বিজ্ঞানের খবর: যে জামাকাপড়ের মূল উপাদান ব্যবহৃত প্লাস্টিক

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
147 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে, ফেসবুকে, চায়ের দোকানে বা ঘরোয়া যেকোনো আড্ডাতেই পরিবেশ দূষণের কথা উঠলে, আলোচনায় একটা শব্দ বারবার ফিরে আসে। প্লাস্টিক।

প্লাস্টিক। রাসায়নিক উপায়ে কৃত্তিমভাবে তৈরি পলিমার। ১৯০৭ সালে পিভিসি (পলি ভিনাইল ক্লোরাইড) ও তার পরবর্তীকালে এক শতক ধরে আবিষ্কৃত বিভিন্ন প্লাস্টিক, মানবসভ্যতার উন্নতি ও অগ্রগতির ইতিহাসে যাদের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসায়নিকভাবে অবিকৃত থাকার ক্ষমতা, স্থিতিস্থাপকতা, স্থায়ীত্ব ইত্যাদি প্লাস্টিকের একাধিক গুণ তাদেরকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় অপরিহার্য করে তুলেছে।

কিন্তু তার পাশাপাশি এই প্লাস্টিকের হাত ধরেই পৃথিবীতে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে পরিবেশ দূষণ। প্লাস্টিকের অন্যতম গুণ, তার রাসায়নিকভাবে অবিকৃত থাকার ক্ষমতার ফলে প্লাস্টিক নষ্ট হয় না। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন ভাবে ক্রমাগত বেড়ে চলে অব্যবহৃত প্লাস্টিকের সম্ভার।

এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার অন্যতম উপায় হল এই ব্যবহৃত প্লাস্টিককে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা। এবিষয়ে বহুদিন ধরেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করে চলেছেন একাধিক গবেষক। নানা উপায়ের মাধ্যমে তারা চেষ্টা করছেন পৃথিবীতে জমে থাকা প্লাস্টিকের ভার কিছুটা লাঘব করে তাকে পুনরায় কাজে লাগানোর। কিন্তু এই ধরণের উদ্যোগে বড়সড় সাফল্য এখনও হাতের বাইরে। যে কারণে পৃথিবীর এখনও পর্যন্ত তৈরি হওয়া মোট প্লাস্টিকের ৯৫% পৃথিবীর নানা জায়গায় জমা হয়ে আছে।

এই পরিস্থিতিতে প্লাস্টিক সমস্যা সমাধানে এক নতুন রাস্তা দেখাচ্ছে ডিগ্রেড নামে ইউনাইটেড কিংডমের একটি কোম্পানি। শুধুমাত্র প্লাস্টিক বোতল পুনর্নবীকরণ করে তারা তৈরি করেছে একধরণের তন্তু, যাকে ব্যবহার করে তৈরি করা যাবে পরিধানযোগ্য বিভিন্ন ধরণের জামাকাপড়। 

শুধুমাত্র প্লাস্টিক বোতল পুনর্নবীকরণ করে তারা তৈরি করেছে একধরণের তন্তু, যাকে ব্যবহার করে তৈরি করা যাবে পরিধানযোগ্য বিভিন্ন ধরণের জামাকাপড়।

এই পদ্ধতিতে প্রথমে বিভিন্ন পুনর্নবীকরনের কারখানার মাধ্যমে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল জোগাড় করে কোম্পানিটি। তারপরে সেগুলো ভালোভাবে পরিস্কার করে ছোট ছোট টুকরোতে পরিণত করে। এটি আবু ধাবিতে অবস্থিত কোম্পানির নিজস্ব প্ল্যান্টে হয়ে থাকে। এই পদ্ধতিতে তারা সমগ্র বোতলটিই, লেবেল এবং ঢাকনাসহ ব্যবহার করে থাকেন বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির ম্যানেজিং ডায়রেক্টর এমা বারবার। 

