বিজ্ঞানের খবর: আনুমানিক ১৫,০০০ বছর পূর্বের জীবাণু ও ভাইরাসের খোঁজ মিলল তিব্বতী হিমবাহে 

প্রিয়জনদের শেয়ার করুন
207 বার লেখাটি পঠিত হয়েছে ~~~

~ কলমে ডঃ অনন্য আলি ~

(ইন্টার্ন হিসেবে এলেবেলের সাথে যুক্ত)


হিমবাহের হিম-সংরক্ষণ থেকে বহু তথ্য পাওয়া সম্ভব— প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশ ও জীব-সম্পদ বিষয়ে। হিমবাহে বন্দী অবস্থায় সংরক্ষিত থাকা এইসব জীব-দেহাবশেষ, জীবাণু ও জৈবকণা ইত্যাদি সংক্রান্ত গবেষণা বহুদিন থেকেই নানাবিধ কারণে বৈজ্ঞানিকদের কাছে উৎসাহের বিষয়।

কোনো বিশেষ হিমবাহের বিভিন্ন স্তরগুলি বিভিন্ন সময়ে উল্লম্ব ভাবে (উপর-নীচে ভাবে) সঞ্চিত হয়। সুতরাং, কোনো হিমবাহের উল্লম্বচ্ছেদের নির্দিষ্ট অংশে যদি কোনো বিশেষ ভাইরাস বা জীবাণু বা জীব-দেহাংশ বা তাদের বংশগতীয় পদার্থ ইত্যাদি তুলনায় অধিক পরিমাণে পাওয়া যায়, তাহলে ওই হিমবাহের ওই অংশটির সঞ্চিত হওয়ার নির্দিষ্ট সময়ে সেই পরিবেশে, ওই ভাইরাসটির/জীবাণুটির/জীবটির আধিপত্য ছিল— পরোক্ষে এই ধারণাও করা যায়। যদি কোনো ভাইরাসের উল্লিখিত অংশ বেশি পরিমাণে পাওয়া যায় তবে বলা যায় যে ভাইরাসটি তার সমসাময়িক জীবজগৎকে সংক্রমণে সক্ষম ছিল এবং বহুক্ষেত্রে পর্যবেক্ষিত যে উহারা সাহায্যকারী জিনের প্রকাশ ঘটিয়ে, ওই নির্দিষ্ট পরিবেশে উহার পোষক জীবটিকে টিকে থাকার জন্য সাহায্যেও সক্ষম। এইরূপে কোনোও নির্দিষ্ট ভাইরাস কোনো নির্দিষ্ট বাস্তুতন্ত্রে উহার পোষককে প্রভাবিত করে, ওই নির্দিষ্ট বাস্তুতন্ত্রে বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

হিমবাহ সংরক্ষিত অণুজীব ও ভাইরাসকণার পর্যালোচনা করার মূল অসুবিধাগুলি হল— প্রথমত, হিমবাহ সঞ্চিত অঞ্চলে অভিযান চালানো প্রযুক্তিগতভাবে জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ। দ্বিতীয়ত, অত্যন্ত কম পরিমাণের জীবভরের ও নিউক্লিক অ্যাসিডের প্রাপ্তি। ফলে, পরবর্তী জীব-রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেগুলি শুরুর সময় বিক্রিয়কের পরিমাণগত ধর্মের উপর অধিক নির্ভরশীল ও স্পর্শকাতর, সেগুলির সম্পাদন ও ফলাফলের বিশ্লেষণে বহু অসুবিধা দেখা দেয়।  তৃতীয়ত, হিমবাহের অংশ সংগ্রহ/সংরক্ষণ/স্থানান্তরণ ইত্যাদি প্রক্রিয়ার সময়ে দূষক পদার্থের মিশ্রণ থেকে হিমবাহের সংগৃহীত অংশকে সুরক্ষিত ভাবে পৃথক রাখা।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় (মুখ্যতঃ ওহায়ো স্টেট ইউনিভারসিটি)- এর গবেষকবৃন্দ উপরিউক্ত সমস্যাগুলির সমাধানে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং ‘গুলিয়া হিমচূড়া’ নামক একটি স্থানে অভিযান চালান বিভিন্ন সময়ে, যার মধ্যে সর্বশেষটি ২০১৫ খৃষ্টাব্দে বলে দাবী করেছেন তাঁরা। জায়গাটি, চীনদেশের উত্তর-পশ্চিম তিব্বতীয় মালভূমিতে অবস্থিত, যার অক্ষাংশ ৩৫.২৫º  উত্তর এবং দ্রাঘিমাংশ ৮১.৪৮º পূর্ব। (নিম্নের চিত্র দ্রষ্টব্য)

