হিগ্স বোসনের গোপন জীবনযাপন

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
157 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

হিগ্স বোসন বা হিগ্স পার্টিকেল হল ‘হিগ্স ফিল্ড’-এর এক পরিবাহী বোসন কণা। আমাদের মহাবিশ্বের সেই আদিমকালের এক্কেবারে প্রথম দিকের মুহুর্ত থেকেই হিগস বোসনের অস্তিত্ব রয়েছে। এর দিকনির্দেশহীন ক্ষেত্রটি (Higgs field) সমস্ত স্পেস জুড়ে বর্তমান এবং ক্ষণস্থায়ী কণাসমূহকে আকৃষ্ট করে ধীরে ধীরে ভর প্রদান করে থাকে। হিগ্স ক্ষেত্র ব্যতীত কোনও স্থিতিশীল কাঠামো থাকতে পারত না; মহাবিশ্ব ঠান্ডা, অন্ধকার এবং নিষ্প্রাণ হয়ে থাকত।

হিগ্স ক্ষেত্র ব্যতীত কোনও স্থিতিশীল কাঠামো থাকতে পারত না; মহাবিশ্ব ঠান্ডা, অন্ধকার এবং নিষ্প্রাণ হয়ে থাকত।

এই ফিল্ড ও কণার নামকরণ হয়েছিল এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ পিটার হিগ্স-এর নামানুসারে, যিনি ১৯৬৪ সালে প্রথম এক মেকানিসম বা পদ্ধতির কথা বলেন, যা মৌলিক কণাগুলোতে (elementary particles) ভর উৎপত্তির জন্য সেই সময় এক পরীক্ষণযোগ্য অনুমান (hypothesis) ছিল। অবশ্য জনগণের কাছে হিগ্স কণার আরেকটা জনপ্রিয় নাম আছে— আজ্ঞে হ্যাঁ এই হল সেই ‘ঈশ্বর কণা’ বা God particle; এই নামটা আসলে এসেছে পদার্থবিদ লিওঁ লেডেরমান-এর লেখা “The God Particle: If the Universe Is the Answer, What Is the Question? (1993)” থেকে, যেখানে লেখক উল্লেখ করেছিলেন পদার্থের অভ্যন্তরীণ গঠন-কাঠামো বুঝতে কেন এই কণার আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালের ৪ঠা জুলাই সার্ন-এর অ্যাটলাস (ATLAS) ও সিএমএস (CMS) পরীক্ষায় প্রথম এক নতুন কণাকে পর্যবেক্ষণ করা যায়, যার ভর হিগ্স-এর সাথে প্রায় একই অঞ্চলে (~ 125 GeV) বর্তমান।

source: [1]

অনেক বিজ্ঞানীই আশা করছেন যে হিগ্স বোসন তাদেরকে এমন ঘটনাসমূহ বুঝতে সহায়তা করবে যেসব ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’ দ্বারা অনুমান করা যায়নি; স্ট্যান্ডার্ড মডেল— যা হল পদার্থবিজ্ঞানীদের সাব্যাটোমিক বিশ্বের এক অনন্য ফিল্ড-গাইড। যদিও স্ট্যান্ডার্ড মডেলটি সমস্ত জ্ঞাত/আবিষ্কৃত সাব্যাটোমিক কণার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার এক দুর্দান্ত সরঞ্জাম, তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে; যেমন— মহাকর্ষ (gravity), মহাবিশ্বের ত্বরণ প্রসারণ (accelerating expansion of the universe), অ্যান্টিম্যাটারের চেয়ে পদার্থ (matter)-এর অদ্ভুত প্রাচুর্য্য ইত্যাদি ব্যক্ত করতে এটি অক্ষম।

বিজ্ঞানীরা হিগ্স বোসনকে নতুন পদার্থবিজ্ঞান বা বিয়ন্ড স্ট্যান্ডার্ড মডেল ফিজিক্স (BSM Physics)-এর সন্ধানের জন্য একটি সরঞ্জাম হিসাবে ব্যবহার করতে চেষ্টা চালাচ্ছেন যা আমাদের গতানুগতিক কণাদের সঙ্গে ইন্টারেক্ট নাও করতে পারে।

বিশেষত, আশা করা যায় যে হিগ্স বোসন ‘ডার্ক ম্যাটার’-এর সাথে ইন্টারেক্ট করতে পারে, যদিও সাধারণ ম্যাটার বা পদার্থের তুলনায় চারগুন বেশি পরিমাণে বর্তমান এই ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে সরাসরি কোনো শক্তিশালী প্রমান এখনও পাওয়া যায়নি। অধিক পরিমাণে বর্তমান এই থিওরিটিক্যাল কণা মহাকর্ষীয় আকর্ষণ (gravitational attraction) দ্বারাই কেবল নিজেদের অস্তিত্বের কথা বলে। গ্যালাক্সিদের ঘূর্ণন গতির মধ্যে, গ্যালাক্সি-ক্লাস্টারগুলোর নড়াচড়াতে, দূরবর্তী আলোর বেন্ডিং-এর সময়ে ইত্যাদি কসমসের অনেক জায়গাতেই পদার্থবিজ্ঞানীরা এর ফুটপ্রিন্ট খুঁজে পেয়েছেন। যদিও ডার্ক ম্যাটার সর্বত্র উপস্থিত বলে বোঝা যায়, তবুও বিজ্ঞানীরা এখনও অবধি এমন কোনো সরঞ্জাম আবিষ্কার করে উঠতে পারেননি যা লাইট এবং ডার্ক সেক্টরদুটির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে পারে।

