বিজ্ঞানের খবর: কণাবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ভবিষ্যৎ কি সত্যি সংশয়পূর্ণ?

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
157 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

বিগত দুইমাসে কণাবিদ্যা বিষয়ক কিছু পরীক্ষালব্ধ ফলাফল আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে। বিভিন্ন বহুল প্রচলিত সংবাদপত্রের বয়ান অনুযায়ী, কণাবিদ্যার দুনিয়ায় নাকি এক “নতুন দিগন্ত” খুলে দিয়েছে এইসব ফলাফল! আসুন একটু জেনে নিই কণাবিদ্যার পরিসরে এই পরীক্ষালব্ধ ফলাফলগুলি কী ইঙ্গিত করছে।

কণাবিদ্যার দুনিয়ায় নাকি এক “নতুন দিগন্ত” খুলে দিয়েছে এইসব ফলাফল!

আমরা জানি, এখনো অব্দি সবথেকে সফলভাবে মৌলিক কণা (ফান্ডামেন্টাল পার্টিকেল) এবং তাদের মধ্যেকার আন্তঃক্রিয়া (ইন্টারঅ্যাকশন) বা বলকে ব্যাখ্যা করতে পেরেছে কণাবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেল। এই মডেলের প্রায় প্রত্যেক সদস্য একটি নির্দিষ্ট প্রতিসাম্য (সিমেট্রি) দিয়ে বাঁধা। এই মডেল থেকেই আমরা জানতে পারি, হিগস্ নামক মৌলকণাটি একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অন্য মৌলকণাদের ভর প্রদান করে। শুধু তাই নয়, আজ অব্দি কণাবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সংসারে থাকা সমস্ত কণার অস্তিত্বই পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করা হয়েছে। তাহলে অসুবিধাটা কোথায়? আসলে এই মডেলটির বেশ কিছু অসম্পূর্ণতা এখনও রয়ে গেছে। যেমন, ১) নিউট্রিনো কণার ভর। এই কণার জন্ম হয় দুর্বল আন্তঃক্রিয়ার (যেমন, বিটা ক্ষয়) মাধ্যমে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখা গেছে, এই কণাটি ভরবিহীন নয়। অথচ, স্ট্যান্ডার্ড মডেল নিউট্রিনোর ভরকেই ব্যাখ্যা করতে পারেনা, এই মডেল অনুযায়ী নিউট্রিনো ভরহীন। ২) দ্বিতীয়ত, আমাদের চারপাশে যে দৃশ্যমান জগত আছে, তা পুরো ব্রহ্মান্ডের ৫ শতাংশেরও কম। বাকি অংশ যে অজানা তমোপদার্থ (ডার্ক ম্যাটার) ও তমোশক্তি (ডার্ক এনার্জি) দিয়ে তৈরি বলে বিজ্ঞানীদের অনুমান, তার সন্ধানও দিতে অপারগ এই স্ট্যান্ডার্ড মডেল। ৩) এই মডেল মহাকর্ষীয় বল সম্পর্কে কোনও ধারণা দেয়না। ৪) এছাড়া এমন অনেক পর্যবেক্ষণযোগ্য রাশি (অবজারভেবল) আছে, স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুযায়ী যাদের তাত্ত্বিক অনুমান এবং পরীক্ষালব্ধ মানের মধ্যে কিছুটা হলেও ব্যবধান আছে, যা কিনা ক্ষেত্র বিশেষে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের পরিসরের বাইরেও কোনও মৌলিক কণাতত্ত্বের অস্তিত্বের ইঙ্গিত বহন করে। ঠিক এইরকমই একটি অবজারভেবল হল মিউওন কণার চৌম্বক ধর্ম, বা পোশাকি নাম মিউওন জি মাইনাস টু, যা কিনা এই কয়েকদিনের ওই আলোচ্য পরীক্ষালব্ধ ফলাফলগুলির মধ্যে অন্যতম।

সেই সংসারের তিন ভাই— সব থেকে হাল্কা ও প্রবীণ ইলেকট্রন এবং সবথেকে ভারী ও নবীন টাও কণার মেজো ভাই হল আমাদের গল্পের মিউওন

