মাতৃদুগ্ধ ও বিশ্ব স্তন্যদান সপ্তাহ

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
747 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

“যদি মায়ের দুধ খেয়ে থাকিস তাহলে সামনে আয়”一

লোকাল ট্রেনের ভিড় ঠেলে কোনরকমে স্টেশনে পা দিতেই কানে এলো বাঙালির সম্ভবত একমাত্র রণহুঙ্কার। কি নিয়ে বাদানুবাদ চলছে সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, শুধু দেখলাম যুযুধান দুই পক্ষকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে আমোদলোভী জনতা। তাদের মধ্যে থেকেই ভেসে এলো টিপ্পনীটা一 “ডিপের দুধ খেলে কি গায়ের জোর কম হবে নাকি?” হাতে কাজ না থাকলে আমিও একটু দাঁড়িয়ে সন্ধ্যেবেলার বিনোদনটা সেরে নিতাম, কিন্তু বাড়িতে এখন নতুন অতিথি। তার জন্য কিছু কেনাকাটা করতে হবে ফেরার পথে一 ওই ডিপের দুধ-ও তার মধ্যে একটা। কেন জানিনা, কথাটা মনে আটকে গেল। সত্যিই তো, চলতি ভাষার ‘ডিপের দুধ’ অর্থাৎ বেবি-ফুড বা ইনফ্যান্ট ফর্মুলা তো মাতৃদুগ্ধেরই এক বিকল্প। অনেক সময় মায়ের শারীরিক অসুবিধার কারণে বা কখনো আধুনিক জীবনযাত্রায় সময়ের অভাবে বা এই অতিমারির প্রকোপে যেসব শিশু মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত, তাদের সঠিক মাত্রায় পুষ্টি প্রদানের অন্যতম উপায় এই ইনফ্যান্ট ফর্মুলা। তবে, সত্যিই কি তা মাতৃদুগ্ধের আদর্শ বিকল্প?

 

UNICEF এর মতে সারা বিশ্বের কেবলমাত্র ৪৪ শতাংশ শিশু (৬ মাস বা তার কমবয়সী) সম্পূর্ণরূপে মাতৃদুগ্ধপোষ্য। ভারতীয় শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা ৪৬ শতাংশ।

 

“মানুষ স্তন্যপায়ী প্রাণী”一 যেখানে আমাদের অস্তিত্বকেই সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে স্তন্যপানের মাধ্যমে, সেখানে একটা আশ্চর্যের পরিসংখ্যান দিই। UNICEF এর মতে সারা বিশ্বের কেবলমাত্র ৪৪ শতাংশ শিশু (৬ মাস বা তার কমবয়সী) সম্পূর্ণরূপে মাতৃদুগ্ধপোষ্য। ভারতীয় শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা ৪৬ শতাংশ। অথচ সদ্যোজাত থেকে শুরু করে জন্মের পর অন্তত ছ’মাস পর্যন্ত শিশুর আহার্য কেবলমাত্র এই মাতৃদুগ্ধই হওয়া উচিত। আরো লজ্জাজনক পরিসংখ্যান এই যে, অপর্যাপ্ত স্তন্যপানের কারণে বার্ষিক শিশুমৃত্যুর সংখ্যা প্রায় আট লক্ষ, যেটা মোট শিশুমৃত্যুর (৫ বছরের নীচে) ১৩ শতাংশ। গবেষণা বলছে, মাতৃদুগ্ধ সেবনে জন্মের ছ’মাসের মধ্যে শিশুমৃত্যুর সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে ১৪ গুন হ্রাস পায়। তাই, মাতৃদুগ্ধ অমৃত সমান কথাটা অত্যুক্তি নয়। মাতৃদুগ্ধের উপকারিতা আমরা মোটামুটি সকলেই অল্পবিস্তর জানি। পর্যাপ্ত স্তন্যপান শিশুর সবরকম পুষ্টি যোগানে সক্ষম, যা শিশুর শারীরিক, বৌদ্ধিক, ও মানসিক বিকাশে অপরিহার্য। এছাড়া শিশুদের শ্বাসজনিত সংক্রমণ, উদরাময় প্রভৃতি রোগ থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি অস্বাভাবিক স্থূলতা (obesity) এবং অসংক্রামক রোগ (non-communicable diseases) যেমন শ্বাসকষ্ট ও ডায়াবেটিস এর মত ভবিষ্যৎ শারীরিক জটিলতাকেও প্রতিহত করে থাকে। শুধুমাত্র শিশুই নয়, মায়ের শরীরের জন্যও দুগ্ধ-নিঃসরণ খুবই উপকারী। সন্তান প্রসবের অনতিবিলম্বে স্তন্যদান করলে প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ (postpartum haemorrhage)-এর সম্ভাবনা কমে। পাশাপাশি, স্তন্যদানের দীর্ঘমেয়াদী ফলস্বরূপ শরীরে Type-2 ডায়াবেটিস, ব্রেস্ট, ইউটেরাইন, এবং ওভারিয়ান ক্যানসারের সম্ভাবনা কম হয় বলে জানা গেছে।

