মহাকর্ষ তরঙ্গ: “বিপুল তরঙ্গ রে…মগন করি অতীত অনাগত” (পর্ব-২)

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
206 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

প্রথম পর্বের পর….

ধরা যাক প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন একদল সৈন্য কুচকাওয়াচ করতে করতে চলেছে কলকাতা থেকে হাওড়ার দিকে। সকলের ডান পা একসাথে উঠছে, একসাথে নামছে, একটা নির্দিষ্ট ছন্দ মেনে বা সমলয়ে। সামনে পার হতে হবে হুগলি নদী। ধরা যাক, আমাদের হাওড়া ব্রিজের ঠিক পাশেই বানানো হয়েছে একই রকম দেখতে আরেকটা সেতু। চোখে দেখে বোঝার জো নেই কোনটা আসল হাওড়া ব্রিজ, আর কোনটা তার নকল। দুটো রাস্তাই ধরা যাক প্রায় ৭০৫ মিটার লম্বা, এবং হাওড়া স্টেশনের একদম মুখটায় এসে দুটো সেতু আবার এক হয়ে গেছে। ধরলাম, এই দুটো সেতুর সামনে কুচকাওয়াচরত সেনাবাহিনী দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল ও একই ছন্দে দুটো আলাদা সেতু দিয়ে চলতে থাকল। ৭০৫ মিটার অতিক্রম করার পর দুটো দল যখন আবার এক জায়গায় এল, দেখা গেল যে তাদের পা ফেলার তাল কেটে গেছে। দুই দলের ডান পা একসাথে আর উঠছে নামছে না। কিন্তু এমনটা কেন হল? দুটো রাস্তাই তো ৭০৫ মিটার দৈর্ঘ্যের ছিল! ইঞ্জিনিয়ারদের ডাকা হল; তারা রাস্তাদুটোর দৈর্ঘ্য মেপে দেখল, আসল হাওড়া ব্রিজের দৈর্ঘ্য ৭০৫ মিটার হলেও নকলটার দৈর্ঘ্য সামান্য বেশি। আর সেকারণে ওটুকু বাড়তি পথ অতিক্রম করতে গিয়েই ঘটেছে এই বিপত্তি।

এখন আমরা এই দুটো আলাদা রাস্তা দিয়ে যাওয়া সেনাদের প্রতিটা দলকে এক একটা আলোক তরঙ্গের মতো কল্পনা করব। ধরলাম, শুরুতে দুটো তরঙ্গের শীর্ষ (peak) একই বিন্দুতে ছিল (ছবিতে যেমন দেখা যাচ্ছে), ফলে তাদের সম্মিলিত প্রভাব বা ‘interfere’ করার ফলে যে নতুন তরঙ্গ তৈরি হবে, তার বিস্তার হবে আরও বেশি; আমরা পেয়ে যাব উজ্জ্বলতর তরঙ্গ (শব্দের অনুনাদ বা রেসোনেন্স-এর ক্ষেত্রে আমরা এই ঘটনাই দেখি)। এই ঘটনাকে বলা হয় গঠনমূলক ব্যতিচার (constructive interference)। অন্যদিকে, বাড়তি রাস্তা চলার পর যদি দেখা যায় একটা তরঙ্গের সবথেকে উঁচু অংশ (peak) অন্য তরঙ্গটির সবথেকে নিচু জায়গার (trough) ওপরে এসে পড়েছে, তখন তরঙ্গদুটি একে অপরের বিস্তারকে খর্ব করার চেষ্টা করবে; আমরা পেয়ে যাব খুবই ম্লান আলোর তরঙ্গ বা অন্ধকার অঞ্চল। এই ঘটনাকে বলে ধ্বংসাত্মক ব্যতিচার (destructive interference)। অর্থাৎ, দুটো একই সাথে জন্ম নেওয়া যমজ তরঙ্গ দুটো আলাদা রাস্তা দিয়ে পরিভ্রমণ করার পরে একে অপরের ওপরে যে দশায় (phase) আপতিত হয়, তা দেখে বোঝা সম্ভব, তাদের দ্বারা অতিক্রান্ত পথ দুটো সমান ছিল কিনা। এরকম দুটো তরঙ্গ যখন উপরিপাতিত হয়, তার ফলস্বরূপ সৃষ্ট নতুন তরঙ্গের বিস্তারের পর্যায়ক্রমিক কমা-বাড়ার ঘটনাকে বলা হয় তরঙ্গের ব্যতিচার (interference)।

কিন্তু এই ব্যতিচারের সাথে আগের পর্বে আলোচিত মহাকর্ষ তরঙ্গ ধরার ফাঁদ লাইগোর কী সম্পর্ক?

