বিজ্ঞানের খবর: অম্লত্বকে কি স্পর্শ করা সম্ভব?

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
173 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

সাধারণ মানুষ অ্যাসিড বলতে কি বোঝে? একটা বর্ণযুক্ত বা বর্ণহীন তরল, যেটা আদতে ক্ষয়কারী (corrosive)— সাধারণের দৃষ্টিতে অ্যাসিড এরকম, কারণ আমরা সাধারণত অ্যাসিড সেরকম কাজে ব্যবহার হতেই দেখি। একটা উদাহরণ হল গয়নার দোকান, দামি ধাতু গলাতে তো অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়। রসিক বাঙালি বলবে পৃথিবীতে যেখানে যা কিছু টক, তার পিছনেই অ্যাসিড আছে। এটাও ভুল কথা না; লেবু, তেঁতুল এগুলোর স্বাদ যে টক তার পিছনে আদত কেরামতি তো অ্যাসিডেরই। কিন্তু রসায়নের ভাষায় অম্লত্বর সাথে সম্পর্কযুক্ত রাশি হল হাইড্রোজেন আয়নের বা প্রোটনের (H+) ঘনত্ব। একজন কেমিস্ট pH মেপে বলবে যে কোন একটা সলিউশান অ্যাসিড কিনা। যদি অ্যাসিড হয়, তবে সেটা কতটা তীব্র।

pH= -log10(H+)

এই pH এর মান শূন্য থেকে সাতের মধ্যে হলে তবেই সেটি অ্যাসিড, না হলে নয়। কিন্তু এ তো গেল জলীয় দ্রবণের কথা। যদি দ্রবণ না হয়, তবে আরও সাধারণ ভাবে বলা যায়, কোন একটা পদার্থের অণু কত সহজে প্রোটন ত্যাগ করে তাই হল তার অম্লত্বের পরিমাপ।

 প্রশ্নটা যদি হয় একটা পৃষ্ঠতলের (surface) অম্লত্ব কত হবে, এটা পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করাটা একটু কঠিন

এবার নিজেদের আলোচনার ক্ষেত্রটা আর একটু বিস্তৃত করা যাক। প্রশ্নটা যদি হয় একটা পৃষ্ঠতলের (surface) অম্লত্ব কত হবে, এটা পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করাটা একটু কঠিন। একটা তলের সব জায়গার বিক্রিয়ার ক্ষমতা সমান না, ফলে যে সব পরীক্ষা পদ্ধতি প্রচলিত আছে তা একটা গড় অম্লত্ব পরিমাপ করবে, কিন্তু স্থান পরিবর্তনের সাথে অম্লত্বের কিরকম পরিবর্তন হবে তা নির্ণয় করা যাবে না।

ভিয়েনা ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির গবেষকরা এই সীমাবদ্ধতাকেই অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন এক বিশেষ ধরণের আণুবীক্ষণিক পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া বা মাইক্রোস্কোপির সাহায্যে; যা হল অ্যাটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপি। অ্যাটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপির মূল নীতি, অপটিক্যাল মাইক্রোস্কোপির মূল নীতির থেকে অনেকটাই আলাদা। অপটিক্যাল মাইক্রোস্কোপে আমরা দৃশ্যমান আলোর সাহায্যে খুব ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্যসীমার জিনিস পর্যবেক্ষণ করি, কিন্তু অ্যাটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপ আসলে ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্যসীমাকে অনুভব করে। একটা উদাহরণ দিলে জিনিসটা পরিষ্কার বোঝা যাবে।

ধরা যাক খুব বেশি সেঁকা একটা পাউরুটি আছে, এবার কেউ চোখ বন্ধ করে তার উপর আঙ্গুল বোলাচ্ছে। সে অনুভব করবে একটা অমসৃণ তল। কতটা অমসৃণ, নিশ্চয়ই একটা কাচের টেবিলের থেকে বেশি অমসৃণ, কিন্তু তার বেশি কিছু সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। এবার সেই একই ব্যক্তি চোখ বুঁজে, হাতে একটা সূচ নিয়ে যদি সেই পাউরুটির তলটাকে পর্যবেক্ষণ করে, তবে সে বুঝবে যে পৃষ্ঠতলটি অমসৃণ, আর সেই অমসৃণতার কারণ আদতে ওই পৃষ্ঠের উপরের অনেক ফাঁক ফোকর। বোঝা যাচ্ছে যে, আঙ্গুল দিয়ে পর্যবেক্ষণ পৃষ্ঠের প্রকৃতি খানিকটা বুঝতে পারলেও সেই পর্যবেক্ষণটা অসম্পূর্ণ। কারণ probe অর্থাৎ আঙুলের দৈর্ঘ্যসীমা, পাউরুটির তলে অবস্থিত ফাঁক ফোকরের দৈর্ঘ্য সীমার চেয়ে অনেকটাই বড়, কিন্তু সূচের দৈর্ঘ্যসীমা তার সমতুল্য, সেই জন্য সূচের সাহায্যে ওই তলের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ।