স্তন্যদানের দীর্ঘমেয়াদী ফলস্বরূপ শরীরে Type-2 ডায়াবেটিস, ব্রেস্ট, ইউটেরাইন, এবং ওভারিয়ান ক্যানসারের সম্ভাবনা কম হয় বলে জানা গেছে।

 

এত কিছু জানার পরেও তবুও আমি এই যে চলেছি আমার ক্রয়ক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমার ইনফ্যান্ট ফর্মুলাটা বগলস্থ করে বাড়ি গিয়ে পিতৃত্ব জাহির করে সংসারের পিঠ চাপড়ানির আশায়, তার কারণটা কি? যে কারণটা আমি চেপে যাচ্ছি সেটা হল, ফর্মুলা ফিডিংয়ের ঝুট ঝামেলা কম। তবে সবাই তো আর আমার মত নয়। সদ্যজাত শিশুর বাবা-মায়েদের একটা বড় দুশ্চিন্তা থাকে যে স্তন্যপান করালে শিশু পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ পাচ্ছে কিনা। এক থেকে ছয় মাসের শিশুর দৈনিক দুধের চাহিদা থাকে গড়ে ৫৭০ থেকে ৯০০ মিলিলিটার। তাই দিনে ৮ বার স্তন্যপানে প্রতিবার মোটামুটি ৭০-৯০ মিলিমিটার (১/৪-১/৩ কাপ) মায়ের দুধ তাদের জন্য যথেষ্ট। অনেক সময়ই দেখা যায় যে ফর্মুলা পানকারী শিশুরা অনেক বেশি (প্রায় ৪৯ শতাংশ বেশি) পরিমাণ ফর্মুলা গলাধঃকরণ করছে। এর প্রধান কারণ হল一 ফর্মুলা অনেক সহজে বোতল থেকে নির্গত হয় আর তাতে শিশুদের বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা, তা হল ফর্মুলাতে leptin এবং adiponectin-এর মত হরমোনের (adipokine) অভাব থাকে, যে হরমোনগুলি শিশুর ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তি বিপাকের মত পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফর্মুলাতে ওই হরমোনগুলো না থাকায় শিশুর ক্ষুধা নিবৃত্তির সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছায় না। তাই মায়ের দুধে শিশুর খিদে মেটে না বলে আশঙ্কার কোনো প্রয়োজন নেই। এই হরমোন ছাড়াও কি তাহলে বেবি ফর্মুলাতে মাতৃদুগ্ধের তুলনায় অন্য কোন উপাদানে ঘাটতি থাকে? ফর্মুলা হল শুধুমাত্র শিশুর খাবার, কিন্তু মাতৃদুগ্ধ হল একটি জটিল পুষ্টিপ্রদানকারী জৈব-তরল যা খাবারের পাশাপাশি মায়ের শরীর থেকে শিশুর শরীরে বিভিন্ন অ্যান্টিবডি, এনজাইম, দীর্ঘ-শৃঙ্খল ফ্যাটি অ্যাসিড, এবং হরমোনের যোগান দেয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, মাতৃদুগ্ধ আরেকটি বিশেষ এবং অনন্য উপাদানের উৎস一 যৌগিক মাতৃদুগ্ধ শর্করা (human milk oligosaccharide, HMO)। এই HMO মাতৃদুগ্ধ ছাড়া কোথাও পাওয়া যায় না। কি এমন এই বিশেষ শর্করা? কি তার চরিত্র?

শিশুখাদ্যে প্রোটিন ও ফ্যাট নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা নিয়ে কিন্তু ততটা চোখে পড়ে না। অথচ মাতৃদুগ্ধের প্রায় ৬২% উপাদান এই শর্করা, যার মধ্যে ৫৪% হল ল্যাকটোজ নামের যৌগিক শর্করা আর বাকি ৮% হল এই মাতৃদুগ্ধ শর্করা বা HMO। যদিও ল্যাকটোজও একরকমের শর্করা কিন্তু তাকে HMO ওর মধ্যে গণ্য করা হয় না। HMO একেবারেই অনন্য এবং শুধুমাত্র মাতৃদুগ্ধেই তা মেলে। ল্যাকটোজ এবং লিপিড বা স্নেহ পদার্থের পরেই মাতৃদুগ্ধের তৃতীয় সর্বোচ্চ উপাদান এই HMO যা প্রতি লিটারে গড়ে ৫–১৫ গ্রাম বর্তমান। শিশু-প্রসবের পরে মাতৃস্তন থেকে যে প্রথম দুধ (colostrum) নির্গত হয় তাতে এই HMO এর পরিমান থাকে ২০–২৫ গ্রাম/লিটার। HMO এর মত, গরুর দুধে একশ্রেণীর যুগ্ম শর্করা (Bovine milk oligosaccharide, BMO) পাওয়া যায়, যার পরিমাণ লিটার প্রতি কেবলমাত্র ৫০ মিলিগ্রাম। তাছাড়াও, HMO এবং BMO-এর মধ্যে বিভিন্ন শর্করার প্রকারভেদ এবং কিছু বিশেষ শর্করার উপাদানে (Fucose এবং Sialic acids) বিস্তর তারতম্য দেখা যায়।

 

চিত্র ১:

 

 

তা হঠাৎ গল্পের মধ্যে গরুকে টেনে আনলাম কেন? না, না, গাছে তোলার জন্য নয়। এর কারণ, ফর্মুলা তৈরি হয় মূলত গরুর দুধ (স্কিমড) থেকে এবং তাতে কিছু উদ্ভিজ্জ/ প্রাণীজ স্নেহপদার্থ, ভিটামিন এবং এনজাইম যোগ করা হয়। কিন্তু উপরের চিত্র থেকেই পরিষ্কার যে অ্যান্টিবডি, হরমোন, এনজাইম, স্টেম-সেল এর পাশাপাশি মাতৃদুগ্ধে নিঃসৃত এই বিরাট পরিমাণ শর্করা (HMO) থেকে বঞ্চিত হয় ফর্মুলা-পানকারী শিশুরা।

উনিশ শতকের শেষভাগে জার্মান-অস্ট্রিয়ান শিশু-বিশেষজ্ঞ এবং মাইক্রোবায়োলজিস্ট থিওডোর এসহেরিখ এবং আর্নস্ট মোরো মাতৃদুগ্ধে এক বিশেষ উপাদানের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যা শিশুদের অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারে সাহায্য করে। সমসাময়িক রসায়নবিদ এশবাহ মাতৃদুগ্ধে ল্যাকটোজ ছাড়া কিছু ‘বিশেষ শর্করার’ কথা জানিয়েছিলেন। তবে HMO এর কয়েকটি উপাদানের রাসায়নিক গঠনের প্রথম হদিস মেলে তারও প্রায় ৮০ বছর পর ১৯৫০–৬০ সালে, বিজ্ঞানী রিচার্ড কুন ও পল জিওর্জি এর হাত ধরে। এরপর গবেষণাগারে অনেক ‘দুধ’ গড়িয়ে যাওয়ার পর, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫০ টিরও বেশি HMO এর অস্তিত্ব নির্ধারণ করা গেছে। এখানে জেনে রাখা দরকার যে প্রত্যেক মা কিন্তু এই সবকটি HMO উপাদান নিঃসরণ করে না। স্তনদুগ্ধে বর্তমান HMO এর উপাদান এবং তার আনুপাতিক পরিমাণ অনেকটাই নির্ভর করে মায়ের জিনগত গঠন এবং ব্লাড গ্রুপের উপর। শিশুর বেড়ে ওঠার সাথে সাথে মাতৃদুগ্ধে এই HMO এর বিভিন্ন উপাদানের পরিবর্তন ঘটতে থাকে ও সামগ্রিকভাবে এই HMO এর আকার দীর্ঘতর হতে থাকে। ঠিক কি কারণে এবং কোন কার্যপদ্ধতিতে শিশুর চাহিদা অনুযায়ী মাতৃদুগ্ধের উপাদানের পরিবর্তন ঘটে তা এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে অজানা। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে শিশুর জন্য মাতৃদুগ্ধ একদম ফিতে মেপে তৈরি হতে থাকে। কতটা জরুরি এই HMO? কি-ই বা তার অবদান একজন শিশুর সামগ্রিক বিকাশে?

