সেটি হবেনি?!

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
342 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

 

 

এই বিরাট মহাবিশ্বে আমরা কি একা? একমেবাদ্বিতীয়ম? মানে, একমাত্র পৃথিবীতেই প্রাণ আছে? পৃথিবীর বাইরে কি কোথাও কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই? নাকি আছে? যদি আছে তাহলে আমরা তাদের খোঁজ পাইনি কেন?
 
এমন প্রশ্ন অনেককেই ভাবায়— এখনও ভাবায়, আগেও ভাবিয়েছে। এবং একটু ভাবলেই বোঝা যায় যে এমন একটা বিপুলায়তন মহাবিশ্বে, কোটি কোটি গ্রহ, উপগ্রহের (তারাটা বেশি গরম বলে বাদ দিলাম) মধ্যে আর কোথাও প্রাণ থাকবে না এটা প্রায় অসম্ভব। কাছাকাছির মধ্যে যা গ্রহ উপগ্রহ আছে সেখানে মোটামুটি আমাদের খোঁজ খবর করা হয়ে গেছে। প্রাণ হয়তো থাকলেও থাকতে পারে, তবে মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীর খোঁজ মেলেনি। একটু বুদ্ধিমান প্রাণী হলেই ভালো, তাতে খোশগল্প করা যায় – রাজনীতি, ফুটবল, এইসব। তবে চেষ্টা অনেক হয়েছে। এখনও ধারেকাছে কোনো গ্রহে জল পেলে আমরা একটু উঁচিয়ে দেখি সেখানে কেউ আছে কিনা। 

 

একটা বিপুলায়তন মহাবিশ্বে, কোটি কোটি গ্রহ, উপগ্রহের মধ্যে আর কোথাও প্রাণ থাকবে না এটা প্রায় অসম্ভব।

 

এখন সোজা কথা হল যদি আমরা বুদ্ধিমান কোনো ভিনগ্রহীর সাথে যোগাযোগ করতে চাই তাহলে করব কিভাবে? প্রথমত আমাদের যা লাগবে তা হল একটা শক্তিশালী রেডিও ট্রান্সমিটার যা তড়িৎচুম্বকীয় সঙ্কেত প্রেরক, যার মাধ্যমে আমরা মহাবিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সঙ্কেত পাঠাতে পারি। আর একটা আশা রাখতে পারি যে কেউ না কেউ সেই সঙ্কেত পাবে আর তারাও সেটা দেখে যারপর নাই খুশি হয়ে উত্তর দেবে। কারণ আমরা ধরে নিচ্ছি তারাও যদি বুদ্ধিমান হয়, তারাও নিশ্চয়ই খোশগল্প করার লোক খুঁজছে। 
 
যদিও এটাও প্রশ্ন যে কি বার্তা পাঠাবো? কোন ভাষায় পাঠাবো? কি এমন পাঠালে ওরা বুঝতে পারবে আমরা যোগাযোগ করতে চাইছি। সেটারও খুব যুক্তি সঙ্গত উত্তর আছে। সেটা ফেসবুকে দিলাম।
 
তো এমন যে পরীক্ষাগুলো চালানো হয়, যেখানে আমরা ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীর খোঁজ করি, তাকেই বলে ‘সেটি’ (SETI – Search for extraterrestrial intelligence)। একদম প্রথম দিকের এমনই একটি পরীক্ষার নাম প্রজেক্ট অস্মা (ozma)। যাঁরা The Wonderful Wizard of Oz পড়েছেন তাঁরা জানবেন যে মায়াবী Oz দেশের রাজকন্যার নাম Ozma, তাঁর নামেই প্রজেক্ট। এখানেই কাজ শুরু করলেন ফ্রাঙ্ক ড্রেক, ১৯৬০ সালে। এই কাজে কার্ল সাগানও যুক্ত ছিলেন। বড়সড় একটি রেডিও এন্টেনা নিয়ে তাঁরা তাক করে বসলেন কাছাকাছির কিছু নক্ষত্রের দিকে। সঙ্কেত পাঠালেন দমতক, আর বলাই বাহুল্য উত্তর এলো না। ঐ ক্রাশকে মেসেজ করলে যেমন অবস্থা হয় ঠিক তেমন। মেসেজ যায়, উত্তর আসে না।         

 

‘সেটি’ (SETI – Search for extraterrestrial intelligence)

 

এক বছর পর ড্রেক একটা সমীকরণ নামালেন, সেই সমীকরণেই ব্যখ্যা পাওয়া যায় কেন উনি সফল হননি, বা কেন আর কেউ কোনদিন সফল হয়নি। এই সমীকরণের নাম ড্রেক সমীকরণ, একদম আকাশ থেকে পাড়া একটা সমীকরণ; অথচ বিজ্ঞানের জগতের একটা অন্যতম সেরা সমীকরণ। নিচের ছবিতে সেটাই দিলাম:
 
 
এবার এক এক করে সবকটা খুলে লিখবো (গাণিতিক সঙ্কেতের বদলে ছবির ব্যবহার করলাম)। 
 

 

আমাদের ছায়াপথে এমন কটা ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণী আছে যাদের সাথে আমরা যোগাযোগ করতে পারি? এই সংখ্যাটা যদি বেশি হয় তবেই আমাদের সাফল্যের সম্ভবনা বেশি। কিন্তু, সেই সংখ্যাটা কত? সেটার মোটামুটি একটা আন্দাজ পেতে আমাদের বুঝতে হবে এই সংখ্যাটা কিসের কিসের ওপর নির্ভরশীল, সেগুলোই রয়েছে সমীকরণের ডান দিকে।

 

সেটার মোটামুটি একটা আন্দাজ পেতে আমাদের বুঝতে হবে এই সংখ্যাটা

 

 

প্রথম, আমাদের ছায়াপথে প্রতিবছর গড়ে কটা করে নক্ষত্র উৎপন্ন হয়। ড্রেকের মতে একটি।

 

 

দ্বিতীয়, একটা নক্ষত্রের গ্রহ থাকার সম্ভবনা কত। কারণ, নক্ষত্রে আমাদের কাম নাই। আমাদের দরকার গ্রহ। ড্রেক বললেন ০.২ থেকে ০.৫ মতো। 

 

তৃতীয়, কেবল গ্রহ হলে হবে না, সেখানে প্রাণ থাকার মতো পরিবেশ চাই। অতএব, এটা জানতে হবে যে এমন নক্ষত্র যার গ্রহ আছে, সেখানে এমন কটা গ্রহ থাকতে পারে যেখানে উপযুক্ত পরিবেশ আছে। ড্রেক বললেন এটা ১ থেকে ৫ এর ভেতর। আমাদের সৌরমণ্ডলেও প্রায় ২–৩টে জায়গা পাওয়া যাবে যেখানে প্রাণ থাকলেও থাকতে পারে।

 

 

এতক্ষণ প্রাণ থাকার সম্ভবনাকে দাঁড় করানো হল, এবার জানতে হবে সত্যি সত্যি প্রাণ থাকার সম্ভবনা কত। ড্রেক একটু বেশি আশাবাদী হয়ে বললেন যে গ্রহে প্রাণ থাকার মতো পরিবেশ আছে, ধরে নিলাম সেখানে প্রাণ আছেই আছে।

 

কেবল প্রাণ থাকলে তো হবে না, তাকে বুদ্ধিমানও হতে হবে।

 

 

 

পঞ্চম, কেবল প্রাণ থাকলে তো হবে না, তাকে বুদ্ধিমানও হতে হবে। অ্যামিবার সাথে তো রেডিও ট্রান্সমিটার দিয়ে কথা বলা যায় না। ড্রেক কিন্তু আশাবাদী; বললেন ধরেই নিলাম প্রাণ থাকলেই তা বুদ্ধিমান।

  

 

কিন্তু, কেবল বুদ্ধিমান হলে তো হবে না, তাদের রীতিমত তড়িৎচুম্বকীয় সঙ্কেত গ্রহণ ও প্রেরণ সঙ্ক্রান্ত প্রযুক্তি থাকতে হবে। সে সম্ভবনা কত? ১০ থেকে ২০ শতাংশ বলে অনুমান।

 

 

আর একদম শেষ যেটা সেটা হল, এমন একটা সভ্যতা যদি থেকেই থাকে তাহলে তারা কত সময় ধরে নিজেরা সঙ্কেত পাঠাবে যাতে আমরা সেই সঙ্কেত গ্রহণ করতে পারি। যেহেতু বুদ্ধিমান ভিনগ্রহী তাই ধরেই নিলাম যে বেশ অনেকক্ষণ ধরেই পাঠাবে; প্রায় ১০০০ থেকে ১০০০০০০০০০ বছর ধরে।

 

সব বসিয়ে ড্রেক পেলেন ২০।

 

সব বসিয়ে ড্রেক N-এর মান পেলেন কম করে ২০। আর বেশি করে ধরলে তো অনেক অনেক। মানে, অন্তত ২০টা গ্রহ নিশ্চয়ই আছে যেখানে এমন বুদ্ধিমান লোক আছে যাদের সাথে যোগাযোগ করা যায়। এই ঘটনাটা ঘটছে আজ থেকে ঠিক ৬০ বছর আছে। একটা কনফারেন্সে ড্রেক তাঁর সমীকরণ এবং অনুমান দেখাচ্ছেন, আর মিটিং-এর বেবাক লোকে খুব খুশি।

 

অতএব, ‘সেটি’ হবেনি বললে হবেনি।

 

যদিও ড্রেকের আশা আজও পূরণ হল না। সেটা খুব স্বাভাবিক। পাঠক ওপরের সমীকরণ খুঁটিয়ে দেখলেই দেখবেন যে তার বেশিরভাগ সংখ্যার অনুমানই ভিত্তিহীন। যেমন ধরুন এর কি নিশ্চয়তা আছে যে একটা ভিনগ্রহের সভ্যতাই ১০০০০০০০০০ বচ্ছর টিকবে আর প্রতিনিয়ত ঐ সঙ্কেত পাঠিয়ে যাবে। বা একটা প্রজাতি বুদ্ধিমান হলে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান থাকার সম্ভবনা ০.১ থেকে ০.২— এগুলো তো নিছকই অনুমান।  কার্ল সাগানও ড্রেকের এই অনুমানগুলোকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। এছাড়াও এই সমীকরণে আপত্তিকর আরও বেশ কিছু জায়গা আছে। তারপরেও এই সমীকরণ ফেলে দেওয়া হয়নি। কারণ, সংখ্যাগুলো ঠিক না হলেও যে পদ্ধতিতে গণনার কথা বলা হয়েছে সেটা ঠিক— অবশ্যই পরবর্তীকালে বেশ কিছু সংযোজন, সংশোধন এবং সংবরদ্ধন করা হয়েছে। এই হিসেব একাধিক বার করা হয়েছে বিভিন্ন অনুমানের ভিত্তিতে, বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে। সবথেকে কম যা N পাওয়া গেছে তা হল ৯.১×১০১৩, অর্থাৎ খোশগল্পের গুড়ে বালি। আর বেশি করে হলে ১৫৬০০০০০, অর্থাৎ বেশ একটা সম্ভবনা রয়েই গেলো। অতএব, ‘সেটি’ হবেনি বললে হবেনি। ‘সেটি’ সফল হতেই পারে।    
 
————————————
~ কলমে এলেবেলে প্রত্যয় ~ 
 

এলেবেলের দলবল

 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

2 thoughts on “সেটি হবেনি?!

  • July 18, 2021 at 6:33 pm
    Permalink

    বেশ লাগলো পড়তে।চেষ্টা চলুক।থেমে গেলে চলবে কেন।ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান।

  • July 18, 2021 at 6:33 pm
    Permalink

    বেশ লাগলো পড়তে।চেষ্টা চলুক।থেমে গেলে চলবে কেন।ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান।

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।