বিজ্ঞানের খবর: জৈব জ্বালানি— আণুবীক্ষণিক শ্যাওলার কার্বোহাইড্রেটকে লিপিডে রূপান্তর

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
502 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

বর্তমান পৃথিবীতে শক্তির চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। শক্তির বেশিরভাগটাই আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। কিন্তু আর কয়েক বছর পর তো এই জীবাশ্ম জ্বালানি নিঃশেষিত হয়ে যাবে, তাহলে তখন কি আর শক্তি উৎপাদন হবে না? এর উত্তর হল— শক্তি উৎপাদন অবশ্যই হবে, কিন্তু তা জীবাশ্ম জ্বালানি  (কয়লা, পেট্রোলিয়াম) থেকে আর নয়। তৈরি হবে জৈব জ্বালানি থেকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কী এই জৈব জ্বালানি? জৈব জ্বালানি হল আণুবীক্ষণিক (মাইক্রোবিয়াল) উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে উদ্ভূত পুনর্নবীকরণযোগ্য এক ধরনের শক্তির উৎস। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় বায়োডিজেলের কথা, যা উদ্ভিজ্জ তেল এবং প্রাণীর চর্বি থেকে তৈরি হয়, সবুজ ডিজেল (গ্রীন ডিজেল) আবার শ্যাওলা ও অন্যান্য উদ্ভিদ উৎস থেকে পাওয়া যায়, বায়োগ্যাস গবাদি পশুর মল থেকে তৈরি হয়। জৈব জ্বালানির পুনর্নবীকরণযোগ্য বৈশিষ্ট্যের কারণে এবং সর্বোপরি সামান্য দূষণের জন্য বর্তমান ও ভবিষ্যতে এর গুরুত্ব অপরিসীম। আমেরিকার সর্ববৃহৎ তেল কোম্পানি এক্সনমোবাইল, উন্নতমানের জৈব জ্বালানি সংক্রান্ত গবেষণার জন্য তিনশো মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ২২,০১,৫২,০০,০০০ টাকা)-ও বেশি বিনিয়োগ করেছে।

“জৈব জ্বালানির মধ্যেই এই পৃথিবী এবং সমগ্র জাতির ভবিষ্যৎ অন্তর্নিহিত আছে।”—ম্যাট ব্লান্ট

যদিও জৈব জ্বালানিরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। যেমন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করতে যে পরিমাণ পেট্রোলিয়াম দরকার, জৈব জ্বালানিতে তার থেকে অনেক বেশি পরিমাণ ইথানল দরকার। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে অতিরিক্ত ইথানল ব্যবহার নিট শক্তিকে কমিয়ে দেয়। আবার এই ইথানল উৎপাদন হয় খাদ্যশস্য থেকে। ফলে শস্যের দামও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। এই কারণে তেল কোম্পানিগুলো, ইথানল উৎপাদনের রাস্তা ছেড়ে শৈবাল চাষের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের দিকে ঝুঁকছে।

আমাদের আলোচ্য মাইক্রোঅ্যালগি হল এমন এক ধরনের সালোকসংশ্লেষকারী উদ্ভিদ, যারা পরিবেশের কার্বন ডাই অক্সাইডকে লিপিডে পরিনত করতে বিশেষভাবে সক্ষম। এই বিষয়ে গবেষণা করার জন্য কোবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক কাটো ইউচি এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধ্যাপক হাশনামা তমহিসা, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কোয়ান্টাম অ্যান্ড রেডিওলজিকাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-র সিনিয়র গবেষক সতহর-এর সাথে হাত মিলিয়েছিলেন। গবেষকরা ওই মাইক্রোঅ্যালগিতে মিউটেশন ঘটানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের আলোর বিম ব্যবহার করেছিলেন। ফলস্বরূপ মাইক্রোঅ্যালগির এক নতুন স্ট্রেনের সৃষ্টি হয়, গবেষকদল এর নাম দেন ক্ল্যামাইডোমোনাস এসপি. কেওআর১। এই নতুন স্ট্রেন এক বিরাট মাত্রায় লিপিড প্রস্তুত করতে পারে, এক্ষেত্রে আলো কোনোরূপ প্রভাব ফেলতে পারেনা।

