স্ট্রেসের অন্দরমহল

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
718 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

ডাঃ সংকেত সেনশর্মা। পেশায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আর নেশা পৃথিবীর কোথায় মস্তিষ্ক সংক্রান্ত কি কি গবেষণা হচ্ছে তার খোঁজ রাখা আর ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সাথে ছুটির দিনে এই বিষয় নিয়ে নানাবিধ আড্ডা দেওয়া। উদ্দেশ্য একটাই— মস্তিষ্ক নিয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করা। বিংশ শতাব্দীর শেষে যখন মার্কিন সরকার ঘোষণা করে যে বিজ্ঞানের অগ্রগতির দিক থেকে শেষ দশ বছর (১৯৯০–১৯৯৯) মস্তিষ্কের যুগ বা decade of brain হিসেবে গণ্য হবে তখন থেকেই মস্তিষ্ক সংক্রান্ত গবেষণা তড়িৎ গতিতে এগোতে থাকে আর তাতে যোগ্য সহায়তা করে প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি। Neuro imaging-এর অকল্পনীয় উন্নতি ও নতুন নতুন প্রয়োগ যেমন fMRI, high resolution MRI  অর্থাৎ 7 tesla MRI, SPECT  ইত্যাদি মস্তিষ্ককে সঠিকভাবে বুঝতে অনেকটাই সাহায্য করে। সোজা কথায় সচল অবস্থায় অর্থাৎ বিভিন্ন কার্যক্রম চলা অবস্থায় এ যেন মস্তিষ্ককের অন্দরমহলকে বায়োস্কোপের মতন চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলা। যাইহোক এসব নিয়েই আজ বর্ষার বিকেলে ডাঃ সংকেত সেনশর্মা তাঁর বসার ঘরে তাকিয়া পেতে তার ভক্ত কয়েকজন ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসর জমাবেন ভাবলেন। যেমন ভাবা তেমন কাজ— সবার ডাক পড়ল। এক এক করে রনি, অনিন্দ্য, রূপক ও সুপ্রিয়র প্রবেশ। এরা সবাই একাদশ আর দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র। প্রায় প্রতি সপ্তাহান্তে বিকেলে এরা আসে তাদের প্রিয় সংকেতদার কাছে ব্রেন নিয়ে অনেককিছু জানতে ও বুঝতে।

“সংকেতদা গত এক বছর ধরে কোথাও বেড়াতে যেতে পারছিনা, স্কুলে যেতে পারছিনা, এই বন্দীদশা আর ভালো লাগছেনা। বড্ড স্ট্রেস্ড ফিল করছি।” ঘরে ঢুকেই সুপ্রিয় বলে ওঠে। সাথে সাথে রূপকের টিপ্পনী “তোর আবার স্ট্রেস। স্ট্রেস মানে কি বুঝিস?” অমনি সুপ্রিয়ও প্রতিবাদ করে ওঠে, “তুই বুঝিস?” সংকেতদা এদের থামিয়ে দিয়ে বলেন, “আঃ ঝগড়া করছ কেন তোমরা? সত্যিই তো, এই স্ট্রেস কথাটা তো প্রায় সময়েই আমরা বলি। কিন্তু কীভাবে এই স্ট্রেস হয় আর কাকেই বা আমরা স্ট্রেস বলব সেটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা চল আজ তোমাদের কিছুটা বোঝাই। স্ট্রেস কথাটা এসেছে পদার্থবিদ্যা থেকে। যেকোনো শক্তি বা ফোর্স এবং তাকে আটকানোর জন্যে যে বাধা, এই উভয়ের পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াকে বোঝানোর জন্যে আমরা স্ট্রেস কথাটি ব্যবহার করি। পরবর্তীকালে হান্স সেলি পরিবেশগত চাপের জন্যে মানুষের শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া বোঝাতে গিয়ে শব্দটি মেডিক্যাল অভিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন। জীবজগতে এই স্ট্রেস কিন্তু সামলায় মস্তিস্ক ও স্নায়ুতন্ত্র। সেটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় মানুষের ক্ষেত্রে এই পরিবেশগত চাপ অনেক জটিল। মানুষের ক্ষেত্রে নিকট কারুর থেকে কটু বা অপমানজনক কথা শোনা থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনেকগুলি কাজ শেষ করা বা আগামী পরীক্ষায় ভালো ফল করতে না পারলে কি ধরণের পরিস্থিতি হতে পারে সেটা  চিন্তা করা, এই সবই বাহ্যিক পরিবেশগত চাপ যা সুচারুভাবে সামলায় এই ব্রেন। জ্ঞানত সেটা আমরা বুঝতেও পারিনা। 

