জোয়ার তরঙ্গ শক্তি (অন্তিম পর্ব)

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
797 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

প্রথম পর্বের পর…….

এতক্ষণ ধরে এক নাগাড়ে কথা বলে স্বাভাবিক ভাবে খুড়োও খানিকটা ক্লান্ত। চায়ের কাপে দীর্ঘ চুমুক দিয়ে আপন মনে ভাবছেন কিছু। তাই অন্যরাও তাঁর চিন্তার ব্যাঘাত ঘটালো না। চা ওমলেট শেষ করে খানিকটা শক্তি সঞ্চয় করে আবার শুরু করলেন “তিনটি বিভিন্ন ধরণের জোয়ার শক্তি প্রকল্প নিয়ে কাজ হচ্ছে বর্তমানে; প্রথমটি হল জোয়ার প্রবাহ, দ্বিতীয়টি ব্যারেজ এবং তৃতীয়টি জোয়ার লেগুন। এই সবেতেই জোয়ার শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করতে তরঙ্গ শক্তি জেনারেটর ব্যবহার করা হয় যা বাড়ীর এবং শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। মোটামুটি হিসেব করে দেখা গেছে যে সারা পৃথিবীতে ব্যবহারযোগ্য জোয়ার তরঙ্গ শক্তির পরিমান আনুমানিক ৬৪,০০০ মেগাওয়াট।

 

 

বেশিরভাগ জোয়ার শক্তি উৎপাদক টারবাইনগুলি জোয়ার প্রবাহে স্থাপন করা হয়। সাগরের ক্রমবর্ধমান ও অপসৃয়মান তরঙ্গরাশি যেখানে বেশি সক্রিয় সেই সব অঞ্চলে জলের নিচে টারবাইনগুলি স্থাপন করা হয়। টারবাইনগুলির ব্লেডের উপরে জলের সৃষ্ট চাপে সেগুলি ঘুরতে থাকে এবং সংযুক্ত জেনারেটরের সাহায্যে বিদ্যুৎশক্তি উৎপন্ন হয়। জোয়ারের স্রোতে টারবাইন স্থাপন করা প্রাথমিক ভাবে কঠিন হতে পারে কারণ যন্ত্রটি জোয়ারকে বাধা দেবার চেষ্টা করবে। যাই হোক সব দিক বিবেচনা করে একবার টারবাইনগুলি যথাস্থানে বসাবার পর জোয়ার শক্তি থেকে লব্ধ যান্ত্রিক শক্তি জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। টারবাইনগুলি অগভীর জলে সবচেয়ে কার্যকর এবং বেশি শক্তি উৎপাদন করতে সক্ষম, এবং জাহাজগুলিও টারবাইনগুলির চারপাশে সহজে চলাচল করতে পারে। জোয়ারে জেনারেটরের টারবাইন ব্লেডগুলিও ধীরে ধীরে ঘোরে যা সামুদ্রিক জীবনকে বাধাপ্রাপ্ত করেনা। পৃথিবীর প্রথম জোয়ার প্রবাহে শক্তি প্রকল্প স্থাপিত হয়েছিল ২০০৭ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডে।

 

 