অ্যাটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপের ক্ষেত্রেও এই রকম সূঁচালো অগ্রভাগ বিশিষ্ট একটি অংশ (Tip) ব্যবহার করা হয়, যার দৈর্ঘ্যসীমা খুবই কম। দৈর্ঘ্যসীমাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ আসলে আমরা তাক (probe) করতে চাইছি আণবিক দৈর্ঘ্যসীমাকে। এই সূঁচালো অগ্রভাগটি স্যাম্পেলের তল স্পর্শ করতেও পারে, আবার নাও করতে পারে, কিন্তু সে যখনই তলের কাছাকাছি আসবে বা স্পর্শ করবে তার উপর কিছু বল ক্রিয়া করবে। খুব জটিল প্রযুক্তির দ্বারা এই বল পরিমাপ করা সম্ভব। এখন স্যাম্পেলের উপর সূঁচালো অগ্রভাগটি ঘোরালে, বিভিন্ন অংশের জন্য এই বলের পরিমাপটি (Force Response) আলাদা হবে, যা দেখে আমরা স্যাম্পেলের তল সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারব। অবশ্যই এইটুকু তথ্য এই পরীক্ষা প্রণালীটিকে (experimental procedure) সম্পূর্ণ বোঝার জন্য যথেষ্ট না, কিন্তু একটা বুনিয়াদি ধারণা অবশ্যই দিতে পারে।

এবার বোঝা যাক আমাদের ভিয়েনা ইউনিভারসিটি অফ টেকনোলজির গবেষকেরা কি করেছেন একটা পৃষ্ঠতলের অম্লত্ব পরিমাপ করার জন্য। তারা তাদের পরীক্ষার জন্য বেছে নিয়েছেন ইনডিয়াম অক্সাইডের তল। তাদের মতে এটি এই পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইনডিয়াম অক্সাইডে চারটি ভিন্ন বিক্রিয়া ক্ষমতাসম্পন্ন অক্সিজেন পরমানু আছে। গবেষকরা অ্যাটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপের সূঁচালো অগ্রভাগটির মুখে হাইড্রক্সিল গ্রুপ(-OH) জুড়ে দিলেন। তাঁরা ইনডিয়াম অক্সাইডের তলটির উপরও কিছু এমন রাসায়নিক বিক্রিয়া করলেন যাতে তলের উপরও হাইড্রক্সিল গ্রুপ শোষিত (Adsorb) হয়। যেহেতু আমাদের তলের অক্সিজেনের বিক্রিয়া ক্ষমতা ভিন্ন, তাই তলের বিভিন্ন অংশে হাইড্রক্সিল গ্রুপের আটকে থাকার জোরও আলাদা। অ্যাটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপের সূঁচালো অগ্রভাগটা যেই তলের হাইড্রক্সিল গ্রুপের কাছে আসবে, তখনই সেই সূঁচালো অগ্রভাগের হাইড্রক্সিল গ্রুপের অক্সিজেন, তলে আটকানো হাইড্রক্সিল গ্রুপের হাইড্রোজেনকে আকর্ষণ করবে। এখন সেই আকর্ষণ বল যদি বেশি হয়, তার মানে ওই অংশগুলিতে প্রোটনের যোজন ক্ষমতা বা প্রোটন আসক্তি (Affinity) কম, তাই সে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আবার আকর্ষণ বল যদি কম হয়, তার মানে সেখানে প্রোটন আসক্তি (Affinity) বেশি, তাই সহজে তাকে বের করে আনা যাবে না।

এভাবেই বিজ্ঞানীরা পুরো তলের বিভিন্ন অংশের প্রোটন আসক্তিকে ছকে ফেলেছেন বা ম্যাপ করেছেন। এবং তাঁদের এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে এই ভাবে বিভিন্ন রকম তলের প্রোটনের আসক্তিকে (Site Specific Proton Affinity) সহজে বের করার জন্য সমাদৃত হবে।

তথ্যসূত্রঃ

https://www.chemistryworld.com/news/acidity-of-a-single-hydroxyl-group-measured-with-atomic-precision-for-first-time/4013689.article

https://www.sciencedaily.com/releases/2021/04/210428113712.htm

M Wagner et al, Nature, 2021

চিত্রসূত্রঃ

 M Wagner et al, Nature, 2021

————————————

~ কলমে এলেবেলে ঋত্বিক ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।