HMO এর সবথেকে বড় ভূমিকা থাকে শিশুর পাচন ও বিপাক ক্রিয়ার উপর। HMO প্রধানত প্রিবায়োটিক (প্রোবায়োটিক নয় কিন্তু) হিসাবে কাজ করে। প্রিবায়োটিক হল সেইসব খাদ্য উপকরণ যা অন্ত্রে ‘ভালো ব্যাকটেরিয়ার’ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে আর শিশুদের পেট-ফাঁপা ও উদারাময় জাতীয় অসুস্থতা থেকে রক্ষা করে। বড়দের ক্ষেত্রে এই প্রিবায়োটিক-এর উৎস হল হাই ফাইবার ফুড一 যেমন কলা, পেঁয়াজ, শাকসবজি ইত্যাদি। শিশুদের ক্ষেত্রে ফাইবারের একমাত্র উৎস হল মায়ের দুধের HMO উপাদানগুলি। বলাই বাহুল্য যে বাজারের ‘প্রিবায়োটিক যুক্ত’ ফর্মুলা মাতৃদুগ্ধের প্রিবায়োটিক উপাদান সরবরাহ করতে অক্ষম। সাধারণভাবে, ফর্মুলাতে প্রিবায়োটিক হিসাবে Galacto-oligosaccharide (GOS) এবং Fructo-oligosaccharide (FOS) ব্যবহার করা হয়, যেগুলো মূলত উদ্ভিজ্জ শর্করা এবং গঠনগতভাবে HMO এর থেকে অনেক আলাদা। তাই সাধারণ ফর্মুলাতে Fucose, Sialic acids, ও N-acetylglucosamine -এর মত জরুরী কিছু মৌলিক শর্করা অবর্তমান। ফর্মুলাতে বিভিন্ন ফ্লেভারিং এজেন্ট-ও (vanillin বা ethyl vanillin) ব্যবহার করা হয় যা শিশুর পাচন এবং বিপাক ক্রিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং ভবিষ্যতে মিষ্টি-স্বাদের খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ায়। মাতৃদুগ্ধপোষ্য শিশুর অন্ত্রে ‘ভালো ব্যাকটেরিয়ার’ উপস্থিতিতে বিভিন্ন ক্ষতিকর রোগজীবাণু বাসা বাঁধতে পারে না। এক্ষেত্রে কিছু বিশেষ HMO উপাদান anti-adhesion এর কাজ করে। শিশুদের উদারাময় এর জন্য দায়ী Campylobacter jejuni ব্যাকটেরিয়াকে 2’-FL (অন্যতম HMO উপাদান) অন্ত্রের কোষে বাসা বাঁধতে দেয় না। শিশুদের আমাশয় এর জন্য দায়ী প্রোটোজোয়ার অন্ত্রকোষে সংসক্তিতেও বাধা দান করে এই HMO। মাতৃদুগ্ধপানকারী শিশুরা দৈনিক কয়েক গ্রাম HMO গলাধঃকরণ করে এবং তার প্রায় ৫% মূত্রের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে এই HMO শুধুমাত্র পৌষ্টিকতন্ত্রই নয়, উপরন্তু রক্তের মাধ্যমে শরীরের নানা অঙ্গে পৌঁছে যায়। HMO শিশুদের ইমিউনিটি ডেভলপমেন্টেও সাহায্য করে। HMO প্লেটলেট ও নিউট্রোফিল সংযুক্তিকে কমিয়ে বিরোধী প্রদাহজনক অবস্থা তৈরি করে। Sialic acid যুক্ত HMO এর প্রভাব সাইটোকাইন উৎপাদন এবং T-cell প্রতিক্রিয়াতেও দেখা যায়। শৈশবে অ্যালার্জি-কারক বস্তুর প্রতি ইমিউন রেসপন্স তৈরিতেও HMO এর অবদান অনস্বীকার্য। ফর্মুলাতে HMO এর ঘাটতি পূরণ করতে সম্প্রতি কিছু ফর্মুলা প্রস্তুতকারক কোম্পানি কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষিত 2’-FL শর্করা-যুক্ত ফর্মুলা বাজারে এনেছে। বহুজাতিক কোম্পানির সেই ফর্মুলার দাম আমার মত মধ্যবিত্তের সাধ্যের বাইরে আর তাতে 2’-FL এর পরিমান তুলনামূলকভাবে কম। তাই বলাই বাহুল্য যে মাতৃদুগ্ধে বহুরকমের HMO সম্ভার পয়সা দিলেও মিলবে না। তাই পাগলা, পয়সা দিয়ে বাঘের দুধ পাওয়া যায় কিন্তু মায়ের দুধ পাওয়া যায় না।

