ঋণাত্বক শক্তির সমুদ্র

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
170 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

মস্কো শহর, সালটা ১৯২৮। সোভিয়েত ইউনিয়ানের জন্মলগ্নের কথা। আগস্ট মাসের ৫ তারিখ থেকে শুরু হল ষষ্ঠ সোভিয়েত পদার্থবিদদের কংগ্রেস। সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা ছাড়া তাতে যোগ দিলেন বেশ কিছু ব্রিটিশ পদার্থবিদ। সেদিনকার লেনিনগ্রাদ স্টেট ইউনিভার্সিটিতেই শুরু হল অনুষ্ঠান। ইতিপূর্বে একজন ব্রিটিশ পদার্থবিদের নিজের পেপার পড়া হয়ে গেছে, এক রাশিয়ান বিজ্ঞানী তাঁকে ধরেছেন আলোচনার জন্যে। আমাদের ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আবার একটু মুখচোরা। এদিকে রাশিয়ান বাবুটি আবার একটু দিলখোলা অমায়িক গোছের— নাম ইগর টাম। এই ইগর ছিলেন রাশিয়ান পদার্থবিদ্যার একজন অন্যতম পথিকৃৎ। আলোচনা খানিকটা হয়েছে, এখন একটু পানাহারের পালা। ইগর হাতে এক পাত্র কম্পট তুলে নিয়েছেন; ব্রিটিশ বিজ্ঞানী চায়ের দিকে হাত বাড়াতেই শুরু হল জোরাজুরি।

 

    – আরে ধুর, কি চা খাচ্ছেন মশাই! কম্পট খেয়ে দেখুন। অসাধারণ জিনিস! নিন নিন।

 

    – এটা কি?

 

    – আরে যত সব ফল হয় তার নির্যাস। ফল জলে ফুটিয়ে বানায়। আরে গোটা মাদার রাশিয়া তো ঐ খেয়েই বেঁচে আছে। অন্য কেউ কিছু খায় নাকি?

 

    – তবে যে শুনি ভদকা?

 

    – সেটা তো আছে। সেসব রাতে হবে। এটাও দারুণ। ফলের রসের মত। নিন নিন। আর একটু বেরি ফেলে দিন। ব্যাস, দেখতে হবে না আর। হ্যাঁ, কথায় ফেরা যাক। তড়িতের ক্ষেত্রে আর তাপগতিবিদ্যায়, মানে ধরুন ধাতুর আপেক্ষিক তাপ, এই দুটোতে ইলেকট্রনের ব্যবহারের তো একটা বিস্তর ফারাক আছে। এতে আপনি আপনার থিওরি কিভাবে লাগাচ্ছেন, মানে তফাতটা…. আরে ইয়াকভ যে? এসো এসো। আলাপ করিয়ে দিই, এ হল ইয়াকভ। আমার সহকর্মী। রাশিয়ান বিজ্ঞানকে দাঁড় করাচ্ছেন এখন। আর, ইনি হলেন পল ডিরাক। ওনার পেপারটা নিয়েই আলোচনা করছি।

 

পল: হ্যালো।

 

ইয়াকভ: হ্যালো। হ্যাঁ, আপনার কাজটা দেখলাম, খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। আমি নিজেও ইলেকট্রনের ওপর আলোকের ক্রিয়া নিয়ে কাজ করছি। একটু আলোচনা করতে পারলে ভালো হয়।

 

ইগর: তোমার পেপারটা কখন পড়বে? ওনার ভালো লাগবে আশা করি।

 

ইয়াকভ: এর পরেই আমার পালা। কিন্তু, আমার তো সময় হয়নি ওটাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার। আপনি কি রাশিয়ান জানেন?

 

পল: না, শিখিনি।

 

হঠাৎ করে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ইওফ এসে হাজির।

 

    – মাফ করেবেন। ইয়াকভ, তোমাকে কমরেড লুনাচারস্কি একবার ডাকছেন, এখনি।

 

ইয়াকভ: ও। আসছি এখনি। (পলের উদ্দেশ্যে) নেতৃত্বের ডাক। যেতেই হচ্ছে। আমি চেষ্টা করব আমার পেপারটা অনুবাদ করে আপনাকে ডাকে পাঠাবার।

 

সেই অনুবাদও হয়নি, সেই চিঠিও আসেনি। অন্তত, আগামী দুবছর তা আসবে না।

 

ব্রিটিশ পদার্থবিদরা নিজেদের পেপার পড়লেন ইংরেজিতে আর রাশিয়ানরা পড়লেন রাশিয়ানে। ব্রিটিশ পদার্থবিদ এর কাজের কথা রাশিয়ানরা বুঝতে পারলেও, রাশিয়ানদের বোঝার ক্ষমতা ব্রিটিশদের খুব একটা হলো না।

 

 