দ্বিতীয় মেশিনটি ভাসমান বয়ার সঙ্গে যুক্ত পারমানেন্ট ম্যাগনেট বা স্থায়ী চুম্বক নির্ভর সরাসরি বৈদ্যুতিক ড্রাইভ যা একটি লিনিয়ার বা রৈখিক জেনারেটর। এর চলমান অংশে মেকানিকাল বা যান্ত্রিক শক্তিকে সংযুক্ত করে সরাসরি তরঙ্গ শক্তিকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে। অনেক সময় অনিয়মিত তরঙ্গ গতির কারনে জেনারেটর স্টেটর এবং চলমান ট্রান্সলেটর-এর মধ্যে আকর্ষণীয় শক্তির তারতম্যের সৃষ্টি হয়। তার ফলে উৎপাদিত অসম ভোল্টেজের কারণে বিদ্যুৎ গ্রিডের সাথে সংযোগ ব্যবস্থাকে জটিল এবং ব্যয়বহুল করে তোলে। এছাড়া যেখানে তরঙ্গ শক্তি উৎপাদনের পরিস্থিতি সবচেয়ে অনুকূল, সেই অঞ্চলে বিদ্যুৎ গ্রিডের সংযোগ পয়েন্টগুলি নাও থাকতে পারে। তখন সেখান থেকে বহুদূর পর্যন্ত সাবমেরিন কেবল সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে হবে; যা খুবই ব্যয় সাপেক্ষ। অপরপক্ষে যেসব দেশে উপকূলবর্তী অঞ্চলের কাছাকাছি সাবস্টেশন আছে, সেখানে তরঙ্গ শক্তির মাধ্যমে উৎপন্ন বিদ্যুৎ গ্রিডগুলিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করতে পারে। তবে এর প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং বিকাশের জন্য প্রাথমিক ব্যয় অত্যন্ত বেশি। সেইজন্য এটা এখনো গবেষণামূলক পরীক্ষা নিরীক্ষার স্তরেই রয়ে গেছে। প্রতিযোগিতামূলক দামে তরঙ্গ শক্তি উৎপাদন করতে হলে বেশ কয়েকটি বাধা অতিক্রম করতে হবে। উচ্চ মানের উপকরণ দিয়ে তৈরি দৃঢ় নির্মাণের প্রয়োজন, যা তীব্র ঝড়ের কবলে অক্ষত থাকবে এবং সামুদ্রিক আবহাওয়া জনিত ক্ষয় ও সমুদ্রের সকল রকম অত্যাচার সহ্য করে যা টিকে থাকবে। এর সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। তবে এর অবস্থান জনিত কারণে এই রক্ষণাবেক্ষণ খুবই সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।

 

আরেকটি জোয়ার শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থায় এক ধরণের বাঁধ ব্যবহার করা হয় যার নাম ব্যারেজ; যা হ’ল একটি নিচু বাঁধ যেখানে বাঁধের উপর দিয়ে জল প্রবাহিত হয়ে যায়। এই ব্যারেজ জলোচ্ছ্বাস-প্রবণ নদীর মোহনা জুড়ে নির্মিত হতে পারে। জোয়ারের জল যখন বাড়তে থাকে তখন বাঁধের গেট খুলে দেওয়া হয়। উচ্চ জোয়ারের সময় বাঁধের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। যার ফলে বাঁধের অভ্যন্তরে একটি জলাধার বা লেগুনের সৃষ্টি হয়। পরে এই জোয়ারের জলকে বাঁধের অভ্যন্তরে অবস্থিত টারবাইনগুলির মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে ছেড়ে দেওয়া হয় যাতে প্রয়োজন মত বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে কাজে লাগানো যায়। পরিবেশের উপর ব্যারেজের প্রভাব বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যারেজের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলের জমি পুরোপুরি প্লাবিত হয়ে গাছপালা এবং প্রাণীজগতের ক্ষতি করতে পারে। ব্যারেজের অভ্যন্তরের জলের লবণাক্তভাব হ্রাস পায়, যার ফলে সেখানে বাসযোগ্য প্রাণীদের শ্রেণীগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। নদী বরাবর বাঁধের নির্মাণের ফলে ভেতর থেকে বাইরে বা বাইরে থেকে ভেতরে মাছের চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়। টার্বাইনের ঘূর্ণনের ফলে ব্যারেজের মধ্যে চলাচলকারী সামুদ্রিক প্রাণীগুলি টার্বাইনের ব্লেডগুলিতে আটকে যেতে পারে। তাদের খাদ্য সীমাবদ্ধ হয়ে যাবার কারণে পাখিগুলি বেঁচে থাকার জন্য অন্য স্থানে যেতে বাধ্য হতে পারে।

