ইউরোপিয়ানদের গায়ের রং সাদা কেন?

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
453 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

দুনিয়ায় চামড়ার রঙের বৈচিত্র্য নিয়ে নিয়ে কত বৈষম্য, বিদ্বেষ, মারামারি, রাজনীতি। কিন্তু, তিন লক্ষ বছর আগে যখন আমাদের প্রজাতির মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্সের উদ্ভব হয়েছিল আফ্রিকায়, তখন কিন্তু সবার চামড়ার রং গাঢ়ই ছিল। তার কারণও ছিল। কারণ হল, আফ্রিকায় সূর্যের গনগনে তেজ। সেই তেজের সাথে আছড়ে পড়ে তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি (Ultra Violet Ray বা UVR) সেখানে। এই অতিবেগুনি রশ্মি ক্ষতি করতে পারে জীবকোষের। এদিকে স্যাপিয়েন্স হয়ে তো লোম টোমও ঝরে গেছে ততদিনে। কোন সুরক্ষা নেই। তাই সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করতে স্যাপিয়েন্সের দেহে তৈরি হল মেলানিন। ত্বকের রঞ্জক মেলানিন এই অতিবেগুনী রশ্মি শোষণ করে কোষকে রক্ষা করল। রঞ্জক মেলানিনের এই আধিক্যের ফলে তখন সব স্যাপিয়েন্সদের ত্বকের রঙই ছিল গাঢ়। কিন্তু স্যাপিয়েন্স যখন আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বময় তখন বদলে গেল গায়ের রং। প্রাচীন মানুষের ডিএনএ সজ্জা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাত্র আট-নয় হাজার বছর আগেও ইউরোপিয়ানরা এত সাদা ছিলনা। দেখা যাচ্ছে, যত বিষুব রেখার থেকে ওপর দিকের অক্ষাংশে যাত্রা করেছে তত ত্বকের রং ফ্যাকাশে হয়েছে। এর থেকে বোঝা যায় যে, মানুষের চামড়ার রঙের পরিবর্তনে এই অক্ষাংশ জনিত যে পরিবেশের পরিবর্তন, তার প্রভাব আছে। কিন্তু অক্ষাংশ জনিত কি এমন পরিবর্তনের ফলে এরকম হলসহজ উত্তর, অবশ্যই সূর্য্যের তেজের তারতম্যের জন্য, কিন্তু সূর্যের তেজের তারতম্যে কি এমন সমস্যা তৈরি হয়েছিল, যে ইউরোপে বা পূর্ব এশিয়ার সবার ত্বকের রং বদলে গেল? আর গেলই বা কিভাবে?

সূর্যের তেজের তারতম্যে কি এমন সমস্যা তৈরি হয়েছিল, যে ইউরোপে বা পূর্ব এশিয়ার সবার ত্বকের রং বদলে গেল? আর গেলই বা কিভাবে?

ত্বকের জন্য অতিবেগুনী রশ্মি ক্ষতিকর হলেও অতিবেগুনী রশ্মি কিন্তু জন্তু জনোয়ারের ভিটামিন ডি তৈরি করতে দরকারও। ভিটামিন ডি, যা হাড় আর পেশীর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভিটামিন ডি হাড়ে ক্যালসিয়াম আর ফসফরাস ধরে রাখে। ভিটামিন ডি-র অভাবে মাত্র ১০–১৫% ক্যালসিয়াম আর ৬০% ফসফরাসই হাড়ে লাগে, বাকি ধুয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে। এর অভাবে শিশুদের হাড়ের সমস্যা দেখা যায়, বৃদ্ধি হয়না ঠিকঠাক। জোয়ান আর বুড়োদের হাড়, পেশী সব দুর্বল হয়ে পড়ে। হাড়-পেশী ছাড়াও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নির্মাণে এই ভিটামিনের ভূমিকা আছে। ভিটামিন ডি-র অভাবে ক্যান্সার, অষ্টিও আর্থারাইটিস, চোট লাগলে হাড় ভেঙে যাওয়া, ডায়াবেটিস সহ নানা রোগ হতে পারে বলে মনে করা হয়। তাই, শরীরকে শক্ত সমর্থ নিরোগ রাখতে শিশু-জোয়ান- বুড়ো সবারই ভিটামিন ডি দরকার। 

ভিটামিন ডি (Vitamin D3) তৈলাক্ত মাছ, মাছের তেল ইত্যাদিতে পাওয়া গেলেও, ভিটামিন ডি-র আসল উৎস কিন্তু জন্তু জানোয়ারদের নিজেদের ত্বক। ত্বকেই তৈরি হয় প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি। কিন্তু এজন্য দরকার সূর্য্যের অতিবেগুনী রশ্মি। খাদ্য থেকে ভিটামিন ডি পাওয়া গেলেও, বিবর্তনগত ভাবেই সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবেই মনুষ্যদেহে ৮০% ভিটামিন ডি-র চাহিদা পূরণ হয়। তাই ভিটামিন ডি-র ঘাটতি পূরণ করতে পর্যাপ্ত সূর্যকিরণ দরকার। কিন্তু মেলানিন অতিবেগুনী রশ্মি শোষণ করে বলে, ভিটামিন ডি তৈরিতে তা বাধা দিতে পারে। তবে আফ্রিকায় সূর্যালোক বেশি, তাই সেখানে চামড়ায় মেলানিনের আধিক্য থাকলেও, তা ভিটামিন ডি তৈরিতে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এভাবেই কেটে গেল প্রায় আড়াই লক্ষ বছর। তারপর আজ থেকে ষাট-সত্তর হাজার বছর আগে স্যাপিয়েন্সরা আফ্রিকা ছেড়ে পাড়ি দিল ভুবন দখল করতে। একদল গেল এশিয়ার পূব দিকে (অধুনা চিন, জাপান, কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া ইত্যাদি), অন্যদল ইউরোপে। এবার হল কি, আফ্রিকা থেকে যত ওপর দিকে লোকে যাত্রা করেছে তত সূর্যালোক তথা অতিবেগুনী রশ্মির পরিমাণ কমতে লাগল। ত্বকের রং যত গাঢ় হবে, ভিটামিন ডি বানাতে তত বেশি অতিবেগুনী রশ্মি লাগবে। তাই চামড়ায় মেলানিন কমা শুরু হল, ত্বক ফ্যাকাশে হল, যাতে ত্বক কম অতিবেগুনী রশ্মিতেও ভিটামিন ডি সংশ্লেষ করতে পারে। এক্ষেত্রে ত্বকের ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া তাই একটি প্রাকৃতিক নির্বাচনের উদাহরণ। 

ত্বকের রং যত গাঢ় হবে, ভিটামিন ডি বানাতে তত বেশি অতিবেগুনী রশ্মি লাগবে। তাই চামড়ায় মেলানিন কমা শুরু হল, ত্বক ফ্যাকাশে হল, যাতে ত্বক কম অতিবেগুনী রশ্মিতেও ভিটামিন ডি সংশ্লেষ করতে পারে। এক্ষেত্রে ত্বকের ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া তাই একটি প্রাকৃতিক নির্বাচনের উদাহরণ।

