আমরা আসলে কি দিয়ে তৈরি? হ্যাড্রন কণার ভর-সংক্রান্ত এক অজানা সাসপেন্স (Suspense about the mass of Hadron particles)

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
700 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

 

 

সূচনা ও মোটিভেশন :

আমরা জানি যে কোনো পদার্থ পরমাণু বা atom দ্বারা গঠিত, এবং পরমাণুগুলি প্রোটন, নিউট্রন এবং ইলেক্ট্রন দ্বারা তৈরি। এই প্রোটন এবং নিউট্রনগুলিকে যদি আরও বিভাজন করা যায় তো দেখা যাবে ‘কোয়ার্ক’ (quark) হিসাবে পরিচিত ছোট ছোট কণা এদের মধ্যে বর্তমান। আরও ভিতরে আরও গভীর অবধি কি পৌঁছনো সম্ভব যেখানে কোয়ার্কদের থেকেও ক্ষুদ্র মৌলিক উপাদান খুঁজে পাওয়া যেতে পারে? এই মুহূর্তে বিজ্ঞানের কাছে এর উত্তর হল ‘না’ বা বলা ভাল অজানা! সুতরাং কোয়ার্ক হল এক ধরনের প্রাথমিক কণা এবং পদার্থের মৌলিক উপাদান।

এখন প্রশ্ন হল, ‘হ্যাড্রন’ কণারা আসলে কি? কেনই বা হঠাৎ তাদের নিয়ে কথা বলা?

সমগ্র মহাবিশ্বের যে কোনো সাধারণ পদার্থের বেশিরভাগেরই ভর কেবল দুটি হ্যাড্রন থেকে আসে: প্রোটন এবং নিউট্রন। তাই নাকি? আজ্ঞে হ্যাঁ! সুতরাং হ্যাড্রন বিষয়ক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রত্যহ পর্যবেক্ষণ করা পদার্থ বা জিনিসগুলোর একটা বড় অংশের প্রকৃতি বর্ণনা করতে সাহায্য করে।

কোয়ার্ক পরিচিতি :

পার্টিকেল ফিজিক্স বা কণা পদার্থবিজ্ঞানে, সাব্যাটমিক কণাদের একাধিক শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে, যার একটি হল, ‘হ্যাড্রন’ নামক যৌগিক কণাদের শ্রেণি। এরা দুই বা তিনটে মৌলিক কণা কোয়ার্কদ্বারা গঠিত। কোয়ার্কগুলো শক্তিশালী স্ট্রং নিউক্লিয়ার ফোর্সের সাহায্যে একে ওপরের সাথে মিলে হ্যাড্রনদের তৈরি করে, ঠিক যেমন ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সের মাধ্যমে (ভ্যান্ডারওয়াল ফোর্স) অণুগুলি একে অপরের সাথে জুড়ে থাকে। অবশ্য এখানে বলে রাখা ভালো যে, সাব্যাটমিক কণাদের ‘লেপ্টন’ নামক আরেক শ্রেণির কণাসমূহ (ইলেক্ট্রন, মিউওন, নিউট্রিনো ইত্যাদি) এই কোয়ার্কদের দ্বারা গঠিত নয়, তারা নিজেরাই একএকটা মৌলিক কণা। ভর ও ক্ষয় পদ্ধতি (decay process) অনুযায়ী এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত কোয়ার্করা ছয় রকমের হয়ে থাকে যথাআপ, ডাউন, টপ, বটম, চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ। আপ ও ডাউন হল সবচেয়ে হালকা ভরের কোয়ার্ক, অন্য ভারী কোয়ার্করা কম স্থিতিশীল (less stable) হওয়ার কারণে পার্টিকেল ডিকে/ক্ষয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত আপ এবং ডাউন কোয়ার্কে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। এই কোয়ার্কদের সঙ্গে কিন্তু আমাদের কারো কারো পরিচিত ডেয়ারি প্রোডাক্ট কোয়ার্কয়োগার্ট (Yogurt)-এর কোনো সম্পর্ক নেই!

