প্রাণীদের শিকার করছে, তারা প্রত্যেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই ঘটনা অবশ্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। নইলে কোন একটি প্রাণীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারত। 

মজার কথা হল, বিভিন্ন প্রজাতি তাদের শিকারির হাত থেকে বাঁচতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছে।

যেমন সবুজ গেছো ব্যাং এমনভাবে পাতার সাথে মিশে থাকে যে শিকারীরা বুঝতেই পারেনা। Monarch প্রজাপতি এতটাই বিস্বাদ হয় পাখিরা তাদের খেতেই পারে না। ক্যাকটাস জাতীয় গাছের কাঁটা অন্য প্রাণীদের খাবার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে গাছেরা কিছু কিছু রাসায়নিক বস্তু ক্ষরণ করে। যার ফলে গবাদিপশুরা যদি সেই গাছেদের খায় তাহলে তাদের শরীর খারাপ করে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের মৃত্যুও হতে পারে। ক্যালোট্রপিস উদ্ভিদের বিষাক্ত রাসায়নিক গবাদিপশুর ক্ষেত্রে মারাত্মক। নিকোটিন, ক্যাফিন, কুইনাইন, ওপিয়াম ইত্যাদি উদ্ভিদজাত রেচন পদার্থ গবাদিপশুর ভক্ষণ থেকে বিরত করে।

এবার আসা যাক প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ক বা কম্পিটিশনের কথা। এখানে দুটো ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী পরস্পরের জন্য মোটেও সুবিধার নয়। অর্থাৎ একটা প্রাণী অপর প্রাণীটির সাথে প্রতিযোগিতা চালায় তার খাদ্য, জীবনসঙ্গী ও বাসস্থান এর জন্যে।

এই কম্পিটিশন একটা প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে হতে পারে, আবার সম্পূর্ণ দুটো আলাদা প্রজাতির মধ্যেও হতে পারে। ধরা যাক অনেককটা কুমড়োর চারাগাছ যদি পাশাপাশি থাকে তবে তারা খাদ্য কিংবা জায়গার কম্পিটিশনের জন্য ঠিকমতো বাড়তে পারবে না। অর্থাৎ এখানে তার প্রতিযোগিতা নিজের প্রজাতির জীবের সাথেই। 

আবার দুটো আলাদা প্রজাতি যেমন দক্ষিণ আমেরিকার লেকের মাছ এবং পরিযায়ী ফ্লেমিঙ্গো পাখির মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে ওই লেকের ছোট ছোট জলজ উদ্ভিদ বা ফাইটোপ্লাংটনগুলো কে খাবে তাই নিয়ে!

এবার আসা যাক Parasitism বা পরজীবীত্বের কথায়। এর কথায় এক্ষেত্রে একটি জীব ক্ষতিগ্রস্ত হয় অপর জীবটি উপকৃত হয়। পরজীবিতা বিভিন্ন প্রকার হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আবার একটি পরজীবীরই দুটো হোস্ট বা পোষক থাকে, এমনটাও হয়ে থাকে।

বেশিরভাগ সময়ই এই পরজীবীরা পোষক অর্থাৎ যাদের শরীরে বাস করে, তাদের ক্ষতি করে। কিছু কিছু পরজীবী আছে যারা শরীরের ভিতর বসবাস করে যেমন ফিতা কৃমি, যকৃত কৃমি ইত্যাদি। কিছু কিছু পরজীবী আবার বহিঃ পরজীবী। দেহের বাইরে, উপরিতলে  বসবাস করে, যেমন উকু্‌ন, কুকুরের গায়ের পোকা ইত্যাদি। উদ্ভিদের ক্ষেত্রে স্বর্ণলতা একটি পরজীবী যা অনেক গাছের উপরে দেখা যায় তাদের দেহে ক্লোরোফিল না থাকায় তারা অন্য গাছ থেকে তাদের পুষ্টি সম্পন্ন করে। 

অনেক পাখিদের ক্ষেত্রে Brood Parasitism অর্থাৎ শাবকজনিত পরজীবিতা দেখা যায়। যেমন কোকিল কাকের বাসায় ডিম পাড়ে। ডিমগুলি একই রকম দেখতে হয় বলে কাক নিজের ডিমের সাথে পার্থক্য করতে পারে না। 

এবার আসা যাক কমেনসেলিজম এর কথায়। এটি এক ধরনের আন্তঃসম্পর্ক যেখানে একটি প্রজাতি উপকৃত হবে কিন্তু তার ফলে আর একটি প্রজাতি ক্ষতিগ্রস্ত বা উপকৃত কিছুই হবে না। অর্কিড আম গাছের উপরে বসবাস করে, তাতে অর্কিডের বাসস্থানজনিত সুবিধা হলেও আম গাছের সুবিধা-অসুবিধা কোনটাই হয় না। একই কথা খাটে লতানো গাছ যখন বড় গাছ আঁকড়ে বৃদ্ধি পায় সেক্ষেত্রে। বার্নাকল (Barnacles) বলে এক ধরনের ছোট ছোট সামুদ্রিক পোকা আজীবন তিমি মাছের পিঠে বসবাস করে। 