একক টারবাইনগুলির চেয়ে ব্যারেজের ডিজাইন অনেক জটিল হয় এবং এটা অনেক বেশি ব্যয়বহুল বিকল্প। যদিও কোনও জ্বালানী ব্যয় নেই, কিন্তু ব্যারেজগুলির জন্য অনেক নির্মাণ সামগ্রী এবং মেশিন ইত্যাদির প্রয়োজন হবে। একক টারবাইনগুলির তুলনায় ব্যারেজগুলি থেকে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন পাবার জন্য সবসময় তদারকিও প্রয়োজন। ফ্রান্সের ব্রিটানির লা রান্স নদী মোহনায় জোয়ার তরঙ্গ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটি ব্যারেজ সর্বপ্রথম নির্মিত হয়েছিল ১৯৬৬ সালে এবং এখনও এটি চলছে এবং বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এই প্ল্যান্টটির বিশেষত্ব এই যে, এখানে শক্তির দুটি  উৎসই ব্যবহার করা হয়— ইংলিশ চ্যানেল থেকে জোয়ার শক্তি এবং রান্স নদী থেকে তরঙ্গ শক্তি।  সর্বোচ্চ ২৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতাযুক্ত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে ২৪ টি টারবাইন দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে গড়ে ৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার সিহওয়া লেক টাইডাল পাওয়ার স্টেশনটি সর্ববৃহৎ এবং তার সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা ২৫৪ মেগাওয়াট।”

অর্ণব এবারে জিজ্ঞেস করল “আচ্ছা খুড়ো এই দুটোর মাঝামাঝি কোনও অর্থ সাশ্রয়কারী বিকল্প হয় না?” খুড়ো ওর মুখের কথাটা কেড়ে নিয়ে বললেন “নিশ্চয়ই হয়। জোয়ারের শক্তি উৎপাদনের তৃতীয় বিকল্প হ’ল জোয়ার জলের একটি অগভীর লবনাক্ত হ্রদ বা লেগুন যা ব্যারেজের মত কাজ করে, কিন্তু সাধারণত পাথরের মত প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি হয়। এই জলোচ্ছ্বাস বা জোয়ার জলের লেগুনগুলি উপকূল বরাবর তৈরি হতে পারে, তবে ব্যারেজের মত তা বন্য জীব বা প্রাণীর চলাফেরায় কোনও বাধা সৃষ্টি করেনা। উচ্চ জোয়ারে এই লেগুনগুলি প্লাবিত হয়ে যায়। ক্রমাগত লেগুনটি পূরণ এবং টারবাইনগুলির মধ্য দিয়ে খালি হওয়ায় ফলে এই জোয়ার শক্তি নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যতক্ষণ জল থাকবে ততক্ষণ শক্তি উৎপাদন করতে পারে। তবে ব্যারেজগুলির তুলনায় এই শ্রেণীর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা অনেক কম এবং নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে শক্তি উৎপাদন নির্ভর এই লেগুনের ধারন ক্ষমতার উপর। দুটি জোয়ারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় সাড়ে বারো ঘণ্টা হওয়ায় জলের পরিমান যথেষ্ট না থাকলে টারবাইন নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চালানো যাবে না। তোদের মনে আছে নিশ্চয় আমরা ‘বিদ্যুৎ বাঁচিয়ে পরিবেশ বাঁচাও’  প্রসঙ্গে যখন আলোচনা করেছিলাম তখন পাম্প স্টোরেজ ব্যবস্থা সম্বন্ধে বলেছিলাম যে বিদ্যুতের চাহিদা যখন কম থাকে তখন সস্তায় বিদ্যুৎ কিনে টারবাইনকে পাম্প হিসেবে চালিয়ে ব্যারেজ পূর্ণ করে রাখা যায়। এখানেও সেই ভাবে জল পাম্প করে লেগুনের ভেতরে ফেলে যখন বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকবে সেই জল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। পরিবেশের উপর এই শ্রেণীর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের প্রভাব খুবই নগন্য। নিম্ন জোয়ারে অল্প জলের কারণে এটি সমুদ্রের প্রাচীর হিসাবে কাজ করে এবং উচ্চ জোয়ারে পুরোপুরি নিমজ্জিত হয়ে যায়। ছোট প্রাণীরা এর অভ্যন্তরে সাঁতার কাটতে পারে। তবে হাঙ্গরগুলির মতো বড় শিকারী প্রাণী লেগুনে প্রবেশ করতে পারে না তাই ছোট মাছগুলি অনায়াসে এখানে বিচরণ করতে পারে। খাদ্যের অভাবে পাখিদের অন্য এলাকায় যেতে হবে না।

