অনুরণন যখন পরিবেশে

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
161 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

এখন বলতে গেলে গোটা পৃথিবীর দৃষ্টিকোণে প্রধান সংকট করোনা পরিস্থিতি, যা স্বাভাবিক ভাবেই দখল করে রেখেছে আমাদের সমস্ত আলাপ-আলোচনা এবং কাজ-কর্মের পরিসর। আমরা যদি একটু ঠিক করোনা পূর্ববর্তী আমলে ফিরে যেতে পারি, তাহলে মনে পড়বে; সেই সময়ে বিশ্বের সম্মুখে সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে মনে করা হতো ‘জলবায়ুর পরিবর্তন’। দূরদর্শনের পর্দায় বা সংবাদপত্রের পাতায় চোখ রাখলে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’, ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ এই শব্দগুলি প্রায়শই আমাদের চোখে পড়ত। এখন সার্বিকভাবে চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু অন্যদিকে সরে গেলেও, এমন নয় যে আগের সমস্যাটির গুরুত্ব কমে গেছে। বিল গেটস সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, এখন থেকে সাবধান না হলে, জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি কোভিড পরিস্থিতির থেকেও ভয়াবহ হতে পারে। তবে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে না পড়ে, আমরা এই অবস্থা এড়াতে পারি, যদি সহায় হয় রাষ্ট্রের সঠিক নীতি এবং দৃঢ় হয় জনসচেতনতার ভিত্তি। বলতে গেলে এটাই যেকোনও গণ-বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসার মূল মন্ত্র, যা আমরা সকলেই উপলব্ধি করছি বর্তমান পরিস্থিতিতে। তো সে যাই হোক, এখন আমরা মোটামুটি সবাই সতর্ক কীভাবে আমরা আমাদের পারিপার্শ্বিক-পরিবেশ পরিস্থিতিকে আমাদের চেষ্টায় কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। তবে আজ আমি একটু অন্যরকম বিষয় নিয়ে কথা বলব, যেখানে শুধু প্রকৃতিই নিয়ন্ত্রণ করে প্রকৃতিকে; পারিপার্শ্বিকের বিপুল পরিবর্তনে কাজ করে অনুরণন।

আজ থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে আমাদের পৃথিবীর জন্ম। ছোটবেলায় আমরা সবাই পড়েছি, সৃষ্টির মুহূর্তে পৃথিবী ছিল একটি জ্বলন্ত গ্যাসীয় পিন্ড। তারপর ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে বর্তমান অবস্থায় এসেছে। এ কথা সত্যি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আরেকটু সূক্ষ্ম স্তরে দেখতে গেলে পৃথিবীর জলবায়ুর বিবর্তনের ধারা বেশ চিত্তাকর্ষক। এমনটা নয় যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা খুব উচ্চমান থেকে কমতে কমতে একটা জায়গায় এসে স্থিতিশীল হল, অথবা এখন ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’-এর ফলস্বরূপ তাপমাত্রা বাড়ছে বলে, একই ভাবে বাড়তেই থাকবে। পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন কখনো বা সময়ের সাথে পর্যায়ক্রমিক, কখনো বা অনুসরণ করে কোনো বিচিত্র ধাঁচ। এখানে মনে রাখা দরকার, আমি পরিবেশের যে অবস্থান্তরের কথা বলছি, তা ভূ-তাত্ত্বিক সময়ের মাত্রায়। তাই আমরা হয়ত আমাদের জীবদ্দশায় এই বদল উপলব্ধি করতে পারব না; কিন্তু বোঝার চেষ্টা করতে পারি, এই মজাদার পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতিকে।