জেনেটিক ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মানুষের গাত্রবর্ণের বিবর্তনটি বেশ জটিল। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে গাত্রবর্ণের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জিনের ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে এই বিবর্তনটি ঘটেছে। আর ইউরোপিয়ান আর পূর্ব এশিয়ার মেলানিন কমিয়ে ত্বকের বর্ণের পরিবর্তনের কারণও ভিন্ন ভিন্ন জিন। ইউরোপিয়ান আর পশ্চিম আফ্রিকানদের মধ্যে রঞ্জক-এর তারতম্যের জন্য দায়ী তিনটি জিনের ছোট ছোট পরিবর্তন (মিউটেশান বা পরিব্যক্তি)- KITLG, SLC25A5, and SLC45A2। আর সোনালি চুলের জন্য দায়ী TYRP1 জিনের পরিবর্তন। আর, HERC2/OCA2 আর TYRP1 জিনের পরিবর্তনে চোখ হল নীল। তবে আফ্রিকা থেকে বেরোবার পর প্রথম পরিব্যাক্তি ঘটে KITLG জিনে। মোটামুটি তিরিশ হাজার বছর আগে। মনে করা হয়, পঁচিশ হাজার বছর আগে পূর্ব এশিয়ান আর ইউরোপিয়ানদের মধ্যে যাত্রাপথ পৃথক হয়ে যায়। তাই  KITLG-র পরিব্যক্তি দুই ক্ষেত্রেই দেখা যায়। এরপর এগারো থেকে উনিশ হাজার বছর আগে TYRP1, SLC24A5, এবং SLC45A2 জিনে উপকারী পরিবর্তন ঘটে। এক্ষেত্রে, একটা কথা বলার, ইউরোপে ও কিন্তু খেপে খেপে অন্যান্য অঞ্চল থেকে পরিযান হয়েছে। আজকের ইউরোপিয়ানদের মোটামুটি মধ্য প্রস্তর যুগের (Mesolithic যুগ— ইউরোপের ক্ষেত্রে যেটা পাঁচ থেকে পনের হাজার বছর আগে) শিকারি-সংগ্রাহক, পশ্চিয় এশিয়া থেকে আগত কৃষক আর স্তেপ অঞ্চলের পশুপালকদের মিশ্রণ। ইউরোপিয়ান জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে এই উপকারী পরিবর্তনগুলো বংশানুক্রমে ছড়িয়ে পড়ে ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দেখা দেয়। SLC45A2 -র পরিবর্তন ঘটে সবচেয়ে শেষে, ইউরোপে মানুষ আসার বহু পরে। এই যে এগারো থেকে উনিশ হাজার বছরের সময়ে এই জিনগত পরিবর্তনের মধ্যে কিন্তু শেষ তুষারযুগও আছে (আজ থেকে পনের থেকে কুড়ি হাজার বছর আগে)। এ সময়ে অনেক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হয়, যেমন শীত থেকে বাঁচতে পোশাক, নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া। এসবের ফলে ত্বকে অতিবেগুনী রশ্মির শোষণ আরও সীমিত হয়ে যায়। তাছাড়া দশ থেকে আঠারো হাজার বছর আগে শীত ও গ্রীষ্মের পার্থক্যও প্রকট হয়। শীত কাল দীর্ঘতর হয়, ফলে শরীরে ভিটামিন ডি-র কম তৈরির আশঙ্কা আরও বাড়ে। তাই যাতে সীমিত অতিবেগুনী রশ্মিতেও ত্বকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরি হয়, সে কারণেই ইউরোপিয়ানদের ত্বকের রং আরও ফ্যাকাশে হয়ে যায়।