জোয়ারগুলি (নিম্ন বা উচ্চ) নির্দিষ্ট চক্র অনুযায়ী এবং সময়ের ব্যবধানে ঘটে থাকে তাই তাদের উপস্থিতি সম্পর্কে আগাম পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব এবং সেই অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করাটাও অনেক সহজ হয়। জোয়ার শক্তির আর একটি সুবিধা হ’ল এটি অন্যান্য বিকল্প শক্তির উৎসগুলির চেয়ে বেশি কার্যকর। যেহেতু জল বাতাসের চেয়ে অনেক ঘন, সেই কারণে খুব কম গতির জলপ্রবাহও প্রয়োজনীয় বিদ্যুত উৎপাদন করতে সক্ষম। হিসেব করে দেখা গেছে যে এমনকি প্রতি সেকেন্ডে এক মিটার গতির জলপ্রবাহেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সাধারণত, তীরবর্তী অঞ্চলে প্রতি মিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের শক্তি ঘনত্ব প্রায় চল্লিশ কিলোওয়াট এবং সমুদ্রের গভীরে গেলে একই দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ প্রায় একশো কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। মহাসাগর জোয়ার শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রগুলি সমুদ্রের গভীরে এবং তীর থেকে  দূরে নির্মিত করা যেতে পারে। তাতে সুবিধে এই যে সমুদ্র সৈকতের আকর্ষণে যে ভ্রমণপিপাসুরা আসেন তাদের কোন বাধা সৃষ্টি হবেনা। দ্বিতীয়তঃ উৎপাদন কেন্দ্রটি  যখন সমুদ্রের আরও গভীরে স্থাপন করা হবে, তখন তীরবর্তী অবস্থানের তুলনায় তা থেকে অনেক বেশি বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এই শক্তির একটা বড় সুবিধা হ’ল যে এটি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় এবং সহজেই উপলব্ধ। বিশ্বের অনেক বড় বড় শহর এবং সমুদ্র বন্দর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে দক্ষতার সাথে এই জোয়ারের শক্তিকে কাজে লাগানো যাবে।  