সমগ্র কসমস-এ যদি হিগ্স ফিল্ডই একমাত্র ভর প্রদানের মাধ্যম হয়, তাহলে ডার্ক ম্যাটার এক্ষেত্রে অবশ্যই ক্লায়েন্ট হওয়া উচিত। এর অর্থ দাঁড়ায়— হিগস ফিল্ডের মুখপাত্র হিগ্স বোসনের অবশ্যই ডার্ক ম্যাটারের সাথে কিছু সম্পর্ক থাকতে হবে!

Source: [2]

ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ ইয়াকোস্টা বলেছেন, “এমনটা হতেই পারে যে ডার্ক ম্যাটার হিগ্স বোসন তৈরিতে সাহায্য করেছে অথবা হিগ্স বোসন ক্ষয় প্রক্রিয়া দ্বারা (decay) ডার্ক ম্যাটার-এ রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে। কাগজে কলমে বা ব্যাপারটা ভাবতে হয়ত সহজ লাগতে পারে, তবে চ্যালেঞ্জটা হল প্রকৃতপক্ষে এর প্রমাণ খুঁজে পাওয়া, বিশেষ করে যখন সমীকরণের এতগুলি অংশ সম্পূর্ণ অজ্ঞাত!”

ডার্ক ম্যাটারের সাথে হিগস বোসন কিভাবে ফ্লার্ট করে চলেছে, তার প্রমাণ খুঁজে পেতে বিজ্ঞানীদের অবশ্যই কীভাবে অদৃশ্যকে দেখতে হয় তা শিখতে হবে। বিজ্ঞানীরা কখনও হিগ্স বোসনকে সরাসরি দেখেননি; প্রকৃতপক্ষে, ওনারা হিগ্স বোসন আবিষ্কার করেছিলেন পরোক্ষে কিছু পার্টিকেল বা কণার সন্ধান পেয়ে, যেগুলি আসলে হিগ্স বোসনের ক্ষয় হওয়ার সাথে সাথে তৈরি হয়। এখন তাঁরা নির্ভুলভাবে পরিমাপ করার চেষ্টা করছেন যে হিগ্স বোসন কত ঘন ঘন বিভিন্ন ধরণের কণায় রূপান্তরিত হয়, যে পরিমাপটা মোটেও সহজ না।

সার্ন ফেলো গবেষক উইল বাটিনগার বলেছেন, “আমরা আমাদের ডিটেক্টর দিয়ে যা দেখতে পাই তা একটা কোনো ক্ষয়ের (decay process) একদম শেষ ধাপ, যাকে আমরা final state বলে থাকি; অনেক ক্ষেত্রে, আমরা ওই ‘ফাইনাল স্টেট’ হিসেবে যে কণাগুলি দেখতে পাই হিগ্স তাদের প্যারেন্ট নয়, বরং গ্র্যান্ডপ্যারেন্ট।”

স্ট্যান্ডার্ড মডেল কেবলমাত্র হিগ্স বোসনের বিভিন্ন সম্ভাব্য ক্ষয়গুলির অনুমানই করে না, সঙ্গে এও বলে যে প্রতিটা ক্ষয় প্রক্রিয়া একে অপরের তুলনামূলক বিচারে কতটা অনুকূল। উদাহরণস্বরূপ, এটি প্রেডিক্ট করে যে, হিগ্স বোসনের প্রায় ৬০ শতাংশ এক জোড়া ‘বটম কোয়ার্ক’-এ রূপান্তরিত হয়, যেখানে সাধারণত কেবল ০.২ শতাংশ এক যুগল ফোটনে রূপান্তরিত হয়ে থাকে।