কিন্তু কে এই মিউওন? ইলেকট্রন যে গোত্রের অন্তর্গত কণা (সম-আধানযুক্ত লেপ্টন কণা), সেই সংসারের তিন ভাই— সব থেকে হাল্কা ও প্রবীণ ইলেকট্রন এবং সবথেকে ভারী ও নবীন টাও কণার মেজো ভাই হল আমাদের গল্পের মিউওন, যার ভর ইলেকট্রনের থেকে প্রায় ২০০ গুণ বেশি। এই ধরণের আণুবীক্ষণিক কণাদের কৌণিক ভরবেগ থাকার দরুন এরা একটা অতিক্ষুদ্র চুম্বকের মত আচরণ করতে পারে। এই ক্ষুদ্র চুম্বকটিকে অন্য একটি চৌম্বকক্ষেত্রের কাছে আনলে সে কীভাবে এবং কতটা প্রভাবিত হবে এবং অন্য চৌম্বকক্ষেত্রের ওপর তার কেমন প্রভাব পড়বে, তা ঠিক করে দেয় কণাটির যে ধর্ম, তাকে বলে চৌম্বক ভ্রামক (ম্যাগনেটিক মোমেন্ট)। এই চৌম্বক ভ্রামকটির সাথে তার কৌণিক ভরবেগের অনুপাতটিকে কণাটার আধান (চার্জ) ও ভরের সাহায্যে একটি সমীকরণের মত লিখতে হলে আমাদের লাগবে একটা সমানুপাতিক ধ্রুবক, যাকে আমরা g-ফ্যাক্টর হিসেবে চিনি। এবার আসি সেই মেজোভাই মিউওন-এর কথায়। প্রাথমিক অনুমান বলে, মিউওনের ক্ষেত্রে g-এর মান ২। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সংশোধিত গণনা দেখায়, g-এর মান ঠিক ২ নয়, সামান্য বেশি। এই মানটি আনুমানিক ২.০০২৩৩১৮৩৬২০(৮৬)। যেহেতু এই g-এর মানটি পুরোপুরি ২ নয়, আমরা যদি একটা নতুন রাশি (g-২)/২ উপস্থাপন করতে পারি, সেই রাশিটির মান কখনোই শূন্য হবে না (g-এর মান ২ হলে, ওপরের রাশিটির মান শূন্য হয়ে যেত)। এই রাশিটিকে আমরা অ্যানোমালাস ম্যাগনেটিক মোমেন্ট বলি। স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুযায়ী এর মান হল ০.০০১১৬৫৯১৮১০(৪৩)। কিন্তু পরীক্ষাগারে প্রাপ্ত অ্যানোমালাস ম্যাগনেটিক মোমেন্ট-এর মানের থেকে এই স্ট্যান্ডার্ড মডেলের প্রাপ্ত মানটি কতটা আলাদা, তা বের করার আরেকটি সমস্যা রয়েছে। এই অ্যানোমালাস ম্যাগনেটিক মোমেন্ট-এর মান এতটাই ছোট, এদের মধ্যেকার পার্থক্য মাপার সময় খুব নগণ্য পরিমান ত্রুটিও ফলাফলে বড়সড় হেরফের করে দিতে পারে। ফলে আমাদের এটা জানা প্রয়োজন, আমরা যে ফলাফলটি পেলাম, তা কতটা খাঁটি। ২০০১ সালে ব্রুকহেভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে এই অ্যানোমালাস ম্যাগনেটিক মোমেন্ট-এর মান নির্নয় করা হল। দেখা গেল এর সাথে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের গণনার বিচ্যুতি ৩.৭ সিগমা পরিমান। এই সিগমা রাশিটির নাম হল স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন। এই ফলাফলকে সহজ ভাবে বললে দাঁড়ায়, আমরা যদি ৪৫০০ বার এই পরীক্ষাটি করি, স্ট্যান্ডার্ড মডেলের গণনার সাথে পরীক্ষালব্ধ ফলের এই পার্থক্যটা নিছক কোনও কাকতালীয় কারণে হয়েছে, সেরকম সম্ভাবনা মাত্র ১ বার। এই ফলাফল থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করলেন, স্ট্যান্ডার্ড মডেলের গণনা সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। বা বলা চলে, স্ট্যান্ডার্ড মডেল নিজে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। ওই একই যন্ত্র ও উন্নততর প্রযুক্তির সাহায্যে এবার পরীক্ষাটি হল ফের্মিল্যাবে, আগের পরীক্ষার ঠিক দু’দশক পরে। উদ্দেশ্য, আরও সূক্ষ্মভাবে স্ট্যান্ডার্ড মডেল ও পরীক্ষায় প্রাপ্ত অ্যানোমালাস ম্যাগনেটিক মোমেন্ট-এর মানের বিচ্যুতি মাপা। এবারে অ্যানোমালাস ম্যাগনেটিক মোমেন্ট-এর মান পাওয়া গেল ০.০০১১৬৫৯২০৬১(৪১) এবং বিচ্যুতির মানটি পাওয়া গেল ৪.২ সিগমা। সহজভাবে বললে, স্ট্যান্ডার্ড মডেল ও পরীক্ষায় পাওয়া ফলাফলের মাঝের পার্থক্য আরও সূক্ষ্মভাবে ধরা পড়ল। এই ফলাফলটি এতটাই নিখুঁত, পরিসংখ্যান অনুযায়ী বলা চলে, ৪০,০০০ বার মাপলে ১ বার মাত্র এরকম সম্ভাবনা থাকবে যে, এই পার্থক্যটা অন্য কোনও কারণে বা কাকতালীয় ভাবে উদয় হয়েছে। এতটা নির্ভুল ফলাফল আরও একবার প্রমান করল, কণাবিদ্যার সম্পূর্ণ পরিসর স্ট্যান্ডার্ড মডেলে সঠিকভাবে ধরা পড়ে না। ঠিক যেমন, এর আগে নিউট্রিনোর ভর, বিভিন্ন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপায়ে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পাওয়া তমো পদার্থ ও তমো শক্তির উপস্থিতির অনুমান, স্ট্যান্ডার্ড মডেলের পরিসরের বাইরে থাকা নতুন কোনও তত্ত্বের ইঙ্গিত বহন করছে। মিউওন জি মাইনাস টু-এর নতুন পরীক্ষার ফলাফল সেইরকম ধারণাকেই আরও জোড়ালো করল।