জোয়ার শক্তি নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনা ও পরিচালনা করার প্রাথমিক ব্যয় খুব বেশি। এর ফলে জোয়ার শক্তি এই মুহূর্তে তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল বিকল্প। যদিও এটা প্রত্যাশিত যে সময়ের সাথে উল্লেখযোগ্যভাবে এই ব্যয় হ্রাস পাবে। জোয়ার শক্তির বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বিকাশ এবং গ্রহণযোগ্যতা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এই কারণে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সঠিক ব্যয় অনুমান করাও বেশ শক্ত। এর ব্যয় কার্যকারিতা নির্ণয় করার প্রধান উপাদানগুলি হচ্ছে ব্যারেজের দৈর্ঘ্য ও উচ্চতা, টাইডাল রেঞ্জ বা জোয়ার পরিসীমা ইত্যাদি। এর উপর নির্ভর করে Gibrat Ratio নির্ণয় করা হয় যা হচ্ছে ব্যারাজের লম্বা (meter) এবং বার্ষিক উৎপন্ন বৈদ্যুতিক শক্তির পরিমানের (kilowatt hour) অনুপাত। এই সংখ্যা যত কম হবে সেই স্থান বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ততটাই সুবিধাজনক। ফ্রান্সের লা রান্স ব্যারেজের জন্য এই সংখ্যার মান ০.৩৬। এই উৎপাদন কেন্দ্রটি মোটামুটি সাফল্যের সঙ্গে চলছে। জোয়ার শক্তি পরিবেশবান্ধব হলেও তীরের কাছাকাছি অবস্থিত পর্যটন এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের গ্রহণযোগ্যতার সাথে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে। উপকূলরেখা বরাবর নির্মাণের কারণে এর অবস্থান সম্পর্কিত অনেক বিধিনিষেধকে মান্যতা দিতে হবে যার ফলে নির্মাণকালীন অনেক বাধার সম্মুখীন হবার সম্ভাবনা আছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ করাও একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে; যেহেতু তারা জলের তলায় থাকে সেই কারণে তা ব্যয়বহুল। যদিও জোয়ার শক্তি এক ধরনের ‘সবুজ শক্তি’, তাহলেও তা আশেপাশের বাসকারী প্রাণীদের উপর কিছুটা প্রভাব ফেলবে এবং তাদের আবাসস্থল পরিবর্তন করতে বাধ্য করতে পারে। জোয়ার শক্তি অন্যান্য পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিগুলির তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য কারণ এটি চাঁদ এবং সূর্যের মহাকর্ষীয় টানার উপর নির্ভরশীল তবে এটি দিনে মাত্র দু’বার উপলব্ধ হয়। জোয়ার শক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যয় বেশি তবে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সামান্য।”

খুড়ো বললেন “এবারে তরঙ্গ শক্তির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। বিশেষ ভাবে নির্মিত বয়া, টারবাইন এবং জেনারেটর তরঙ্গ শক্তিকে দূষণমুক্ত বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে। যদিও এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রচেষ্টা সেই ১৮৯০ সাল থেকে চলে আসছে কিন্তু তরঙ্গ শক্তির ব্যবহার এখনও ব্যাপকভাবে শুরু হয়নি। ২০২০ সালের হিসেব অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী তরঙ্গ শক্তির কার্যকরী ক্ষমতা বর্তমানে মোটে ১৬ মেগাওয়াট। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হ’ল ২০২০ সালের হিসেব অনুযায়ী কিলোওয়াট প্রতি এর উৎপাদন ব্যয় উপকূলবর্তী বায়ু চালিত উৎপাদন কেন্দ্রের তুলনায় প্রায় দশগুণ বেশি।

তরঙ্গশক্তি রূপান্তরকরণের জন্য উদ্ভাবনী পদ্ধতির পরীক্ষা নিরীক্ষা গত তিন দশক ধরে চলছে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা ও একাডেমিক গবেষণা গোষ্ঠীগুলি বিভিন্ন তরঙ্গ শক্তির সম্ভাব্য ব্যবহারিক দিক নিয়ে গবেষণা করে চলেছে। সার্বিক ভাবে ব্যয় হ্রাস এবং সার্বজনীন চাহিদা বৃদ্ধিই একমাত্র ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিকে প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলির সাথে অনুকূল প্রতিযোগিতার সম্মুখীন করতে পারবে।

তরঙ্গজনিত জলের আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে উপরিবর্নিত মেশিনটি কাজ করে। এটি একটি স্থির কাঠামোর সাহায্যে জলের উপরে একটি বদ্ধ বাতাসের চেম্বারে স্থাপন করা হয়। আন্দোলিত জলের স্তম্ভ ওঠানামার মধ্য দিয়ে উপরিস্থিত বায়ুস্তরের উপর চাপ বৃদ্ধি বা হ্রাস করে একটি দ্বিমুখী বায়ুপ্রবাহ সৃষ্টি করা হয় যা অনেকটা বায়ু চালিত টারবাইনের নীতি অনুসরণ করে কাজ করে। এই চেম্বারের উপরে একটি টারবাইন স্থাপন করে পরিবর্তিত দ্বিমুখী বায়ুচাপের সাহায্যে টারবাইনটি ঘোরানো হয় এবং তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। এই বিশেষ ওয়েলস টারবাইনটি এমনভাবে নির্মিত হয় যে এটি বায়ু প্রবাহের দিকনির্বিশেষে সর্বদা একই দিকে ঘুরবে; তবে প্রচলিত টারবাইনগুলির চেয়ে এর দক্ষতা প্রায় ৫০–৬০ শতাংশ কম।