এখানে উল্লেখ করে রাখা ভালো, কোয়ার্ক হল একধরনের প্রাথমিক কণা এবং পদার্থের মৌলিক উপাদান, যা হ্যাড্রন নামক সাব্যাটমিক কণাদের গঠনের মুখ্য উপাদান। তবে, সাব্যাটমিক কণাদের ‘লেপ্টন’ নামক এক শ্রেণির কণাসমূহ (ইলেক্ট্রন, মিউওন, নিউট্রিনো ইত্যাদি) এই কোয়ার্কদের দ্বারা গঠিত নয়, তারা নিজেরাই এক-একটা মৌলিক কণা। ভর ও ক্ষয় পদ্ধতি (decay process) অনুযায়ী এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত কোয়ার্করা ছয় রকমের হয়ে থাকে যথা— আপ, ডাউন, টপ, বটম, চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ। আপ ও ডাউন হল সবচেয়ে হালকা ভরের কোয়ার্ক, অন্য ভারী কোয়ার্করা কম স্থিতিশীল (less stable) হওয়ার কারণে পার্টিকেল ডিকে/ক্ষয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত আপ এবং ডাউন কোয়ার্কে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। এই কোয়ার্কদের সঙ্গে কিন্তু আমাদের কারো কারো পরিচিত ডেয়ারি প্রোডাক্ট কোয়ার্ক য়োগার্ট-এর কোনো সম্পর্ক নেই!

যদি পরীক্ষামূলক ফলাফলগুলি এটা দেখায় যে— হিগ্স বোসনগুলি প্রায়শই কিছু নির্দিষ্ট কণায় প্রেডিকশনের চেয়ে কম-বেশি ক্ষয়ে যায়, তবে এর মানে দাঁড়াতে পারে যে কয়েকটি হিগ্স বোসন লুকিয়ে লুকিয়ে অজান্তেই ডার্ক ম্যাটারে রূপান্তরিত হচ্ছে। অবশ্যই, এই ধরণের নির্ভুল পরিমাপ বিজ্ঞানীদের বলে দিতে পারে না যে হিগ্সগুলো তার ক্ষয় পথের (decay path) অংশ হিসাবে ডার্ক ম্যাটারের রূপ নিচ্ছে; কেবলমাত্র এই অদ্ভুত আচরণকে নির্দেশ করে থাকে। হিগ্সগুলোকে এই ব্যাপারে হাতে-নাতে ধরার জন্য, বিজ্ঞানীদের ডার্ক ম্যাটাররের সাথে হিগ্সদের মেলামেশার অকাট্য প্রমাণ প্রয়োজন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে আমরা কীভাবে অদৃশ্য বস্তু দেখতে পাব? একটু ভাবলেই উত্তর মিলতে কষ্ট হয় না— অদৃশ্য বস্তুদের উপস্থিতি পরোক্ষে আমরা বুঝতে পারি তাদের প্রভাব দ্বারা, যা সব আমরা সহজেই দেখতে পাই! উদাহরণস্বরূপ, মানুষ বাতাস দেখতে পায় না, কিন্তু আমরা আমাদের জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এটা জানতে পারি যে, ঝোড়ো বাতাসের ভিত্তিতে গাছগুলো দুলছে কিনা। বিজ্ঞানীরা একইভাবে ডার্ক ম্যাটার কণার সন্ধান করতে পারেন।

আমরা জানি যে “For every action, there is an equal and opposite reaction” অর্থাৎ “প্রতিটি ক্রিয়ার এক সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে”। বাটিনগারের মতে— যদি আমরা দেখি যে কণারা কোনো একদিকে শুট করা হচ্ছে, তার অর্থ হল অন্য দিকে কিছু একটা থেকে অন্য অভিমুখে শুটগুলো করা হচ্ছে! যদি একটা হিগ্স বোসন ধরে নেওয়া যায় যে একটা দৃশ্যমান কণা ও এক ডার্ক ম্যাটার কণায় রূপান্তরিত হয়, তবে দৃশ্যমান কণাগুলোর একাকী ট্র্যাকগুলোর একটা করে বিজোড় এবং ব্যাখ্যাতীত ট্র্যাজেক্টরি থাকবে, যেটা ইশারা করে যে— সম্ভবত এক ডার্ক ম্যাটার কণা পালিয়ে যাচ্ছে আমাদের বোঝার আগেই।

কাজেই হিগ্স বোসন বিজ্ঞানীদের কাছে হল স্ট্যান্ডার্ড মডেলের অভ্যন্তরে এবং তার আওতার বাইরের অজ্ঞাত ও অচিহ্নিত অঞ্চলগুলোকে সন্ধান করার নতুন কৌশল। এলএইচসি-র নিরবিচ্ছিন্ন গবেষণা এবং এর ভবিষ্যতের আপগ্রেডগুলো বিজ্ঞানীদের এই একান্ত মিতভাষী কণার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে সক্ষম করবে।

তথ্যসূত্র:

https://www.symmetrymagazine.org/

https://home.cern/science/physics/higgs-boson

চিত্রসূত্র:

[1] https://slidetodoc.com/a-new-era-in-fundamental-physics-higgs-from/

[2] https://physics.aps.org/articles/v10/s119

————————————

~ কলমে এলেবেলের অতিথি দেবদীপ ঘোষাল ~

দেবদীপ সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে (হ্যাড্রন ফিজিক্স) পিএইচডি শেষ করে বর্তমানে ওখানেই সায়েন্টিফিক রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে কাজ করছেন।

 

 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।