চিত্র ১ – ক) চীনদেশে গুলিয়া হিমচূড়ার অবস্থান। খ) গুলিয়া হিমচূড়ার শীর্ষ থেকে উল্লম্ব হিমদণ্ডের সংগ্রহ। গ) সংগৃহীত ‘এস থ্রী’ কেন্দ্রক – এর একটি চিত্ররূপ। হিমদণ্ডের ঊর্ধ্বপ্রান্ত বর্তমান সময়ের অনুরূপ। দণ্ড অনুসারে নীচের দিকে প্রাচীনতর হিম স্তরের অবস্থান আশা করা যায়। [চিত্রঋণঃ(Zhong et al. 2021), সমগ্র চিত্রটি আসল প্রবন্ধের চিত্রের অনুকরণে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে হাতে এঁকে। কাজেই সর্বত্র সঠিক মানদণ্ডের অনুরূপ হয়তো হয়ে ওঠে নি। লেখক এই ঘটনার জন্য দুঃখিত। ]

 

উপরিউক্ত অভিযান থেকে গবেষকবৃন্দ, গুলিয়া হিমচূড়া’র শীর্ষক থেকে একটি ৫০.৮ মিটার উল্লম্ব হিমদণ্ড সংগ্রহ করেন, যার নাম ওনারা রাখেন ‘এস থ্রী’ কেন্দ্রক। এই ‘এস থ্রী’ কেন্দ্রক হিমদণ্ডটির শেষ ভাগ থেকেই ওনারা প্রায় ১৫,০০০ বছরের পুরনো ভাইরাসের বংশগতীয় পদার্থ খুঁজে পেয়েছেন।

হিমদণ্ডটির দুটি ভিন্ন স্তর (যথাক্রমে- ডি ২৫ ও ডি ৪৯, চিত্র ১) থেকে সর্বমোট ৩৩-টি ভাইরাসের কার্যকরী শ্রেণীবিন্যাসগত একক$১ (viral Operational Taxonomic Unit বা vOTU) খুঁজে পাওয়া গেছে— যাদের দৈর্ঘ্য কমপক্ষে ১০ হাজার একক (>= 10kb)। এই ৩৩-টির মধ্যে মাত্র ৪-টিকে (প্রায় ১২%) এখনও অব্ধি জানা শ্রেনীবিন্যাসের মধ্যে রাখা গেছে আর ২-টিকে (প্রায় ৬%) হিম-সম্পর্কিত-ভাইরাসের সাথে সম্পর্কিত পাওয়া গেছে।

সুতরাং, বাকী ২৭-টি (প্রায় ৮২ %) তুলনায় অজানা ভাইরাস আমাদের বোঝায় যে হিমবাহ সংরক্ষিত এই জীবকণা ও জীবাণুগুলি হয়তো আমাদের চেনা পৃথিবীর তুলনায় অন্যরকম পরিবেশ উপভোগ করতো।