ভাবতে একটু অবাক লাগলেও, আমরা বর্তমানে বসবাস করছি একটি বরফ যুগে

পৃথিবীর জলবায়ু মূলত দুটি বিশেষ অবস্থার মধ্যে পরিবর্তিত হয়; একটি হল ‘বরফ যুগ’, আরেকটি হল ‘গ্রীন-হাউস পর্যায়’। ‘আইস এজ’ বা ‘বরফ যুগ’ সম্পর্কে আমাদের প্রায় সকলের মনে একটা বিমূর্ত ধারণা আছে, যা জন্ম নিয়েছে প্রধানত কল্পকাহিনীতে এর উল্লেখ থেকে। ‘বরফ যুগ’ শুনলেই আমাদের মনে হয়, সারা পৃথিবী বুঝি বরফে ঢেকে আছে আর বিশালাকায় দানবীয় পশমাবৃত প্রাণীরা চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই কল্পনা সর্বাংশে সত্যি নয়। ‘বরফ যুগ’ হল সেই সময়কাল, যখন পৃথিবীর পৃষ্ঠতল এবং তার উপরের বায়ুস্তরের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকে; যার ফলস্বরূপ মেরু অঞ্চলে, মহাদেশীয় ভূমিতে এবং উচ্চ-পার্বত্য এলাকায় বরফের স্তর আর হিমবাহ অবস্থান করে। অন্যদিকে ‘গ্রীন-হাউস পর্যায়’-এ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা থাকে বেশি আর বরফের অস্তিত্ব মুছে যায় ধরিত্রীর বুক থেকে। সুতরাং ভাবতে একটু অবাক লাগলেও, আমরা বর্তমানে বসবাস করছি একটি বরফ যুগে; মহাদেশগুলির বিভিন্ন স্থানে, দুই মেরুতে আর পর্বতমালার শিখরে বরফের উপস্থিতি তার প্রমান। এটি ‘কোয়াটারনারি আইস এইজ’, যা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ২৫ লক্ষ বছর আগে। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে পঞ্চম বরফ যুগ।

এবার আমরা ঢুকে যাই এই বরফ যুগের ভিতরের আলোচনায়। আপেক্ষিকভাবে কম তাপমাত্রার যেকোনও একটি বরফ যুগের সম্পূর্ণ সময়কালে উষ্ণতা কিন্তু এক জায়গায় স্থির থাকে না; সেটি পর্যায়ক্রমিক ভাবে পরিবর্তিত হয় ভিন্ন মানের মধ্যে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট বরফ যুগের ভিতর ক্রমান্বয়ে কম শীতল এবং বেশি শীতল পরিবেশের মধ্যে অবস্থান্তর ঘটে; শীতলতর পর্যায়টিকে বলা হয় ‘গ্লেসিয়াল’ আর তুলনামূলকভাবে বেশি উষ্ণতার সময়কালটিকে বলা হয় ‘ইন্টারগ্লেসিয়াল’। ‘গ্লেসিয়াল’ পর্যায়ে পৃথিবীর অধিকাংশ স্থানই বরফে ঢেকে যায়; বলতে গেলে পৃথিবী একটি বরফের গোলায় পরিণত হয়। আর ‘আইস এইজ’ বলতেই আমাদের মনের চোখে যে ছবিটি ধরা পরে সেটি হল এটি। তাহলে সঠিকভাবে বলতে গেলে বরফ যুগ বলতে আমরা যা ভাবি, সেটা তার একটা বিশেষ পর্যায় মাত্র; বরফ যুগের অন্য একটি পর্যায় অর্থাৎ উষ্ণতর ‘ইন্টারগ্লেসিয়াল’ সময়কালটি আমাদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আমরা এই সময়েই পৃথিবীতে বসবাস করছি।

বিজ্ঞানের দরবারে প্রবর্তিত হল এক নতুন ধরণের প্রক্রিয়ার তথ্য, যার নাম ‘স্টোকাস্টিক রেসোনেন্স’

বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের খেয়ালে ‘গ্লেসিয়াল’ আর ‘ইন্টারগ্লেসিয়াল’ সময়কালের মধ্যে পরিবর্তন ঘটে নির্দিষ্ট সময় পরপর। এই অবস্থান্তরের সময়কাল প্রায় লক্ষ বছরের মাত্রায়। সৃষ্টিকর্তা যেমন মহাবিশ্বের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে রেখেছেন রহস্য, তাঁর গড়া সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী-সম্প্রদায়টি জন্মের সূচনা থেকেই উঠেপড়ে লেগেছে সেই প্রহেলিকা উদ্ঘাটনের কাজে। স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞানীদের মনে প্রশ্ন জাগে, বিশ্ব-প্রকৃতির এই আমূল পরিবর্তনের ভিত্তি কী? যা কিনা আবার পর্যায়ক্রমিক। সেই উত্তর খুঁজতে প্রথমেই দেখা দরকার এমন কি পরিবেশগত প্রভাব থাকতে পারে যার ক্রমপরিবর্তনের ধারা এবং সময়কাল ‘গ্লেসিয়াল-ইন্টারগ্লেসিয়াল’ অবস্থান্তরের সাথে মেলে; সেক্ষেত্রে পৃথিবীর জলবায়ু সেই প্রভাবের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ একই ভাবে বদলাবে। খুঁজতে খুঁজতে দেখা গেল, পৃথিবী যে উপবৃত্তাকার পথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, তার কেন্দ্রীয় দূরত্ব ব্রহ্মান্ডের সামগ্রিক মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে অনুরূপভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। সুতরাং মিলে গেল পরিবর্তনের পর্যায়ক্রমিক ধরণ এবং সময়কাল। কিন্তু এখানে আরেকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে, সেটি হল এই প্রভাবের শক্তিমাত্রা; অর্থাৎ দেখতে হবে, যাকে আমরা অবস্থান্তরের কারণ বলে মনে করছি, সেটা সত্যি করেই বদল ঘটানোর জন্য যথেষ্ট প্রবল কিনা। ব্যাপারটা এরকম; ধরা যাক কোনো এক ব্যক্তির কিছু নিজস্ব চিন্তাধারা আছে, কিন্তু তার প্রকাশ খুব একটা বলশালী নয় যে তা অন্য আরেক ব্যক্তিকে একইভাবে প্রভাবিত করতে পারবে। তো এক্ষেত্রেও দেখা গেল, পৃথিবীর কক্ষপথের কেন্দ্রীয় দূরত্ব পরিবর্তনের প্রভাবটি এতটাই ক্ষীণ যে তার পক্ষে পরিবেশের এই সুবিপুল পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। চলতে থাকল আরো গভীর অনুসন্ধান। ফলস্বরূপ বিজ্ঞানের দরবারে প্রবর্তিত হল এক নতুন ধরণের প্রক্রিয়ার তথ্য, যার নাম ‘স্টোকাস্টিক রেসোনেন্স’। ‘রেসোনেন্স’ কথাটির বাংলা প্রতিশব্দটি হল ‘অনুরণন’; এর সাথে আমরা পরিচিত বিজ্ঞান-পাঠ্যপুস্তকে দোলকের আলোচনা থেকে। সহজভাবে বলতে গেলে যখন একটি দোলকের দোলনের হার বা কম্পাঙ্ক, তার উপর প্রযুক্ত বহিঃস্থ বলের কম্পাঙ্কের সমান বা সমানুপাতিক হয় তখন দোলনের বিস্তার হঠাৎ খুব বেড়ে যায়; ঘটে যায় অনুরণন। ঠিক যেমন দুই বন্ধুর চিন্তা-ভাবনার ধরণ একদম হুবহু মিলে গেলে তাদের প্রাণের উদ্দীপনা বেড়ে যায় শতগুণ, অনেকটা সেইরকম। ‘স্টোকাস্টিক’ শব্দটি জড়িত অনিশ্চিত ঘটনা-রাশির সংখ্যাতাত্বিক বিবরণের সাথে। বিজ্ঞান-সংক্রান্ত সেই গুরুগম্ভীর আলোচনায় না গিয়ে শুধু জেনে রাখি জলবায়ু পরিবর্তনের ধারা বোঝার জন্য আরেকটি নতুন ধরণের প্রাকৃতিক প্রভাবের প্রসঙ্গ বিবেচনা করার প্রয়োজন হল, যার গতিপ্রকৃতি অপ্রত্যাশিত ধরণের, আগে থেকে নির্ণয় করা যায় না। সেটি সম্পর্কিত সৌর-বিকিরণ-মাত্রার বার্ষিক ওঠা-নামার সাথে।

এই মুহূর্তে মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক, এখানে হঠাৎ দোলকের প্রসঙ্গ আসছে কেন? বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনার বিজ্ঞানভিত্তিক তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য অনেক সময়ই অবতারণা করা হয় সম্ভাব্য নকশা বা ‘মডেল’-এর। এক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ‘মডেল’টিতে মনে করা হল জলবায়ুর দুই অবস্থা, ‘গ্লেসিয়াল’ আর `ইন্টারগ্লেসিয়াল’-এর মাঝে আছে একটা অন্তরায়; সেটা অতিক্রম করলেই হবে জলবায়ুর পরিবর্তন। বাস্তবে যেহেতু এই অবস্থান্তর ঘটে পর্যাবৃত্ত রীতিতে; অর্থাৎ বিশেষ সময় অন্তর একই ধরণের জলবায়ু ফিরে ফিরে আসে, এর সাথে সাদৃশ্য পাওয়া যায় দোলকের গতির; কারণ দোলকটিও নির্দিষ্ট সময় পর একই জায়গায় উপস্থিত হয়। তাহলে ‘মডেল’-টিতে প্রথমত আছে দুটি অবস্থা; যাদের মধ্যে চলাচল দোলকের গতির মত, দ্বিতীয়ত একটি পর্যায়ক্রমিক এবং তৃতীয়ত একটি অনির্দিষ্ট প্রকৃতিগত প্রভাব। সব মিলিয়ে এটা একটা বাধা টপকানোর গল্প— সেটা যেকোনো একটি প্রভাবের উপস্থিতিতে সম্ভব নয়; এমনকি তাদের অস্তিত্ব যেকোনো মাত্রার হলেও হবে না। হতে হবে এমন বিশেষ মানের, যাতে অনির্দিষ্ট বল দ্বারা নির্ধারিত দুই অবস্থার মধ্যে দোলনকাল মিলে যায় ক্ষীণ পর্যাবৃত্ত প্রভাবটির দোলনকালের সাথে; মিল হবে ছন্দের, প্রকৃতির বুকে ঘটবে অনুরণন। একটি দুর্বল প্রভাব যা অবস্থান্তর ঘটাতে সমর্থ নয়, অন্য আরেকটি অনির্দিষ্ট বলের সাথে জুড়ে গিয়ে নিয়ে আসতে পারে আমূল পরিবর্তন। এই ঘটনাই হলো ‘স্টোকাস্টিক রেসোনেন্স’।

যদিও সর্বপ্রথম এই তত্ত্বের অবতারণা করা হয়েছিল, বরফ যুগে পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন বুঝতে; পরে এই প্রক্রিয়ার কার্যনীতি সফলতার সাথে ব্যবহার করা হয়েছে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির নানা ক্ষেত্রে; বিভিন্ন যন্ত্রে— যেখানে প্রায়-ঘুমন্ত একটি সংকেতকে প্রবলভাবে জাগিয়ে তোলা হয় এক অনিশ্চিত বলের প্রভাবে। প্রযুক্তির অনেক ক্ষেত্রেই এই অনির্দিষ্ট বলটি অনাকাঙ্খিত, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েস’ বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু মজার ব্যাপারটি হল সঠিক মাত্রায় এর প্রয়োগ ব্যাপক উন্নতি ঘটাতে পারে যন্ত্রের প্রতিক্রিয়ায়; এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, পরিমাপ হতে হবে সুনির্দিষ্ট। এ যেন প্রকৃতির শিক্ষা; জীবনের, বিজ্ঞানের সর্বত্রই দরকার পরিমিতি বোধ। তাহলেই আসবে অগ্রগতি।

————————————-

~ কলমে এলেবেলের অতিথি মৌপ্রিয়া দাশ ~

মৌপ্রিয়া জার্মানির ম্যাক্স প্লান্ক ইনস্টিটিউট ফর দ্য ফিসিক্স অফ কমপ্লেক্স সিস্টেমস-এ কর্মরত বিজ্ঞানী।

 
 
 
 
 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।