 ভিটামিন ডি-র জন্য আরেকটি খুব মজার ঘটনাটাও ঘটেছিল ইউরোপিয়ানদের আরেকটি জিনে। চিনা, জাপানি, কোরিয়ান, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আশি থেকে একশো শতাংশ লোক দুধ খেয়ে হজম করতে পারেনা। এমনকি ভারতেও তা স্থানভেদে ত্রিশ থেকে সত্তর শতাংশ। দুধ খেলেই না না রকম অস্বস্তি হয় পেটে। কিন্তু বেশির ভাগ ইউরোপিয়ান ও ইউরোপ থেকে আগত অ্যামেরিকানরা দিব্যি দুধ হজম করতে পারে। আসলে দুধে থাকে ল্যাকটোজ। দেহে ল্যাকটোজকে ভাঙে ল্যাকটেজ নামক উৎসেচক। ইউরোপ বাদে পৃথিবীর অন্যান্য অংশে বেশির ভাগ লোকের ল্যাকটেজ উৎসেচক শৈশবে দুগ্ধপোষ্য অবস্থা কাটলে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। ফলে অল্প স্বল্প ল্যাকটোজ হজম করতে পারলেও বেশি খেলেই অস্বস্তি হয়। একে বলে Lactose Intolerance। কিন্তু হাজার সাত আট বছর আগে ইউরোপিয়ানদের ল্যাকটেজ জিনে একটা ছোট্ট পরিবর্তন ঘটে, ফলে তাদের ল্যাকটেজ সারাজীবন সক্রিয় থাকে। তাই তাদের ক্ষেত্রে ল্যাকটেজ দিয়ে ল্যাকটোজ ভেঙে দুধ হজম করতে কোন অসুবিধে হয়না। কিন্তু তাদের ল্যাকটেজ উৎসেচকের জিনে এই পরিবর্তন ঘটল কেন? কারণ, সেই পরোক্ষ ভাবে ভিটামিন ডি। দুধে থাকে প্রচুর ক্যালসিয়াম। ক্যালসিয়াম আর ভিটামিন ডি হল হাড়ের গঠনের জন্য একে অপরের পরিপূরক, ভিটামিন ডি হাড়ে ক্যালসিয়াম নিয়ে যায় এবং বজায় রাখে। তাই ল্যাকটেজ জিনে এই পরিব্যক্তিও হাড়ের ক্ষয় রুখতে সাহায্য করে। যেহেতু সূর্যালোকের অপ্রতুলতার কারণে ভিটামিন ডি উৎপাদন সীমিত, তাই সেই ভিটামিন ডি-কে খুব হিসেব করে কাজে লাগাতে এই পরিব্যক্তি। এছাড়াও খাদ্যে ভিটামিন ডি-র প্রাচুর্য্যের ওপর নির্ভর করে ইউরোপিয়ানদের নিজেদের মধ্যে ভিটামিন ডি-র পরিবহণের জন্যেও বিভিন্ন জিনের (DHCR7 এবং NADSYN1) পরিব্যক্তি দেখা যায়। 

মোটামুটি ভাবে ভিটামিন ডি সংশ্লষের জন্যই এই সব পরিব্যক্তি ও প্রাকৃতিক নির্বাচন ঘটেছে বলে প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র থেকে হাজার হাজার বছর আগের বিভিন্ন সময়ের কয়েকশো দেহাবশেষ থেকে সমস্ত জেনেটিক তথ্য মিলিয়ে, বিজ্ঞানীরা আপাতত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।  

তথ্যসূত্রঃ 

1. Gibbons, A (2015). How Europeans evolved white skin? Science, doi:10.1126/science.aab2435

2. Beleza, S., Santos, A. M., McEvoy, B., Alves, I., Martinho, C., Cameron, E., . . . Rocha, J. (2013). The timing of pigmentation lightening in Europeans. Mol Biol Evol, 30(1), 24-35. doi:10.1093/molbev/mss207

3. Mathieson, I., Lazaridis, I., Rohland, N., Mallick, S., Patterson, N., Roodenberg, S. A., . . . Reich, D. (2015). Genome-wide patterns of selection in 230 ancient Eurasians. Nature, 528(7583), 499-503. doi:10.1038/nature16152

4. Sorthe, J., & Moghaddam, A. (2019). Lactase persistence may explain the paradoxical findings of high vitamin D concentrations in Europeans living in areas of low UV-B irradiation. Eur J Clin Nutr, 73(4), 585-593. doi:10.1038/s41430-018-0179-x

——————————————————

~ কলমে এলেবেলে নির্মাল্য ~

 

 

এলেবেলের দলবল

 

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।