সমুদ্র উপকূলবর্তী পৃথিবী পৃষ্ঠের বেশিরভাগ অংশকে জলবায়ু জনিত কারণে সূর্য বিভিন্ন হারে উষ্ণায়িত করে তোলে; যার ফলে অসম তাপের সৃষ্টি হয়। পৃথিবী পৃষ্ঠের উপর এই অসম তাপের কারণে বাতাস এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় প্রবাহিত হয় এবং এই বায়ুপ্রবাহ দ্বারা তরঙ্গের সৃষ্টি হয়। যেহেতু বায়ু সর্বদা চলমান থাকবে তাই তরঙ্গগুলিকে সর্বদা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যাবে; ফলে এটিকে পুনর্নবীকরণযোগ্য উৎস হিসাবে গন্য করা হয়। জোয়ার শক্তির তুলনায় এটি কম নির্ভরযোগ্য কারণ এটি বাতাসের গতি এবং তার প্রভাবের উপর নির্ভরশীল। সামুদ্রিক তরঙ্গ শক্তির পরিবর্তনশীলতা স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তুলনামূলকভাবে কম, তবে দীর্ঘ মেয়াদে— উদাহরণস্বরূপ, ঋতু অনুযায়ী বা বার্ষিক ভিত্তিতে তা যথেষ্ট পরিবর্তনশীল। তবে নিরবচ্ছিন্ন শক্তি অর্জনের জন্য এটা একটা গ্রহনযোগ্য এবং সম্ভাবনাময় বিকল্প। হাওয়ার সাহায্যে তরঙ্গে যে কাইনেটিক এনার্জি বা গতিবেগ শক্তি প্রয়োগ করা হয়, তার পরিমাণ বিশাল— উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে ৪ ফুট (পাশাপাশি দুটো ঢেউ-এর সর্বোচ্চ বিন্দুর মধ্যে দূরত্ব), ১০ সেকেন্ড (এই দূরত্ব যেতে ঢেউয়ের যে সময় লাগে) একটি তরঙ্গ উপকূলের প্রতি মাইলে আনুমানিক ৩৫,০০০ হর্স পাওয়ার শক্তি বহন করতে পারে। এই তরঙ্গ শক্তি তারপরে ওয়েভ এনার্জি কনভার্টর বা তরঙ্গ শক্তি রূপান্তরকারী যন্ত্রের মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়।”  

খুড়ো বলেন “জোয়ার শক্তি এবং তরঙ্গ দ্বারা উৎপাদিত শক্তি উভয়ই জলবিদ্যুৎ শক্তিরই একটি রূপ।  বিশ্বের খুব কম দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে জোয়ার বিদ্যুৎ এবং তরঙ্গ বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হয়েছে। কারণ এর তৈরি করার খরচ এখনও আকাশছোঁয়া। যদি আমরা সাধ্যমত দামে প্রযুক্তিটি সঠিকভাবে পেতে পারি তবে জোয়ার ও তরঙ্গ শক্তি গ্রীন-এনার্জি বা সবুজ-শক্তির অংশীদার হয়ে সৌর শক্তি, বায়ুচালিত শক্তি, ভূ-তাপীয় শক্তি এবং জলবিদ্যুতের পরিপূরক হয়ে  উঠতে পারবে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেটা হয়ত আকাশ কুসুম মনে হতে পারে, কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে তোরা এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ দেখে যেতে পারবি।”

———————————-

~ কলমে এলেবেলের অতিথি দেবাশীষ দাশগুপ্ত ~

দেবাশীষ একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রযুক্তিবিদ

 

 

 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।