এই কংগ্রেস আরও কয়েকদিন রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে ঘুরে ঘুরে চলল। মজাটা হলো, ব্রিটিশ পদার্থবিদরা নিজেদের পেপার পড়লেন ইংরেজিতে আর রাশিয়ানরা পড়লেন রাশিয়ানে। ব্রিটিশ পদার্থবিদ এর কাজের কথা রাশিয়ানরা বুঝতে পারলেও, রাশিয়ানদের বোঝার ক্ষমতা ব্রিটিশদের খুব একটা হলো না। তবে এখানেই শুরু হলো ইগর টাম আর পল ডিরাকের গভীর বন্ধুত্বের। অন্য জন হলেন ইয়াকভ ফ্রেঙ্কেল। এই ইয়াকভ ঠিক এর ২ বছর আগে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন পদার্থবিদ্যার। উনি দেখিয়েছেন যে কোন একটা কেলাসের ভেতরে হোল থাকে। হোল শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হতে পারে যেখানে ইলেকট্রন নেই বা কেলাসের শূন্যস্থান। কোন বাংলা প্রতিশব্দ তৈরি হয়েছে বলে জানি না, তবে ‘গর্ত’ শব্দটাই সঠিক প্রতিশব্দ হবে বলে মনে হয়। যখনি কোন একটা পরমাণু থেকে ইলেকট্রন লাফিয়ে পাশের পরমাণুতে চলে যায়, তখন সেখানে তৈরি হয় হোল বা গর্ত। এটাকে উদ্ভূত কণা হিসেবে ধরা যায়। এই যে আমরা বলে থাকি যে বিদ্যুৎ প্রবাহের সময় যেদিকে ইলেকট্রন প্রবাহিত হয় বিদ্যুৎ তার বিপরীতে প্রবাহিত হয়। এটাকে একটু অন্যভাবে বললেই বলা যায় ইলেকট্রন যখন প্রবাহিত হয়ে কেলাসের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় লাফিয়ে চলে যাচ্ছে, তখন মূলত এই হোল বা গর্ত ঠিক তার উল্টো দিকে যাচ্ছে। ইলেকট্রন ক থেকে খ -তে গেল, অর্থাৎ খ-তে আগে ইলেকট্রন ছিল না, হোল ছিল। এখন সেখানে ইলেকট্রন চলে এলো, গর্ত বুজে গেলো, কিন্তু ক খালি পড়ে রইল। অর্থাৎ গর্ত খ থেকে ক-তে এসে হাজির। ইলেকট্রন যেদিকে গেলো, গর্ত তার বিপরীতে গেলো। মানে, তড়িৎ প্রবাহ যেদিকে হয় এই গর্তের প্রবাহ ঠিক সেই দিকে। পদার্থবিজ্ঞানে এই ধারণা আজও ব্যবহৃত হয পরিবাহী অপরিবাহী অতিপরিবাহীর ক্ষেত্রে। এই কথাটা সেদিন ডিরাক জানলে হয়তো বিজ্ঞানের ইতিহাসটা একটু অন্যরকম হতে পারতো, তবে তাতে কিছু আটকাল না।

 

ডিরাক তখন যে কাজে মগ্ন সেটা হল কোয়ান্টাম বলবিদ্যা আর আপেক্ষিকতাবাদকে এক ছাতার তলায় আনা। এই চেষ্টায় উনি প্রথম না, এর আগেও অনেকেই চেষ্টা করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলেন ক্লেইন আর গরডন। একদম স্রোয়েডিঙার সমীকরণের ধাঁচে ওনারা বানিয়েছেন ক্লেইন-গরডন সমীকরণ। তাতে সব মোটামুটি ঠিকঠাক ছিল, বাধ সাধল শুধু একটা জায়গায়— সম্ভবনা, বা যাকে আমরা প্রবাবিলিটি বলি, তা ক্ষেত্রবিশেষে ঋণাত্বক হয়ে যেতে লাগল। সম্ভবনা এমন একটি জিনিস যা আর যাই হোক ঋণাত্বক হতে পারে না। তার কোন মানে থাকে না। সম্ভবনা সর্বদা ০ থেকে ১ এর মধ্যে হতে হবে। যে ঘটনা ঘটতে পারে না তার সম্ভবনা ০, যে ঘটনা অবশ্যই ঘটবে তার সম্ভবনা ১। আমি যদি বলি একটা কয়েন টস করলে হেড আসার সম্ভবনা -০.২, তাহলে তার কোন মানে নেই। এখানেই আটকে গেছিল ক্লেইন-গরডন সমীকরণ।

 

সম্ভবনা এমন একটি জিনিস যা আর যাই হোক ঋণাত্বক হতে পারে না।

 

 

ডিরাকের জিনিয়াস এখানেই ছিল যে উনি স্রোয়েডিঙার সমীকরণের থেকে একটু বেরিয়ে ভাবলেন, এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যেটা উপলব্ধি করলেন সেটা হল কোয়ান্টাম বলবিদ্যা আর আপেক্ষিকতাবাদকে মেলাতে গেলে ওয়েভফাঙ্কসনের দু’বার অবকল করার দরকার নেই, একবার করলেই যথেষ্ট। এই অংশটা সাধারণ পাঠকের না বুঝলেও চলবে। মূলকথা হল ডিরাক ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে একটি এমন নতুন আপেক্ষিক কোয়ান্টাম বলবিদ্যার উপস্থাপনা করলেন যাতে সম্ভবনা ঋণাত্বক হবার সম্ভাবনা আর রইল না।