আসলে মস্তিষ্কের কাজই হচ্ছে homeostasis বজায় রাখা, মানে খুব সহজ করে বলতে গেলে শারীরবৃত্তীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। আর যে পদ্ধতিতে homeostasis বজায় রাখে এই মস্তিষ্ক, সেটাকে allostasis বলে”। সঙ্গে সঙ্গে  অনিন্দ্যর জিজ্ঞসা “কিন্তু সংকেত দা সব গুলিয়ে গেল, একটু  সহজ করে বোঝাবেন?” ডাঃ সংকেত বললেন “দেখ, তোমাদের বাড়ীতে এয়ার কন্ডিশনার বা এসি আছে না? এসি কী করে? এসি আসলে একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখে ঘরের ভেতরে, বাইরের তাপমাত্রা যাই হোক না কেন। কীভাবে করে? যখনই ঘরের তাপমাত্রা নির্ধারিত মাত্রা ছাড়িয়ে যায় সাথে সাথে এসির কম্প্রেসার চালু হয়ে যায় আর ঘর ঠাণ্ডা হয়ে ওই নির্ধারিত তাপমাত্রা ফিরে পায়। এই ব্যাপারটা অনেকটা homeostasis বজায় রাখার সাথে তুলনা করতে পারি আমরা। বাইরের পরিবেশে অনেক ওঠা নামা চলতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, হঠাৎ কোনো বিপদের সম্মুখীন হওয়া অথবা শরীরের ভেতরে অনেক ওঠানামা যেমন, অনেকক্ষণ খালি পেটে থাকলে সুগার কমে যাওয়া ইত্যাদি। সত্যি কথা বলতে কি, স্বাভাবিক অবস্থায় দৈনন্দিন জীবনে প্রতিনিয়ত বাইরের বা ভিতরের পরিবেশের এই আলোড়নের প্রভাব বিন্দুমাত্রও আমাদের উপরে পড়েনা। জীবন তার নিজের নিয়মেই এগিয়ে যায়। আর এই ব্যালান্স প্রতিনিয়ত সুচারুভাবে বজায় রেখে চলে ব্রেন। আর এই ব্যাল্যান্সটা বজায় না থাকলে যে অবস্থার উদ্ভব হয় তাকেই সহজ কথায় বলে স্ট্রেস। এই সময়ে যে মনের অবস্থা হয় স্ট্রেস বলতে অনেকটা সেটাকেই বোঝায়।”

“বাঃ বেশ সুন্দর বোঝালেন তো সংকেত দা” বলল রনি। “কিন্তু ধরুন হঠাৎ বাগানে সাপ দেখে বা সাপের হিস হিস শব্দ শুনে ভয়ে যে গায়ে কাঁটা দেয় বা বুক ধড়ফড় করে গায়ে ঘাম দিয়ে ওঠে সেটা কীভাবে হয়? ব্রেন বোঝে কীকরে যে সামনে বিপদ?” প্রশ্ন করে রনি। “দেখ, আসলে প্রতিনিয়ত পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সকল অনুভূতি তড়িৎ তরঙ্গের আকারে স্নায়ুতন্তুগুলির মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে এসে উপস্থিত হয় “থ্যালামাস” বলে মধ্য মস্তিষ্কের একটি অংশে, যা ব্রেনের রিলে স্টেশন হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও গন্ধ অনুভূতি (olfactory sensation) মস্তিষ্কের সামনে কিন্তু একদম নীচের দিকে olfactory bulb বলে একটি অংশে অনুভূত হয়। এবার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হছে এই সমস্ত অনুভূতির একটি অংশ ‘থ্যালামাস’ থেকে রিলে হয় ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে’ যা কিনা সমস্ত বিচারক্ষমতার উৎস। আর একটি অংশ রিলে হয় ‘আমিগড্যালা’ (amygdala) বলে ছোট মটরশুঁটির দানার মতন একটি অংশে। এই ‘আমিগড্যালা’ থাকে ব্রেনের দুইপাশে অবস্থিত টেম্পরাল লোবের ভিতরে।”