লাইগো বা “লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ অবজার্ভেটরি” নামটির শেষে জুড়ে থাকা ‘অবজার্ভেটরি’ বা মানমন্দির শব্দটি শুনলেই কল্পনায় ভেসে ওঠে একটা গোম্বুজাকৃতি আদল আর টেলিস্কোপ। কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গকে পাকড়াও করার জন্য যে ‘অবজার্ভেটরি’ তৈরি করা হল এখানে, তার চেহারার সাথে এই টেলিস্কোপ-গম্বুজের চেহারার কোনও মিলই নেই। মজার কথা হল, অন্যান্য মানমন্দিরে যেমন অপটিক্যাল ও রেডিও টেলিস্কোপের সাহায্যে তড়িৎ-চুম্বকীয় ‘আলো’ পর্যবেক্ষণ করা হয়, এখানে সেইরকম কোনও ব্যবস্থাই নেই— বা বলা ভালো এই যন্ত্র দৃষ্টিহীন। শুধু তাই নয়, কানামাছি খেলার সময় যেমন খুব ভালো করে চোখ বাঁধতে হত, যাতে বাইরের আলো চোখে না আসতে পারে, সেভাবেই এই যন্ত্রটিকে বাইরের সমস্ত তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের সংসর্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়।

অন্যান্য মানমন্দিরে যেমন অপটিক্যাল ও রেডিও টেলিস্কোপের সাহায্যে তড়িৎ-চুম্বকীয় ‘আলো’ পর্যবেক্ষণ করা হয়, এখানে সেইরকম কোনও ব্যবস্থাই নেই— বা বলা ভালো এই যন্ত্র দৃষ্টিহীন।

এবার আসা যাক ব্যতিচারের গল্পে। প্রকৃতপক্ষে লাইগো হল ইংরেজির L এর মত আকৃতিবিশিষ্ট দুটো বিশালকায় ইন্টারফেরোমিটার যন্ত্র (interfere-o-meter বা interferometer), যাদের প্রত্যেকটির কাজ হল দু’দিক থেকে আসা লেজার তরঙ্গের ব্যতিচার (interference) মাপা। এই দুটো ইন্টারফেরোমিটার যন্ত্রকে একে অপরের থেকে ৩০০০ কিলোমিটার ব্যবধানে রাখা হল; একটা লিভিংস্টোন, লুইসিয়ানায় এবং অন্যটা হ্যানফোর্ড, ওয়াশিংটনে। প্রতিটা ইন্টারফেরোমিটারের L এর মত সমকোণে থাকা দুটো করে বাহুর প্রত্যেকটির দৈর্ঘ্য সমান এবং তাদের প্রতিটির মাপ ৪ কিলোমিটার করে। এখানে মনে রাখতে হবে, আমরা একটা অতি সূক্ষ্ম দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন মাপার জন্য এত বড় ফাঁদ পেতেছি (সেটা কতটা সূক্ষ্ম সে কথা আমরা আগের পর্বে আলোচনা করেছি)। সেই কারণে ইন্টারফেরোমিটারের L এর মত হাতদুটিকে হতে হয় খুব লম্বা, যাতে এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনকে মাপা সম্ভব হয়। আগেই আমরা আলোচনা করেছি, মোটামুটি দুটো জায়গার মধ্যেকার দূরত্ব যদি কয়েক হাজার মিটার হয়, মহাকর্ষ তরঙ্গ সেই পথ দিয়ে গেলে এই দূরত্বের যে পরিবর্তন হবে তা হল ১০-১৯ মিটার, যা একটা প্রোটন কণার ব্যাসের দশ হাজার ভাগের এক ভাগ। অতএব লাইগোর এই লম্বা বাহুগুলির দৈর্ঘ্য সম্পূর্ণরূপে সমান রাখতে কতটা প্রযুক্তিগত নৈপুণ্য প্রয়োজন তা স্বভাবতই আন্দাজ করা যায়; অতি নগণ্য মাপের হেরফের পুরো পরীক্ষাকেই ভেস্তে দেবে।

আগেই বলেছি এই যন্ত্রের মূল মন্ত্র হল তরঙ্গের ব্যতিচার। বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে জন্ম দেওয়া হয় দুটো লেজার রশ্মিকে, যাদের জন্মের সময়কার দশা আমাদের জানা, অনেকটা সেই কুচকাওয়াচের সৈন্যদের পায়ের ছন্দের মত। লেজার রশ্মির প্রত্যেককে L আকৃতির এক একটা বাহু দিয়ে পাঠানো হয়। তারা প্রত্যেকে ৪ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করার পরে যখন এক জায়গায় উপরিপাতিত হবে, যন্ত্রের নকশা অনুযায়ী, তারা একে অপরের সাথে বিপরীত দশায় মিলিত হবে। ফলে এরা একে অপরের বিস্তারকে নষ্ট দেবে এবং আমরা দেখতে পাব ধ্বংসাত্মক ব্যতিচার (destructive interference)। এই ঘটনাকে যদি একটা সিগন্যালে রূপান্তরিত করি, ধ্বংসাত্মক ব্যতিচারের অর্থ— যন্ত্রে কোনও সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ এমন একটা যন্ত্র বানানো হল, যেখানে L এর দুটো বাহুর দৈর্ঘ্য সমান হলে, সেখান দিয়ে যাতায়াত করা লেজার রশ্মির ব্যতিচারের কারণে যন্ত্রে পাওয়া সিগন্যালের মান হওয়া উচিৎ ‘শূন্য’। এবার যদি এরকম হয় যে, কোনও কারণে L এর দুটো বাহুর মধ্যে যেকোনও একটার দৈর্ঘ্যে সামান্য পরিবর্তন হল, তাহলে দুটো লেজার রশ্মির একটি অন্যটির চেয়ে সামান্য বেশি বা কম পরিমান পথ অতিক্রম জন্য তারা একে অপরের বিস্তারকে পুরোপুরি খারিজ করতে পারবে না— ফলস্বরূপ আমরা যন্ত্রে একটা সিগন্যাল দেখতে পাব। শুধু তাই নয়, যতক্ষণ তরঙ্গটি ওই পথ দিয়ে প্রবাহিত হবে, স্থান-কালের ক্রমাগত সংকোচন-প্রসারণে লেজার রশ্মির ব্যতিচারের দশাও প্রতি মুহূর্তে পাল্টাতে থাকবে, ফলে যন্ত্রে পাওয়া সিগন্যালের মানেও তারতম্য হতে থাকবে।

দুটো লেজার রশ্মির একটি অন্যটির চেয়ে সামান্য বেশি বা কম পরিমান পথ অতিক্রম জন্য তারা একে অপরের বিস্তারকে পুরোপুরি খারিজ করতে পারবে না— ফলস্বরূপ আমরা যন্ত্রে একটা সিগন্যাল দেখতে পাব।

আমরা আগেই বলেছি মহাকর্ষ তরঙ্গ প্রবাহিত হয় স্থান-কালের জ্যামিতির সংকোচন প্রসারণের মাধ্যমে। অর্থাৎ যদি এমন হয়, ইন্টারফেরোমিটারের দুটি বাহুর একটির মধ্যে দিয়ে মহাকর্ষ তরঙ্গটি প্রবাহিত হল, তাহলে সেই বাহুটির দৈর্ঘ্য অন্যটির থেকে সামান্য বদলে যাবে। ফলে মহাকর্ষ তরঙ্গের উপস্থিতি আমরা ধরে ফেলব হাতেনাতে, যন্ত্রে পাওয়া সিগন্যালের সাহায্যে। শুধু তাই নয়, এই সিগন্যাল বিশ্লেষণ করলে আমরা পেয়ে যাব, মহাকর্ষ তরঙ্গটির উৎস, বয়স ও জন্ম সম্বন্ধীয় যাবতীয় তথ্য (আগের পর্বে জেনেছি, নিচে আরও একবার দেওয়া হল)।