এরপরে এই ফ্লেকগুলি (ছোট ছোট টুকরো) প্যাকেটবন্দি হয়ে চলে যায় ভারত, পাকিস্তান ও চিনে অবস্থিত ডিগ্রেডের একাধিক কারখানায়। সেখানে ফ্লেকগুলোকে কেটে একেবারে ছোট ছোট টুকরোতে পরিণত করা হয়। তারপর গরম করে গলিয়ে সরু ছিদ্রযুক্ত জালিকার মধ্যে পাঠানো হয়। একে ঠান্ডা করে যে বৃহদাকৃতি পলিয়েস্টারের তন্তু পাওয়া যায়, তাকে বিভিন্নভাবে কেটে নানা মাপের সুতো উৎপন্ন করা হয়। কখনও কখনও এর সঙ্গে তুলো মিশিয়ে তুলো আর পলিয়েস্টারের সংকর তন্তুও উৎপন্ন করা হয়।

সাধারণত ৫০০ মিলিলিটারের বোতল তারা ব্যবহার করে থাকেন বলে জানিয়েছেন কোম্পানির কর্মকর্তা ক্রিস বারবার। তাদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, সাধারণত একজোড়া শর্টস তৈরি করতে গড়ে ৪০ এবং একটি জ্যাকেট তৈরি করতে ৪০ থেকে ৬০টি বোতলের প্রয়োজন হয়। এছাড়াও এই তন্তুর মাধ্যমে প্রায় সবধরণের জামাকাপড়, এমনকি মাস্ক, ব্যাগ প্রভৃতিও তৈরি হয়। যেহেতু এই পুরো প্রস্তুতিকরণের পদ্ধতির কোন অংশেই কোনরূপ রাসায়নিকের ব্যবহার নেই, তাই সাধারণ মানুষের পরিধানের জন্য এই কাপড় সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ বলে দাবি কোম্পানির কর্মকর্তাদের।

এছাড়াও এই তন্তুর মাধ্যমে প্রায় সবধরণের জামাকাপড়, এমনকি মাস্ক, ব্যাগ প্রভৃতিও তৈরি হয়।

শুধুমাত্র জমে থাকা প্লাস্টিক দূরীকরণের মাধ্যমেই নয়, অন্যভাবেও পরিবেশ দূষণ কমাতে সাহায্য করছে ডিগ্রেডের এই উদ্যোগ। পৃথিবীর বস্ত্রশিল্পের অধিকাংশ সুতো তৈরি হয় তুলো থেকে। এই তুলো উৎপাদন পদ্ধতি বিপুলমাত্রায় পরিবেশ দূষণ ঘটায়। পৃথিবীতে উৎপন্ন মোট গ্রিন হাউস গ্যাসের ১% আসে এই তুলো উৎপাদনের ফলে। অন্যদিকে, ডিগ্রেড কোম্পানির এই পদ্ধতিতে নির্গত কার্বনের পরিমাণ তুলো উৎপাদন পদ্ধতির মাত্র ৫৫%। শুধু তাই নয়, ডিগ্রেডের এই পদ্ধতিতে সাধারণ তুলো উৎপাদন পদ্ধতির তুলনায় ২০% কম জল ও ৫০% কম শক্তি খরচ হয়, যা সামগ্রিকভাবে এই পদ্ধতিকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

ডিগ্রেডের এই পদ্ধতিতে সাধারণ তুলো উৎপাদন পদ্ধতির তুলনায় ২০% কম জল ও ৫০% কম শক্তি খরচ হয়, যা সামগ্রিকভাবে এই পদ্ধতিকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

প্লাস্টিকের জন্মযাত্রা থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে জমে থাকা ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতলের সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাতাশ কোটি। যার মধ্যে ৬%-এরও পুনর্নবীকরণ হয় না। এমা, ক্রিস ও তাদের কোম্পানি এই বিরাট সংখ্যাকেই চেষ্টা করছেন পরিবেশের ক্ষতির জায়গায় মানুষের উন্নতিতে বদলে ফেলার। কতটা পারবেন, তা ভবিষ্যত বলবে।

————————

~ কলমে এলেবেলে বেদাংশু ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।