মানব মস্তিষ্কে অ্যামিগডালার অবস্থান চিত্র।  লাল অংশগুলি হল আমিগড্যালা -র আনুমানিক অবস্থান 



আমিগড্যালা ও মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশের মধ্যে যোগাযোগ 

এবারে রূপকের প্রশ্ন “আচ্ছা সংকেত দা, একটা ছোট বাচ্চা কীকরে সাপ বা কোনো ভয়ংকর জীবকে ভয়ের বস্তু বলে বুঝতে পারে?” সংকেত দা’র উত্তর “জন্মের পর প্রথম যখন একটি বাচ্চা সাপ চোখে দেখল আর হিস হিস শব্দ কানে শুনল তখন মা বাচ্চাটিকে টেনে সরিয়ে দিল আর ভীষণ ভয় দেখিয়ে বোঝাল যে সাপ একটি ভয়াবহ প্রাণী। দেখলেই পালাতে হয়। এই শেখানোটায় (learning) একটা ভয়ের শিক্ষা প্রদান করা হল যাকে নিউরোসাইন্সের ভাষায় fear conditioning বলা হয়। এই শিক্ষার ফলস্বরূপ বাচ্চাটি এরপরে সাপ জাতীয় কিছু দেখলেই বা হিস হিস শব্দ শুনলেই সতর্ক হওয়া বা পালানো শুরু করে। আসলে এক্ষেত্রে দৃশ্য ও শব্দের অনুভূতিকে ভয়ের অনুভূতি বলে চেনানোর জন্যে ‘আমিগড্যালা’ উত্তেজিত বা active হয়ে পড়ে। সে তখন তড়িৎ সংকেত পাঠাতে শুরু করে ‘হাইপোথ্যালামাস’ বলে ব্রেনের একটি অংশে এবং তাকে উত্তেজিত করে। ‘হাইপোথ্যালামাস’ তখন corticotrophin releasing hormone নামে এক হরমোন ক্ষরণের মাধ্যমে উত্তেজিত করে ‘পিটুইটারি’ গ্রন্থিকে। ফলে পিটুইটারি গ্রন্থি ক্ষরণ করে adrenocorticotrophic hormone এবং উত্তেজিত করে ‘অ্যাড্রেনাল’ গ্রন্থিকে। সে তখন ক্ষরণ করা শুরু করে স্ট্রেস হরমোন বা cortisol।

 ব্রেন যেভাবে স্ট্রেস জনিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে

আবার ভয় পাওয়ার দরুন উত্তেজিত ‘আমিগড্যালা’ অটোনমিক নারভাস সিস্টেমের সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমকে উত্তেজিত করে। ফলে norepinephrine ক্ষরণ হয় যা কিনা হৃৎস্পন্দনের গতি বাড়ায়, ঘাম ঝরায়, মাংশপেশী টান টান করে, ইত্যাদি শারীরবৃত্তীয় কাজ সংঘটিত করে। এই সবই ভয় পেলে হয়; যেটা এক্ষেত্রে সাপ দেখে বাচ্চাটির হল।” “বেশ বুঝলাম” বলল রূপক। “কিন্তু এই ভয় পাওয়াটা তো রক্ষাকারী মানে protective। কিন্তু স্ট্রেস বলতে তো আমরা বুঝি একটানা বহুদিন এই অনুভূতিটা নিয়ে বেঁচে থাকা। আমি সেটাই বলতে চেয়েছি” বলল সুপ্রিয়। 