স্ট্যান্ডার্ড মডেল ও ফান্ডামেন্টাল ফোর্স সমূহ :

সৌভাগ্যবশত সাব্যাটমিক কণাদের মধ্যেকার বিবিধ ইন্টারঅ্যাকশন ব্যাখ্যা করার জন্য এক মূল্যবান উপকরণ মজুত আছে। ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’, যা হল পদার্থবিজ্ঞানীদের সাব্যাটোমিক জগতের এক অনন্য ফিল্ডগাইড। যদিও স্ট্যান্ডার্ড মডেলটি সমস্ত জ্ঞাত/আবিষ্কৃত সাব্যাটোমিক কণার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার এক দুর্দান্ত সরঞ্জাম, তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে; যেমন এটি মহাকর্ষ (gravity), মহাবিশ্বের ত্বরণ প্রসারণ (accelerating expansion of the universe), অ্যান্টিমেটারের চেয়ে পদার্থ (matter)-এর অদ্ভুত প্রাচুর্য্য ইত্যাদি কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ব্যক্ত করতে অক্ষম। আর সেই সেই জায়গাগুলোকে নিয়ে আধুনিক যে সব গবেষণা বিশ্বব্যাপি চলছে, সেই ক্ষেত্র ‘বিএসএম ফিজিক্স’ বা Beyond Standard Model Physics নামে পরিচিত।

standard model [1]

আমাদের নেচারে চারটে প্রধান মৌলিক বল বা fundamental force রয়েছে, যথাস্ট্রং ফোর্স, উইক ফোর্স, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স ও গ্রাভিটেশনাল ফোর্স; যাদের মধ্যে স্ট্রং ফোর্স হল সবচেয়ে শক্তিশালী, কিন্তু খুব ক্ষুদ্র পরিসরে কর্মক্ষম, অন্যদিকে গ্রাভিটেশনাল ফোর্স হল এদের মধ্যে দুর্বলতম। ঠিক যেমন আমরা সবাই ফোটন কণার সঙ্গে কম বেশি পরিচিত, যা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সের বাহক বা carrier হিসেবে কাজ করে, তেমনই স্ট্রং ফোর্সেরও এক বাহক আছে, যা গ্লুওননাম অভিহিত। এর সম্পর্কে আরেকটু পরে আলোচনা করা যাক। এখন এই স্ট্রং নিউক্লিয়ার ফোর্স মহাবিশ্বের অধিকাংশ পদার্থের গঠন সংক্রান্ত কাঠামো নির্ধারণে দুটো খুব গুরুত্বপূর্ণ স্তরে কাজ করে থাকে

) খুব গভীরে দেখলে নিউক্লিয়ন (প্রোটন, নিউট্রন) ও অন্যান্য হ্যাড্রনদের কোয়ার্ক সহযোগে তৈরি করে।

এবং ২) আরেকটু ম্যাক্রোস্কোপিক স্কেলে সেই প্রোটন ও নিউট্রন নামক হ্যাড্রনদের নিয়ে পরমাণুর নিউক্লিয়াস গঠন করে।

 

 

constituent forces  [2]

মৌলিক সমস্যার উদ্রেক ও ‘মিসিং রেসোনেন্স’ :

কিন্তু সমস্যাটা ঠিক এই জায়গাতেই! কোনো যৌগিক/কম্পোসিট সিস্টেমের ভর যেমন তার বিল্ডিং ব্লক উপাদান সমূহের উপরই মূলত নির্ভর করে, হ্যাড্রনরা কিন্তু তার ব্যতিক্রম। এদের মোট ভরের খুব সামান্য অংশই এদের উপাদান কোয়ার্কগুলোর থেকে আসে। একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার করে সংখ্যায়িত করা যাকপ্রোটনের কথা যদি ধরা হয়, এরা তিনটে কোয়ার্ক দ্বারা সৃষ্ট (দুটো আপ ও একটা ডাউন কোয়ার্ক)। এই তিনটে কোয়ার্ক সমগ্র প্রোটন ভরের কেবলমাত্র ০..% কন্ট্রিবিউট করে থাকে। বাকি ৯৮%-এরও বেশি ভর আসে কোয়ার্কগুলোর মধ্যে কাজ করা স্ট্রং ইন্টারঅ্যাকশনের ডিনামিক্যাল এফেক্টএর কারণে। বলা ভালো একটা হ্যাড্রনের ভরের বেশিরভাগ অংশই আসলে গ্লুওনের শক্তি থেকে আসে যা হাড্রনদের ভিতরে কোয়ার্কগুলিকে একসাথে আবদ্ধ করে রাখে। ‘গ্লুওন’ হল কোয়ার্কের মতন আরেক প্রাথমিক কণা যা কোয়ার্কের মধ্যেকার স্ট্রং ফোর্সের এক বিনিময় কণা বা এক্সচেঞ্জ পার্টিকলহিসাবে কাজ করে। এই ব্যাপারটাকে অনেকটা আমাদের পরিচিত দুটো চার্জযুক্ত কণার মধ্যবর্তী ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সে ফোটন কণার বিনিময়ের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। সাধারণ ভাষায় বলতে গেলেগ্লুওনরা আদতে কোয়ার্কদেরকে একসাথে গ্লুকরে (Glue) বা জুড়ে প্রোটন এবং নিউট্রনের মত হ্যাড্রন গঠন করে থাকে।