গবেষকদল এই নতুন স্ট্রেন কেওয়ার১-এ এও দেখেছেন যে, এর মধ্যে শ্বেতসার ভঙ্গকারী উৎসেচকের জিন আইএসএ১ ঠিক ভাবে কাজ করতে পারে না, ফলে শ্বেতসার-এর জায়গায় এক নতুন ধরনের শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট উৎপন্ন হয়, যার নাম ফাইটোগ্লাইকোজেন।

সাধারণত মাইক্রোঅ্যালগি আলোর উপস্থিতিতে কার্বোহাইড্রেট সংশ্লেষ করে ও সঞ্চয় করে, এবং আলোর অনুপস্থিতিতে সেই শ্বেতসার ভেঙে দেয়।

সাধারণত মাইক্রোঅ্যালগি আলোর উপস্থিতিতে কার্বোহাইড্রেট (পড়ুন শ্বেতসার) সংশ্লেষ করে ও সঞ্চয় করে, এবং আলোর অনুপস্থিতিতে সেই শ্বেতসার ভেঙে দেয়। যদিও অনেক কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি ভাবে ভাঙা সম্ভব না, কিন্তু আমাদের আলোচ্য মাইক্রোঅ্যালগি, ফাইটোগ্লাইকোজেন নামে যে কার্বোহাইড্রেট উৎপন্ন করে, তা আলোর অনুপস্থিতিতে পুরোপুরিই ভেঙে দেয়। এই বিয়োজন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, বিয়োজন চলাকালীন গ্লুকোজ-৬-ফসফেট, ফ্রুকটোজ-৬-ফসফেট, এসিটাইল কোএ নামে বিভিন্ন মধ্যবর্তী যৌগ উৎপন্ন হয়। গবেষকরা আলোকপাত করেছেন যে আইএসএ১ জিনের ত্রুটির কারণে যে লিপিডের অত্যাধিক উৎপাদন, তার মধ্যেই এই বিপাকীয় ক্রিয়া অন্তর্নিহিত আছে। এই কেওআর১ স্ট্রেনটি ফাইটোগ্লাইকোজেনকে দ্রুত ভেঙে ফেলে এবং এর ফলে উৎপন্ন হওয়া মধ্যবর্তী যৌগগুলো এরপর লিপিড উৎপাদনে সাহায্য করে।

আশা করা হচ্ছে এই নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করে মাইক্রোঅ্যালগি উৎপাদন অদূর ভবিষ্যতে একটা বড় মাত্রায় জৈব জ্বালানি উৎপাদনে সহায়ক হয়ে উঠবে।

১) ক্ল্যামাইডোমোনাস এসপি. কেওআর ১: এটি এক ধরনের মাইক্রোঅ্যালগি। এর উৎস তাইওয়ান-এর নোনাজল। এর উপর কৃত্রিমভাবে একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের আলো ফেলে কেওআর১ স্ট্রেনটির সৃষ্টি করা হয়েছে। এই নতুন স্ট্রেনটি নোনা জল ও স্বাদু জল দু’জায়গাতেই বিস্তার লাভ করতে পারে। এটি কার্বোহাইড্রেটকে ভাঙতে এবং তাদেরকে লিপিডে রূপান্তরিত করতে সক্ষম।

২) শ্বেতসার ভঙ্গকারী উৎসেচক: এটি এক ধরণের প্রোটিন যা শ্বেতসারকে ভেঙে লিপিড সংশ্লেষণের জন্য সহায়ক ছোট ছোট কাঠামো তৈরি করে।

৩) ফাইটোগ্লাইকোজেন: এটি এক ধরনের শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট। শ্বেতসার-এর তুলনায় এটি যথেষ্ট শাখা প্রশাখা যুক্ত। জলে সহজেই দ্রবণীয় অর্থাৎ আন্তঃকোষীয় উৎসেচকের দ্বারা সহজেই ছোট ছোট শাখায় ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব।

তথ্যসূত্র:  https://www.sciencedaily.com/releases/2021/05/210506105452.htm

———————————–

~ কলমে এলেবেলে দেবারুন ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।