এই ঘটনাটিই প্রথম দেখতে পাওয়া গেছিল ২০১৫ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বরের ভোরে। কিন্তু এত সূক্ষ্ম পরিমাপের ক্ষেত্রে এটা বোঝা কি আদৌ সম্ভব যে যন্ত্রে পাওয়া সিগন্যালটি মহাকর্ষ তরঙ্গের কারণেই, অন্য কোনও যান্ত্রিক সমস্যা, বা পারিপার্শ্বিক গোলযোগের জন্য নয়? সত্যি বলতে কি, একটা যন্ত্রে পাওয়া সিগন্যাল থেকে এহেন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া কখনই সম্ভব নয়। কিন্তু একই ঘটনা যদি একাধিক যন্ত্রের চোখে ধরা পড়ে, তাহলে ঘটনার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব। সেই কারণেই লাইগোতে ৩০০০ কিলোমিটার ব্যবধানে দুটো ইন্টারফেরোমিটার যন্ত্র রাখা আছে। এক্ষেত্রে জায়গাগুলির ভৌগোলিক অবস্থানও খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে। সেদিন ০.০০৭ সেকেন্ড ব্যবধানে দুটো যন্ত্রেই ধরা পড়েছিল সিগন্যালটি। দুটো জায়গার দূরত্ব ও সিগন্যাল পাওয়ার সময়ের ব্যবধান থেকে হিসেবে করে যে ফলাফল পাওয়া গেছিল, তাতে বোঝা গেল, একমাত্র মহাকর্ষ তরঙ্গের উপস্থিতির কারণেই দু’জায়গাতেই এই সিগন্যাল পাওয়া গেছে। সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে আমরা জানতে পেরেছি ১৩০ কোটি (১.৩ বিলিয়ন) বছর আগের ঘটে যাওয়া দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষের বিষয়ে।

এই অসম্ভবকে বাস্তবায়িত করার জন্য ২০১৭ সালে তিন বিজ্ঞানী রেইনার ওয়াইস, কিপ এস. থর্ন, এবং ব্যারি সি. বারিশকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। ওই সালেই প্রতিষ্ঠিত হয় লাইগো সায়েন্টিফিক কোলাবোরেশন (LSC)। ক্যালটেক এবং এমআইটি দ্বারা পরিচালিত এই প্রজেক্ট-এর সাথে আমেরিকা ছাড়াও যুক্ত আছে আরও প্রায় আঠেরোটি দেশ, যার মধ্যে ভারতেরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। LIGO -INDIA প্রোজেক্ট শুরু হয়েছে ভারতে, লাইগোর সাথে যৌথভাবে। এছাড়াও ইতালি ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগে ইউরোপিয়ান গ্রাভিটেশনাল অবসার্ভেটরির আর্থিক আনুকূল্যে ইতালিতে তৈরি ইন্টারফেরোমিটার VIRGO, জার্মানির হানোভার কাছে অবস্থিত GE0600, জাপানের প্রকল্পিত KAGRA ব্রম্হান্ডের বিভিন্ন দিক থেকে আগত মহাকর্ষ তরঙ্গকে সনাক্তকরণের কাজে নিয়োজিত। ফলে আশা করা যায়, ভবিষ্যতে আমরা বিভিন্ন ধরণের মহাকর্ষ তরঙ্গ সম্পর্কে আরও সম্যক ধারণা পাব। উন্মোচিত হবে মহাবিশ্বের আনাচ-কানাচ।

ওপর থেকে লাইগো ইন্টারফেরোমিটার: লিভিংস্টোন, চিত্রসূত্র: Caltech/MIT/LIGO Laboratory

 ———————————

~  কলমে এলেবেলে চিরশ্রী ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।