বিজ্ঞানের খবর: নিজে নিজে সেরে ওঠার গল্প

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
268 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~


বিজ্ঞান জগতে ভাঙা বিষয়টা চিরকালই ভীষণ কৌতূহলোদ্দীপক। মানুষ জানতে চেয়েছে একটা বস্তুকে আমরা যদি ক্রমাগত ভাঙতে থাকি, তবে শেষ অবধি আমরা কি পাব? সেই প্রশ্ন মানুষকে পরমাণু, নিউক্লিয়াস, ইলেক্ট্রন প্রোটনের সন্ধান দিয়েছে। তবে এই ভাঙার প্রশ্নটা তো দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে। মাটির পৃথিবীতে ভাঙা মানে সোজা কোথায় কোনো কিছু নষ্ট হওয়া। হাত থেকে কাঁচের গ্লাসটা পড়ে ভেঙে গেল, কিংবা পকেট থেকে মোবাইলটা বার করতে গিয়ে মেঝেতে পড়ল আর স্ক্রিনটা মাঝ বরাবর চিড় খেয়ে গেল। তার মানে বাস্তব জগতে ভাঙা মানে অপচয়। তবে অপচয় হতে থাকবে আর বিজ্ঞানীরা কিছু ভাববেন না সে নিয়ে, তা কি করে হয়? একটা দিকে অবশ্যই বিজ্ঞানীরা চাইবেন যে এমন জিনিস তৈরি করতে, যাতে তা সহজে না ভাঙে, আবার এমন জিনিসও তো বানানো যায় যা ভাঙলেও আবার নিজে থেকেই জুড়ে যাবে। এই রকম ভাঙা গড়ার খেলায় ভারতের একটা গবেষণা বর্তমানে বেশ চর্চিত হচ্ছে, আর সেটাই এই লেখার মূল বিষয়।

 এমন জিনিসও তো বানানো যায় যা ভাঙলেও আবার নিজে থেকেই জুড়ে যাবে। 

কোনো জিনিস ভেঙে যাওয়া মানে তার সাধারণ অবস্থায় যে সজ্জা সেটা কোনো ভাবে ব্যাহত (Disrupt) হওয়া। এই ছিন্নাবস্থা (disruption) থেকে কি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব? সাধারণ অভিজ্ঞতা বলে, না সম্ভব নয়; অন্তত সাধারণ অবস্থায়, সাধারণ বস্তুর ক্ষেত্রে। কিন্তু এমন কিছু বস্তু আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে, যাদের ভাঙা অবস্থা থেকে পূর্বাবস্থায় নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু সেই বস্তুগুলো সবই নরম ঘন বস্তু (Soft matter); কিছু বিশেষ জেল, পলিমার এই রকম জিনিসের উদাহরণ। নরম ঘন বস্তু সেই সব জিনিস, যাদের ওপরে কোনো ভাবে আকৃতি পরিবর্তন করার চেষ্টা হলে তারা সেই চেষ্টাকে প্রতিহত করতে পারে না। কঠিন বস্তুতে কি এরকম স্ব-নিরাময় সম্ভব? আইসার (IISER) কলকাতা, আইআইটি খড়গপুর আর RWTH Aschen বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বিশেষ ধরণের কেলাসে এই স্ব-নিরাময় ক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই বিশেষ কেলাসটির নাম পিজোইলেকট্রিক কেলাস। এটির বিশেষত্ব হল, এই কেলাসের দুটি নির্দিষ্ট অভিমুখ (unique direction) থাকে, একটি দিক বরাবর যান্ত্রিক পীড়ন (Mechanical Stress) প্রয়োগ করলে অন্যদিকে বৈদ্যুতিক সংকেত(Electrical Signal) পাওয়া যায়।

এই স্ব-নিরাময় ঘটনাটি দেখা গিয়েছে বাইপাইরাজল নামক একটি জৈব পিজোইলেকট্রিক কেলাসে। এই বস্তু সম্পর্কিত রসায়ন এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ; কারণ কোনো বস্তুর আকার ধরে রাখে, সেই বস্তু তৈরি হয়েছে যে অণু বা পরমাণু দিয়ে, তাদের মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষন বল। আর এই বলের পরিমানের উপর নির্ভর করবে,আমরা যে বস্তুটি ভাঙব, সেটি আবার নিজের পূর্বাবস্থায় ফিরবে কি না। পরীক্ষাগারে এই বাইপাইরাজল কেলাসের ছোট ছোট সূঁচ তৈরি করা হয়েছিল। তাদের মাত্রা (dimension) মোটামুটি লম্বায় ২ মিলিমিটার আর চওড়ায় ০.২ মিলিমিটার। উপযুক্ত চাপ প্রয়োগ করে এই সূঁচগুলোকে ভাঙা হয়েছিল, এবং তারপর পর্যবেক্ষণ করা হয় যে সময়ের সাথে সেই ভাঙা সূঁচগুলো আবার নিজের পূর্বাবস্থায় ফিরতে পারে কি না, এবং হ্যাঁ, দেখা যায় যে তারা ফিরেছে। 

এটা একটা যুগান্তকারী গবেষণা, কারণ প্রথম স্ব-নিরাময়ক কঠিন বস্তু পাওয়া গেল পরীক্ষাগারে। তবে এমন নয় যে এই আবিষ্কারের ফলে কাল বাজারে এমন আই ফোন চলে আসবে, যেটা হাত থেকে পড়ে গেলেও তার কাঁচ আপনাআপনি জুড়ে যাবে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা আদপে এভাবে হয় না। পরীক্ষাগারে একটা স্ব-নিরাময়ক কঠিন পদার্থ পাওয়া গিয়েছে, তার মানে তাদের মধ্যবর্তী আণবিক বিন্যাস, কেলাস গঠন, অণুদের মধ্যবর্তী আকর্ষণ বল নিয়ে আরো গবেষণা করলে হয়ত এমন স্ব-নিরাময়ক কঠিন বস্তু আরো তৈরি করা সম্ভব হবে, যা পরবর্তীকালে বাজারজাত পণ্যে প্রয়োগ করা যাবে, বা বলা ভালো প্রয়োগ করা যেতে পারে। 

https://phys.org/news/2021-07-autonomous-self-healing-piezoelectric-molecular-crystals.html

https://science.sciencemag.org/content/373/6552/321

(চিত্র সংগৃহীত)

———————————————–

~ কলমে এলেবেলে ঋত্বিক ~

এলেবেলের দলবল

► লেখা ভাল লাগলে অবশ্যই লাইক করুন, কমেন্ট করুন, আর সকলের সাথে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন। 

► এলেবেলেকে ফলো করুন। 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।