এই সম্পর্কে আমরা কিছুটা অবশ্যই জানতে পেরেছি আইনস্টাইনের বিখ্যাত E= mc2 এনার্জিভর সমীকরণ থেকে, যেটা আমাদের বলে ভর হল আদতে শক্তির জন্য একটি গোপন স্টোরেজ ফেসিলিটি। কিন্তু এই ব্যাপারে আরো বিশদ ও গূঢ় জ্ঞান প্রয়োজন। ঠিক কীভাবে গ্লুওনের শক্তি হ্যাড্রনগুলির ভরেতে রূপান্তরিত হয়, সেই প্রশ্নের উত্তর পদার্থবিদরা এখনও বিশদে খোঁজার চেষ্টা করছেন।

তাই হ্যাড্রনদের ভর ও তাদের ক্ষয় বা ডিকে (decay) সম্পর্কে জানতে এদের এক্সসাইটেড স্টেট নিয়েও পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করা হয়, যেগুলোকে বিজ্ঞানের ভাষায় রেসোনেন্স‘/Resonance নাম দেওয়া হয়েছে। ‘হ্যাড্রন স্পেকট্রোস্কোপি’র ক্ষেত্রে এই স্টাডি করা হয়ে থাকে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে পার্টিকল ফিজিক্সএ রেসোন্যান্স হল উত্তেজিত ও খুবই স্বল্প স্থায়ী কোনো এক কণার এনার্জি বিষয়ক এক peak বা শিখর। অর্থাৎ এরা খুব কম মাত্রার ‘লাইফ টাইম’ওয়ালা কণাদেরকেই বুঝিয়ে থাকে। হ্যাড্রনদের এক্সসাইটেড স্টেটগুলোর লাইফটাইম এতটাই কম হয় যে, এদের বেশিরভাগই ১০-২২–১০-২৪ সেকেন্ডএর মধ্যেই গ্রাউন্ড স্টেটএ ফিরে আসে বিভিন্ন ডিকে পদ্ধতির দ্বারা। তাহলেই ভেবে দেখুন, বিজ্ঞানীদের কাছে কত কম সময় থাকে এদের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে!

কিন্তু জীবন অনেক সময় আরও জটিল হয়ে থাকে, না চাইতেও! এই ক্ষেত্রে যেমন এক দীর্ঘস্থায়ী সমস্যামিসিং রেসোনেন্স“(missing resonance)-এর উপস্থিতিবিষয়টাকে আরও জটিল করে দেয়। সেটা আবার কি? আসলে নেচারের বিভিন্ন কার্যলাপকে বুঝতে ও তাকে ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞানে থিওরিটিক্যাল মডেল তৈরি করা হয়ে থাকে গণিত ও স্ট্যাটিসটিক্সএর সাহায্য নিয়ে। সেগুলোকে যাচাই করা হয় পরীক্ষা নিরীক্ষার দ্বারা। যখন আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়না, তখন ধরা হয় থিওরিটিক্যাল মডেলগুলোতে খুঁত রয়েছে আর নয়ত পরীক্ষা করার সময় ‘এক্সপেরিমেন্টাল বায়াস’ বর্তমান। ঠিক এক্ষেত্রেও কয়েক দশক যাবৎ এরকম এক সমস্যার সম্মুখীন বিজ্ঞানীরা, যাকে ওই ‘মিসিং রেসোনেন্স’ নাম দেওয়া হয়েছে। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সএ স্পেকট্রোস্কোপি সংক্রান্ত থিওরিটিক্যাল মডেলগুলোর অনুমান ও বর্ণনার তুলনায় এখনো অবধি অনেক কম পরিমানেই এই রেসোনেন্স স্টেটগুলো পরীক্ষার (practical experimental facilities) দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা গেছে। এর দু’রকম কারণ হতে পারে হয় পরীক্ষাগুলোর খামতি বা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে, নাহলে মডেলগুলোর মধ্যেই ত্রুটি বর্তমান।

 

 

missing resonance problem; the yellow and the orange marks are only the experimentally verified ones [3].

অধিকতর পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টা :

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্টাল ফেসিলিটিগুলো (জার্মানি, জাপান, আমেরিকা, ফ্রান্স, সুইৎজারল্যান্ড, রাশিয়া, চীন, ইসরায়েল এবং অন্যান্য আরো কিছু দেশে) এই সমস্যা দূর করতে অনবরত পরীক্ষা করে চলেছে। কি করা হচ্ছে সেখানে? সাধারণতঃ এরকম ফিক্সড টার্গেটএক্সপেরিমেন্টাল সাইটগুলোতে পরীক্ষার জন্য তিনটে প্রধান অংশ থাকে: একটা কোনো টার্গেট নিউক্লিয়াস, অ্যাক্সিলারেটর সহযোগে উৎপন্ন একটা কোনো উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন শক্তিশালী বিম বা রশ্মি এবং ইন্টারঅ্যাকশন/সংঘর্ষস্থানের আশেপাশে ডেটা সংগ্রহ করার জন্য কিছু ডিটেক্টর। ফোটন বা কোনো ভারী আয়ন রশ্মির (beam) সাহায্যে বিভিন্ন নিউক্লিয়াস (হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, কার্বন, ডিউটেরিয়াম ইত্যাদি)-কে খুব দ্রুততার সাথে সমানে আঘাত করে তাদের রেসোনেন্স কাঠামো এবং ‘রিঅ্যাকশনক্রস সেকশন’ স্টাডি করা হচ্ছে অ্যানালিসিস কাজকর্মের দ্বারা। এভাবে অনেক সময়েই সেই লুকিয়ে থাকা বা খুঁজে না পাওয়া রেসোন্যান্সকে লক্ষ্যভেদ করা সম্ভব হচ্ছে। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, পদার্থবিদ্যায় ‘ক্রস সেকশন’ বলতে বোঝায় কোনো এক সাব্যাটমিক কণা/পার্টিকল বা অ্যাটমিক নিউক্লিয়াস তার ওপর এসে পড়া কোনো রশ্মি বা পার্টিকলএর সঙ্গে ইন্টারঅ্যাকশন এর ফলে কোনো বিশেষ প্রক্রিয়া বা রিঅ্যাকশন কতটা প্রদর্শন করবে তার সম্ভাবনা বা probability। আশা করা যায়, আগামী কিছু বছরে এইভাবে আমরা হ্যাড্রনের এই ভরবিষয়ক সাসপেন্সটা ও একই সঙ্গে মিসিং রেসোনেন্সসমস্যা দুটোর ওপর আরও বেশি আলোকপাত করতে পারব।

schematic of A2 fixed target experimental setup in Mainz, Germany [4]

তথ্যসূত্র:

[1] https://cds.cern.ch/record/2315477 

[2] https://en.wikipedia.org/wiki/Fundamental_interaction 

[3] https://www1.cb.uni-bonn.de/index.php?id=3&L=1 

[4] Susanna Costanza, EPJ Web Conf., 164, 07034 (2017). (DOI: 10.1051/epjconf/201716407034) 

[5] https://www.symmetrymagazine.org/article/hundreds-of-hadrons 

————————————

~ কলমে এলেবেলের অতিথি দেবদীপ ঘোষাল ~

দেবদীপ সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে (হ্যাড্রন ফিজিক্স) পিএইচডি শেষ করে বর্তমানে ওখানেই সায়েন্টিফিক রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে কাজ করছেন।

 
► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 
 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।