আরেকটা এমন উদাহরণ বলা যায়। শিয়াল খাবারের সন্ধান করার জন্য সিংহের দেখানো রাস্তা ধরেই চলে। খুব চালাক তো সে। শিকার খোঁজার কাজটা শেয়ালের জন্যে সহজ হয়ে যায়, অবশ্য সিংহের তাতে কিছুই যায় আসে না, অর্থাৎ সে উপকৃত বা ক্ষতিগ্রস্ত কিছুই হচ্ছে না এজন্যে!

আরেক ধরনের সম্পর্ক  Ammensalism (অ্যামেনসালিসম)-এ একটি প্রজাতি (A) অপর প্রজাতির (B) উপস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়, কিন্তু অপর প্রজাতির (B) কোনও ক্ষতি হয়না। যেমন Penicilium ছত্রাকটি পেনিসিলিন Antibiotic নির্গত করে বলে তার চারপাশে অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে না। ব্যাকটেরিয়ার এখানে ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু পেনিসিলিয়াম-এর না ক্ষতি, না উপকার।

এবার সব শেষে  আলোচনা করা যাক মিউচুয়ালিজম বা মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কে। এই মিউচুয়ালিজম-এর জন্যে দুটো প্রজাতির দুজনেই উপকৃত হয়। গাছের ছালে, পাথরের উপর যে লাইকেন আমরা দেখে থাকি, তা ছত্রাক এবং শৈবাল-এর একটি সহাবস্থান। ছত্রাকের নিজের দেহে ক্লোরোফিল না থাকায় তারা সালোকসংশ্লেষ করতে পারে না, খাদ্যের ব্যাপারে তারা শৈবাল এর উপর নির্ভরশীল। উল্টো পিঠে ছত্রাকও শৈবালকে আশ্রয় দিয়ে, আর্দ্রতা এবং পুষ্টি দ্রব্যের যোগান দিয়ে সাহায্য করে। 

মাইকোরাইজা একটি ছত্রাক যা উচ্চ শ্রেণীর উদ্ভিদের মূলে বসবাস করে। এই ছত্রাক উদ্ভিদকে মাটির মধ্যে থাকা খনিজ পদার্থ বা মিনারেল শোষণে সাহায্য করে আবার ওই উদ্ভিদটি ছত্রাককে শর্করা জাতীয় খাদ্যদ্রব্য দিয়ে সাহায্য করে। 

ডুমুর আবার পরাগ সংযোগের ব্যাপারে একদম নির্দিষ্টভাবে বোলতার উপরই নির্ভরশীল। ডুমুর ফুলের ভিতর তারা ডিম পাড়ে, পরাগ সংযোগ ঘটে  ডুমুরফুলের। আবার এই বোলতার ছোট ছোট লার্ভাগুলো ডুমুরের কচি বীজ খেয়ে জীবনধারণ করে থাকে।

প্রাণীরা গাছেদের বীজ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে গাছেদের উপকার করে। সেক্ষেত্রে ফলের যোগান দিয়ে গাছ প্রাণীদের খাদ্যের যোগান দিচ্ছে ঠিকই, গাছেরাও কিন্তু তাদের বংশ বিস্তারের নিরিখে উপকৃত হচ্ছে।

আরেক ধরনের পারস্পরিক উপকারিতার সম্পর্ক দেখা যায় Proto- Cooperation-এ। এটা এক ধরনের সহযোগিতামূলক আচরণ, যেখানে দুটি প্রজাতি আলাদা আলাদাভাবেও অবস্থান করতে পারে, কিন্তু পরস্পরের সান্নিধ্যে এলে উভয়েই উপকৃত হয়। যেমন Pluvianis নামক পাখীরা কুমিরের দাঁতের মধ্যে থাকা রক্ত চোষক পোকা খেয়ে নেয়, তাতে পাখী যেমন খাবার পায়, কুমিরটাও ওই পাখিটাকে দিয়ে দাঁত পরিস্কারের কাজটা করিয়ে নেয়!  

সুতরাং, পরিবেশের বিভিন্ন প্রাণীর এই পারস্পরিক সম্পর্ক, যেমন মজাদার, তেমনই বহুমাত্রিক। এতরকম বৈচিত্র্য আছে বলেই না, এত সুন্দর আমাদের এই পৃথিবী! 

————————————-

~ কলমে এলেবেলে দেবযানী ~

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।