তাহলে উপায় কি? উত্তর জলের মতো সোজা一 অসম্ভব না হলে শিশুকে মায়ের দুধ পান করাতেই হবে। যদি প্রসবের পর স্বাভাবিকভাবে দুগ্ধ-নিঃসরণ না হয়, স্তন্যদানের শুরুটা মায়েদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। প্রসবোত্তর বেদনা ও ক্লান্তিতে তাই অনেকসময় তারা হাল ছেড়ে দেন। সেক্ষেত্রে অভিজ্ঞ পরিজন বা lactation consultant খুব জরুরী ভূমিকা নিতে পারে। এছাড়া পরিবারের উৎসাহ প্রদান এবং সাহায্য একান্ত ভাবে কাম্য। জন্মের প্রথম দিকে শিশুর ২–৩ ঘন্টা অন্তর স্তন্যপান যেন ব্যাহত না হয়। আমার মত নতুন বাবারা যারা কাজের বাহানা দিয়ে বালিশ-কম্বল নিয়ে রাতে অন্য ঘরের দরজা খুঁজি, সেটা যাতে না করি সেটারও খেয়াল রাখতে হবে। World Breastfeeding Week এর এবছরের থিম “Protect breastfeeding: a shared responsibility”। তাই শুধুমাত্র নবজাতকের পরিবারই নয়, আমাদের সবার সামাজিক দায়িত্বের কথা ভুললে চলবে না। মায়ের পর্যাপ্ত পুষ্টির বন্দোবস্ত করা, সরকারি হাসপাতাল ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মীদের lactation consultation এর পাঠ দেওয়া, কর্মক্ষেত্রে lactation/nurshing room এর ব্যবস্থা করা, পাবলিক প্লেসে স্তন্যদানরত মায়েদের প্রাইভেসি বজায় রাখা一 এরকম নানা উদ্যোগ নিতে হবে। সবরকম সামাজিক স্তরে মাতৃদুগ্ধের উপকারিতা এবং মাতৃস্তনের ‘যৌনতা বনাম কার্যকারিতা’ সম্বন্ধে সচেতনতা গড়ে তোলাটা জরুরী। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) এবং UNICEF-এর যৌথ উদ্যোগে শিশুদের মাতৃদুগ্ধ পানের শোচনীয় অবস্থার উন্নতির বিশেষ চেষ্টা চলছে। তাদের লক্ষ্য ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ৫০% শিশুকে সম্পূর্ণরূপে স্তন্যপানের উপর নির্ভরশীল করে তোলা। অবশ্যই এই উন্নতি আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া কখনোই সফল হবে না। WHO এবং UNICEF এর যে যৌথ সুপারিশগুলো মনে রাখতে হবে, তা হল一
জন্মের প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই শিশুর স্তন্যপানের ব্যবস্থা প্রয়োজন। মাতৃদুগ্ধ নিঃসরণ না হলেও skin-to-skin contact অত্যন্ত জরুরী।
✅ জন্মের প্রথম ছয় মাসে শিশুকে কেবলমাত্র মাতৃদুগ্ধ পান করানো (জলপান-ও নয়)।
ছয় মাসের পর শিশুকে মাতৃদুগ্ধের সাথে নিরাপদ, পর্যাপ্ত পুষ্টিকর ও বয়সভিত্তিক supplementary food দেওয়া যেতে পারে।
শিশুকে অন্তত দুই বছর বা তার বেশি বয়স পর্যন্ত স্তন্যপান করানো।

চিত্র :

 

 

 

 

এত কিছু ভাবতে ভাবতে কখন যে ফার্মেসিটা ছেড়ে এসেছি বুঝতে পারিনি। মনে মনে ঠিক করলাম, যখন আমার বাড়ির নতুন অতিথির আর তার মায়ের শরীর সঙ্গ দিচ্ছে, তখন আর কোনো ফর্মুলা নয়, মায়ের দুধই হোক তার একমাত্র আহার। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে চোখ গেল রাস্তার ধারের দর্জি দোকানটায়, নাম Tailor-Made। আধুনিক রেডিমেড জামা-কাপড়ের বাজারে বৃদ্ধ দোকানীর সেলাই মেশিন আর বিশেষ চলে না। দোকানে চলছে শুধু একটা রেডিও, আর তাতে বেজে চলেছে一
“…..বিধির প্রথম দান এ বিশ্বসংসারে
মাতৃস্নেহ (পড়ুন মাতৃদুগ্ধ), কেন সেই দেবতার ধন
আপন সন্তান হতে করিলে হরণ
সে কথার দিয়ো না উত্তর….”
———————————————
~ কলমে এলেবেলের অতিথি অনিরুদ্ধ শাসমল ~

অনিরুদ্ধ নিউ ইয়র্কে ফাইজার (Pfizer) ভ্যাকসিন রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্টে কর্মরত বিজ্ঞানী।

 

 

 
 
 


► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

 

 
 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।