 

কোয়ান্টাম বলবিদ্যা আর আপেক্ষিকতাবাদকে মেলাতে গেলে ওয়েভফাঙ্কসনের দু’বার অবকল করার দরকার নেই, একবার করলেই যথেষ্ট।

 

 

তবে একটা ঝামেলা রয়ে গেলো। সেটার মূলটা লুকিয়ে আছে আইন্সটাইনের কাজে। যেটাকে আমরা সবসময় E=mc2 বলে থাকি সেটা বাস্তবে হল E2=p2c2 +m2c4; একটি দ্বিঘাত সমীকরণ। আর একটি দ্বিঘাত সমীকরণের দুটি বীজ থাকতেই হবে। মানে, E2= p2c2 + m2c4। এই ঋণাত্বক বীজটা, বা ঋণাত্বক শক্তিটা, কোন একটা ভাবে কেটে পড়ার কথা, কিন্তু, ডিরাকের সমীকরণে তা কোন ভাবেই হল না— ঋণাত্বক বীজটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়াল, কোন ইলেকট্রনের অস্তিত্ব থাকলে তার ঋণাত্বক শক্তির ওয়েভফাঙ্কসন থাকতেই হবে।

 

এবার ধনাত্বক ও ঋণাত্বক শক্তিটা একবার ভালো করে দেখা যাক। যেহেতু p2c2 সর্বদা ধনাত্বক, তাই E হয় mc2-এর থেকে বড়, নয় –mc2-এর থেকে ছোট। অতএব, যা পেলাম তা হলো, ইলেকট্রনের শক্তিmc2-এর থেকে বেশি হতে পারে, বা –mc-এর কম (ছবি দেখুন), মাঝে 2mc2-এর ফাঁক। তারমানে কোন একটা ইলেকট্রন mc2-এর ওপরের জায়গা থেকে একটা ফোটন ত্যাগ করে, নিচের জায়গায়, মানে –mcএর নিচে, চলে আসতেই পারে। কিন্তু, তাহলে তার আরও অধঃপাতে যাওয়া কেউ আটকাতে পারে না। অর্থাৎ, সে ক্রমাগত আলোক বিকিরণ করতে করতে ঋণাত্বক থেকে ঋণাত্বকতর শক্তির দিকে চলতে থাকবে। কিন্তু, বাস্তবে তা তো দেখি না। পদার্থবিজ্ঞান একটি পরীক্ষা নির্ভর বিষয়, সেখানে থিওরি যতই জমকালো হোক না কেন, পরীক্ষার সাথে না মিললে তার দাম নেই।

ডিরাক কিন্তু এর সমাধান করলেন। উনি বললেন আসলে ঋণাত্বক শক্তি অংশটা সম্পূর্ণভাবে ইলেকট্রন দিয়ে ভর্তি হয়ে আছে। যেহেতু একটা শক্তিস্তরে একটার বেশি ইলেকট্রন থাকতে পারে না, তাই ধনাত্বক শক্তিওয়ালা কোন ইলেকট্রন চাইলেও শক্তি বিকিরণ করে ঋণাত্বক শক্তি অংশে নেমে আসতে পারে না। এই সম্পূর্ণভাবে পরিপূর্ণ ঋণাত্বক শক্তির অংশটাকে বলা হয় ডিরাকের ঋণাত্বক শক্তির সমুদ্র।

 

অন্যদিকে ধনাত্বক শক্তির অংশে কিন্তু অনেক ফাঁকা জায়গা— ঋণাত্বক শক্তির সমুদ্র থেকে চাইলেই একটা ইলেকট্রন খানিকটা আলোক শোষণ করে ওপরে উঠে আসতে পারে। আর সেটা ওপরে উঠে এলে সমুদ্রে যা পড়ে থাকে তা হল হোল বা গর্ত। মানে, ধনাত্বক অংশে আমরা দেখতে পেলাম একটা নতুন ইলেকট্রন, যার আধান -e আর শক্তি E। আর ঋণাত্বক অংশে দেখতে পেলাম -e আধান আর -E শক্তির অনুপস্থিতি। ইয়াকভ ঠিক এটাই কেলাসের ভেতর দেখেছিলেন। এই হোল বা গর্তই হলো ইলেকট্রনের প্রতিকণা। আমরা ইলেকট্রনের প্রতিকণা হিসেবে যে পজিট্রনের কথা জানি, তাও মূলত এই একই জিনিস, শুধু একটু অন্য ভাবে দেখা।

 

————————————

 

~ কলমে এলেবেলে প্রত্যয় ~

 

এলেবেলের দলবল

 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।