তবে কি স্ট্যান্ডার্ড মডেল ভুল?

তবে কি স্ট্যান্ডার্ড মডেল ভুল? এখনো অব্দি যা তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে এটা বলাই যায় যে, এটি একটি অসম্পূর্ণ তত্ত্ব। কিন্তু কণাবিদ্যার পরিসরে পরীক্ষাগারে প্রাপ্ত বিভিন্ন ফলাফল, এই স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সংশ্লিষ্ট অনুমানগুলিকে বলিষ্ঠভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। কিন্তু উপরিউক্ত অমিমাংসিত ফলাফলগুলি কি অন্য কোনও তত্ত্বের পক্ষে আরও নির্ভুল উপায়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে কণাবিদ্যার তাত্ত্বিক গবেষকেরা বিভিন্ন রকম মডেলের উপস্থাপনা করে থাকেন। কখনও নতুন কোনও প্রতিসাম্য দ্বারা, কখনও বা নতুন কোনও মাত্রা(ডাইমেনশন)-র সাহায্য নিয়ে বিভিন্ন তাত্ত্বিক মডেল তৈরি করা হয়, যা স্ট্যান্ডার্ড মডেলের খামতিগুলো তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ, এখানে আলোচ্য পরীক্ষাটিতে অ্যানোমালাস ম্যাগনেটিক মোমেন্ট-এর যে মান পাওয়া গেছে, তাত্ত্বিকভাবে তাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে, যদি মিউওনের চারপাশে শক্তির সামান্য হেরফের-এর জন্য কিছু অজানা ভার্চুয়াল কণার মেঘ তৈরি হয় (এই ভার্চুয়াল কণারা শুন্যস্থান বা ভ্যাকুয়াম-এ ক্রমাগত তৈরি ও ধ্বংস হচ্ছে), যাদের অস্তিত্ব স্ট্যান্ডার্ড মডেলে নেই। এ বিষয়ে গবেষণা চলছে বিগত কয়েক দশক ধরে। কিন্তু এখনও অব্দি স্ট্যান্ডার্ড মডেল ব্যাতিত উপরিউক্ত অন্য কোনও তাত্ত্বিক মডেলকেই কোনও পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের দ্বারা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। তাই এই মিউওন জি মাইনাস টু-এর এই পরীক্ষাটি কণাবিদ্যার বর্তমান অভিমুখে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও, একে কণাবিদ্যার “নতুন দিগন্ত” বলার সময় এখনও আসেনি। তথ্যসূত্র : https://muon-g-2.fnal.gov/ ——————————————- ~ কলমে এলেবেলে চিরশ্রী ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।