স্ট্রেস হরমোন ক্ষরণের প্রক্রিয়া 

“হুম। বুঝলাম। দেখ বিষয়টা হচ্ছে, শুরুতে বলছিলাম না ‘থ্যালামাস’ রিলে স্টেশান থেকে একটা অংশ মস্তিষ্কের ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’-এ যায়, আর আরেকটা অংশ ‘আমিগড্যালা’-তে যায়। এই ‘আমিগড্যালা’-ই পুরো ভয়জনিত কর্মকান্ডগুলি সম্পন্ন করে। আর ‘প্রিফরন্টাল কর্টেক্স’ বিচারক্ষমতা প্রয়োগ করে ভয় পাওয়াটা কতটা যুক্তিযুক্ত বা কতক্ষণ স্থায়ী থাকা উচিৎ সেটা ঠিক করে এবং সেই অনুযায়ী আমি এতক্ষণ ধরে যে প্রক্রিয়াটা বর্ণনা করলাম সেটাকে থামাবার চেষ্টা করে, অনেকটা গাড়ীর ব্রেকের মতন। মোদ্দাকথা একটানা চলা ভয়জনিত প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রিত করে উত্তেজনা প্রশমিত করে এই ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’। এবারে ধর যদি এই ব্রেকটা কাজ না করে তাহলে এই ভয় এবং আতঙ্কের অনুভূতি একটানা চলতেই থাকে, অথচ বাঁচার জন্যে সেই ভয়ের আর কোন প্রয়োজনীয়তা তখন আর নেই। সেই মানুষটি তখন স্ট্রেস অনুভব করেন। আর এই অনুভূতি; যেমন লকডাউন জনিত একাকীত্ব, সময়ের মধ্যে কোনো কাজ শেষ করা, বা সম্পর্কের টানাপোড়েনের জন্যে অশান্তি ইত্যাদি যা এই স্ট্রেসের সূচনা ঘটায় তাকে আমরা বলি স্ট্রেসার। তোমরা স্ট্রেসার নিয়েই এত চিন্তিত হও অথচ দেখ রহস্য কিন্তু লুকিয়ে আছে যার যার মগজে বা ব্রেনে। কারণ এক এক মানুষের এই স্ট্রেসারগুলো সহ্য করে ব্যালান্স বজায় রাখার ক্ষমতা এক এক রকম। এটাকে বলে stress resilience। যার এটা কম সে অল্পতেই চাপে পড়ে যায় বা স্ট্রেসের শিকার হয়।” 

এতগুলো কথা একটানা বলে একটু থামেন সংকেত দা । “দেখ, যা কিছু বোঝালাম এতক্ষণ সেটা অতি সরলীকরণ মাত্র। মস্তিষ্কের কর্মকান্ডগুলি এর থেকে অনেক বেশি জটিল। বিভিন্ন অংশের মধ্যে তথ্যের এই আদানপ্রদান চলতেই থাকে ভেতরে আর সবমিলিয়ে ব্রেন সম্পূর্ণ শারীরিক ও মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।”

সবাই সমস্বরে বলে ওঠে “সংকেত দা আজ তাহলে এটুকুই থাক। স্ট্রেস নিয়ে অনেক কিছু আলোচনা হল। আবার কখনো ব্রেনের অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে কি বলেন?”

 “সেই ভালো” বললেন সংকেত দা। 

——————————-

~ কলমে এলেবেলের অতিথি তীর্থঙ্কর দাশগুপ্ত ~

 

তীর্থঙ্কর পেশায় একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম বি বি এস এবং সাইকিয়াট্রির উপরে স্নাতকোত্তর শিক্ষালাভ। বর্তমানে “মনের আলো” নামে একটি স্নায়ু ও মনোরোগ চিকিৎসা কেন্দ্রের সাথে যুক্ত।

 
 
 


► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 
 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।