এই ২৭-টির মধ্যে ৩-টি ভাইরাসের কার্যকরী শ্রেণীবিন্যাসগত একককে সংগৃহীত হিমদণ্ডের একেবারে শেষ স্তরেও (ডি ৪৯) পাওয়া গেছে। এই শেষ স্তরের বয়স নির্ণীত হয়েছে আনুমানিক ১৪,৪০০ বছর$২। সুতরাং, অনুমেয় যে উক্ত ভাইরাস তিনটি প্রায় ১৫,০০০ বছর আগের পৃথিবীতে সক্রিয় ছিল।

প্রাপ্ত বিভিন্ন ভাইরাসগুলির জিনের ক্রমের তুলনামূলক পর্যালোচনা থেকে পাওয়া গেছে যে—

প্রথমত, ভাইরাসগুলি তাদের পোষকের পুষ্টিদ্রব্য আহরণে সাহায্য করত,

দ্বিতীয়ত, হয়ত ভাইরাসগুলি মাটি অথবা উদ্ভিদ থেকে উৎপন্ন হয়েছিলো।

উক্ত গবেষণাটি ‘বি এম সি মাইক্রোবায়োম’ পত্রিকায় প্রবন্ধাকারে গত ২০শে জুলাই, ২০২১; প্রকাশিত হয়েছে।

বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ  উপরের লেখাটি মূলত নীচে দেওয়া তথ্যসূত্রের প্রথম প্রবন্ধটি  অনুসারে লেখা। প্রবন্ধটিতে অবশ্যই অন্য আরও জীবাণুদের প্রাপ্তি এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলি সবিস্তারে বর্ণিত আছে, যাদের মধ্যে মাত্র কয়েকটির বিষয়ে (মূলত ১৫,০০ বছরে পুরনো ভাইরাস) উপরের আলোচনায় লেখা হয়েছে।

তথ্যসূত্র

  1. Zhong ZP, Tian F, Roux S, et al. Glacier ice archives nearly 15,000-year-old microbes and phages. Microbiome. 2021;9(1):1-23. doi:10.1186/s40168-021-01106-w
  2. Wu D, Doroud L, Eisen JA. TreeOTU: Operational Taxonomic Unit Classification Based on Phylogenetic Trees. 2013;(November). http://arxiv.org/abs/1308.6333.
  3. Lladó Fernández S, Větrovský T, Baldrian P. The concept of operational taxonomic units revisited: genomes of bacteria that are regarded as closely related are often highly dissimilar. Folia Microbiol (Praha). 2019;64(1):19-23. doi:10.1007/s12223-018-0627-y
  4. Mysara M, Vandamme P, Props R, et al. Reconciliation between operational taxonomic units and species boundaries. FEMS Microbiol Ecol. 2017;93(4):1-12. doi:10.1093/femsec/fix029
  5. Beck D, Settles M, Foster JA. OTUbase: An R infrastructure package for operational taxonomic unit data. Bioinformatics. 2011;27(12):1700-1701. doi:10.1093/bioinformatics/btr196
  6. Blaxter M, Mann J, Chapman T, et al. Defining operational taxonomic units using DNA barcode data. Philos Trans R Soc B Biol Sci. 2005;360(1462):1935-1943. doi:10.1098/rstb.2005.1725
  7. Haeberli W, Brandova D, Burga C, et al. Methods for absolute and relative age dating of rock-glacier surfaces in alpine permafrost. Proc Eighth Int Conf Permafr. 2003:343-348.
  8. Racoviteanu AE, Williams MW, Barry RG. Optical remote sensing of glacier characteristics: A review with focus on the Himalaya. Sensors. 2008;8(5):3355-3383. doi:10.3390/s8053355
  9. Fuchs M, Owen LA. Luminescence dating of glacial and associated sediments: review, recommendations and future directions. Boreas. 2008;37(4):636-659. doi:10.1111/j.1502-3885.2008.00052.x

———————————————–

লেখক পরিচিতি : সরকার পোষিত বালিকা মহাবিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী আয়োগ অনুমোদিত)।

 

 

 

 

Leave a Reply

free hit counter
error

লেখা ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন।